চলুন নৃত্য করি

0
22

একজন ভক্তের একটি দিন, কঠোর পরিশ্রম এবং বিধি-নিষেধের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হলেও তার মাধ্যমে লাভ হয় মুক্তি, প্রসন্নতা এবং চিরবর্ধনকারী আনন্দ।

নাগরাজ দাস

অনেক লোক মনে করে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সদস্যরা জীবন নৃত্যে যোগ দিতে ব্যর্থ। তারা মনে করে আমরা জীবনের আনন্দ লাভের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত। তারা বলে “আপনাদের জীবন অনেক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। আপনারা কীভাবে সুখী হতে পারেন? জীবনের অনেক আনন্দ আপনারা পরিত্যাগ করেছেন। জড়জগতের সমস্ত বিষয়ের জন্য মানুষ লালায়িত সেগুলো কীভাবে আপনারা প্রত্যাখান করতে পারেন? এভাবে আপনাদের জীবন কেন নষ্ট করছেন?”
কিন্তু কৃষ্ণভক্তদের এ ধরনের কোনো অনুভূতিই নেই যে, তারা তাদের জীবন নষ্ট করছে। যদিও তারা অনেক জিনিস পরিত্যাগ করেছে এবং তাদের এসব বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। একজন ভক্তের জীবন বৈচিত্র্যতায় পরিপূর্ণ, যদিও এ ধরনের বৈচিত্রতা জড়জগতে মানুষ যেভাবে উপভোগ করে তা থেকে ভিন্ন। আধুনিক সমাজ আমাদের উৎসাহিত করে উন্মুক্ত মনের হতে এবং পূর্ণভাবে জাগতিক বৈচিত্র্যসমূহ উপভোগ করতে। এমনকি সবচেয়ে সামর্থবান ব্যক্তিরাও জগতের এ সমস্ত বৈচিত্র্য উপলব্ধি করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, কতজন উন্মুক্ত মনের ব্যক্তি হরেকৃষ্ণ মন্দিরে সানডে ফিস্টের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে?
ভক্তদেরকে মাঝে মাঝে বলা হয় অন্য জগতের মানুষ’। আমরা এই জগতে বাস করছি এবং অন্যদের মত আমাদেরও একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু আমরা জাগতিক বিষয়গুলোকে ভিন্নভাবে দর্শন করি। এ সমস্ত বিষয়কে অভক্তরা যেভাবে দর্শন করে ঠিক সেই ভাবে দর্শন করি না। আমরা সবকিছুকে দর্শন করার চেষ্টা করি বৈদিক শাস্ত্রের পরম জ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে, যা কৃষ্ণভাবনা আন্দোলনের দার্শনিক জ্ঞানের ভিত্তি। আমরা সে সমস্ত বিষয়কে মূল্যায়ন করি যেগুলো পারমার্থিক জীবনে অবদান রাখতে পারে।
আমি কৃষ্ণভাবনাময় ভক্তের জীবনের একটি দিনের কথা এখানে তুলে ধরছি। যদিও আমরা সবাই ভক্ত কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন ভক্ত বিভিন্ন উপায়ে কৃষ্ণসেবা করছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলাডেলফিয়াতে যেখানে আমি বাস করি, কিছু ভক্ত মন্দিরের সঙ্গে সংযুক্ত একটি বিল্ডিং এর অ্যাপার্টমেন্টে থাকে, কিছু ভক্ত মন্দিরের পাশেই প্রতিবেশী হিসেবে থাকে, আবার কিছু থাকে অনেক দূরে। কিছু ভক্ত মন্দিরে পূর্ণ সময় ধরে প্রত্যক্ষভাবে সেবা করে এবং কেউ কেউ আবার বাইরে চাকরিও করে। একজন ভক্তের জীবনধারা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য আমি নিজের জীবনের একটি দিনের কথা এখানে তুলে ধরেছি। আমি একজন বিবাহিত এবং মন্দিরের নিকটে একটি অ্যাপার্টমেন্টে বাস করি। ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিন প্রকাশনা সেবায় পূর্ণ সময় ধরে সেবা করি। আমার সহধর্মিনী প্রানদা দেবী দাসী অবসর সময়ে ব্যাক টু গডহেডে সেবা করে। সে ব্যাক টু গড়হেডের লেখাগুলো টাইপ করে এবং অন্য সময় গৃহস্থালীর অন্য কাজ ও রান্নার কাজে সময় ব্যয় করে। আমাদের দৈনন্দিন জীবন শুরু হয় ভোর ৩টা থেকে ৷
হয়তো প্রশ্ন উঠতে পারে “কেন এত তাড়াতাড়ি উঠতে হয়?”
