জড় সমস্যা: রাগ বা ক্রোধ (শেষ পর্ব)

0
691

গত সংখায পর

শ্রীমৎ রাধানাথ স্বামী

ক্রোধের কারণ : ক্রোধের কারণ এবং সমাধান আলোচনা করতে গিয়ে শ্রীমদ্ভাগবতে এ সম্পর্কিত অনেক উদাহরণ দেয়া হয়েছে।

Four-Kumaras-Brahma chittagong শ্রীমদ্ভাগবতের ৩য় স্কন্ধে ক্রোধের উৎস সম্পর্কে একটি বর্ণনা রয়েছে : প্রথমে ব্রক্ষা সনক, সনন্দ, সনাতন ও সনৎকুমার নামক চারজন মহর্ষিকে সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁরা সকলেই ছিলেন উর্ধ্বরেতা এবং তাই তাঁরা জড়জাগতিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতে অনিচ্ছুক ছিলেন। (ভা.-৩(১)/১২/৪) ব্রক্ষা তাঁর পুত্রদের সৃষ্টি করে তাঁদের বললেন, “হে পুত্রগণ! এখন তোমরা প্রজা সৃষ্টি কর।” কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবের প্রতি ভক্তিপরায়ণ হওয়ার ফলে মোক্ষধর্মনিষ্ঠ কুমারেরা সেই কার্যে তাঁদের অনিচ্ছা প্রকাশ করলেন। (ভা.৩ (১)/১২/৫) তাঁদের পিতার আদেশ পালন করতে অস্বীকার করার ফলে, ব্রক্ষার অন্তরে দুর্বিষহ ক্রোধ উৎপন্ন হয়েছিল, যা তিনি তখন সংবরণ করতে চেষ্টা করেছিলেন। (ভা.-৩(১)/১২/৬) ক্রোধ অজ্ঞান থেকে উৎপন্ন হোক অথবা জ্ঞান থেকে উৎপন্ন হোক, তার রূপ একই। ব্রক্ষা যদিও তাঁর ক্রোধ সংবরণ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হওয়া সত্ত্বেও তিনি তা করতে সক্ষম হননি।সেই ক্রোধ তার প্রকৃত রং নিয়ে রুদ্ররুপে ব্রক্ষার ভ্রূ-যুগলের মধ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ক্রোধ রজ এবং তমোগুণ থেকে উৎপন্ন হয়, তাই তার বর্ণ নীল (তমোগুণ) ও লোহত (রজোগুণ)। (ভা.-৩(১)/১২/৭) তাঁর জন্মের পর তিনি ক্রন্দন করতে করতে বলতে লাগলেন-“হে বিধাতা! হে জগদ্‌গুরু! দয়া করে আপনি আমার নাম ও স্থানসমূহ নির্দেশ করে দিন।” (ভা.-৩(১)/২/৮) পদ্মযোনি ভগবান ব্রক্ষা তখন মৃদু বাক্যের দ্বারা সেই বালকটি শান্ত করেন এবং তাঁর অনুরোধ স্বীকার করে বললেন-ক্রন্দন করো না।তুমি যা চেয়েছ তা আমি অবশ্যই
করব।(ভা.-৩(১)/১২/৯) তারপর ব্রক্ষা বললেন-হে সুরশ্রেষ্ট! যেহেতু তুমি উৎকন্ঠিত হয়ে ক্রন্দন করেছ, তাই প্রজাসমূহ তোমাকে রুদ্র নামে অভিহিত করবে।(ভা.-৩(১)/১২/১০) এভাবে যদি কেউ অধর্মের পথে ধাবিত হয় তবে নরক এবং যাতনা দিয়ে শেষ হয়। ক্রোধ হল নরকের দিকে ধাবিত হওয়ার পথে অন্যতম ধাপ।

কিভাবে ক্রোধ কাজ করে: তিন ধাপে এটি কাজ করে যার প্রথমটি হল ভোক্তা অভিমান

ধাপ-১ :

ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে।
সঙ্গাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধোহভিজায়তে॥
ক্রোধাদ্ ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতিবিভ্রমঃ।
                           স্মৃতিভ্রংশাদ্ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশ্যতি।       (গীতা-২/৬২-৬৩)

