গ্রন্থ অধ্যয়নে যখন বিড়ম্বনা (শেষ পর্ব)

0
40

রাধিকা বল্লভ দাস : খুব বেশি পুনরাবৃত্তি ও বিরক্তিকর একজন অপরাধী যখন পুলিশ অফিসারদের দ্বারা জটিল সব প্রশ্নবানে বিদ্ধ হয়, তখন সেগুলো তার কাছে বিরক্তির উদ্রেক করে। অফিসাররা এটি করতে বাধ্য হয় কেননা বিভিন্ন সময়ে তার উত্তরগুলোর ধারাবাহিকতা সঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য। তদ্রূপ একজন বদ্ধজীব নিজেকে অস্থায়ীভাবে জড় বিষয়ের সঙ্গে আবদ্ধ করে। শ্রীল প্রভুপাদ পুন পুন আমাদেরকে অবহিত করছেন যে, আমাদের প্রকৃতি হল চিন্ময় যদি তা পুনঃ পুনঃ শ্রবণ করতে বিরক্তির উদ্রেক হতে পারে কিন্তু এই পুনরাবৃত্তি আমাদের জন্য অনুকম্পা স্বরূপ যার মাধ্যমে প্রকৃত মনোভাব প্রকাশ পাবে। ঐ উক্তিসমূহ আমাদের জন্য এক সময় আমাদের আনন্দের উৎস হতে পারে। যখন শরীরের কোন আহত স্থানে পুনঃ পুন মলম প্রয়োগ করা হয় তার মাধ্যমে আমাদের আহত স্থান ভাল হয়ে উঠে। শ্রীল প্রভুপাদ ভগবদ্‌গীতায় ২/২৫ তাৎপর্যে বলেছেন, “কোনো তত্ত্বকে নির্ভুলভাবে ও সম্যরূপে বুঝতে হলে, সেই জন্য তার পুনরাবৃত্তি দরকার।”
শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে দেহ ও আত্মার পার্থক্য আলোচনার জন্য ভগবান স্বয়ং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তা পুনরাবৃত্তি করেছেন। তদ্রুপ তাঁর গ্রন্থগুলোতে শ্রীল প্রভুপাদ কোনো একই বিষয় বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে আমাদেরকে সেই বিষয়সমূহের গুরুত্ব উপলব্ধিতে সহায়তা করেছে।
গ্রন্থ অধ্যয়ন জ্ঞানীর স্তরে উপনীত করে কেউ হয়তো ভাবতে পারে যে, যিনি গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন তিনি হলেন একজন জ্ঞানী ব্যক্তি কিন্তু ভক্ত নয়। কিন্তু ভগবদ্‌গীতায় (১৮/৭০) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “যিনি আমাদের এই পবিত্র কথোপকথন অধ্যয়ন করবেন, তাঁর সেই জ্ঞানযজ্ঞের দ্বারা আমি পূজিত হব। এই আমার অভিমত।” এভাবে আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর বাণীসমূহ অধ্যয়নের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করতে পারি। যদি আমাদের অধ্যয়ন শুধুমাত্র বিভিন্ন শ্লোক উক্ত করার মাধ্যমে পাণ্ডিত্য অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা করা হয় তবে আমাদেরকে জ্ঞানমার্গে অধিষ্ঠিত বলে বিবেচিত হয়। যদি আমরা গভীরভাবে পরম্পরা ধারায় যথার্থভাবে শাস্ত্র অধ্যয়নের প্রচেষ্টা করি তবে তা ভক্তিমার্গে অধিষ্ঠিত বলে বিবেচ্য হবে।

ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাসের জন্য

মাঝে মাঝে কেউ ভাবতে পারে যে, বিষয়ী লোকেরা কৃষ্ণভাবনার চেয়ে ইন্দ্রিয়তৃপ্তিমূলক কথোপকথনের প্রতি বেশি আগ্রহী। আমাদের সমাজে বিভিন্ন নাস্তিক্যবাদ প্রচার রয়েছে। সেই সমস্ত লোকদের সাথে সম্মুখীন হয়ে আস্তিক্যবাদ প্রচার করতে হবে। কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শনের ওপর সঠিক জ্ঞান না থাকলে আমরা হয়তো তাদের দ্বারা পরাস্ত হতে পারি। এমনকি এরকম যুক্তি তর্কে তাদেরকে সফলভাবে পরাস্ত করতে পারি তবুও ভালভাবে সে শিক্ষা সম্বন্ধে অবগত না হওয়ায় ভেতরে ভেতরে দুর্বলতা অনুভব করতে পারি। শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থগুলো আমাদের নিজেদের পরিপুষ্টতার জন্য নিয়মিত অধ্যয়ন করা উচিত। যখন কোন অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে একজন সাধারণ ব্যক্তি তা দেখে আতঙ্কিত হতে পারে কিন্তু একজন প্রশিক্ষিত অগ্নি নির্বাপণকারী তা দেখে মোটেই আতঙ্কিত হন না। তদ্রুপ যখন আমাদের চোখ শাস্ত্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হবে তখন এমনকি বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমরা আতঙ্কিত হব না।