বৈদিক শাস্ত্র ব্যাখ্যা করে যে, সূর্য উদয়ের কয়েক ঘন্টা পূর্বে ঘুম থেকে উঠলে তা বিশেষভাবে পারমার্থিক অনুশীলনের জন্য উপকারী। কেউ যদি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে (৩ টায় উঠার জন্য বলা হচ্ছে না) তাহলে সে উপলব্ধি করতে পারবে, দেরীতে ঘুম থেকে উঠার চেয়ে ভোরে ভোরে ঘুম থেকে উঠা অনেক কার্যকরী । নিজেদেরকে অধিক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভগবানের প্রতি মনোনিবেশে সহায়তা করে।
আমাদের এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠার অন্য একটি কারণও রয়েছে : আমরা খুব বেশী ঘুমাতে চাই না। অধিকাংশ ভক্ত ৬ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমিয়ে থাকে। যেটি একজন স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির জন্য অনেক বেশী। শরীরের সুস্বাস্থ্যের জন্য ঘুম প্রয়োজন, কিন্তু অতিরিক্ত ঘুম অস্বাস্থ্যকর। এতে সময়ও নষ্ট হয়, একজন ভক্তের জন্য সময় অত্যন্ত মূল্যবান। সাধারণ লোকেরা মাঝে মাঝে আমাদেরকে অলস হিসেবে সমালোচনা করে। আমরা জীবনের অন্যান্য দায়িত্ব বা চিন্তা ছাড়াই শুধু জপ-কীর্তন আর নৃত্য করি। আসলে, আমরা পারমার্থিক প্রগতি সাধনের প্রচেষ্টায় অত্যন্ত ব্যস্ত।
আত্ম-উপলব্ধি একটি সহজ বিষয় নয়। জড় শরীরের মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সমগ্র জীবন চলে যায়। এই মোহই হল সমস্ত জড় দুঃখ-দুর্দশার উৎস। আত্ম উপলব্ধি এত গুরুত্বপূর্ণ ও মানবজীবন এত সংক্ষিপ্ত যে, ভক্তরা তাদের সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায়। এজন্যে তারা অতিরিক্ত ঘুমানোর চেষ্টা করে না।
ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে দেহের ১২টি স্থানে তিলক পরিধান করি। এভাবে তিলক পরিধানের মাধ্যমে আমার স্মরণ হয় যে, কৃষ্ণ আমার দেহের অভ্যন্তরে পরমাত্মা হিসেবে রয়েছেন এবং আমার এই দেহটি শুধুমাত্র তাঁর সেবার জন্যেই। এরপর আমি ঐতিহ্যবাহী বৈষ্ণবীয় পোশাক ধুতি ও কুর্তা পরিধান করি।
যখন তিলক, পোশাক পরিধান করতে থাকি তখন আমি আমার গুরুদেব শ্রীল এ. সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের প্রবচন শ্রবণ করি। আমাদের (শিষ্যদের) সাথে তাঁর বার বছরের সাহচর্যে শ্রীল প্রভুপাদ প্রতিদিনই কৃষ্ণভাবনার বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় প্রবচন প্রদান করেছিলেন। তাঁর সেই প্রবচনসমূহ ও বিভিন্ন অধ্যাপক, ছাত্র এবং অন্যান্যদের সাথে তাঁর কথোপকথনসমূহ রেকর্ড করা হয়েছিল। সম্পূর্ণ দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বেদের আমৃত্যু সত্য সম্বন্ধীয় তাঁর প্রবচন খুব ভোরে শ্রবণ করে আমি রসাস্বাদন করি।
পোশাক পরিধানের পর আমি তুলসী মালায় হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ শুরু করি। অন্য সব দীক্ষিত ভক্তের মত আমিও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, প্রতিদিন এই ১৬টি শব্দ সম্বলিত মন্ত্র প্রায় দুই হাজার বার জপ করা, যা সম্পূর্ণ করতে প্রায় দু’ঘন্টা সময় প্রয়োজন হয়।