অনুবাদ: “ইন্দ্রিয়ের বিষয়সমূহ সম্বন্ধে চিন্তা করতে করতে মানুষের তাতে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কাম উৎপন্ন হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতিবিভ্রম, স্মৃতিবিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ এবং বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয়।”

ধাপ-২: আমি হলাম কর্তা এবং এভাবে আমার বাসনা সন্তুষ্ট করতে পারি।

প্রকৃতে: ক্রিয়মাণানি গুনৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।
              অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে॥     (গী.৩/২৭)

অহঙ্কারে মোহাচ্ছন্ন জীব জড়া প্রকৃতির ত্রিগুণ দ্বারা ক্রিয়মাণ সমস্ত কার্যকে স্বীয় কার্য বলে মনে করে ‘আমি কর্তা’-এইরকম অভিমান করে।

ধাপ-৩: আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটি পাইনি এই অনুভবের ফলে ক্রোধ সৃষ্টি হয়।

কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ।
               এহাশনো মহাপাপ্না বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্॥ (গী. ৩/৩৭)

bhagavad-Gita-and-krishna-arjuna chittagong পরমেশ্বর ভগবান বললেন-হে অর্জুন! রজোগুণ থেকে সমুদ্ভূত কামই মানুষকে এই পাপে প্রবৃত্ত করে এবং এই কামই ক্রোধে পরিণত হয়। কাম সর্বগ্রাসী ও পাপাত্মক; কামকেই জীবের প্রধান শত্রু বলে জানবে।
ভগবান ঘোষণা করেছেন যে, অপূর্ণ বাসনা জীবকে হতাশা ও ক্রোধের দিকে পরিচালিত করে।
সমাধান : ক্রোধ নিয়ন্ত্রণের ছয়টি ধাপ
১ম ধাপ: সহনীয়তা
ক্রোধ হল একটি বেগের মত আর তাই সবাইকে সহিঞ্চু হতে হবে। রূপ গোস্বামী উপদেশামৃতে ব্যাখ্যা করেছেন।

উৎসাহন্নিশ্চয়াদ্ধৈর্যাত্তত্তৎ কর্ম-প্রবর্তনাৎ
গঙ্গত্যাগাৎ সতোবৃত্তেঃ ষড়্ভির্ভক্তিঃ প্রসিধ্যতি॥

ভক্তিযোগে ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে সেবাকার্য সম্পাদন করার অনুকূলে ছ’টি প্রধান নিয়ম বা বিধি বর্তমান আছে। যথা-সেবাকার্যে উৎসাহ, দৃঢ়বিশ্বাস সংকল্প, ধৈর্য-ধারণ, নববিধা ভক্তির বিধি অনুসারে সেবাকার্য সম্পাদন, আসক্তি ও অসৎসঙ্গ ত্যাগ, পূর্বতন আচার্যবর্গের পদাঙ্ক অনুসরণ। এই ছয়টি বিধি অনুসারে পারমার্থিক জীবন-যাপন করলে ভক্তিযোগে অবশ্যই সিদ্ধিলাভ করা যাবে।
২য় ধাপ: ব্যক্তিগতভাবে
যখন কোন সমস্যা হয় তখন সেটিকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা উচিত স্থানীয়ভাবে কতিপয় বিবেচ্য লোকেদের মধ্যে, কিন্তু এটিকে সবার মাঝে ছড়াতে দেওয়া উচিত নয়।
উদাহরণ: ধ্রুব মহারাজ একসময় ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যক্ষকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন কিন্তু কুবের এবং স্বয়ম্ভু মনু ব্যক্তিগতভাবে ত্রসে তাকে শান্ত করেছিলেন।
৩য় ধাপ: পরিণামদর্শী (prudently)
ভগবান কৃষ্ণ গীতায় (১৭/১৫) ব্যাখ্যা করলেন-

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতং চ যৎ।
           স্বাধ্যায়াভ্যসনং চৈব বাক্সময়ং তপ উচ্যতে॥          

