ঘুরে আসি পুরী রথযাত্রায়

0
75

শ্রীমন্দির হল শহরের কেন্দ্রে প্রধান মন্দির যেখানে পূজিত হয় ভগবান জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা রাণীর অপ্রাকৃত বিগ্রহ। মন্দিরের ভিতর কোন অহিন্দুর প্রবেশ নিষেধ। কোন পশ্চিমা ব্যক্তি এই মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না। বছরে একবার এখানে একটি বিশাল উৎসব হয়ে থাকে। যেখানে ভগবানের বিগ্রহ মন্দির থেকে বেরিয়ে আসে ভক্তবৃন্দদের দর্শন দেয়ার জন্য । এ উৎসবটি বিশ্বে সুপরিচিত ‘রথযাত্রা উৎসব’ নামে এবং সে সময়েই শুধুমাত্র সবার জন্য বিগ্রহ দর্শন উন্মুক্ত। নিম্নে সে রথযাত্রার রথ তৈরি থেকে শুরু করে রথযাত্রার শেষ পর্যন্ত ছবি সহ বর্ণনা তুলে ধরা হল। দুর্লভ এ ছবিগুলোর কিছু তুলেছেন পুরী মন্দিরের পাণ্ডাদের অন্যতম সুদর্শন দাস মহাপাত্র এবং বাকি ছবিগুলোর বর্ণনাসহ তুলে ধরেছেন শ্রীনন্দনন্দন দাস। চলুন ঘুরে আসি পুরী রথযাত্রায়।

রথ তৈরি

উৎসবের কয়েক মাস পূর্ব থেকেই পাণ্ডারা রথ বানানো শুরু করে। তারা পার্শ্ববর্তী একটি বন থেকে কাঠ কেটে একত্রে জড়ো করে এবং রথের বিভিন্ন উপাদান তৈরি শুরু করে। উৎসবের কয়েক সপ্তাহ পূর্বে প্রধান সড়কে যেখানে রথ প্রস্তুত হয় সেখানে একত্রে জড়ো করে রথ তৈরি শুরু হয়। আমি যখন প্রথম দেখেছিলাম তখন উৎসবের বাকি মাত্র কয়েক দিন। আমার ভাবনাতেই আসেনি যে, রথযাত্রার আগের দিনই রথ তৈরি সম্পন্ন করবে।

রথ প্রস্তুত

আমি ভীড় ঠেলে বাইরে রাস্তার পাশের একটি লাইব্রেরির ছাদ থেকে পুরো উৎসবটি দর্শনকরছিলাম। রথগুলো প্রস্তুত এবং অনেক পুলিশ লোকজনদের রথের কাছে না আসার জন্য নিয়ন্ত্রণরত। আর কয়েক মিনিট পরেই বিগ্রহত্রয় রথে আরোহন করবে।

বলরামের রথারোহনযখন বিগ্রহএয় মন্দির থেকে বের হওয়া শুরু করেছে সাধারণ লোকজন এবং ভক্তবৃন্দদের মাঝে সত্যিকারের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল । সবাই ধ্বনি দিতে লাগল- জয় বলরাম! জয় জগন্নাথ! এখানে ছবিতে আমরা শ্রী বলরামের ছবিটি দেখতে পাচ্ছি। তিনি সুন্দর সাজে সজ্জিত হয়ে রথে আরোহন করছেন। তিনি খুব বৃহৎ এবং লম্বা । যারা তাকে বহন করে তাদের চেয়েও খুবই ভারী। পুলিশসহ সবাই বিগ্রহ তুলছে- যারা এই বিগ্রহের রথারোহন পরিচালনা করেন তাদের বলা হয় দয়িতাপতি। অনেক পাণ্ডা আবার রথের সামনে থেকে দড়ি দিয়ে টানেন, অন্যরা তার (বিগ্রহের) বাহু ধরে উপরে তুলতে সাহায্য করেন। কিছু পাণ্ডা পেছন থেকে ঠেলতে সাহায্য করেন। এভাবে বিভিন্ন উপায়ে বিগ্রহত্রয়কে রথে আরোহন করানো হয়।

সুভদ্রা দেবীর রথারোহন

সুভদ্রা রাণীকে মন্দিরের বাইরে আনা এবং রথে আরোহন করানো অন্য বিগ্রহের চেয়ে সহজসাধ্য। তাই একটি মাত্র দল তাকে নিয়ে সোজা রথের উপর খুব সহজে উঠে তার আসনে বসান।

 