প্রচারের জন্য

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১৮/৬৯) ব্যক্ত করেছেন যে, “এই পৃথিবীতে মানুষদের মধ্যে তাঁর থেকে অধিক প্রিয়কারী আমার কেউ নেই এবং তাঁর থেকে অন্য কেউ আমার প্রিয়তর হবে না।” এই শ্লোকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে যদি কাউকে কৃষ্ণভাবনা প্রচার করতে আগ্রহী হয় তবে তাকে অবশ্যই প্রতিকূলতার জন্যেও প্রস্তুত থাকতে হবে। এরকম প্রতিকূল সময়ে আমরা তখন গ্রন্থ অধ্যয়নের সময় নাও পেতে পারি। কেউ যখন শিকারে যায় তখন কোন প্রাণীকে দেখা মাত্রই বলতে পারে না যে “দেখি কোন বন্দুক আছে কিনা”। শিকারে গেলে তাকে অবশ্যই অস্ত্র নিতে হবে। তদ্রুপ শাস্ত্র অধ্যয়নের মাধ্যমে বিপক্ষ দলের যুক্তিসমূহ মোকাবেলার জন্য বুদ্ধিকে অবশ্যই তীক্ষ্ণ করতে হবে। শ্রীল প্রভুপাদ শ্রীমদ্ভাগবতের (৬/১/৩৮) শ্লোকের তাৎপর্যে লিখেছেন, “কেউ যখন কারও প্রতিনিধিত্ব করে তখন সেই ব্যক্তি উদ্দেশ্য পূর্ণরূপে অবগত হওয়া তার অবশ্য কর্তব্য। তাই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে ভক্তদের পূর্ণরূপে শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবগত হওয়া উচিত; তা না হলে তাদের মূঢ় বলে বিবেচনা করা হবে। সমস্ত ভক্তদের, বিশেষ করে প্রচারকদের কৃষ্ণভাবনামৃতের দর্শন জানা উচিত যাতে প্রচার করার সময় তাদের লজ্জিত হতে না হয়। এবং অপমানিত হতে না হয়।”
শ্রীমদ্ভাগবতে (৪/২২/৬২) বলা হয়েছে যে, ভগবানের এক মহান ভক্ত পৃথু মহারাজ ছিলেন পারমার্থিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে বৃহস্পতির মতো দক্ষ। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর তাৎপর্যে লিখেছেন, “পৃথু মহরাজ যদিও ছিলেন ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত একজন মহান ভক্ত, তবুও তিনি বৈদিক শাস্ত্রের গভীর জ্ঞানের প্রভাবে সমস্ত নির্বিশেষবাদী ও মায়াবাদীদের পরাস্ত করতে পারতেন। পৃথু মহারাজের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি যে, বৈষ্ণব বা ভগবদ্ভক্ত কেবল ভগবানের সেবাতেই যুক্ত থাকেন না, প্রয়োজন হলে ও দর্শনের ভিত্তিতে নির্বিশেষবাদী বা মায়াবাদীদের সঙ্গে তর্ক করতে তাদের নির্বিশেষবাদকে পরাস্ত করতে প্রস্তুত করেন।” অতএব আমাদেরকে শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অধ্যয়ন করতে হবে যাতে ভক্তিমূলক সেবার বিপরীতে সমস্ত ভ্রান্ত ধারণাসমূহ আমরা পরাস্ত করতে পারি। এটি ভক্তিমূলক সেবার ক্ষেত্রে বৈরি নয় বরং এটি ভক্তিমূলক সেবার পবিত্রতা সুরক্ষা করে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্মরণ শ্রীল রূপ গোস্বামী ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ভক্তি জীবনের সমস্ত বিধি নিষেধগুলোর উদ্দেশ্য হলো সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ রাখা এবং কখনো তাকে বিস্মৃত না হওয়া। তদ্রুপ শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়নের উদ্দেশ্য হলো সর্বদা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করা এবং কখনো তাকে বিস্মৃত না হওয়া। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তাঁর বিদ্যার বিলাসে নামক একটি ভজনে উল্লেখ করেছেন,

জড়বিদ্যা যত মায়ার বৈভব,
তোমার ভজনে বাধা ।
মোহ জনমিয়া, অনিত্য সংসারে,
জীবকে করয়ে গাধা ॥

ভগবানের শ্রীনারায়ণের জয় হোক। তাঁর পাদপদ্মের স্মরণ না করে শাস্ত্রাধ্যয়ন করা কেবল অরণ্যে রোদনের তুল্য।

মুকুন্দ-মালা-স্তোত্র-২১

শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে যে কেউ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে যথার্থভাব নিয়ে সর্বদা স্মরণ করতে পারে। এভাবে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ নিয়মিত অধ্যয়ন কৃষ্ণভাবনায় ঠিকে থাকার জন্য এবং সে সাথে পরিপুষ্টতার জন্য পরম সার হিসেবে কাজ করে।
লেখক পরিচিতি: রাধিকা বল্লভ দাস, ইস্‌কন মুম্বাইয়ে একজন ব্রহ্মাচারী হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। তিনি যুব সমাজের মাঝে কৃষ্ণভাবনা প্রচার করে থাকেন।


 

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জুন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here