আমি হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করি ভগবানের প্রতি শুদ্ধপ্রেম লাভ করার জন্য। আমি ভক্তি সহকারে জপ করার চেষ্টা করি এবং অন্য কোনো চিন্তাবিহীন হয়ে ভগবানের অপ্রাকৃত নামের শব্দতরঙ্গ শ্রবণ করার চেষ্টা করি। যেহেতু মন স্বভাবতই চঞ্চল, তাই মনসংযোগ সহজ কোনো বিষয় নয়। শুদ্ধভাবে হরিনাম জপের জন্য অনুশীলন প্রয়োজন। এ কারণে আমাদের নিয়ন্ত্রিতভাবে জপ করতে হবে। যদিও আমার জপ ততটা যথাযথ নয়, তবে আমার এ বিশ্বাস রয়েছে যে, অনুশীলনের মাধ্যমে শুদ্ধ হরিনাম জপের স্তরে একদিন উপনীত হতে পারবো। তখন প্রতি মুহূর্তে কৃষ্ণকে প্রত্যক্ষভাবে বা মুখোমুখি দর্শন করতে পারবো। আমার এই বিশ্বাস রয়েছে, কারণ বৈদিক সাহিত্যে এবং অনেক মহান ভক্তের সাক্ষ্য হরিনাম জপের সুফল সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। সমস্ত শাস্ত্রে হরিনাম জপের পারমার্থিক পুরষ্কার সম্পর্কে ঘোষণা রয়েছে।
৪.১৫ মিনিটে মঙ্গল আরতিতে অংশগ্রহণের জন্য মন্দিরে যাওয়ার পূর্বে আমি প্রায় ১ ঘন্টা হরিনাম জপ করি। ‘মঙ্গল’ অর্থ ‘পবিত্র’ এবং ‘আরতি’ অর্থ একটি অনুষ্ঠান যেখানে বিগ্রহের জন্য ভিন্ন ভিন্ন উপকরণ নিবেদন করা হয় এবং সমবেত ভক্তরা ভগবানের গুণ-মহিমা কীর্তন করে ও তাঁর কাছে প্রার্থনা নিবেদন করে।
ভক্তদের জন্য প্রতিদিন মঙ্গল আরতিতে যোগদান করা সবচেয়ে পালনীয় একটি অনুষ্ঠান।
আমি গত ১৩ বছর যাবৎ এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আসছি। যদিও প্রতিদিনই একই গান গেয়ে আসছি, তবুও এ সমস্ত গান বা ভজন আমি প্রতিবারই গাইতে ভালোবাসি। কক্ষের মধ্যে সম্মিলিত মধুর সুর, ধূপকাঠি ও পুষ্পের সুগন্ধ, মৃদঙ্গের সুমধুর ছন্দ এবং করতালের ঐক্যতান একটি উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে যা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভগবান কৃষ্ণ হলেন আমার প্রভু এবং আমি তাঁর নিত্যসেবক।
কীর্তন শুরু হয় গুরুদেবের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা নিবেদনের মাধ্যমে, তারপর ক্ৰমান্বয়ে সম্মিলিতভাবে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন ও নৃত্য শুরু হয়। ভক্তরা আনন্দে উদ্দণ্ড নৃত্য করতে থাকে। যখন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করি তখন আমি উল্লসিত অনুভব করি এবং সেটাই স্বাভাবিক কেননা কৃষ্ণ হলেন সমস্ত আনন্দের উৎস। যখন আমি নৃত্য করি সেটি কৃত্রিমতা নয় বরং আমি তখন এক আনন্দময় সমাধিতে বিরাজ করি। আমি আনন্দ অনুভব করি, তাই নৃত্য করি। কেননা এর মাধ্যমে আমি কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করতে চাই। যদি আমার ক্লান্তি বা অনুৎসাহ অনুভব হয়, তখন যেকোনোভাবে জপ নৃত্য করার চেষ্টা করি এবং কৃষ্ণ তখন হৃদয়ের অভ্যন্তর থেকে প্রকৃত উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা করে।
