ঘণ্টা দ্বারা সুরক্ষিত : ইস্কনের প্রথম কৃষ্ণবিগ্রহ সত্যরাজ দাস

0
69

নিউইয়র্ক শহরে ঘণ্টার দোকানে ঘণ্টা কেনার সময় শ্রীল প্রভুপাদের প্রথম দিকের দুজন শিষ্য কৃষ্ণবিগ্রহকে আবিষ্কার করলেন

নিউইয়র্ক শহরে ঘণ্টা কেনার সময় শ্রীল প্রভুপাদের প্রথম দিকের ২ জন শিষ্য খুঁজে পান। সেপ্টেম্বর, ১৯৬৫, যখন শ্রীল প্রভুপাদ নিউইয়র্ক শহরে পৌঁছলেন, তখন তিনি শ্রী বৃন্দাবনধাম ও তাঁর আরাধ্য শ্রীগোবিন্দজিউ, শ্রীগোপীনাথজিউ ও শ্রীরাধা দামোদরজিউর এর বিরহ অনুভব করতে লাগলেন, যেমনটি তিনি ডায়েরিতে লিখেছিলেন।
সাত মাসের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার পর, তিনি পূর্বাঞ্চলে তাঁর প্রথম মন্দির উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে সানফ্রান্সিসকো, মন্ট্রিয়েল, লস্ অ্যাঞ্জেলস এবং লন্ডনে দ্রুত বিভিন্ন কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয় যখন তাঁর আন্দোলনের গোড়াপত্তন হচ্ছিল।
এসকল মন্দিরে, শ্রীকৃষ্ণ সাড়ম্বরে বিরাজ করছিলেন, যা প্রভুপাদকে বিরহ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। যারা ইসকনের ইতিহাস সম্বন্ধে পরিচিত তারা প্রথম দিকের বিগ্রহ সেবার ঘটনাগুলো ভালোভাবে জানেন। এসব হৃদচাঞ্চল্যকারী ঘটনা ঘটে ১৯৬৬ সালে শ্রীল প্রভুপাদ ইসকন প্রতিষ্ঠার পরপরই। উদাহরণস্বরূপ প্রভুপাদের প্রথম দিকের শিষ্যা মালতি দাসী মাতাজীর কাহিনি তুলে ধরা যায়, যিনি, ১৯৬৭ সালে সানফ্রান্সিসকোর একটি দোকানে প্রভু শ্রী জগন্নাথের দারু (কাঠ) বিগ্রহ খুঁজে পান। যদিও এই চিন্ময় বিগ্রহ সম্পর্কে তার ধারণাই ছিল না, তিনি শ্রীল প্রভুপাদের কাছে নিয়ে আসেন। বিগ্রহের সেই দীপ্তিময় রূপ দেখে প্রভুপাদ তাঁর স্বরূপ (পরিচয়) বর্ণনা করে বললেন, “তুমি ভগবান জগন্নাথকে নিয়ে এসেছ। তিনি জগতের নাথ, স্বয়ং শ্ৰীকৃষ্ণ । তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।” আরো অনেক কাহিনি আছে শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহকে ঘিরে।
যেমন : লন্ডনের শ্রীশ্রী রাধালন্ডনেশ্বর (১৯৬৯), ব্রুকলিনের শ্রীশ্রী রাধা গোকুলানন্দ (১৯৬৮), শ্রীশ্রী রুক্মিণী দ্বারকাধীশ (১৯৭১), পেনিসিলভানিয়ার গীতা নগরীতে শ্রীশ্রী রাধাদামোদর (১৯৭০) এবং ওয়াশিংটনের শ্রীশ্রী রাধা মদনমোহন জিউ ।

