জন্মাষ্টমী কিভাবে পালন করবেন?

0
44

হরিভক্তিবিলাসের ১৫ তম বিভাগে ২৪৭ থেকে ৫৪২ নং শ্লোকে জন্মাষ্টমী ব্রতের মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে এবং কিভাবে তা পালন করতে হবে সে সম্পর্কে উক্তি রয়েছে। এই বিভাগে ভগবানের আবির্ভাব দিবস পালনের তিনটি কারণ বর্ণিত রয়েছে:

নিত্যত্বঞ্চ পরন্তস্য ভগবৎপ্রীণনান্মতম্ ।
বিধিবাক্যবিশেষাচ্চাকরণে প্রত্যবায়তঃ ॥
(হরিভক্তিবিলাস ১৫/২৬৬)

“শ্রীজন্মাষ্টমী ব্রতের নিত্যত্ব স্বীকৃত হয় তিন প্রকারে: ১. যখন কেউ এই ব্রত পালন করে তখন ভগবান তাঁর প্রতি প্রসন্ন হন। ২. এই ব্রত পালনের জন্য বিশেষ শাস্ত্রীয় নির্দেশনা রয়েছে। ৩. এই ব্রত পালন না করাটি দোষযুক্ত।”

কৃষ্ণের প্রীতিবিধানার্থে

স্কন্দ পুরাণের নিম্নের বিবৃতি থেকে জানা যায় যে, জন্মাষ্টমী ব্রত পালন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রীত করে:

প্রহলাদাদ্যৈশ্চ ভূপালৈঃ কৃতা জন্মাষ্টমী শুভা ।
শ্রদ্ধয়া পরয়া বিষ্ণোঃ প্রীতয়ে কৃষ্ণবলুভা ॥
প্রাজাপত্যর্ক্ষসংযুক্তা শ্রাবণস্যাসিতাষ্টমী ।
বর্ষে বর্ষে তু কৰ্ত্তব্যা তুষ্ট্যর্থং চক্রপাণিনঃ ॥
(হ.বি ১৫/২৬৭-২৬৮)

“শ্রীবিষ্ণুর প্রীতিবিধানার্থে এমনকি প্রহ্লাদ মহারাজের মত মহান মহান রাজাগণ শ্রদ্ধার সহিত কৃষ্ণের অতি প্রিয় এ জন্মাষ্টমী ব্রত পালন করেছিলেন। রোহিনী নক্ষত্র যুক্তা ভাদ্র মাসের কৃষ্ণাষ্টমী ব্রতোৎসব শ্রীচক্রপাণির তুষ্টির জন্য প্রতি বছর সবারই এই জন্মাষ্টমী উদ্‌যাপন করা কর্তব্য। পালন না করার দোষসমূহ হরিভক্তিবিলাসের এই বিভাগে ২৬৯ থেকে ২৮২ নং শ্লোকে শ্রীবিষ্ণুরহস্য পুরাণের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যে, যদি কেউ জন্মাষ্টমী উপবাস পালন না করেন এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে বিশেষ পূজা নিবেদন না করেন তাহলে কি প্রতিক্রিয়ার সৃস্টি হয়। নিম্নে কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হল:
“জন্মাষ্টমীর দিনে ভোজন করলে শকুন মাংস, গাধা, কাক, শ্যেনপক্ষী বা মনুষ্য ভোজন করা হয়। জন্মাষ্টমী দিনে যিনি ভোজন করেন, তিনি ত্রিলোকের সমস্ত পাপ ভোজন করেন। যদি কেউ জন্মাষ্টমীতে তিলমাত্রও উদর পূরণ করে তবে তার শরীরকে মৃত্যুর পর যমদূতগণ তিল তিল করে পীড়া দেয়। দিনে ভোজনকারী অতীত ও অনাগত একশত কুলকে ঘোর নরকে পতিত করে।… যে নারী প্রতি বছর কৃষ্ণজন্মাষ্টমী ব্রত করে না সে অরণ্যে ভুজঙ্গী হয়। সমস্ত ভক্তের কর্তব্য এমনকি স্বল্প, অর্থ ব্যয়েও দেবকী নন্দনের প্রীতিবিধানার্থে জন্মাষ্টমী উদ্‌যাপন করা। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব দিবস উদযাপন করতে ব্যর্থ হওয়া উচিত নয়, অন্যথা না করলে এককল্প (এক হাজার চতুর্যুগ) নরক বাস হয়।
সূত্র: (হরিভক্তিবিলাস ১৫/২৭০, ২৭২, ২৭৪, ২৭৭, ২৮২)

