(জন্মাষ্টমী) পুতনা ও ভণ্ড গুরুরা (শেষ পর্ব)

প্রকাশ: ২ আগস্ট ২০২০ | ৬:১০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৩ আগস্ট ২০২০ | ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 475 বার দেখা হয়েছে

(জন্মাষ্টমী) পুতনা ও ভণ্ড গুরুরা (শেষ পর্ব)

পুতনা ভণ্ডগুরুর প্রতিনিধিত্ব করে।
ভণ্ডগুরু এক অথবা দুই উভয়রূপেই প্রকাশিত হতে পারে।
১. একজন প্রতারক তথাকথিত গুরু ইন্দ্রিয়তর্পণ অথবা মোক্ষ কিংবা উভয়
প্রচার করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে যে একজন ব্যক্তি কিছু
কৃষ্ণভাবনাময় কর্মে যুক্ত আছে, কিন্তু শুদ্ধভক্তির উপলব্ধি তার নেই এবং
তার উপলব্ধির ঊর্ধ্বে সে তার অনুগামী বা শিষ্যদেরকে নির্দেশ দেবার চেষ্টা করে অথবা তাদের অবস্থা বিবেচনা না করে উপদেশ দেয়।
২. জড়-জাগতিক অভিজ্ঞতার কারণে ভিতরে ভিতরে নিজেকে গুরুজ্ঞান করাও পুতনার মতোই। তার ভক্তদের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করার জন্য তার পরমানন্দ রক্ষা করতে কৃষ্ণ স্তনপান ছলে পূতনার প্রাণবায়ু শুষে নিলেন, যাতে তা নবীন ভক্তদের হৃদয়ে আবির্ভূত হয়।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, “পুতনা ছিল পূর্ব জন্মে বলি মহারাজের ছোট বোন রত্নমালা। যদিও গর্গ সংহিতায় বলা হয়েছে যে সে ছিল তার কন্যা।”
পুতনা প্রসঙ্গে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের অভিমত দি হারমোনিস্ট পত্রিকায় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর পুতনা প্রসঙ্গে সবিস্তারে আলোকপাত করেছিলেন, নিচে তা প্রদত্ত হল:
১. শ্রীকৃষ্ণ শুদ্ধ আত্মাদের কাছে তার দিব্য আবিভাব লীলা প্রকাশ করেন, যাঁরা সমস্ত পার্থিব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে অবস্থিত।
মহা পরাক্রমশালী রাজা কংস পরম সত্যের আবির্ভাবের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিল কারণ তিনি তাকে নিধন করবেন, এটি গবেষণামূলক অবস্থানের অতিরঞ্জিত বর্ণনা হয়, তা সঙ্গতিপূর্ণ। পরমার্থবাদীদের প্রতি জড়বাদীদের একটি স্বাভাবিক বিরোধ রয়েছে। তারা ধর্মের ছলে ভণ্ডামী আর নিজেদের মতের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসে অবিচলিতভাবে স্থিত। তারা একই সাথে সমভাবে মোহগ্রস্ত যে পার্থিব এবং অপার্থিব বা জাগতিক ও আধ্যাত্মিকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তারা সমভাবাপন্ন ব্যক্তি কর্তৃক শাস্ত্র ব্যাখ্যা দ্বারা তাদের এই মোহকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। অভিধান প্রণেতারাও এর অন্তর্ভুক্ত।
২. শাস্ত্রে আভিধানিক ব্যাখ্যাই যথাযথ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হিসেবে কংসের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে এবং তাই পরম সত্যের প্রতি তার ভীতি ও বিতৃষ্ণা সঙ্গতিপূর্ণ। কংস কর্তৃক এই সমস্ত ব্যাখ্যাকারের অনুমোদিত যাদের কাছে পরম সত্য সম্বন্ধে যেকোনো বিশ্বাসের উৎপত্তি সন্দেহজনক। মহারাজ কংস ভালভাবে জানেন যে যদি একবারও পরম সত্যে বিশ্বাস উদিত হয় তাহলে তার সমস্ত আসুরিক প্রত্যাশা ভেস্তে যাবে।