মঙ্গল আরতির পর আমি নির্ধারিত জপ শ্রবণ করি। এরপর এক ঘন্টা হয় আমার অফিসে না হয় গৃহে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন বা লেখালেখির কাজে সময় ব্যয় করি। যারা জীবনের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে চায় তাদের জন্য শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন অত্যন্ত মূল্যবান। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যদেরকে কৃষ্ণভাবনা বিষয়ে তাদের উপলব্ধি লেখার জন্যও উৎসাহিত করতেন। তাই প্রতিদিন আমি কিছু সময়ের জন্য লেখালেখির চেষ্টা করি।
এরপর সকল সাতটায় মন্দিরে ফিরে যাই এবং বিগ্রহ দর্শনের জন্য অন্য ভক্তদের সঙ্গে অপেক্ষা করি। বিগ্রহসমূহ তখন সুন্দর পোশাকে সুসজ্জিত হয়।
ভক্তরা তখন দশ মিনিটের জন্য বিগ্রহের উদ্দেশ্যে ভজন ও প্রার্থনা নিবেদন করে। এরপর শঙ্খধ্বনি বাজলে গুরুপূজা শুরু হয়। গুরুপূজা হল শ্রীল প্রভুপাদের আরাধনা করা। ভগবদ্‌গীতা এবং অন্যান্য বৈদিক শাস্ত্রসমূহে ভগবানের প্রতিনিধিকে এভাবে আরাধনা করার জন্য বলা হয়েছে। যদিও শ্রীল প্রভুপাদের অনেক শিষ্যই এখন পারমার্থিক গুরুদেব, যাদের নিজেদেরও অনেক শিষ্য রয়েছে, তবুও মন্দিরে যে গুরুপূজা অনুষ্ঠিত হয় তা শ্রীল প্রভুপাদের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। শ্রীল প্রভুপাদের কৃপা ছাড়া আমাদের অনেকেই কখনো কৃষ্ণ সম্পর্কে শোনেনি, তাই তাঁকে ভালোবাসা ও সেবা নিবেদনের জন্য আমাদের জীবনকে উৎসর্গ করা উচিত। তাঁর অপার কৃপায় ভক্তরা পারমার্থিক জীবনে বিশেষ অবদানের জন্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে সবাই শ্রীল প্রভুপাদ সম্পর্কে জানবে ।
গুরুপূজায় আমরা বিশেষত গুরুদেবের কৃপা প্রার্থনা করি কেননা তাঁর মাধ্যমেই আমরা কৃষ্ণকৃপা প্রাপ্ত হই, গুরুদেবের কৃপা ছাড়া কেউ পারমার্থিক প্রগতি লাভ করতে পারে না। এই বিষয়টি সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন যে, কেউ প্রথমে তাঁর ভক্তের ভক্ত হওয়া ছাড়া কৃষ্ণভক্ত হতে পারে না। মঙ্গল আরতি, গুরুপূজা সমাপ্ত হয় হরে কৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে।
সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে শ্রীমদ্ভাগবত ক্লাস শুরু হয়। শ্রীমদ্ভাগবত মানে হল, “পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত মধুর লীলাবিলাস।” এটি বৈদিক শাস্ত্রের সারস্বরূপ, কেননা এটি ভগবানের অতীত অপ্রাকৃত লীলাবিলাস বিশেষভাবে বর্ণিত রয়েছে। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রের রচয়িতা, শ্রীল ব্যাসদেব শ্রীমদ্ভাগবত রচনা করেন। যেখানে প্রকৃত সত্য সম্পর্কে চূড়ান্ত বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। শ্রীমদ্ভাগবতের শ্লোকসমূহ নিয়মিত শ্রবণের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়ের সমস্ত আবর্জনা বিদূরিত করে এবং ভগবানের প্রেম লাভের মাধ্যমে আমাদের জীবনকে যথার্থ হিসেবে গড়ে তোলে। শ্রীমদ্ভাগবতের শ্লোকসমূহ প্রতি মাসে ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা হয়।
