জীবকুল ভগবানের নিত্যদাস

0
640

 

কৃষ্ণানুশীলন বাদ দিয়ে মানব সমাজ কখনও সুখী হতে পারে না। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম ভোক্তা আর আমরা তাঁর দাস। প্রভু ভোগ করছেন এবং দাসেরা প্রভুকে ভোগে সহায়তা করছেন। জীবকুল ভগবানের নিত্যদাস, তাদের কর্তব্য ভগবানের ভোগে সহায়তা করা। শ্রীমতি রাধারাণী হচ্ছেন দাসীশিরোমণি, তাঁর কাজ হচ্ছে সবসময় শ্রীকৃষ্ণকে তুষ্ট করা। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন রাধানুরক্ত, কারণ রাধরাণী হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সেবিকা। বৈদিক সাহিত্যে রাধাঠাকুরাণীর চৌষট্টিটি গুণাবলীর বর্ণনা রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এই ভব সংসারে আমরা সকলে জড় ইন্দ্রিয়সুখ ভোগেই ব্যস্ত। তাই ভগবদগীতায় (৩/৪২)উল্লেখ করা হয়েছে-

ইন্দ্রিয়ানি পরান্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যো বুদ্ধে পরতস্সঃতু সঃ॥

“জড় বস্তু অপেক্ষা সক্রিয় ইন্দ্রিয়গুলি শ্রেয়; ইন্দ্রিয়াদি অপেক্ষা মন শ্রেয়; মন অপেক্ষা বুদ্ধি শ্রেয়; এবং সে (আত্মা) বুদ্ধি থেকেও শ্রেয়।” আত্মা চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত। জড় ভূমিকায় আমরা ইন্দ্রিয় সুখ ভোগে আগ্রহী। এইভাবে প্রকৃতির মায়াজালে আমরা আবদ্ধ হয়ে যাই। তাই শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে-

 নূনং প্রমত্ত কুরুতে বিকর্ম
যদিন্দ্রিয়প্রীতয় আপৃনোতি।
ন সাধু মন্যে যত আত্মনোহয়ম্
আসন্নপি ক্লেশদ আস দেহঃ॥ (ভাগবত ৫/৫/৪)

“ইন্দ্রিয়ের প্রীতিবিধানই যার জীবনের লক্ষ্য, নিঃসন্দেহে সে বিসয়ে প্রমত্ত হয়ে ওঠে এবং নানা অপকর্ম বা বিকর্মে নিয়োজিত হয়। সে জানে না যে, তার বিগত পাপময় জীবনের ফলে ইতোমধ্যেই সে এই দেহটি লাভ করেছে যা অনিত্য এবং তার দুঃখ দুর্দশার কারণ সেটাই। প্রকৃতপক্ষে জীবাত্মার জড় দেহপ্রাপ্তির কথা নয়, কিন্তু ইন্দ্রিয়ভোগের জন্য তাকে এই প্রাকৃত শরীর দান করা হয়েছে। সুতরাং ইন্দ্রিয় উপভোগের ক্রিয়াকলাপের মাঝে বুদ্ধিমান মানুষ নিজেকে আবার লিপ্ত করবে, সেটা আমি উচিত কাজ বলে মনে করি না, যার দ্বারা সে অনন্ত কাল ধরে একটির পর একটি জড় দেহ ধারণ করে চলতেই থাকে।’’জীবকুল এই ভবসংসারে ইন্দ্রিয় তর্পণের জন্য খুবই তৎপর। রাস্তাঘাটে আমরা কুকুরদের মৈথুন করতে দেখি। তা দেখতে খুবই দৃষ্টিকটু মনে হয়, কিন্তু মানবকুলও এই কাজে লিপ্ত হয়। আমাদের জানা উচিত, ইন্দ্রিয় তর্পণ পশুর জন্য আর ইন্দ্রিয সংযম মানুষদের জন্য। তপস্যার দ্বারা আমরা পবিত্র হয়ে উঠতে পারি এবং আমাদের শাশ্বত জীবন ফিরে পেতে পারি।