জাগতিক কল্যাণ সমূহ

হরিভক্তিবিলাসের ১৫ তম বিভাগের ২৮৩ শ্লোক থেকে ৩৪০ পর্যন্ত জন্মাষ্টমীর মহিমা সম্পর্কে বিভিন্ন শাস্ত্রের উক্তি প্রদত্ত হয়। এই বিভাগে উক্ত হয়েছে যে কিভাবে জাগতিক কল্যাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ ভবিষ্যোত্তর পুরাণের বিভিন্ন উদ্ধৃতি হরিভক্তিবিলাসের নিন্মোক্ত শ্লোকসমূহে (১৫/২৮৩ ২৮৪ ২৮৯ ২৯২) রয়েছে। যেখানে এ উৎসব উদ্‌যাপনের মাধ্যমে কিভাবে বিভিন্ন জাগতিক কল্যাণ সাধিত হয় সে সম্পর্কে বলা হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালন করলে সাত জন্মের পাপ হতে মুক্ত হওয়া যায়। পুত্র সন্তান, আরোগ্য, অতুল সৌভাগ্য লাভ হয় এবং সত্যধর্ম পরায়ন হয়ে মৃত্যুর পর বৈকুণ্ঠধাম প্রাপ্তি হয়।…যে দেশে মানবগণ সর্বদা এই পবিত্র জন্মদিন বর্ণমালায় লিখিত বা চিত্রপটে অঙ্কিত ও সর্ব্বালঙ্কার শোভিত করে উৎসব সহ পূজা করে সেই দেশে কখনও শত্রুভয় উৎপন্ন হয় না, মেঘ যথাকালে বর্ষন করে, খড়ার দুর্ভোগ থাকে না। বিবিধ প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও নরকাদির ভয় এবং পশু হতে, নকুল, সর্প পাপজ রোগ, পাপ, রাজ্য চৌর ইত্যাদি হতে কখনও ভয় হয় না।
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের বিশ্লেষণ
এ প্রসঙ্গে চৈতন্য শিক্ষামৃতে প্রথম অধ্যায়ে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর উল্লেখ করেছেন কিভাবে ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য লোকেদের বিভিন্ন উপায়ে অনুপ্রেরণা লাভ করা উচিত:
১. ভয়
২. আশা-জাগতিক আকাঙ্ক্ষা পুরনের জন্য
৩. কর্তব্যবুদ্ধি- কি করা উচিত এই মানসিকতা
৪. রাগ- ভগবানের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এ সমস্ত অনুপ্রেরণা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: যারা ভয়, আশা, কিংবা কর্তব্যবুদ্ধি নিয়ে ভগবানের আরাধনা করেন তারা ততটা শুদ্ধ স্তরের নয়। পক্ষান্তরে যারা রাগ অনুসারে ভগবানের আরাধনা করেন তারাই হলেন প্রকৃত উপাসক। ভয় ও আশা সর্বনিম্ন স্তরের। যখন একজন অনুশীলনকারীর বুদ্ধি স্বচ্ছ হয় তখন তিনি ভয় ও আশা পরিত্যাগ করে এবং কর্তব্যবুদ্ধিই তার একমাত্র অভিপ্রায় হয়। যতদিন পর্যন্ত ভগবানের প্রতি রাগ ভাব প্রকাশিত হয় না, ততদিন পর্যন্ত ভক্তের কর্তব্যবুদ্ধি নিয়ে ভগবানের আরাধনা করার ভাব পরিত্যাগ করা উচিত নয়। এই কর্তব্যবুদ্ধি থেকে দুটি বিষয় উদিত হয়:
১. বিধি-সম্মান, অর্থাৎ পারমার্থিক বিধিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ২. অবিধি পরিত্যাগ, অর্থাৎ বিধির বিপরীতে প্রতিকূল বিষয়গুলো পরিত্যাগ ।

শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশনা

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদও জন্মাষ্টমী ব্রতের নিয়মসমূহ পালন করার জন্য তার সকল অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১১/৫৪ নং শ্লোকের ভাষ্যে লিখেছেন, “বৈদিক শাস্ত্রে নানা রকম বিধি-নিষেধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যদি কেউ শ্রীকৃষ্ণকে জানতে চায়, তা হলে তাকে শাস্ত্রের এই সমস্ত নির্দেশগুলি মানতে হবে। শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে কৃচ্ছ্রসাধন করা যায়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন করতে হলে আমরা শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন উপলক্ষ্যে জন্মাষ্টমীতে এবং প্রতি মাসে দুটি একাদশীতে উপবাস ব্রত পালন করতে পারি”।