ক্লাসে আমরা দিনে ভাগবতের সংস্কৃত শ্লোকটি উচ্চারণ করি এবং একজন ভক্ত শ্রীল প্রভুপাদ কৃত অনুবাদ ও ভাষ্য পাঠ করে। তিনি তখন ঐ নির্দিষ্ট শ্লোকের ওপর বৈদিক শাস্ত্রের সহযোগীতায় প্রবচন প্রদান করেন। শ্রীমদ্ভাগবতের ওপর যিনি প্রবচন প্রদান করেন তাকে শ্রীল ব্যাসদেবের প্রতিনিধি রূপে বিবেচনা করা হয়। তিনি ব্যাসদেবের চুড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিপরীতে অন্য কোনো কিছু বলবেন না। আমি সপ্তাহে একবার ভাগবত ক্লাস দেওয়ার সুযোগ পাই এবং আমি এটিকে সর্বদা এক চ্যালেঞ্জ ও উদ্দীপনাময় অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখি ।
এভাবে বক্তা আধ ঘন্টার মত বলার পর আলোচনাটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, তাঁর অনুসারীদের কখনোই অনুর্বর মস্তিষ্কের হওয়া উচিত নয়। পক্ষান্তরে কৃষ্ণভাবনার দর্শন উপলব্ধির জন্য তাদের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করা উচিত। ভাগবত ক্লাসে শ্রোতা ভক্তরা মাঝে মাঝে বৈদিক শাস্ত্রের ও বক্তার প্রবচনের আলোকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে। এ প্রকার আলোচনা প্রায়ই মনোরম বিতর্ক প্রতিযোগীতার মতো হয় এবং বৈদিক জ্ঞানের উজ্জ্বল আলোক বিকিরণের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে।
এরপর ভক্তরা সবাই একসাথে প্রসাদ আস্বাদন করে, তখন ভক্তরা কৃষ্ণভাবনার বিজ্ঞানের ওপর কোনো রচনা বা বাক্যালাপ করে থাকে। সকাল ৯টায় প্রসাদ আস্বাদনের মাধ্যমে ৬ ঘন্টার পারমার্থিক অনুশীলনের সমাপ্তি ঘটে। এবার আমি আমার দৈনন্দিন অন্যান্য কাজ শুরু করার প্রস্তুতি গ্রহণ করি
আমাদের ভক্তরাও তাদের নিজেদের কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুত হয়। কেউ মন্দির পরিচালনা করে, কেউ প্রচারের জন্য বাইরে বেরিয়ে যায় এবং অন্যরা তাদের নিজ নিজ কাজে নিয়োজিত হয়।
ব্যাক টু গডহেড অফিসে আমি পরবর্তী সংখ্যার জন্য প্রবন্ধসমূহ সম্পাদনা করি। ব্যাক টু গডহেডের অন্যান্য সেবকদের সাথে আমিও বিভিন্ন পরিকল্পনা, নির্বাচন, ছবি বসানো, ছবির বিবরণ, টাইটেল, সাবটাইটেল এবং আরো অন্যান্য সেবা সম্পাদন করি। পাঠকদের বিবিধ চিঠিপত্রের উত্তর প্রদান করি যেগুলো আমাদের চিঠিপ্রত্র বিভাগে ছাপানো হয়। আমি ব্যাক টু গডহেড প্রকাশনায় যারা অবদান রাখছেন তাদের সঙ্গে পত্র বিনিময় করি। উপরন্তু আমি নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতে চেষ্টা করি। এটি চ্যালেঞ্জিং আবার সন্তুষ্টজনক কর্ম এবং কৃষ্ণভাবনামৃত প্রসারে অবদান রাখতে সক্ষম হওয়ায় আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান অনুভব করি।
দুপুর ১টায় আমি মধ্যাহ্ন ভোজ সম্পন্ন করি যা আমার স্ত্রী (প্রানদা) প্রস্তুত করেছিল এবং আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে শ্রীল প্রভুপাদের বিগ্রহকে নিবেদন করেছিল। তারপর আমি অফিসে ফিরে যাই এবং সন্ধ্যা ৬.৩০ পর্যন্ত কাজ করি।