এই জীবন হচ্ছে পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতিপর্ব এবং যদি আমরা আমাদের দিব্য ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করতে চাই, আমাদের সনাতন আবাস ভগবদ্ধামে ফিরে যাবার জন্য আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি শুদ্ধ করতে হবে। আর এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে মানব জীবনের ইন্দ্রিয়গুলিকে শুদ্ধ করে তোলার আন্দোলন যাতে মানুষ এই জন্মেই সকল দুঃখ কষ্টের অবসান ঘটিয়ে তার আপন আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের জড় ইন্দ্রিয়গুলি আমাদের যথার্থ ইন্দ্রিয় নয়।আমাদের দেহ যেমন পোশাকে আচ্ছাদিত থাকে, আমাদের ইন্দ্রিগুলিও তেমনই আচ্ছাদিত। আমাদের প্রকৃত দেহ এই জড় দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত। দেহিনোহস্মিন যথা দেহে । চিন্ময় দেহ জড় দেহের বিবর্তন হচ্ছে এবং তারপরে তা অন্তর্হিত হচ্ছে। যদিও এটা আমাদের প্রকৃত শরীর নয়, তবু আমরা এ সাহায্যে ইন্দ্রিয় ভোগে ব্যস্ত। যাই হোক, আমাদের অন্তিম সুখের জন্য আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে পবিত্র করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। ইন্দ্রিযগুলিকে ধ্বংস করা বা কামনাহীন হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কামনা বা বাসনা হচ্ছে এক জড় কর্ম, আর কামনা বাসনা বর্জিত হওয়াও সম্ভব নয়। আমরা কামনা বাসনাগুলো যাতে দিব্যকর্মে ব্যবহার করতে পারি, সেই উদ্দেশ্যে এই ইন্দ্রিয়গুলিকে শুদ্ধ করতে হবে। ভক্তিযোগ আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিকে ধ্বংস করতে চায় না, এইগলিকে শুদ্ধ বা পবিত্র করতে চায়। ইন্দ্রিয়গুলি পবিত্র হলে, আমরা কৃষ্ণভজনা করতে পারি-

সর্বোপাধিবিনিমর্ক্তং তৎপরত্বেন নির্মলম্।
হৃষীকেণ হৃষীকেশ সেবনং ভক্তিরুচ্যতে॥

“ভক্তি মানে ইন্দ্রিয়ের অধিপতি পরম পুরুষোত্তম ভগবানের সেবায় আমাদের সকল ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়োজিত করা। চিন্ময় আত্মা পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় ব্রত হলে তা দুটি ফল প্রসব করে-একটি হচ্ছে সে জড় উপাধিমুক্ত হয় আর ভগবদ্ভজনের ফলে তার ইন্দ্রিয়গুলি পবিত্র হয়।” (নারদ পঞ্চরাত্র)আমরা ইন্দ্রিয়ের অধিপতি হৃষীকেশের সেবা করতে পারি। ঠিক যেমন হাত শরীরের অংশ, আমরাও তেমনই শ্রীকৃষ্ণেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই আমাদের ইন্দ্রিয়গুলিও শ্রীকৃষ্ণের চিন্ময় দেহের অংশ। আমরা ইন্দ্রিয়গুলি পবিত্র করে, আমাদের স্বরূপে অবস্থিত হয়ে কৃষ্ণভজন করতে পারি। কিন্তু স্বরূপ বিস্মৃত হয়ে ইন্দ্রিয় সুখে তৎপর হলে আমরা জড় বন্ধনে আবদ্ধ হই। কৃষ্ণসেবার ধর্ম যখন আমরা ভুলে যাই, তখনই আমরা মায়িক সংসারে পতিত হই এবং নিজেরা ইন্দ্রিয়সুখ ভোগে বিজড়িত হয়ে পড়ি। যতদিন আমরা নিজ ইন্দ্রিয় সুখ ভোগে নিযুক্ত থাকি,ততদিন আমাদের অন্য জড়দেহ গ্রহণ করতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ এমনই কৃপাময় যে, আমরা যদি হিংস্র প্রাণী বাঘ, ভাল্লুকের মত মাংস খেতে থাকি তাহলে তিনি আমাদের পশুর শরীর দান করবেন। কিন্তু যদি ভক্ত হতে চাই, তাহলে তিনি আমাদের এক ভক্ত দেহ প্রদান করবেন। এই জীবন হচ্ছে পরবর্তী জীবনের প্রস্তুতিপর্ব এবং যদি আমরা আমাদের দিব্য ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করতে চাই, আমাদের সনাতন আবাস ভগবদ্ধামে ফিরে যাবার জন্য আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি শুদ্ধ করতে হবে। আর এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে মানব জীবনের ইন্দ্রিয়গুলিকে শুদ্ধ করে তোলার আন্দোলন যাতে মানুষ এই জন্মেই সকল দুঃখ কষ্টের অবসান ঘটিয়ে তার আপন আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারে। হরে কৃষ্ণ।                                             

 মাসিক চৈতন্য নভেম্বর ২০১০ সালে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here