জন্মনিয়ন্ত্রণ একটি ভ্রান্তি (পর্ব-১)

0
42

জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রকৃতি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত এই জনসংখ্যার সমস্ত প্রয়োজন সরবরাহ করতে পারছে না বলে জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের যে অভিমত, বেদের সিদ্ধান্ত অনুসারে তা সম্পূর্ণ ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। জনসাধারণ যদি ভগবৎ চেতনাসম্পন্ন হয়, তা হলে জনসংখ্যা অন্তহীনভাবে বৃদ্ধি পেলেও প্রকৃতি তাদের অনায়াসে পালন করতে পারে। আজকাল জনমানসে অন্যতম একটি ভুল ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে এবং তা হল জনসংখ্যার অত্যধিক বৃদ্ধি রোধ করার জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণের আবশ্যকতা রয়েছে। কিন্তু এই প্রসঙ্গে শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বলেছেন, “এই জগতে আমাদের জীবনধারণের জন্য কোন কিছুরই অভাব নেই।” শ্রীল প্রভুপাদের মতে, “আধুনিক মানব সমাজের নেতারা খাদ্যপরিস্থিতি নিয়ে বিচলিত এবং তারা তাদের পরিকল্পনাবিহীন প্রশাসনিক অব্যবস্থার প্রকৃত সত্যটিকে ঢাকতে গিয়ে ছলনার আশ্রয় নিয়ে অত্যধিক হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অজুহাত দেখায়।” শ্রীমদ্ভাগবত ৩/৫/৫ তাৎপর্য

অতিপ্রজনন বা অস্বাভাবিকভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কবল থেকে পৃথিবী এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। একটি সাধারণ গণনা থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্যই আমেরিকার টেক্সাস রাজ্যের ২,৬৭,৩৩৯ বর্গমাইলের মধ্যে বসবাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এবং সেক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষের জন্য ১৫০০ বর্গফুট স্থান বরাদ্দ করা সম্ভব। কিন্তু খাদ্যের কি ব্যবস্থা হবে? ক্যালিফোর্ণিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণামূলক সমীক্ষা থেকে জানতে পারা যায় যে, কৃষিবিজ্ঞানের আধুনিক প্রণালী অবলম্বন করে সমগ্র বিশ্বের কৃষকেরা এত অধিক পরিমাণে কৃষিজ সম্পদ উৎপাদন করতে সমর্থ হবে যে, তা দিয়ে বর্তমান জনসংখ্যার দশগুণ বেশি মানুষকে অতি উন্নতমানের খাদ্য জোগানো সম্ভব হবে। আর মানুষ যদি আমিষ খাদ্যের সমান পুষ্টিকর বিশুদ্ধ নিরামিষ খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হয়, তা হলে বর্তমান জনসংখ্যার ত্রিশ গুণ বেশি মানুষকে খাদ্য জোগান দেওয়া সম্ভব হবে। ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে আফ্রিকায় এক দুর্ভিক্ষের পর্যালোচনাকালীন বিবৃতি থেকে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিটি দেশের মধ্যেই যথেষ্ট পরিমাণে কৃষি সংক্রান্ত ব্যবস্থাদি বর্তমান ছিল, যা দিয়ে দেশের প্রতিটি মানুষের ক্ষুন্নিবৃত্তি করা সম্ভব হত। ফ্রান্সিস মুরে লাঁ পীয়ের গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘ফুড ফাস্ট’-এর মধ্যেও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন যে, দেশের অধিকাংশ উর্বর এবং ভাল কৃষিক্ষেত্রগুলি নষ্ট করা হয়েছিল রপ্তানিযোগ্য ফলন উৎপাদনের মাধ্যমে। শ্রীল প্রভুপাদও এই সত্যের পুনরুক্তি করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে মরিশাসে প্রচার পরিক্রমার সময়ে সেই দেশের নেতৃস্থানীয় ও অগ্রগণ্য কয়েকজন নাগরিকের উপস্থিতিতে একটি বক্তৃতা প্রদানকালে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, “আপনাদের মরিশাস দ্বীপে খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কৃষিক্ষেত্র রয়েছে।” তারপর তিনি ক্ষুব্ধভাবে বলেছিলেন, “কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণ শস্য উৎপাদন করার পরিবর্তে আপনারা বিদেশে রপ্তানি করার জন্য আখ উৎপন্ন করছেন। কিন্তু কেন? আপনারা সর্বপ্রথমে আপনাদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন করুন। তারপর যদি সময় থাকে এবং দেশবাসীর প্রয়োজনের অনুপাতে যদি যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্যশস্য থাকে, তখন আপনারা রপ্তানির জন্য ফল এবং ফসলাদি উৎপন্ন করতে পারেন।” শ্রীল প্রভুপাদ আরও বলেছিলেন, “আমি আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকার মতো মহাদেশগুলিতে পরিভ্রমণ করেছি এবং সর্বত্রই দেখেছি যে, কত খালি জমি পড়ে রয়েছে। যদি আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য এই জমিগুলি ব্যবহার করি, তা হলে বর্তমান জনসংখ্যার দশগুণ মানুষকে আমরা আহার জোগাতে পারব। অভাবের কোন প্রশ্নই উঠবে না। সমগ্র সৃষ্টির স্রষ্টা পরমেশ^র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর সবই ‘পূর্ণম’।” সঠিক খাদ্য ব্যবস্থা বা নীতির অভাবেও খাদ্য উৎপাদনের সম্ভাবনাগুলি বিনষ্ট হচ্ছে। মরিশাসে বক্তৃতা প্রদানকালে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, “আমি পাশ্চাত্য দেশগুলিতে দেখেছি যে, তারা পশুদের জন্য খাদ্যশস্য উৎপাদন করছে। পশুরা সেই খাদ্যশস্য আহার করছে, আর মানুষেরা আহার করছে সেই সমস্ত পশুদের এটি কি ধরনের নীতি? পশুরা খাদ্যশস্য আহার করছে, কিন্তু সেই পরিমাণ খাদ্যশস্য বহু মানুষ আহার করতে পারে।”
বর্তমানে এই ধরনের নীতিরই প্রচলন রয়েছে। সরকারী পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, আমেরিকায় সংগৃহীত নব্বই শতাংশ ভোজ্য খাদ্যশস্য সেই সমস্ত পশুদের খাওয়ানো হয়, যাদের পরে মাংসের জন্য জবাই করা হয়। কিন্তু গবাদি পশুকে আট কিলো খাদ্য শস্য আহার করানোর ফলে মাত্র আধ কিলো মাংস উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ প্রতি আট কিলো খাদ্যশস্যের বিনিময়ে মাত্র আধ কিলো মাংস পাওয়া যায়। তাঁর বক্তৃতার উপসংহারে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, “খাদ্যশস্য যথাযথভাবে বিতরণ করার জন্য যদি পৃথিবীর বুকে এমন একটিও সরকার থাকত, তাহলে পৃথিবীতে অভাব অনটনের কোন প্রশ্নই উঠত না। তা হলে কোন কসাইখানা খোলারও প্রয়োজন হত না এবং অতিপ্রজনন বা জনসংখ্যা বৃদ্ধির মিথ্যা সিদ্ধান্ত বা বিবৃতি উপস্থাপনার প্রয়োজনও হত না।” (শ্রীমদ্ভাগবত ৪/১৭/২৫ তাৎপর্য)