মি. সারনা’র ঘণ্টা

আমেরিকার হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের প্রথম দিকের পৃষ্ঠপোষকদের অন্যতম শ্রী সজ্জন সিং সারনা (১৮৯৭ ১৯৭৫) যাকে অধিকাংশ ভক্তই চেনেন না। তার একটি ভারতীয় হস্তশিল্পের আমদানির ব্যবসা ছিল, যার নাম ছিল “Bells of Sarna” তার প্রথম মজুদখামারটি ছিল নিউইয়র্ক শহরেই। তখন ISKCON সবেমাত্র যাত্রা শুরু করল।
শিখ ধর্মানুসারী মি. সারনার জন্ম পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে, যিনি পরবর্তীতে ১৯২০ সালে আমেরিকাতে স্থানান্তরিত হন। তিনি পাশ্চাত্য সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন এবং ভারত ও তার আধ্যাত্মিক সম্পদের ওপর এর মোহিনী প্রভাব দেখে তিনি খুবই বিস্মিত হন। প্রকৃতপক্ষে, বিংশ শতাব্দীর প্রাক দশকগুলিতে ভারতীয়দের আমেরিকায় অভিবাসনের মাধ্যমে ভারতের বুকে পাশ্চাত্য চর্চার এটি বিশাল ঢেউ উঠে। নিজেকে একজন পাইকার হিসেবে ১৯৩০ সালে নিউইয়র্ক শহরে প্রতিষ্ঠিত করে, তিনি আমেরিকাতে ভারতীয় কাপড়, আগরবাতি এবং পিতলের সরঞ্জামাদি আমদানির ব্যবসা শুরু করেন। স্বপ্নে একবার যাদুকরী গরুর ঘণ্টা দেখার পর, তিনি বিভিন্ন প্রকারের ঘণ্টাও আমদানি করে এবং অবশেষে তার “Bells of Sarna” জন্ম দিলেন। কোম্পানির ট্রেডমার্ক হিসেবে তিনি প্রতিটি ঘণ্টার একটি নাম দিতেন এবং এর উদ্দেশ্য ও ভারতীয় ইতিহাসও ঘণ্টার সাথে জুড়ে দিতেন।
১৯৬০ দশকের দিকে, পাশ্চাত্যে হিপ্পিদের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তরুণেরা ধূপকাটি ধূপদানি, ভারতীয় দেব দেবীর ভাস্কর্য, পোস্টার এবং অন্যান্য বক্তিগত দ্রব্যাদি কেনে তাদের ধ্যান ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। সারনা পর্যায়ক্রমে পাইকারী ব্যবসা হতে ডিপার্টমেন্ট স্টোর, হেড স্টোর, গিফট শপ উদ্বোধন করেন। তার ব্যবসা ক্রমশ বর্ধিত হতে থাকে। একসময় এস. এস. সারনার বিশাল এক ইন্ডাস্ট্রি দাঁড় করান।
এখানেই ব্রহ্মানন্দ দাস এবং গর্গমুনি দাস আসেন। ১৯৬৬ সালে ইসকন প্রতিষ্ঠার পরপরই এই মার্কিন ভ্রাতৃদ্বয় শ্রীল প্রভুপাদের মিশনে যোগ দেন। ব্রহ্মানন্দ ছিলেন প্রথম আশ্রম অধ্যক্ষ এবং গর্গ মুনি (যাকে প্রভুপাদ আদর করে গর্গমানি (Garga money) বলে ডাকতেন) ছিলেন কোষাধ্যক্ষ। ভ্রাতৃদ্বয় সারনার প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কিছু আনুষঙ্গিক পণ্য কিনে ২৬ সেকেন্ড অ্যাভিনিউতে অবস্থিত তাদের গিফ্ট শপে রাখার জন্য, যা ছিল পাশ্চাত্যে ইসকনের প্রথম মন্দির। সেকেন্ড অ্যাভিনিউতে শ্রীল প্রভুপাদের সংকলিত শ্রীমদ্ভাগবত, পরলোকে সুগম যাত্রা এসব গ্রন্থের ভারতীয় সংস্করণ সংরক্ষিত আছে, সাথে ব্যাক টু গডহেড, গীতোপনিষদ, তার প্রথম পুস্তিকা উন্মাদ কে? এবং লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ।
শপটিতে আরো পাওয়া যায় ধূপকাঠি, প্রভুপাদের রেকর্ডিং অ্যালবাম, জপমালা। মি. সারনা পিতলের ধূপদানি ও ঘণ্টার হাতল ও তার সরবরাহ করতেন। মি. সারনা ভারতের বিভিন্ন নকশার ধূতির চাদরও সরবরাহ করতেন যা দেওয়ালে ঝালর হিসেবেও ব্যবহার করা যেত।
ব্রহ্মানন্দ বলেন, “আমরা তার (মি.সারনা) শহরতলীর শো রুমটিতে যেতাম ছোট্ট একটা কক্ষে ঘণ্টা, পিতলের আসবাব, টেবিল এবং যাবতীয় খেলনার মাঝে একটি কালো মার্বেল পাথরের কৃষ্ণমূর্তি ছিল। আলাদা কোণে বসন, মুকুট বা গহনাও ছিল না তাতে। মূর্তি শরীরের সাথেই তার বস্ত্রাদি খঁচিত ছিল। হাতে একটি সাধারণ ধাতুর দণ্ড বাঁশি হিসেবে ছিল। আমি সবসময়ই ধূলোময় সেই বিগ্রহটিকে দেখতাম, কিন্তু মি. সারনাকে কখনোই কিছু বলিনি। আমরা শুধু কৌতুহল নিয়ে তাকিয়েই থাকতাম ৷
আমরা প্রথম বিগ্রহ পূজা সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করি শ্রীল প্রভুপাদের শ্রীমদ্ভাগবত প্রথম স্কন্ধ যা তিনি ভারত থেকে সাথে এনেছিলেন এবং তাঁর প্রবচন হতে। আমাদের শুধু কেবল তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা ছিল, কোনো হাতে কলমে প্রশিক্ষণ ছিল না। মি. সারনা’র কাছ থেকে বিগ্রহটি চাওয়াটা একটা দুঃসাহস ছাড়া আর কিছু নয়। অর্থ তেমন একটা না থাকায় তা কেনার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবুও শ্রীকৃষ্ণকে এভাবে অবহেলিত, ধূলোমগ্ন হয়ে পড়ে থাকতে দেখাটা খুবই কষ্টের ছিল, যদিও তখন আমরা জানতাম না ওটা কিসের বিগ্রহ?
