জগন্নাথ নিজে এসেছিলেন

0
55

একদিন মালতী ব্যস্তভাবে শ্রীল প্রভুপাদের অ্যাপার্টমেন্টে এসে তার থলি থেকে একটি ছোট্ট কাঠের মূর্তি শ্রীল প্রভুপাদের ডেস্কের উপর রেখে, জিজ্ঞাসা করল, “এটা কি, স্বামীজী?” শ্রীল প্রভুপাদ নীচু হয়ে বড়বড় চোখ, চ্যাপ্‌টা মাথা, হাস্যোজ্জ্বল তিন ইঞ্চি লম্বা কালো পুতুলটিকে দেখতে লাগলেন। পুতুলটির গঠন মোটাসোটা, তার হাত দুটি সামনের দিকে বেরিয়ে আছে, তার বক্ষঃস্থল হলুদ আর সবুজ রঙে সাধারণভাবে রঙ করা আর তাতে কোন পা দেখা যাচ্ছে না। শ্রীল প্রভুপাদ তৎক্ষণাৎ সেই ছোট্ট মূর্তিটিকে শ্রদ্ধা সহকারে মাথা নীচু করে করজোড়ে প্রণতি নিবেদন করলেন। আনন্দে তাঁর চোখ দুটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং তিনি হেসে বললেন, “তুমি জগতের নাথ জগন্নাথকে নিয়ে। এসেছ। ইনি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। তোমায় অসংখ্য ধন্যবাদ।” শ্রীল প্রভুপাদ আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠলেন, আর স্বামীজিকে এইভাবে আনন্দ দিতে পেরে মালতী এবং অন্যরা বিস্ময়াবিষ্টচিত্তে মেঝের উপর বসে রইল। শ্রীল প্রভুপাদ তাদের বোঝালেন যে, এটি হচ্ছে শ্রীজগন্নাথদেবের শ্রীবিগ্রহ, শ্রীকৃষ্ণের একটি বিগ্রহ, যা হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষে পূজিত হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন যে, আরও দুটি শ্রীবিগ্রহ-তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রাসহ তিনি পূজিত হন ।
উত্তেজিতভাবে মালতী জানাল যে, কোস্ট প্লাস নামক বিদেশ থেকে রপ্তানি করা জিনিসের দোকানটিতে সে এই ছোট্ট জগন্নাথকে খুঁজে পেয়েছিল। সেখানে এই রকম আরও কয়েকটি মূর্তি সে দেখেছে এবং শ্রীল প্রভুপাদ তাকে বলেছিলেন, তৎক্ষণাৎ সেখানে গিয়ে সেগুলি কিনে আনতে। মালতী তার স্বামী শ্যামসুন্দরকে সেই কথা জানিয়েছিল এবং তারা দু’জনে তৎক্ষণাৎ সেই মূর্তি দুটি কিনে আনবার জন্য সেখানে ছুটে গিয়েছিল। শ্রীল প্রভুপাদ কৃষ্ণবর্ণ, হাস্যোজ্জ্বল জগন্নাথকে ডানদিকে রেখেছিলেন। লাল হাস্যোজ্জ্বল মুখ, চৌকো চোখ এবং হলুদ রঙের অবয়ব-বিশিষ্ট সব চাইতে ছোট্ট মূর্তি সুভদ্রাকে মাঝখানে রেখেছিলেন এবং সাদা গোল মাথা, লাল রংয়ের চক্ষু বিশিষ্ট, হাস্যোজ্জ্বল, জগন্নাথের মতো হাত দুটি সামনের দিকে বের করা এবং নীল আর হলুদ অবয়ব-বিশিষ্ট বলরামকে বাঁদিকে সুভদ্রার পাশে রেখেছিলেন। তাঁর ডেস্কের উপর তাঁদের দিকে তাকিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেউ কাঠখোদাই-এর কাজ জানে কি না। শ্যামসুন্দর জানিয়েছিল যে, সে একজন ভাস্কর এবং শ্রীল প্রভুপাদ তাকে বলেছিলেন, এই জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রার তিন ফুট উঁচু প্রতিকৃতি খোদাই করতে।
শ্রীল প্রভুপাদ তাদের বলেছিলেন যে, দু’হাজার বছর আগে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামক এক কৃষ্ণভক্ত রাজা ছিলেন। সূর্যগ্রহণের সময় শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর ভ্রাতা ও ভগিনীসহ কুরুক্ষেত্রে গিয়েছিলেন, সেই প্রকাশের বিগ্রহ মহারাজ ইন্দ্ৰদ্যুম্ন খুঁজছিলেন। রাজা যখন স্বর্গের কারিগর বিশ্বকর্মাকে সেই রূপের মূর্তি তৈরি করতে অনুরোধ করেন, তখন একটি শর্তে বিশ্বকর্মা রাজী হয়েছিলেন তাঁর কাজের সময় কেউ তাঁকে বাধা দিতে পারবে না। দরজা বন্ধ করে বিশ্বকর্মা যখন কাজ করছিলেন, তখন দীর্ঘকাল রাজা অপেক্ষা করে ছিলেন। কিন্তু একদিন রাজা আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। তিনি দরজা খুলে কতটা কাজ হয়েছে, তা দেখতে গেলেন। তাঁর শর্তানুসারে তিনটি অসম্পূর্ণ মূর্তি রেখে, বিশ্বকর্মা সেখান থেকে চলে গেলেন। শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম এবং সুভদ্রার এই বিস্ময়কর মূর্তিগুলি পেয়ে, রাজা আনন্দে অধীর হয়ে তাঁদের পূজা করতে মনস্থ করলেন। তিনি তাঁদের একটি মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করলেন।


 

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জুন-২০০৯ হতে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here