অনুদ্বেগকর, সত্য, প্রিয় অথচ হিতকর এবং বৈদিক শাস্ত্র পাঠ করাকে বাচিক তপস্যা বলা হয়। কথার এমন শক্তি রয়েছে যে, সেটি কাউকে আঘাত বা খুশি করতে পারে।
উদাহরণ: একজন ভিক্ষুক এসে এক ধনী জমিদারকে অনেক প্রশংসা স্তুতি জানিয়ে সন্তুষ্ট করল। তখন ধনী জমিদার সন্তুষ্ট হয়ে সেবকদের বলল এই ভিক্ষুককে যা চায় তাই দাও। তখন সেই ভিক্ষুক অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। কিন্তু কোনকিছুই এল না। তারপর সেই ভিক্ষুক জমিদারকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে জমিদার বলল, “তুমি আমাকে বাক্য (কথা) দিয়ে সন্তুষ্ট করেছ, আমিও তোমাকে বাক্য দিয়ে সন্তুষ্ট করেছিলাম।”

এজন্য চাণক্য পন্ডিত বলেছেন,  জিহ্বাগ্রে বাসতে লক্ষ্মী, জিহ্বাগ্রে মিত্র বান্ধব। অর্থ, বন্ধু এবং আত্মীয়-স্বজন জিহ্বার অগ্রভাগে অবস্থান করে। এর মানে হল কেউ অর্থ পাবে কিনা, কিংবা প্রিয় বন্ধু এবং সুজন পাবে কিনা তা নির্ভর করে কিভাবে সে কথা বলে তার উপর।
ধাপ-৪:  ক্রোধকে সঠিক পথে পরিচালিত করে ক্রোধ ব্যবহার করতে হবে যারা ভগবান এবং তার ভক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকলাপে রত তাদের বিরুদ্ধে।

উদাহরণ: হনুমানজী তার ক্রোধকে শ্রীরামচন্দ্রের সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন, অর্জুন তার ক্রোধকে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভগবান কৃষ্ণের সেবা করেছিলেন।
ধাপ-৫: ইতিবাচকভাবে
ইতিবাচক মনোভাব ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য
উদাহরণ: দুই বন্ধু মরুভূমিতে হাঁটার সময় প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় বন্ধুকে এক বিতর্কে চড় মারে। ফলে প্রথম বন্ধু যতটা না মুখে আঘাত পায় তার চেয়েও বেশি আঘাত পায় হৃদয়ে। তখন সে বালিতে লিখে রাখে “আজ আমার বন্ধু আমাকে চর মেরেছে। যখন তারা একটি মরুধ্যান দেখল তারা সেখানে সাঁতার কাটতে চায়। একসময় প্রথম বন্ধুটি ডুবে যেতে লাগলে দ্বিতীয় বন্ধু তাকে রক্ষা করে, তখন একটি পাথরে ১ম বন্ধু লেখে, “আজ আমার বন্ধু আমার জীবন রক্ষা করেছে।” এর কারণ জিজ্ঞেস করলে ১ম বন্ধু বলে যেটি প্রথমে লিখেছিলাম সেটি বাতাসের কারণে মুছে যাবে কিন্তু পাথরে লেখা সেটি রয়ে যাবে। এর মানে কারো আশীর্বাদ মনে রাখা উচিত স্থায়ীভাবে, কারো অভিশাপ নয়।
৬ষ্ঠ ধাপ: ব্যক্তিগতভাবে
ব্যক্তিগত স্তরে সবার জানা উচিত ক্রোধ হল শুধুমাত্র কোন নির্দিষ্ট ঘটনার জন্য কারো প্রতি উত্তর স্বরূপ। তাই এজন্য দোষী করা উচিত নয়। ক্রোধ হল এসিডের মত যেই পাত্রে সংরক্ষণ করা হবে সেটিকে ধ্বংস করে ফেলবে।

ক্রোধকে জয় করার উপায়: চারটি পদক্ষেপ

১. ক্রোধ চেনা:

ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ।
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্রয়ংত্যজেৎ

(গীতা-১৬/২১)