মি. সারনা’র সাথে আমাদের কেবল ব্যবসাকেন্দ্রিক সম্পর্ক ছিল। তিনি ছিলেন মুণ্ডিত মস্তক এবং কোনো পাগড়ি ছিল না। তিনি একজন শিখ ধর্মানুসারী। আমরা তেমন একটা ধর্ম বিষয়ে কথা বলতাম না, আর তিনি আমাদের কেন্দ্রগুলোতেও কখনো আসেন নি।
কিন্তু আমাদের মধ্যে একটা মিল ছিল। তিনি তার হস্তশিল্পগুলো বিক্রির করার কারণে ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে খুবই গর্বিত এবং সে সম্বন্ধে আমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে বলেন। একইভাবে, আমরাও পাশ্চাত্যের কিছু দিক তুলে ধরতাম যা মূলত ভারতীয়। তিনি গরুর ঘণ্টা, হাতির ঘণ্টা এবং মন্দির ঘণ্টার কার্যকারিতা ও ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে পছন্দ করতেন। এ ব্যাপারে তার অগাধ জ্ঞান ছিল। নিউইয়র্কের মতো একটি শহরে ভারতীয় সংস্কৃতির একটি জাদুঘর স্থাপন করাই হল তার জীবন স্বপ্ন। এ কারণেই তিনি সব ধরনের ভারতীয় শিল্পকর্ম, হস্তশিল্প আমদানি করেন এবং সংরক্ষণ করেন।
১৯৬৭ সালের এক শীতের বিকেলে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর সদ্য প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্র দেখভাল করার জন্য সানফ্রান্সিসকোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ঠিক তখন মি. সারনা ভক্তদের ফোন করে বলেন যে, তার কাছে একটা জিনিস আছে এবং তিনি ভক্তদের শীঘ্রই তার অ্যাপার্টমেন্টে যেতে বলেন। ব্রহ্মানন্দ এবং গর্গমুনি নতুন ভক্ত রূপানুগ দাসসহ তার অ্যাপার্টমেন্টে গেলেন। তখন মি. সারনা মন্দিরের জন্য সেই কৃষ্ণমূর্তিটি তাদের নিয়ে যেতে বললেন। এর কারণটি তিনি বলেননি এবং ভক্তরাও জিজ্ঞেস করেননি। যদি তিনি তার মত পাল্টান এই আশঙ্কায়। ব্রহ্মানন্দ ভেবেছিলেন যে, ওটা হয়তো বিক্রি করা যাচ্ছিল না এবং ক্রমশ ধূলিস্যাৎ হচ্ছে বলেই মি.সারনা বিগ্রহটি দান করে দিচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভগবদ্ভক্তি বশত তিনি একাজ করেছিলেন। তিনি প্রভুপাদের মিশনকে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন।
তার কনিষ্ঠ কন্যার ভাষ্যমতে, “আমার বাবা ছিলেন এক শিখ কিন্তু আসলে একজন যোগী যিনি প্রত্যেক রূপেই ভগবানকে ভক্তি করতেন, যেমন : প্রকৃতি, জীব, প্রভৃতি । শ্রীকৃষ্ণকে ভক্তি করলেও তিনি বুদ্ধদেব, মহাবীর ওনাদেরও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি পাশ্চাত্যে প্রাচ্য হাওয়া বয়ে আনতে ব্রতী ছিলেন এবং তিনি এই কার্যটি ভারতীয় শিল্পপণ্য পাশ্চাত্যে আনার মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন। তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা ছিলেন, পাশাপাশি একজন ধার্মিক ব্যক্তিও। নিউইয়র্কে তার এক মজুদঘর ছিল যা ছিল পাইকারি ব্যবসার মূলকেন্দ্র। এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সম্পদকে সকলের সাথে শেয়ার করতে চেয়েছিলেন। উপহার প্রদানের কারণে তার এক খ্যাতি ছিল। তিনি শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহটি উপহার দিয়েছে তা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। আমি নিশ্চিত যে, তিনি বিগ্রহটি দেওয়ার জন্য ততখানিই উদগ্রীব ছিলেন যতখানি আপনারা নেওয়ার জন্য ছিলেন।
মি. সারনা’র অনুমতিক্রমে ব্রহ্মানন্দ, তার ভাই ও রূপানুগ প্রভু বিগ্রহটিকে ২৬ সেকেন্ড অ্যাভিন্যুতে নিয়ে গেলেন। যখন মাঝপথে আসলেন, তারা অনুভব করতে লাগলেন যে, শ্রীকৃষ্ণ এসব পাবলিক যানে চড়তে চাচ্ছেন না। তাই তারা একটি ট্যাক্সি ক্যাব ভাড়া নিলেন। ২৬ সেকেন্ড অ্যাভিন্যুতে আনার পর বিগ্রহটিকে একটি বেদীতে বসানো হল। প্রথমদিকে বিগ্রহটিকে কোনো কিছুই নিবেদন করা হতো না। পরবর্তীতে ভক্তরা ধূপ নিবেদন করেন এবং ঘণ্টা বাজাতেন। বলাবাহুল্য, ঘণ্টাটি মি. সারনা’র দোকান থেকে কেনা। এভাবে ইস্কনের প্রথম শ্রীকৃষ্ণ বিগ্রহের প্রকাশ হল।