খাদ্য বনাম প্রসাদ

উপরে উল্লেখিত হরিভক্তিবিলাসে ১৫/২৭২ নং শ্লোকে বিবৃতি রয়েছে অর্থাৎ যে ব্যক্তি তিলমাত্রও জন্মাষ্টমী দিবসে উদর পূরণ করে তার শরীরকে তিল তিল করে যমদূতগণ পীড়া দেয়। এক্ষেত্রে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে কেন শ্রীল প্রভুপাদ এই বিষয়টি পুনঃ পুনঃ জোর দেননি। কেন জন্মাষ্টমী দিবসে অনেক বৈষ্ণব অতিথিদের মাঝে প্রসাদ পরিবেশন করেন? যদিও এই দিবসে আহার নিষেধ করা হয়েছে, কিন্তু হরিভক্তিবিলাসে যারা প্রসাদ গ্রহণ করেন তাদের জন্য কোন প্রতিকূল প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে বর্ণনা নেই। শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতায় (৩/১৩) কৃষ্ণ বলেছেন,

যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ ।
ভুঞ্জতে তে তুঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ ॥

“ভগবদ্ভক্তেরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন, কারণ তাঁরা যজ্ঞাবশিস্ট অন্নাদি গ্রহণ করেন। যারা কেবল স্বার্থপর হয়ে নিজেদের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তির জন্য অন্নাদি পাক করে, তারা কেবল পাপই ভোজন করে।”
জন্মাষ্টমীর মহিমা ও বিধিনিষেদের এই বর্ণনা পূর্বের বিভাগে হরিভক্তিবিলাসে বলা হয়েছে যে, প্রসাদকে খাদ্য বলে বিবেচনা করা অনুচিত। প্রসাদকে স্বয়ং কৃষ্ণের মতো গ্রহণ করা উচিত, এটিকে সর্বদা জড় জগতের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করা উচিত। হরিভক্তিবিলাসে (৯/৪০৩-৪০৪) বৃহদ্বিষ্ণু পুরাণের উদ্ধৃতি প্রদান করা হয়েছে: শ্রীকৃষ্ণের নৈবেদ্য এবং অন্ন পানাদি যে কোন দ্রব্য ভোজনের বিষয়ে ভক্ষ্যাভক্ষ্য (আহার্য বা অনাহার্য) বিচার করতে নেই। শ্রীহরির নৈবেদ্য অপ্রাকৃত, শাশ্বত ও শ্রীবিষ্ণু থেকে অভিন্ন ।
প্রসাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন কোনো রকম অপবিত্রতা সৃষ্টি করে না। বরং যারা ভগবান থেকে অভিন্ন কৃষ্ণের উচ্ছিষ্ট রূপ প্রসাদকে, অবমাননা করে অথবা দোষ ত্রুটি সহকারে প্রসাদ গ্রহণ করে তবে তারা মহাপরাধী। হরিভক্তিবিলাসে বৃহদ্বিষ্ণু পুরাণের আরো কিছু শ্লোকে উদ্ধৃত আছে, “যে সকল ব্রাহ্মণ বিষ্ণু নৈবেদ্য গ্রহণের ব্যাপারে বিকারগ্রস্ত হন এবং শ্রীহরির নৈবেদ্যকে জাগতিক হিসেবে গ্রহণ করেন তারা কুষ্ঠব্যাধিগ্রস্ত হবেন এবং স্ত্রী পুত্রাদি বর্জিত হয়ে অনন্তকালের জন্য নরকগামী হন। যেরকম হরিভক্তিবিলাসের ১৫/২৮২ নং শ্লোকে উদ্ধৃত রয়েছে যে, সমস্ত ভক্তদের কর্তব্য ব্যক্তিগত জন্মাষ্টমী পালন করা। যদি তা না করা হয় তবে শাস্ত্রের নির্দেশনাকে অবহেলা করা হয়। স্কন্দ পুরাণের উৎকল খণ্ডে (৩৬/১৯-২০) নিন্মোক্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় যে, জন্মাষ্টমীতে অতিথিদের মাঝে প্রসাদ বিতরণ সেবা করার জন্য অনেক বৈষ্ণব ইতস্তত বোধ করেন না। “এমনকি যদি কেউ শারীরিক ও মানসিক অবস্থায় অপবিত্র থাকেন কিংবা অবিধি কার্যকলাপে নিযুক্ত থাকেন তাঁর উচিত যেখানেই সুলভ হয় সেই মহা প্রসাদ আস্বাদন করা। এক্ষেত্রে অন্য কোনো কিছু বিবেচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।”


 

মাসিক চৈতন্য-সন্দেশ সেপ্টেম্বর ২০১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here