গুরুপূজায় আমরা বিশেষত গুরুদেবের কৃপা প্রার্থনা করি কেননা তাঁর মাধ্যমেই আমরা কৃষ্ণকৃপা প্রাপ্ত হই, গুরুদেবের কৃপা ছাড়া কেউ পারমার্থিক প্রগতি লাভ করতে পারে না। এই বিষয়টি সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে জোর দিয়ে বলা হয়েছে। কৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন যে, কেউ প্রথমে তাঁর ভক্তের ভক্ত হওয়া ছাড়া তাঁর ভক্ত হতে পারে না। মঙ্গল আরতি, গুরুপূজা সমাপ্ত হয় হরে কৃষ্ণ কীর্তনের মাধ্যমে ।


প্রানদা এবং আমি সন্ধ্যায় একত্রিত হয়ে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করি। আমরা কোনো টেলিভিশন নিই নি। যদিও হয়তো টিভির কিছুটা প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু আমরা অনুভব করি যে, শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থের পবিত্র সান্নিধ্যে সময় ব্যয় করাটাই সর্বোত্তম। যদিও আমরা প্রতিদিনই গ্রন্থ অধ্যয়ন করি, কিন্তু সর্বদাই আমরা নব নব স্বাদ লাভ করি এবং কৃষ্ণভাবনার উপলব্ধি লাভ করি। আমরা এ গ্রন্থসমূহ অধ্যয়নের ক্ষেত্রে কখনো ক্লান্ত অনুভব করি না।
সন্ধ্যায় হালকা প্রসাদ নেওয়ার পর রাত ৮.৩০ মিনিটে দৈনন্দিন ব্যস্ততার পরিসমাপ্তি ঘটে। পরদিন সকালে ৩টা থেকে আবার কার্যক্রম শুরু হয়। এভাবে প্রতিদিন চলতে থাকে।
যদিও জাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমার দৈনন্দিন কর্মসূচি বৈচিত্র্যতাহীন মনে হতে পারে। কিন্তু আমি যদি কৃষ্ণভাবনার পরিশুদ্ধতার পদ্ধতিসমূহ নিজের জীবনে গুরুত্বের সাথে প্রয়োগ করি, তবে পারমার্থিক অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যতার অভাব হবে না। এমনিতেই বাহ্যিকভাবে মন্দিরে অনেক বৈচিত্র্যতা রয়েছে কিন্তু প্রকৃত বৈচিত্র্যতা বা প্রকৃত স্বাদ আস্বাদিত হয় আভ্যন্তরীণভাবে।
অন্যদের মতো, আমি অনুভব করতে চাই যে, আমার কার্যসমূহের মূল্য রয়েছে। একজন কৃষ্ণভক্ত হিসেবে আমি জানি আমি একজন চিন্ময় আত্মা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সেবক। আমার প্রকৃত মূল্য নিহিত আছে এর মধ্যে। তত্ত্বগতভাবে এবং অভিজ্ঞতার আলোকে আমি জানি যে, যতই আমি কৃষ্ণ সেবা করবো ততই আমি সুখী হব।
প্রত্যেকেই কৃষ্ণের সেবা করতে পারে। এটি প্রত্যেকের পারমার্থিক অধিকার। সামাজিক, পেশাগত এবং পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা সত্ত্বেও আপনি যদি কৃষ্ণ সেবা করতে চান তবে আপনি কোনো না কোনো পথ খুঁজে পাবেন, সে প্রচারমূলক কার্যক্রমের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে পারেন। কৃষ্ণ সেটিকেও একটি মূল্যবান সেবা হিসেবে দেখবেন এবং তার মাধ্যম পরিশোধন প্রক্রিয়াও সাধিত হয়।
অনেকভাবে আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থা পারমার্থিক প্রগতির জন্য আদর্শ। কেননা আমি মন্দিরের নিকেটে থাকি, প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণভাবনা প্রচারের সেবা করি এবং আমার অনেক জাগতিক দায়িত্ব-কর্তব্যও নেই। উপরোক্ত বর্ণনা থেকে মনে হতে পারে যে, আমার জীবনটি খুবই সরল বা অবাস্তব। আসলে আমি আমার নিত্য নৈমিত্তিক জীবন সম্পর্কে এখানে বর্ণনা করলাম।