শ্রীবিগ্রহের নামকরণ

শ্রীল প্রভুপাদ নাম দিলেন শ্রীমদনমোহন। এই নামের তাৎপর্য হল যে, ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুসারীদের সেবিত বৃন্দাবনের প্রথম বিগ্রহের নাম শ্রীমদনমোহন। শ্রীবিগ্রহের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এক ব্রাহ্মণ শ্রীসনাতন গোস্বামীকে এ বিগ্রহ অর্পণ করেন। যেহেতু তিনি বৃদ্ধ ও দরিদ্র ছিলেন, তিনি শ্রীবিগ্রহকে যথাবিহিত উপাচারে সেবা করতে পারতেন না, কিন্তু শুদ্ধভক্তি দিয়ে যতটুকু সম্ভব সেবা করতেন। ঐতিহ্যের একটি দিক হল, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তরা কোনো সেবা সম্পাদনের পূর্বে এই মদনমোহনের কাছে আশীর্বাদ চাইত, যেমনটি শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীজি শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত রচনার পূর্বে করেছিলেন। তাই ইকন নামক নতুন সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রথম বিগ্রহের নাম “শ্রীশ্রী মদনমোহন” রাখা শ্রীল প্রভুপাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল ৷ আরো বলা যায়, শ্রীমদনমোহন হচ্ছেন প্রত্যেক নব্য ভক্তের প্রথম বিগ্রহ। শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে (আদি ১/১৯) শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর ভাষ্যে লিখেছেন, “পারমার্থিক জীবনের প্রারম্ভে আমাদের অবশ্যই মদনমোহনের সেবা করতে হবে, যাতে তিনি আমাদের আকর্ষণ করেন এবং আমাদের ক্ষেত্রে মদনমোহনের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা অত্যাবশ্যক। এভাবে পাশ্চাত্য জগতে ইস্কন এর প্রথম বিগ্রহের জন্য মদনমোহন নামটি একেবারেই যথার্থ।
মজার ব্যাপার হল, যখন ব্রহ্মানন্দ এবং গর্গমুনি একসাথে প্রভুপাদের সামনে আসতেন তখন প্রভুপাদ ঠাট্টা করে বলতেন, “রূপ সনাতন এসেছে”।
ব্রহ্মানন্দ ছিলেন বড় ভাই, যে কারণে তাকে রূপ গোস্বামীর বড় ভাই সনাতন গোস্বামীর সাথে তুলনা করা যায়। উল্লেখ্য, শ্রীল প্রভুপাদ শৈশবে কলকাতার টালিগঞ্জে তাঁর বাসার কাছে যেতেন এবং পার্শ্ববর্তী শ্রীমদনমোহন মন্দির দর্শন করতেন। এটা ছিল তাঁর জীবনের প্রথম দেখা কৃষ্ণবিগ্রহগুলোর মধ্যে অন্যতম। হয়তো, আমেরিকান শিষ্যদের জন্য আনা বিগ্রহের নামকরণে অনুষ্ঠানে প্রভুপাদের সেই বিগ্রহটি তাঁকে প্রভাবিত করেছিল ।
শ্রীমান দামোদর দাস (প্রভুপাদের প্রথম দিকের শিষ্য) নিউইয়র্ক অবস্থিত শ্রী মদনমোহন বিগ্রহের কিছু কাহিনি তুলে ধরেন।
তাঁর কথাগুলো শ্রীমান অমর দাসকে প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
“শ্রীল প্রভুপাদ সুন্দর কালো মার্বেল পাথরের মদনমোহনের দিকে তাকিয়েছিল। প্রথমে তিনি বিগ্রহের সামনে দাঁড়ান। তারপর ভগবান জগন্নাথ ভিষিক্ত হলে, বিগ্রহের নিজের ছোট্ট গৃহটিতে বেদীর ওপর স্থাপন করা হয়। যখন আমরা ৬১ সেকেন্ড অ্যাভিনিউতে যায় (১৯৬৭), তখন তিনি গোবিন্দ নামে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁকে মন্দির কক্ষের বামের দেয়ালের ওপর আয়না বেষ্ঠিতভাবে প্রদর্শিত হতো। খুব বিধিবদ্ধ পূজা অনুষ্ঠান করা না হলেও অন্তত প্রতিদিন স্প্রে দিয়ে সুগন্ধি প্রদান করা হতো। পরবর্তীতে তার এ অবস্থানের উন্নতি হয় যখন তাঁকে ব্রুকলিনে (১৯৬৯) নেওয়া হয় এবং তাঁকে শ্রীল প্রভুপাদের কোয়ার্টারে অধিষ্ঠিত করা হয়। তখন প্রথমবারের মতো তিনি কিছু পোশাক পরিধান করেছিলেন।