কাম, ক্রোধ ও লোভ-এই তিনটি নরকের দ্বার, অতএব ঐ তিনটি পরিত্যাগ করবে।

২. অনুতাপ: অনুতাপের আগুনে সমস্ত পাপ ভস্মীভূত হয়। ঠিক তেমনি ক্রোধকেও জয় করা যায়।

৩. প্রতিরোধ: ক্রোধের প্রভাবকে প্রতিরোধ করুন

শক্লোতীহৈব যঃ সোঢ়ুং প্রাক্ শরীরবিমোক্ষণাৎ।কামক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্তঃ স সুখী নরঃ॥

(গীতা-৫/২৩)

এই দেহ ত্যাগ করার পূর্বে যিনি কাম, ক্রোধ থেকে উদ্ভূত বেগ সহ্য করতে সক্ষম হন, তিনিই যোগী এবং এই জগতে তিনিই সুখী হন।
৪. উপলব্ধি:

ভাগবতের ৮ম স্কন্ধে গজেন্দ্র ভগবানের উদ্দেশ্য প্রার্থনা নিবেদন করেন এভাবে-

নমো নমস্তুভ্যমসহ্যবেগ-শক্তিত্রয়ায়াখিলধীগুণায়।

প্রপন্নপালায় দুরন্তশক্তয়ে কদিন্দ্রিয়াণামনবাপ্যবর্ত্মনে॥

হে প্রভুু, আপনি তিন প্রকার শক্তির অসহ্য বেগের নিয়ন্তা। আপনি সমস্ত ইন্দ্রিয় সুখের উৎসরূপে প্রতীয়মান এবং আপনি শরণাগতজনের রক্ষক। আপনি অনন্ত শক্তি সমন্বিত, কিন্তু যারা ইন্দ্রিয় সংযমে অক্ষম তারা আপনাকে লাভ করতে পারে না। আমি বার বার আপনাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।(ভা.-৮/৩/২৮)

উপসংহার: আমরা ক্রোধকে একেবারে জয় করতে পারি না, কিন্তু ভগবদ্‌বিদ্বেসীদের প্রতি আমরা ক্রোধ প্রকাশ করতে পারি। শ্রীচৈতন্যদেব দুর্বৃত্ত জগাই-মাধাই এর প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করেন। কারণ ঐ ভ্রাতৃদ্বয় নিত্যানন্দ প্রভুকে অপমান করে ও তাঁকে গুরুতরভাবে আঘাত করে। শিক্ষাষ্টকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু শিক্ষা দিয়েছেন, তৃণাদপি সুনীচেন তরোরপি সহিষ্ণুনা অর্থাৎ তৃণ অপেক্ষা দীন এবং তরু অপেক্ষা সহিষ্ণু হতে হবে।

কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, তা হলে মহাপ্রভু ক্রোধ প্রকাশ করলেন কেন? এর অর্থ হচ্ছে নিজের ক্ষেত্রে ভক্ত সব অপমান সহ্য করবেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের বা তাঁর শুদ্ধ ভক্তের অবমাননায় যথার্থ ভক্ত আগুনের মতো ক্রোধ প্রকাশ করবেন। ক্রোধবেগ সংযত করা যায় না। কিন্তু উপযুক্ত ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা যায়। ক্রোধের বলেই পবন-পুত্র হনুমান লঙ্কায় আগুন ধরিয়ে দেন। এইভাবে তিনি আজও ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত হিসেবে জগৎপূজ্য। এইভাবে হনুমান তাঁর ক্রোধের যথাযোগ্য ব্যবহার করেন। অর্জুনও তাই করেছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করেননি, কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণই অর্জুনের ক্রোধাগ্নি জ্বালিয়ে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “যুদ্ধ তোমায় করতেই হবে।” ক্রোধ ছাড়া যুদ্ধ করা সম্ভব নয়, তাই ক্রোধবেগ জয় করা সম্ভব একমাত্র কৃষ্ণসেবায় তা প্রয়োগ করার মাধ্যমে। হরে কৃষ্ণ।

(মাসিক চৈ্তন্য সন্দেশ ফেব্রুয়ারী ২০১২ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here