এই প্রকার ভীতিরও ঐতিহাসিকতা রয়েছে। তদনুরূপ অভিজ্ঞতাবাদী কতৃত্ব যদি বহাল থাকে তাহলে পরমার্থ বিষয়ে অন্ধ বিশ্বাস অবনমিত হবে। শাস্ত্রের অভিজ্ঞ শিক্ষকের বিজ্ঞানভিত্তিক সতর্ক বাণী মেনে না নেওয়ার জন্য কংস এই তথাকথিত ভয়ের ভান করে। বৈদিক শাস্ত্রে প্রমাণিত সনাতন ধর্মের যথার্থ ব্যাখ্যা ও এর বাস্তবিক অভিজ্ঞতাকে ব্যাকরণ ও অভিধানের কল্পনাপ্রসূত সুন্দর সুন্দর যুক্তির দ্বারা হেয় করতে উৎসুক।
কংস দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে যে ভগবানে বিশ্বাস বা আস্তিক্য অভিজ্ঞতাবাদ দ্বারা পরাভূত হতে পারে যদি প্রারম্ভেই এই অভিজ্ঞতাবাদ অবলম্বিত হয়। তার মতে অতীতে আস্তিক্যবাদের কাছে নাস্তিক্যবাদের নতি স্বীকার করার কারণ আস্তিক্যবাদের ভ্রান্ত ধর্মান্ধ জনগণের মাঝে প্রচার প্রসারের সুযোগ ছিল। কিন্তু আমন্ত্রণ ছাড়াই কংসকে দেখতে পাওয়া যায়। যখন কৃষ্ণ আবির্ভূত হন স্বয়ং তার দ্বারাই হতভাগা বিদ্বেষীরা অবগত হয় যে তাদের কাল আবির্ভূত হয়েছেন। আপাতভাবে বয়স, লিঙ্গ ও জাত-কুল বিচারে নিরপেক্ষ জনসাধারণ ঐধ্বত্য অভিজ্ঞতাবাদীদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়, যারা পরম সত্যের বিধানের বিরোধী, যার আবির্ভাব নিতান্তই অভিজ্ঞতাবাদের কর্তৃত্বের সাথে সামঞ্জস্যহীন।
কিন্তু অভিজ্ঞতাবাদীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেই, যাদের নিয়ম-নীতি এই জগতের বদ্ধ জীবদের মনে ভগবানের বিধানের মতোই সুপ্রতিষ্ঠিত, যার ফলে যে কোন মানুষের একচেটিয়াভাবে ভগবানকে অনুসরণ করার প্রবণতা বাধাগ্রস্থ হয়। একমাত্র তখনই সম্ভব যখন তিনি স্বয়ং তার হৃদয়ে আবির্ভূত হবেন।
৩. পুতনা সমস্ত শিশুদের হত্যাকারিণী। শিশু, যখন সে (ছেলে/মেয়ে) মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ট হয় তখন সে ধর্মের কপট শিক্ষকদের হাতে পতিত হয়। এইসব শিক্ষকেরা এই জগতের নাস্তিকদের দ্বারা আগাম বানচালে সফল; সদুপদেশকারীদের প্রচেষ্টা রোধ করে এবং তাদের সহায়তা কখনো কার্যকর হয় না। পৃথিবীর সু-প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার দ্বারা এই কাজটি নিশ্চিত করা হয়। পার্থিব পিতা-মাতার সহায়তায় জন্মক্ষণ থেকে কেউ মানুষের পারমার্থিক জীবন বিনাশ করার জন্য তারা শুধু জাগরূক পুতনা প্রেরণে সফল হয়েছে। মানুষের কোন কৌশলই এই সকল পুতনাদেরকে লক্ষ্য অর্জনের পথ থেকে প্রতিহত করতে পারেন না। এই ব্যাপারটি সাধারণত এই জগতের মানুষের নিরীশ্বরবাদী স্বভাবের কারণে ঘটে থাকে।
৪. এই ভৌতিক জগতে আস্তিক্যবাদের নামে নাস্তিক্যবাদ প্রচারের সর্বোত্তম সুযোগ রয়েছে। এদ্বারা সর্বদাই প্রমাণ করেছে যে তাঁরা সাংসারিকতার সব থেকে গোঁড়া সমর্থনকারী এমনকি সেখানে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধমূলক কার্যকলাপও দৃশ্যমান হয়।
এটি তাদের প্রতি প্রতিপক্ষের কোন পরিকল্পিত খারাপ মন্তব্য নয়। এই জগতে মন্দির প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সর্বদা আপত্তিকর নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষকে ধর্মোপদেশ দান করার জন্য এখনো কোন নির্দিষ্ট ধর্মমত সফল হয়নি। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নির্দেশ দিয়েছেন নির্বিচারে সনাতন ধর্মের উপদেশ প্রচার করার জন্য। এর মানে এই নয় যে, কৃত্রিমভাবে একজন নিজেকে সনাতন ধর্মের আদর্শ প্রচারক হিসেবে ঘোষণা করবে এবং নিজে আচরণ করবে না। বদ্ধজীবের সহজাত প্রবৃত্তি জড়তা কাটানোর জন্য শাস্ত্র নির্দেশিত বিধিবদ্ধ জীবনযাপন আবশ্যক।