শ্রীমদনমোহন ওয়াশিংটনে গেলেন

১৯৭০ দশকের শুরুতে, প্রভুপাদ মদনমোহনকে ভক্তদের পরিচালনা করার জন্য ওয়াশিংটনে নিয়ে যেতে চাইলেন। এ কাহিনিটি কয়েকটি সিরিজে বিভক্ত যা শ্রীমান বৈয়াসখি দাস প্রভু তাঁর শ্রী রাধা দামোদর গ্রন্থে পুনর্বাচ্য করেছেন। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন “এবার মদনমোহনের জন্য একজন সঙ্গী খুঁজতে হবে। তিনি শ্রীমতি যমুনা দেবী দাসীকে এ দায়িত্ব দেন, যিনি সে সময় বৃন্দাবনে বাস করছিলেন তিনি তা সম্পন্ন করলেন। যখন রাধারাণীর বিগ্রহ আমেরিকাতে পৌছল, তখন দামোদর দাস প্রভু সপরিবারে কেনেডি বিমানবন্দরে চলে গেলেন এবং বিগ্রহটি সোজা তার পরিচালনাধীন ওয়াশিংটন মন্দিরে নিয়ে গেলেন ৷
এটা ছিল ১৯৭৩ এর গ্রীষ্ম, এবং ঐ বছরের শরৎকাল তার ভক্তরা যথাবিহিতভাবে বিগ্রহ দু’টির প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন এবং সেবা পূজা শুরু করেন। ছয় বছর পর শ্রীবিগ্রহ যথাবিহিত সেবা পেয়েছিলেন। ইসকন এর অন্যান্য বিগ্রহগুলোও সেবাপূজা পাচ্ছেন এবং ভক্তদের কৃপা করছেন। কিন্তু শ্রীমদনমোহন হলেন প্রথম বিগ্রহ যা ৭০ দশকের আগে পর্যন্ত রীতিসিদ্ধ সেবা পূজাটুকুও পান নি।
প্রাণ প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই দিব্য একটি ঘটনা যা তৎকালীন Washington post সাময়িকীতে স্থান পেয়েছিল। সংবাদের শিরোনাম ছিল “Lord krishna lives on Q street” প্রায় ২ ফুট উঁচু এ বিগ্রহের দৈনিক দু’বার ভোগ হয়, লাল, নীল ও সবুজ চুমকি বসানো শুভ্র রেশমী পোশাক পরানো হয়।
প্রথমদিকে, বিগ্রহটি কেবল একটি বৈদিক মূর্তি বলেই মনে হয়েছিল সবার, কিন্তু চার ঘন্টাব্যাপী অবিরাম নৃত্য কীর্তন, যজ্ঞ, অভিষেক অনুষ্ঠানের পর সবার কাছে তাদের নিজেদের শ্রীকৃষ্ণ তাদের ঈশ্বর বলে মনে হল।
দুজন ভক্তকে দায়িত্ব দেওয়া হল শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা হতে সম্মিলিতভাবে উচ্চস্বরে শ্লোক উচ্চারণ করার জন্য।
শ্রীমৎ রূপানুগা গোস্বামী মহারাজ ডান হাতে একটি বড় পাত্র হতে বড় চামচের সাহায্যে দই তুলে চামচের তলাটি আলতোভাবে রাধারাণীর মস্তকে স্পর্শ করালেন এবং ঢাললেন তখন ডানহাতে একটি বই হতে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন। এভাবে যখন চলতে লাগল, তখন দইগুলো শ্রীবিগ্রহের রেশমী কাপড় বেয়ে, মালা থেকে শ্রীবিগ্রহের কাঁধে পড়তে লাগল। যখন দই শেষ হল তখন শ্রীবিগ্রহকে জল সিঞ্চন করা হল। অভিষেক শেষে মহারাজ এবং দামোদর প্রভু শ্রীবিগ্রকে পর্দার আড়ালে নিয়ে গেলেন।
একই প্রক্রিয়ায় শ্রীকৃষ্ণের অভিষেক ও সমাপ্ত হল। তরুণ ভক্তরা কীর্তন ও উদ্দণ্ড নৃত্য করছিল ।