তবে তার কিছু সামান্য পরিবর্তন ঘটে থাকে। যেমন, সপ্তাহে একবার মুদির দোকানে পরিবারের জন্য বাজার করতে যাওয়া কিংবা একবার করে আমার গাড়িটিকে মেকানিকের কাছে নিয়ে যাওয়া।
এক্ষেত্রে কোন পেশায় আছি সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদি আপনি কৃষ্ণভাবনার প্রগতির জন্য বিভিন্ন নিয়মকানুন সমূহ অনুসরণ করেন। যেমন, নিয়মিত হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করা এবং মাংসাহার, অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ, নেশা ও দ্যূতক্রীড়া বর্জন করা এবং সে সাথে কোনো উপায়ে কৃষ্ণভাবনা প্রচারে অবদান রাখেন, তবে আপনি একজন কৃষ্ণভক্ত। কৃষ্ণ আপনার সেবাটি গ্রহণ করবেন।
ভক্তরা বিভিন্ন কৃষ্ণভাবনার কার্যকলাপের মাধ্যমে এত ব্যস্ত থাকেন যে, পারমার্থিক প্রগতিতে বাধা প্রদানকারী এরকম জিনিসের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সময় তাদের নেই। লোকেরা বলে পারমার্থিক জীবন পালন করার সময় তাদের নেই, কিন্তু যদি আমরা পারমার্থিক প্রগতি সম্পর্কে আন্তরিক বা একনিষ্ঠ হয় তবে আমরা অনেক অপ্রয়োজনীয় কার্যে ব্যয়িত সময় থেকে সময় বের করে আনতে পারবো।
কৃষ্ণভাবনার বাইরে অনেক কার্যাবলী জাগতিক লোকদের কাছে খুবই ভাল হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু সেগুলো দেহাত্মবুদ্ধি চেতনাকেই বৃদ্ধি করে, যা কৃষ্ণভাবনার পরিপন্থী। একজন কৃষ্ণভক্ত সেগুলো পরিহার করেন, কেননা এসমস্ত বিষয় তাদের পারমার্থিক প্রগতিকে প্রতিহত করে।
আমি কোনো রেস্টুরেন্টে, নাইটক্লাবে, থিয়েটারে, আড্ডায়, সিনেমা হলে, পার্কে, জনসভায় অথবা ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা দেখতে মাঠে যাই না। সেজন্যে সেগুলো হারানোতে আমার কোনো অনুভূতিও নেই। ঐ ধরনের তথাকথিত আনন্দকে পারমার্থিক আনন্দের সঙ্গে তুলনা করলে নিতান্তই তুচ্ছ। ভক্তসঙ্গের মাধ্যমে এ আনন্দময় জীবনের অভিজ্ঞতাই হল প্রকৃত জীবন, যারা তাদের চেতনাকে পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা করছে।
আমরা কোনো কিছুই হারাচ্ছি না। আমাদের অনেক কিছুই রয়েছে, আর এখন কৃষ্ণভাবনার অভিজ্ঞতা লাভ করছি। আমরা ছলাকলাহীন (naive) নয়। আমরা প্রাচীরের গুরুত্বহীন ফুলও নই। আমরা বিভিন্ন বাদকদের বাদ্যে শুধু নৃত্য করে চলেছি।

নাগরাজ দাস ১৯৭৪ সালে সানফ্রান্সিসকোতে কৃষ্ণভক্ত হয়েছিলেন। তিনি ১৯৮৬ থেকে আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিনের নিষ্ঠাবান সেবক হিসেবে নিয়োজিত আছেন এবং ১৯৯৮ সালে শ্রীমৎ জয়দ্বৈত স্বামী মহারাজের পর সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। নাগরাজ দাস প্রবন্ধ সম্পাদনা থেকে শুরু করে ঠিক সময়ে ব্যাক টু গডহেড বের হওয়ার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন সবকিছু করে থাকেন। তিনি একজন দক্ষ গায়ক এবং প্রবক্তা হিসেবেও সারাবিশ্বে সুপরিচিত। তিনি ও তাঁর সহধর্মিনী প্রানদা দেবী দাসী আলুচুয়াতে বাস করেন। 


 
 
 
 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here