৫. কিন্তু কৃত্রিমভাবে বিধিনিষেধ পালনের কোন মুল্য নেই। ধর্মের প্রামাণিক শিক্ষক কোন কৃত্রিম পদ্ধতির পণ্যও নয় আবার আনুকুল্য প্রদানকারীও নয়। তার কাছে অচৈতন্য অবস্থায় অধঃপতিত হবার কোন সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট কোন স্ত্রোত্র পাঠের মাধ্যমে যে সাধনা এর মাধ্যমে একজনকে ধর্মমতের পূর্ণ সত্যে অধিষ্ঠিত করতে পারবে না। সুসংগঠিত গীর্জার ধারণা বোধগম্য রূপের মধ্যে একটি। বাস্তবিক পক্ষে এটি জীবন্ত পারমার্থিক আন্দোলন বন্ধ করণের চিহ্ন। যেমন আগে থেকে কোন প্রতিকূল ধারণা হৃদয়ে বড় হতে থাকলে তা ত্যাগ করা অসম্ভব, ঠিক তেমনি গীর্জার যাজকীয় প্রতিষ্ঠাও স্রোতস্বিনীর বিশাল বাঁধা-স্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধনের জন্য জনসাধারণের পারমার্থিক বিনাশ সাধন বাসনার ইঙ্গিত করে। তারা পরম সত্যের অন্ত বিষয়েও নিঃসঙ্কোচ চিত্তে এবং তৎবিধিপূর্বক প্রামাণিক শিক্ষকের পথ নির্দেশের ইঙ্গিত দেয়।
৬. যারা যে কোন যথার্থ পারমার্থিক আন্দোলনের নামে যে কোন পার্থিব অর্থে, যে কোন পাথির্ব সফলতা, কোন পার্থিব অবস্থার উৎকর্ষ সাধনের ব্যবস্থা করছে তারা ব্যাপকভাবে ভুল করছে। তারা পার্থিব প্রত্যাশী, যারা ধর্মের নামধারী শিক্ষকের অনিষ্টকর প্রতিযোগিতার পৃষ্ঠপোষকতা করে। (পুতনারা যাদের মনমত কাজ হচ্ছে ধর্মের যথাযথ সবিশেষবাদ বিধান সম্ভাব্য আবির্ভাবের প্রারম্ভেই দমিয়ে দেওয়া)। পুতনাদের শুধু আস্তিক্যবাদীদের ওপরই বল প্রয়োগ করার শক্তি আছে। এটি একটি প্রশংসাহীন কিন্তু উপকারী কাজ যা তারা তাদের অনাকাক্সক্ষী শিকারদের জন্য করে থাকে।
৭. যখনই শুদ্ধ আত্মাদের হৃদয়ে ভগবদ্ভক্তি জাগ্রত হয় তখনই নবজাতক কৃষ্ণ সদৃশ ভগবদ্ভক্তি, পূতনারূপী নির্বিশেষবাদীদের দ্বারা প্রারম্ভেই স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়। হবু হত্যাকারী নিজেকেই নিজে হত্যা করে। এটিই হচ্ছে নেতিবাচক সেবার পুরষ্কার যে পুতনার সমস্ত প্রকার কুটিল পদক্ষেপের দ্বারা অজ্ঞাতসারেই কুটিলতার বিরোধিতা করে যা আস্তিক্যবাদের কারণস্বরূপ।
৮. কিন্তু পুতনা তার পুরষ্কার গ্রহণ করতে মোটেও পছন্দ করে না যা তার ভ্রমাত্মক ব্যক্তিত্ব্যের সম্পূর্ণ বিনাশ সাধন করে। মহারাজ কংসও তার প্রতিনিধিদের সেবা বঞ্চিত হতে পছন্দ করে না। ধর্মের ভণ্ড শিক্ষকদের নির্বাক অবস্থান হচ্ছে জড় জগতে পরম পুরুষোত্তমের আবির্ভাবের প্রথম পরিস্কার ইঙ্গিত। ধর্মের প্রামাণিক শিক্ষকগণ কৃষ্ণের বাণী প্রচারের মাধ্যমে ভণ্ড শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণের আবির্ভাবের ঘোষক।

সূত্র: মাসিক চৈতন্য সন্দেশ 
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ও ব্যাক টু গডহেড এর ।। গ্রাহক ও এজেন্ট হতে পারেন
প্রয়োজনে : 01820-133161, 01758-878816, 01838-144699
সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।