জড় সমস্যা: রাগ বা ক্রোধ

0
482

শ্রীমৎ রাধানাথ মহারাজ: 

কামক্রোধবিমুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্।
অভিতো ব্রক্ষনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্। গীতা ৫/২৬

অনুবাদ: কাম-ক্রোধশূন্য, সংযতচিত্ত আত্মতত্ত্বজ্ঞ সন্ন্যাসীরা সর্বতোভাবে অচিরেই ব্রক্ষনির্বাণ লাভ করেন।

উক্ত বিষয়টি আলোচনার সুবিধার্থে আমরা এটিকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করেছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে এই পাঁচটি ভাগ আলোচনার মাধ্যমে আশা করি বিষয়টি সম্পর্কে আপনারা পূর্ণ সমাধান লাভ করতে পারবেন।

সেই পাঁচটি ভাগ হল যথাক্রমে- ১। সমস্যা ২। সমস্যার লক্ষণ ৩। ক্রোধের কারণ ৪। সমাধান ৫। সমাধানের প্রয়োগ
সমস্যা: রাগ বা ক্রোধ এই সমস্যাটির পেছনে বিবিধ কারণ জড়িত। আকাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হওয়াই হল এসব বিবিধ কারণের সারাংশ। ক্রোধের ফলে যে কিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে উদাহরণ না দিলেও চলবে। কারণ প্রায় প্রতিদিনই আমাদের চারপাশে এর যথেষ্ট উদাহরণ রয়েছে। তবুও বিশ্বে আলোচিত এমন কিছু উদাহরণ এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হল।

উদাহরণ: গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষত বিদ্যালয়গুলোতে বন্দুকের গুলিতে মানুষ মেরে ফেলার ঘটনা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বিষয় হল এই যে,ছাত্র-ছাত্রীরাই এ সমস্ত…সংঘর্ষে লিপ্ত। এর পেছনের অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হল যে ছাত্র-ছাত্রীরা যে সমস্ত সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছে তা মোকাবেলা করার সামর্থ্য তাদের নেই এবং তাদেরকে হতাশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সহায়তা করারও কেউ নেই। যার ফলে চরম ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তারা এ সংঘর্ষে লিপ্ত।
উদাহরণ: নেপালের রাজপুত্র তার মা-বাবা ও কয়েকজন ঘনিষ্ট আত্মীয়সহ নয়জনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করার মত নিন্দনীয় ঘটনা বিশ্বে খুব আলোচিত।একমাত্র কারণ ছিল রাজপুত্র পরিবার তার সঙ্গে একটি মেয়ের বিবাহের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ছিলেন।আকাঙ্খিত লক্ষ্য অপুরণে চরম ক্রোধের বশবর্তী হয়ে এ হত্যাকান্ডে লিপ্ত হন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি বিষয়টি বুঝতে সহায়তা করবে।
উদ্ধৃতি: ক্রোধ হল বাতাসের মত যেটি মনের প্রদীপকে নিভিয়ে দেয়।’
‘যদি হৃদয় একটি ভলকানো (ক্রোধের আগ্নেয়গিরি) হয় তবে কিভাবে সেখানে ফুল ফলাতে আশা কর।’
‘ক্রোধ হল এক শব্দে ‘বিপদ’।’
‘দিয়াশলাইয়ের মাথা আছে কিন্তু বুদ্ধি নেই, আর তাই জ্বলে উঠে।’
ক্রোধের ফলাফল: শারীরিকভাবে ক্রোধের কারণে নার্ভাস সিস্টেমের উপর সরাসরি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।যার ফলে একটি শরীর থেকে বিষাক্ত কিছু দ্রব্য নি:সৃত হয়।
উদাহরণ : একটি মেডিক্যাল জার্নালের প্রতিবেদনে ছাপানো হয় যে কিভাবে একজন মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সময় অতিরিক্ত ক্রোধের কারণে তার শিশুটি মারা যায়। কেননা অত্যাধিক ক্রোধগ্রস্ত অবস্থায় দুধ খাওয়ানোর সময় দুধের সঙ্গে এক প্রকার বিষাক্ত দ্রব্য নিঃসৃত হয়, আর শিশুটি তা গ্রহণের ফলে মারা যায়।
সামাজিকভাবে : শুধুমাত্র নিউইয়র্কেই অপরাধের হার,সমগ্র ভারতের অপরাধের হারের সমান ইউ.এস এতে এক নাম্বার ইন্ডাষ্টি হল প্রিজন ইন্ডাষ্টি(কারাগার ইন্ডাষ্টি)
অর্থনৈতিকভাবে : শুধুমাত্র হাঙ্গামা বা দাঙ্গা নিরসনের জন্য সারা বিশ্বে কোটি কোটি অর্থ ব্যয় হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে : অনেক বড় বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে শুধু ক্রোধের বশবর্তী হয়ে।
পারিবারিকভাবে : যে সমস্ত শিশুরা পরিবারের বিভিন্ন ক্রোধের সাক্ষী হয়ে বেড়ে উঠে, যার ফলে তাদের সামগ্রিক উন্নয়ন বাধা সৃষ্টি হয়।
রাজনৈতিকভাবে : রাজনৈতিক সমস্ত কার্যক্রম ক্রোধের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্টিত হয়। শুধু যে রাজনৈতিক ব্যাক্তিরা একে অপরের উপর ক্রোধান্বিত হয় তাই নয়, সাধারণ লোকেরাও রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের উপর ক্রোধান্বিত হয়।
উদাহরণ : তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে, কমিউনিষ্ট শাসনামলে একসময় সামগ্রিক অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছিল।রুটির জন্য লোকেরা লাইন ধরে অপেক্ষা করা এক খুব সাধারণ দৃশ্য ছিল। একজন ব্যক্তি লাইনে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় হতাশ হয়ে পড়ে এবং একসময় লাইন থেকে বিচ্যুত হয়ে সে তার বন্ধুকে বলল, ‘আমি এখন এই কমিউনিস্ট নেতাকে হত্যা করতে যাচ্ছি। হত্যা করতে গিয়ে সে যখন ফিরে আসে, তখন বন্ধু তার ফিরে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তার উত্তর দেন, ভেতরে ঐ নেতাকে হত্যার জন্যও এক দীর্ঘ লাইন।