অত্যধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রথম সতর্ক বাণী শুনিয়েছিলেন ইংরেজ অর্থনীতিবিদ ম্যালথাস (১৭৬৬-১৮৩৪), যিনি গণনা করে দেখিয়েছিলেন যে, পৃথিবীর ভাণ্ডারে সঞ্চিত সীমিত খাদ্যসামগ্রীর তুলনায় জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ম্যালথাস বলেছিলেন যে, নতুন কৃষিক্ষেত্রগুলি থেকে দীর্ঘ সময় সাপেক্ষে কঠোর শ্রমের বিনিময়ে এবং সুপরিকল্পনার মাধ্যমে অত্যন্ত সীমিত পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন করা সম্ভব হবে। কিন্তু তার তুলনায় কাম-লালসা চরিতার্থ করতে গিয়ে মানুষ তাদের ইচ্ছামতো অনেক বেশি সন্তানের জন্মদান করবে, যদি না সে বিষয়ে তাদের নিয়ন্ত্রিত করা হয়। তাই বিস্ফোরিত জনসংখ্যা প্রায় সব সময়ই প্রাপ্তব্য খাদ্যদ্রব্যের সম্ভাবনা অতিক্রম করছে এবং ফলস্বরূপ তাদের অভাব অনটনের ক্লেশ ভোগ করতে হচ্ছে। ম্যালথাস তাঁর এই নীতির সারাংশে বলেছিলেন যে, খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন হয় গাণিতিক মাত্রা অনুসারে, কিন্তু জনসংখ্যার বৃদ্ধি হয় জ্যামিতিক গণনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত দ্রুত গতিতে। ম্যালথাস আরও বলেছেন, “প্রকৃতির মাঝে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় যত সামগ্রী আছে, তার থেকে জনসংখ্যা অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে এবং এই উক্তির যথার্থতা প্রমাণিত হবে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রের মানব সমাজের সমীক্ষার মাধ্যমে।” কিন্তু বৈদিক সিদ্ধান্ত অনুসারে, প্রকৃতি প্রায় অন্তহীনভাবে জীবনের প্রয়োজনীয় সমস্ত সামগ্রী উৎপাদন করতে পারে। তবে প্রকৃতির এই বদান্যতায় ছেদ পড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য নয়, জনগণের আত্মহননকারী কার্যকলাপ ও বৈরী মনোভাবের জন্য। বাস্তব অভিজ্ঞতা বা পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞান আমাদের বিভিন্ন জীব ও প্রাকৃতিক উপাদান সমূহের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার গভীরতা সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছে এবং এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা যে বিভিন্ন প্রকার কৃত্রিম প্রযুক্তির দ্বারা কিভাবে বিঘ্নিত হয়, সে বিষয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে নাসার বৈজ্ঞানিক গবেষক জিম লাভলক। তিনি গবেষণাকালে মন্তব্য করেছিলেন যে, “পৃথিবীর সমস্ত জীবসত্তা, বায়ু, সমুদ্র এবং ভূমি একত্রে এমন একটি সুসমন্বিত অবস্থার সৃষ্টি করে, যেটিকে একক সত্তাবিশিষ্ট বলে মনে হতে পারে এবং তা পৃথিবীর পরিবেশকে জীবন ধারণের উপযোগী করে তোলে।” গ্রীকদের ভূমিদেবীর নামানুসারে তিনি এই গবেষণামূলক সূত্রটির নাম দিয়েছেন “গায়া নীতি”। জড় বিজ্ঞানের নীতির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত থাকার ফলে লাভলক নিজে ভূমির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর সাকারত্বে বিশ্বাস করেন না ঠিকই কিন্তু তিনি উল্লেখ করেছেন, “ভূমি দেবীর সম্বন্ধে বিশ্বাস বা ধারণা, যাঁকে গ্রীকেরা বহু পূর্বে ‘গায়া’ বলে সম্বোধন করত, তিনি সমগ্র ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং মহান ধর্মসমূহের সঙ্গে সহাবস্থানকারী একটি বিশেষ মত বা ধারার ভিত্তিস্বরূপ।” বৈদিক শাস্ত্রসমূহ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, সমগ্র ধরাতল ভূমিদেবীর দৃশ্যমান প্রকাশ এবং এই ভূমিদেবীই জনগণের পারমার্থিক চেতনার মান অনুসারে তাঁর উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি বা হ্রাস করেন। এই প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, “তাই পৃথিবীর বুকে জনসংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেলেও, সেই ভার ভূমিদেবীর কাছে আনন্দের কারণ হয়ে থাকে, যদি জনগণ ভগবৎ চেতনার অনুকূলে যথাযথভাবে পরিচালিত হয় এবং কোন দুষ্কর্মে না লিপ্ত হয়।” (ভাগবত ৩/৩/১৪, তাৎপর্য)

