জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া

0
740

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

যয়া সম্মোহিতো জীব আত্মনং ত্রিগুণাত্মকম্।
গয়োহপি মনুতেহনর্থং তৎকৃতং চাভিপদ্যতে।। (ভাগবত ১/৭/৫)

এই বহিরঙ্গা শক্তির প্রভাবে জীব জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণেল অতীত হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে জড় সৃষ্টি বলে মনে করে এবং এইভাবে জড় জগতের তিনটি গুণের অতীত হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে জড় সৃষ্টি বলে মনে করে এবং এইভাবে জড় জগতের দুঃখ দুর্দশারূপ ফলের অধীন হয়ে পড়ে।
ব্যাসদেব তিনটি বিষয় দর্শন করেছিলেন: জীবাত্মা, পরমেশ্বর ভগবান এবং মায়া। মায়া মানে যা নয়। সুতরাং মায়ার শুরুই হল, যা নয়, তা থেকে। আমি এই দেহ নই, কিন্তু আমি ভাবছি, আমি এই দেহ। এই হচ্ছে মায়া। আমি এই দেহ নই। তা বাস্তব সত্য। কিন্তু আমি ভাবছি- “আমি এই দেহ।” এ হল মায়ার শুরু। এ হল পশুর ধারণা- যারা মানুষের থেকেও অধম। আজকাল মানুষও সেরকমভাবে চিন্তা করছে। এগুলোই হচ্ছে অনর্থ। ভগবদগীতার শিক্ষার শুরু ও এখানে, অর্জনকে বোঝানো হচ্ছে: “অর্জুন, তুমি এই দেহ নও।” তথা দেহান্তর প্রাপ্তিঃ (গীতা ২/১৩)। নানা ভাবে বোঝানো হল। এই হচ্ছে অনর্থ। এই দেহ এবং দেহের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সবকিছুকে সর্বস্থ বলে মনে করা, অহং মমেতি (ভাগবত ৫/৫/৮), এই হচ্ছে মায়া। এটাই অনর্থ। অনর্থ মানে যার কোনো অর্থ হয় না। তাই আমরা যদি আমাদের জীবনের এই অনর্থগুলোকে বন্ধ করতে চাই, তাহলে আমাদের ভক্তিযোগ গ্রহণ করতেই হবে। কিন্তু কিছু সময়ের জন্য আমরা বিপথগামী হয়ে পড়েছি। মায়া কিংবা জড়া প্রকৃতি আমাদের বিপথগামী করছে। মায়ার আদেশ অনুসারে আমরা সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছি। আমরা ভাবছি হয় এইভাবে, নয়তো ঐ ভাবে আমাদের অস্তিত্বের সংগ্রামকে বন্ধ করতে সক্ষম হব। তা সম্ভব নয়। দৈবী হ্যোষা গুণময়ী মম মায়াদুরত্যয়া (গীতা ৭/১৪)। যদি পরিকল্পনা বানাতে চাও, তা বানাতে পার, কিন্তু ভগবানের ইচ্ছা ভিন্ন সেই পরিকল্পনা কখনো সফল হবে না। ভ্রান্ত উপলব্ধির বশে আমরা হয়তো এই জড় জগতে সুখী হওয়ার জন্য শত সহস্র পরিকল্পনা তৈরি করতে পারি। এই জন্যই বলা হয় সম্মোহিত– বিভ্রান্তি। ময়া সম্মোহিত জীব আত্মনং ত্রিগুণাত্মকম্ ॥ আত্মনম্, স্বয়ং সে ভাবছে যে সে হচ্ছে জড় জগতের সৃষ্টি। সত্ব, রজ ও তম নামের তিনটি গুণ রয়েছে। কেউ ভাবছে, “আমি খুব ভাল লোক, আমি খুব সৎ লোক। এটিও ভ্রান্ত পরিচিতি। আবার কেউ ভাবছে, ‘আমি অনেক কিছু করতে পারি, আমার অনেক শক্তি। আমার সমান কে আছে? এ হচ্ছে রজগুণ। সেটিও মায়ার আদেশ। আবার কেউ আছে অলস, শুধু মায়া, কিছুই বুঝতে পারে না—- সেটি তমোগুণ। সেটিও ত্রিগুণাত্মকম্– এই ত্রিভুবন মধ্যে। তাই এই জড় জগতের মধ্যে কেউ ভাল, কেউ খুব রজপ্রধান, আবার কেউ তামসিক, অজ্ঞ। গুণগত কিছু পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু তাদের সকলেই মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ। তাই চিন্ময় স্তরে উন্নীত হওয়ার জন্য, যে কথা বলা হয়, অনর্থোপশমং সাক্ষাদ্ভক্তিযোগমধ্যোক্ষতে (ভা. ১/৭/৬)। তোমাদের ভক্তিযোগ গ্রহণ করতেই হবে। ভক্তিযোগ মানে সরাসরি পরমেশ্বর ভগবান অধোক্ষজের সঙ্গে সম্পর্কিথ হওয়া। আর সে কথা বহু জায়গায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে- কোন্ পন্থা অবলম্বন করলে অধোক্ষজ ভঘবানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া যায়। একেই বলে প্রত্যেক দেশে প্রত্যেক মানব সমাজে ধর্ম সম্পর্কে কিছু না কিছু ধারণা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য কী? উদ্দেশ্যে হচ্ছে পরম কর্তৃত্ব অধোক্ষজ ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া। অধোক্ষজ মানে অক্ষজ বা ইন্দ্রিয় জ্ঞানের উর্ধ্বে। অক্ষ মানে চক্ষু। অধো মানে অধো কৃত্বা। তাই আমাদের জ্ঞান, আমাদের অভিজ্ঞতা, পরীক্ষণমূলক জ্ঞান, সবকিছুই পরম নিয়ন্তাকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে। তাই তার নাম হচ্ছে অধোক্ষজ। তবু সেটা বুঝতে হবে। একথাই এখানে সুপারিশ করা হল:

অনর্থোপশমং সাক্ষ্যাৎ ভক্তিযোগমধো জে।
লোকস্যাজানতো বিদ্বাং শ্চক্রে সাত্বত সংহিতাম্ ॥ (ভাবগত ১/৭/৬)

মানুষ জানে না, কীভাবে এই জড় জাগতিক ধারণার উর্ধ্বে উঠা যায়, কীভাবে অধোক্ষজ ভগবান, পরম নিয়ন্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া যায়। এই হচ্ছে একমাত্র পন্থা। এটিই বাস্তব। শুধু ভক্তিযোগের মাধ্যমেই ভগবানকে জানা যায়। অন্য কোন পথ নেই। ভগবদ্গীতাতেও বলা হয়েছে, ভক্ত্যা মামভিজানতি যাবান্ যশ্চাষ্মি তত্ত্বতঃ (গীতা ১৮/৫৫)। সেই অধোক্ষজকে জানতে চাওয়াই ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য। ধর্ম কোন আচার অনুষ্ঠান নয়। সেটা বহ্য। প্রকৃত ব্যাপার হল জড় ধারণার উর্ধ্বে অবস্থিত। সেই অধোক্ষজের সঙ্গে কিভাবে সম্পর্কযুক্ত হওয়া যায়। তবে ভক্তিযোদের আশ্রয় গ্রহণ করলে তা সম্ভব হয়। অনর্থোপশমম্। তাহলে অবাঞ্চিত অনর্থ সকল পরিষ্কার হবে। আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবানকে উপলব্ধি করা। 