সমস্যার লক্ষণসমূহ (ক্রোধের প্রকারভেদ):

১. ক্রোধকে দমিয়ে রাখা
কারণ: অনেকে মনে করে যে, তার ক্রোধান্বিত হওয়ার কোন অধিকার নেই। (বিশেষ পরিস্থিতিতে)
লক্ষণ-২: নীরব আচরণ
কারণ: অনেকে মনে করে যে, ক্রোধ প্রকাশ করা, এটি ঠিক নয় বা এটি অনেকটা ছেলেমানুুুষি।
লক্ষণ-৩: অসুস্থ বা উদ্ধিগ্ন হয়ে পড়ে।
কারণ : অনেকে মনে করে যে সে হয়ত আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে বা এই প্রবল অনুভুতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে না।
লক্ষণ-৪: অন্যের প্রতিক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে ক্রোধকে দমিয়ে রাখা।
কারণ: কেউ তার ক্রোধ প্রকাশ করলে পরিণামেত কি ফল হবে সে ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। এর উদাহরণ হল, ইংল্যঅন্ডে ৬০% অফিসের কর্মকর্তারা মনে মনে তাদের বস্‌কে হত্যা করতে উদ্যত হয়।
লক্ষণ-৫: জিনিস ভাঙ্গার প্রবণতা
কারণ: অনেক সময় যখন সে ক্রোধান্বিত হয় তখন অপরপক্ষে বোঝাতে অক্ষম হওয়া কিংবা অপরপক্ষের সঙ্গে কোনরকম বোঝাপড়া না হলেই এ রকম আচরণ করে।
লক্ষণ-৬: অন্য লোকদের উপর চড়াও হওয়া
কারণ: একজনের ক্রোধ অন্যজনের উপর ঝাড়তে চাওয়া
লক্ষণ-৭: শারীরিকভাবে আঘাত করা
কারণ: একটি দর্শন হল ‘সর্বোত্তম আত্মরক্ষা হল একটি ভাল অপরাধ’
লক্ষণ-৮: ভয় প্রদর্শন, চিৎকার চেঁচামেচি করা কিংবা সে কারো নিকটে যেতে ভয় পায়।
উদাহরণ: একসময় আলেক্সন্ডার দ্যা গ্রেট বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন এক বড় সাধুর সাথে সাক্ষাতের জন্য। তার সৈন্যরা কুটিরের ভেতরে গিয়ে সাধুকে জানাল যে আলেক্সান্ডার এসেছেন তাকে দেখতে। কিন্তু সাধু বলল, বৃন্দাবনে কৃষ্ণকে ছাড়া তিনি আর কাউকেই চেনে না। কে এই আলেক্সান্ডার? বরং আলেক্সান্ডারেকেই তার কাছে আসা উচিত। এই নয় যে সাধুটি তাকে দেখতে যাবে, এর ফলে আলেক্সান্ডার ক্রোধান্বিত হয়ে তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করতে উদ্যত হল। এরপর সাধু বের হয়ে বলল “আসুন, আমার চাকরের চাকর, আসন গ্রহণ করুন,” এতে আলেক্সান্ডার আরো ক্রুদ্ধ হল এবং তার মস্তক ছিন্ন করতে ছুটে গেল। কিন্তু সাধুর অবিচলতা দেখে তামল এবং এর কারণ জিজ্ঞেস করল। তখন সাধুটি বলল, “দেখ আমি ক্রোধকে জয় করেছি এবং তাই ক্রোধ আমার চাকর। কিন্তু তুমি সেই ক্রোধেরই সেবা করছ। আর তাই তোমাকে আমি আমার চাকরের চাকর বলে সম্বোধন করেছি। তখন আলেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট সাধুর কথা শুনে নিজের ভুর বুঝতে পেরেছিলেন। (চলবে)

 [আগামী সংখ্যায় আরো লক্ষণ, কারণ উৎস এবং সমাধান বৈদিক শাস্ত্রের মতাদর্শে তুলে ধরা হবে।]

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জানুয়ারি ২০১২ সালে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here