সুতরাং, বেদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ম্যালথাস এবং পরবর্তীকালের জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের এই ধারণা ভ্রান্ত যে, প্রকৃতি বিপুল জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করতে অক্ষম। যদি জনগণ ভগবৎ চেতনাসম্পন্ন হয়, তা হলে প্রকৃতি জনগণের সমস্ত চাহিদা স্বচ্ছন্দে মেটাতে পারেন এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি অন্তহীনভাবেই তা করে আসছেন এবং চিরকাল তা করতে পারেন। তবুও ম্যালথাস জন্ম নিয়ন্ত্রণ সম্বন্ধে মূল্যবান কয়েকটি বিষয়ের ইঙ্গিত করেছেন। তার মত অনুসারে, “স্বেচ্ছায় বিবাহ বর্জন করা এর সবচাইতে ভাল সমাধান। অবশ্য সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই রিপুর বেগ দমন করতে হবে।” এই উক্তির মাধ্যমে তিনি সব রকমের অবৈধ যৌন সংসর্গ পরিহার করতে বলেছেন। ম্যালথাস বিশেষভাবে অবাধ যৌন সংসর্গের বিরোধিতা করেছেন, গর্ভপাত ও জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য সমস্ত রকমের গর্ভনিরোধক ব্যবস্থাদি যার অন্তর্গত। এই বিষয়ে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, “অবৈধ যৌন সংসর্গের ফলে যে সমস্ত শিশু গর্ভজাত হচ্ছে, তাদের এইভাবে হত্যা করা অত্যন্ত নিকৃষ্ট বৃত্তির পরিচায়ক এবং তা উন্নত মানব চেতনার পক্ষে চরম কলঙ্কজনক। এই ধরনের নীতিবিরুদ্ধ ক্রিয়াকলাপের ফলে মানবসভ্যতার মূল আদর্শ ক্ষুন্ন হয় এবং তার খারাপ প্রতিক্রিয়া সমগ্র সমাজকে প্রভাবিত করে।”
ফলে, তার অবশ্যম্ভাবী পরিণামে গৃহের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিনষ্ট হয়, দাম্পত্য জীবন দুর্বল হয়ে পড়ে, পিতামাতার সঙ্গে সন্তানের বাৎসল্যপূর্ণ স্নেহ প্রীতির অভাব দেখা দেয়, সন্তানের লালন-পালন ও শিক্ষার বিষয়ে পিতামাতার যত্ন ও প্রচেষ্টা শিথিল হয়ে পড়ে। ম্যালথাস যে সমস্ত বিপদের সম্বন্ধে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ইতিমধ্যেই সেগুলি প্রকাশ হতে শুরু করেছে। বিবাহবিচ্ছেদ, কিশোরদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা, যৌন অপরাধÑএসমস্তই বর্তমানে ঘটছে। ছন্নছাড়া গৃহ সংসার থেকে উদ্ভূত হয়ে অবাঞ্ছিত শিশুরা আদালতগুলির পরিবেশকে ভারাক্রান্ত করে তুলছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here