জগন্নাথের রথারোহন

অবশেষে ভগবান জগন্নাথ মন্দিরের দ্বার থেকে বেরিয়ে রথের দিকে আসলে উপস্থিত ভক্তবৃন্দরা উৎফুল্ল হয়ে উঠে। সবাই প্রেমভক্তিসহকারে ধ্বনি দিতে থাকে এবং তার কাছে প্রার্থনা করে থাকে। তাকে দয়িতারা নিয়ে আসার সময় সবাই ভগবানের মুখ দর্শন করতে না পারলেও খুব সহজেই মস্তকের সেই বিশাল তাজটি দর্শন করতে পারে।

জগন্নাথকে তোলার পরেই পুরীর রাজা এসে রথ ঝাড়ু দেবে এবং এরপর রথযাত্রা শুরু হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। গুণ্ডিচার মন্দিরে পৌঁছে তারা এক সপ্তাহ ধরে সেখানে অবস্থান করবেন।

মানুষের ঢল
এরপর যখন রথযাত্রা শুরু হয় বেশির ভাগ ভক্ত রথের দড়ির আশা ত্যাগ করে রাস্তার পাশে হেঁটে হেঁটে রথযাত্রায় অংশগ্রহণ উপভোগ করে। আর অত্যন্ত সৌভাগ্যবানরা রথের দড়ি টানতে থাকে। বিগ্রহের প্রীতি বিধানের উদ্দেশ্যে রথের দড়ি টানা কিংবা কীর্তন দলের সাথে কীর্তন করা, কিংবা দূর থেকে বিগ্রহ দর্শন বা রথ দর্শন করা মানেই হল তার সমস্ত জড় অস্থিত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করা। শাস্ত্র সিদ্ধান্ত অনুসারে জীবের উপর এর মাধ্যমে পরম সৌভাগ্য বর্ষিত হয়।

রথকে খুব কাছ থেকে দেখলে রথের উপর বিগ্রহের সহযোগীরা এবং পূজারীরা রথের উপর বিগ্রহের সঙ্গী হয়। তারা রথের উপর বসে থাকে।

নৃত্যরত রাধানাথ স্বামী 

ঐতিহাসিক মুহূর্তটি হল ইস্কন কীর্তন দলটির যেটি পরিচালনা করছিলেন। রাধানাথ স্বামী মহারাজ। তারা সবাই জগন্নাথের রথের সামনে দিব্যপ্রেমে নৃত্য কীর্তন করছিলেন। যে রকমটি আজ থেকে ৫০০ বছর আগে ভগবান শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এই পুরীতেই করতেন। রাধানাথ স্বামী মহারাজ পূর্বেই এই জগন্নাথ মন্দির থেকে তাকে বিশেষ একটি লাল শাল প্রদানের মাধ্যমে সম্মানিত হয়েছিলেন এবং তারা ভগবানের দ্বার থেকে বেরিয়ে আসার সময় জগন্নাথকে খুব কাছে থেকে দর্শন করার সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন। এটি একজন ভারতীয় নয় বিদেশী শুদ্ধ ভক্তের প্রতি বড় একটি শ্রদ্ধা নিবেদন ।

রাতের রথ

মাঝে মাঝে সন্ধ্যা নেমে এলে রথ আর সামনে যায় না, আর পুরো রাত ঐ স্থানেই রথ সহ সবাই রাস্তার উপর অবস্থান করে। এর পরদিন যাত্রা শুরু হয় সুযোগে অনেকে তীর্থযাত্রী রথের উপর উঠে ভগবানকে খুব সামনে থেকে দর্শনের সুযোগ লাভ করে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভক্তরাও ভগবানকে দর্শনের জন্য ব্যস্ত।

স্বর্ণবেশে জগ্ননাথ, বলদেব ও সুভদ্রা

গুণ্ডিচা মন্দিরে এক সপ্তাহ থেকে ফিরতি রথে এক সময় জগন্নাথকে স্বর্ণ বেশে সজ্জিত করা হয়। আর তখন জগন্নাথের এ রূপ দর্শনের জন্যও ভক্তদের ঢল নামে ।
ছবিতে জগন্নাথের ডান হাতে স্বর্ণ চক্র এবং তার বাম হাতে রৌপ্য শঙ্খ । একইভাবে চরণসহ অন্যান্য বিগ্রহদের দুর্লভ বেশ দর্শন করুন। হরেকৃষ্ণ।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন-২০১২ ইং সালে প্রকাশিত 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here