যখন মদনমোহনকে তৈল মর্দন এবং স্নান করানো হচ্ছিল তখন এক তরুণ একটি ভারতীয় ঢংয়ের মৃদঙ্গ নিয়ে আসল এবং অপূর্বভাবে বাজাতে লাগল ভক্তরা তখন কীর্তনে মেতে ছিলেন। এক একজন করে সমস্ত কীর্তন মঞ্চ কীর্তনানন্দে লাফ দিতে লাগল, চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে, বাহু তুলে সবাই কীর্তনে অংশগ্রহণ করতে লাগল। সবারই মুখমণ্ডল দিব্য উচ্ছাসে পূর্ণ হয়ে গেল।
এক ঘণ্টা পর, নৃত্য কীর্তনের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। প্রতিটি চোখ ঐ কমলা ও রূপালী রঙের পর্দার দিকে। তখন হঠাৎ মৃদঙ্গ থেমে গেল এবং তত্ক্ষণাৎ পর্দা খুলে গেল। পুরো সমাবেশ অপলক দৃষ্টিতে অপূর্ব উজ্জ্বল বিগ্রহকে দর্শন করতে লাগল এ এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা।
কিম এবং ক্রিস দম্পতি, যারা দুজনই চিত্রশিল্পী অনুষ্ঠানের কিছুদিন আগে থেকে তারা মন্দিরে যাতায়াত করতেন। দামোদর দাস প্রভু তাদেরকে শ্রী বিগ্রহকে রং করার এবং বিগ্রহ কারুকাজ করার সেবা দিয়েছিলেন। ক্রিস বলেন, “আমি কিমকে সাহায্য করতাম। অধিকাংশ কাজ সেই করেছে। বেদীটি ওখানেই ছিল এবং আমরা পর্দার পেছনেই কাজ করতাম। আমার মনে পড়ে, কিম বিগ্রহের নয়নকমল, হাতের ও পায়ের জলু আঁকত। আমরা অঙ্কন নির্দেশনা হিসেবে প্রভুপাদের বই ব্যবহার করতাম। সাথে দামোদর প্রভু ও তাঁর সহধর্মিণী মৃগনেত্রী মাতাজীর পরামর্শও ছিল। শ্রীমতি মমতা দেবী দাসী ছিলেন শ্রীমদনমোহনের প্রথম পূজারী। অভিষেক অনুষ্ঠানের স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেন, “আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে দামোদর প্রভুর কীর্তন। যখন শ্রীমৎ রূপানুগা মহারাজ অভিষেক করছিলেন, আমরা সবাই বসেছিলাম আর তা উপেভোগ করছিলাম, তখন দামোদর প্রভু গভীর ধ্যান সহকারে ধীরলয়ে তাঁর সুরেলা ও গভীর কণ্ঠে কীর্তন করছিলেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। সেই কীর্তন আমার হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। আমাদের তখন একটাই উপলব্ধি হচ্ছিল যেন শ্রীকৃষ্ণ এ হরিনামে এখন বিরাজ করছেন, তাঁর উপস্থিতি অনুভব করতে পারছিলাম। শ্রীনাম হতেই যেন তিনি সরাসরি শ্রীবিগ্রহরূপেই প্রকটিত হলেন তখন এরকম মনে হল। এসমস্ত কিছুই শ্রী শ্রীরাধা মদনমোহনের কৃপাতে, শ্রী প্রভুপাদের কৃপাতে ।
অভিষেক পরবর্তী পোশাক শৃঙ্গারের কোনো কিছু আমি মনে করতে পারছি না। কিন্তু রাত্রে শয়ন পর্বের কিছু সম্মতি আছে। সেই পর্দার পেছনে শ্রীবিগ্রহের সাথে একাকি অবস্থান করে এক প্রশান্তি অনুভব করছিলাম। আমি কিছু সেবা করলাম। বিগ্রহের ভুবনভুলানো রূপ আমাকে পুরোপুরি হরণ করে নিয়েছিল। এটাই অৰ্চা বিগ্রহের কৃপা। আমি সেই কৃপালাভের সুযোগ পেয়ে নিজেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী মনে করি।