 মানব জীবন : অথতো ব্রহ্মা জিজ্ঞাসা। এই হচ্ছে মানব জীবনের উদ্দেশ্য। এইসব পশুদেরও অনেক জিজ্ঞাসা রয়েছে। আর উত্তরও রয়েছে। ঠিক যেমন পত্র পত্রিকায় আমরা অনেক খবর দেখতে পাই। অসংখ্য খবর। কিন্তু কীভাবে ভগবানকে উপলব্ধি করতে হয়, সে সম্পর্ক কোনো খবর নেই। এই হচ্ছে অনর্থ। তাই লোকস্যানজানতো, ভগবান সম্পর্কে তাদের কোনো খবর জানা নেই, সে নিজে কী, ভগবানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, তার কী করণীয়– সম্বন্ধ, অভিধেয়, প্রয়োজন। সমস্ত বৈদিন নীতি এই তিনটি তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সম্বন্ধ। সবাই বলে ভগবান আছেন, ভগবান কী এবং ভগবানের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কী, তা বুঝতে হবে। এ হচ্ছে সম্বন্ধ। আর সম্বন্ধ উপলব্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রকৃত কার্য শুরু হয়। সেই প্রকৃত কার্যটিই হল ভক্তি। আর জড় কার্য, যা ভক্তি নয়, তাকে বলা হয় মায়া। তাই ভাগবতে বলা হয়েছে:

ধর্ম স্বনুষ্ঠিতঃ পুংসাং বিষ্ককসেন কথাসু যঃ।
নোৎপাদয়েদ্ যদি রতিং শ্রম এব হি কেবলম্ ॥ (ভাগবত ১/২/৮)

আপনি হয়তো খুব ধার্মিক লোক। খুব সুন্দরভাবে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান সম্পাদন করছেন। খুব দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু আপনি যদি অধোক্ষজ বা বিস্বকসেনকে না জানেন, বিস্বসেন হচ্ছে কৃষ্ণেরই একটি নাম। যদি তাঁকে উপলব্ধি করার জন্য উদ্গ্রীব না হন, তাহলে সমস্ত ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, নান প্রকারের ধর্ম–শুধুই পশুশ্রম- শ্রম এব হি কেবলম ॥ জ্ঞানীরা শুধু জ্ঞান অর্জনের চেষ্ঠা করে। না, তুমি জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে পার, তবে যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি সম্বন্ধ জ্ঞান লাভের স্তর থেকে অভিধেয় স্তরে উন্নীত না হচ্ছ, ততক্ষণ তোমার জ্ঞান তোমাকে সাহায্য করবে না। অভিধেয় হচ্ছে বস্তুতপক্ষে কার্য করা। সম্বন্ধ হল জ্ঞান। আবার অভিধেয় তথা কার্য করার উদ্দেশ্যে হচ্ছে কোনো লক্ষ্য বা প্রয়োজন লাভের স্তরে পৌছানো।
সে কথাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ব্যাখ্যা করছেন, সেই লক্ষ্যটা কী: প্রেমা পুমার্থ মহান্॥ সেটিই দরকার। সেটিই প্রয়োজন। ভগবান কৃষ্ণের প্রতি তোমার স্বাভাবিক প্রেমকে বিকশিত করতে হবে। তাহলেই তা সার্থক। তাই যে মুহুর্তে আমরা কৃষ্ণকে ভালবাসার স্তরে উন্নীত হই, কীভাবে কৃষ্খকে ভালবাসতে হয়, কীভাবে কৃষ্ণকে ভালবাসতে হয়, তা জানতে পারি, তখনই আমাদের সমস্ত অনর্থের উপশম হয়। অনর্থোপশমং সাক্ষাদ্ভক্তিযোগমধোক্ষজে (ভাগবত ১/৭/৬)। সাধারণ লোকেরা মূর্খ, বোকা, তারা কিছুই জানে না। না তে বিদুঃ স্বার্থগতিং হি বিষ্ণুম্ (ভাগবত ৭/৫/৩১)। প্রত্যেকেই জড় জাগতিক উপায়ে সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। জড় জাগতিকভাবে তুমি যাই করো না কেন, মায়া এতই প্রবল যে, সে সবকিছু ভেঙে ফেলবে।

প্রকৃতেঃ ক্রিয়মানানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।
অহংকার বিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে ॥ (গীতা ৩/২৭)

(মাসিক চৈতন্য পত্রিকা জানুয়ারি ২০১৪ প্রকাশিত )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here