নিজ আলয় Potamac

তখন থেকে ১৯৭৩ সাল অবধি, ভক্তরা সানন্দে Dupont মোড়ের Q street মন্দিরে শ্রী শ্রী রাধা দামোদরের সেবা করছিল। ১৯৭৬ সালে তাঁরা বর্তমান ঠিকানা Potamac, Maryland এ স্থানান্তরিত হন। ঐ বছরই শ্রীল প্রভুপাদ নতুন মন্দিরটি দর্শন করেন এবং সেবা উন্নত করার অনুপ্রেরণা দেন। বর্তমানে, Dupont circle ইসকন মন্দিরটি ১২ একর সুন্দর গাছ গাছালি সমন্বিত জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। বনভূমির আদলে সৃষ্ট এ পরিবেশটি শ্রীশ্রী রাধা দামোদর বিগ্রহের ধ্যানে মনকে নিবিষ্ট করার, এক বৃন্দাবনী ভাব তৈরি করার আদর্শ স্বরূপ। ১৯৭০ সালে ফেব্রুয়ারিতে, শ্রীশ্রী গৌর নিতাই এবং তার পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের অক্টোবরে সীতারাম, লক্ষ্মণ ও হনুমান বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মন্দির ভবন ছাড়াও তাতে রয়েছে সাংস্কৃতিক সমাবেশ হল, ভক্তনিবাস ও অতিথিশালা।
সমগ্র প্রপার্টির বুক জুড়ে কিছু ছোট ছোট খাড়ি বা নালা রয়েছে। ভক্তরা জমিতে ফুল ও শাক সবজির চাষ করেন। সেগুলো শ্রীবিগ্রহ ও গো সেবায় ব্যবহৃত হয়। কারণ গো প্রজাতি শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়। কয়েকটির গলায় ঘণ্টা পরানো হয়েছে যা নিশ্চিতভাবে মি. সারনার হাসি ফুঁটিয়েছে।


লেখক পরিচিত : সত্যরাজ দাস (স্টিভেন রোজেন) শ্রীল প্রভুপাদের একজন দীক্ষিত শিষ্য। তিনি একাধারে Journals of Vaishnava studies পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিনের সহযোগী সম্পাদক ।


 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, জুলাই – সেপ্টেম্বর ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here