গ্রন্থবিতরণ শারদ উৎসব ২০২০ পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান

0
32

শাস্ত্রনিপুন ভক্ত দাস:


কৃষ্ণার্থে অখিল চেষ্টা (ভ.র.সি) শুধুমাত্র শ্রীকৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করার জন্যই আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা নিয়োজিত হওয়া উচিত। “কেউ যদি আমাকে উত্তম উপায়ে সন্তুষ্ট করতে চায় তাহলে তার উচিত গ্রন্থ বিতরণ করা।”

(শ্রী গোবিন্দকে পত্র, বম্বে, ডিসেম্বর ৬,১৯৭৪)

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) নন্দনকানন, চট্টগ্রাম থেকে ইসকন যুব গোষ্ঠী কর্তৃক আয়োজিত গ্রন্থ বিতরণ শারদ উৎসাহ ২০২০ উদযাপিত হয়েছে। অনেক উৎসাহ উদ্দীপনায় চট্টগ্রাম ইস্‌কন ইয়ুথ ফোরামের সমস্ত ভক্তরা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে গ্রন্থ বিতরণ সম্পন্ন করেছেন। কেননা আমরা অনেক উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে এই কঠিন করুণা মহামারীর প্রাদুর্ভাবে আমরা অনেক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠিত ছিলাম। তথাপি সেইসব অশুভ শক্তিকে পরাভূত করে শ্রীল প্রভুপাদের এই দিব্য গ্রন্থাবলী সকলের গৃহে পৌঁছে দিয়েছিল প্রবাদ এর এই নির্ভীক সৈনিকরা। এই গ্রন্থ প্রচার হল কৃষ্ণভাবনামৃতের নির্যাস। যেটি সংস্থাপন করেছেন ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। তিনি বলতেন আমাদের কার্যকলাপ ও আচরণ আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচার। কারণ, কথার থেকে কাজের জোর বেশি। তাই কথাই না বড় হয়ে কাজে বড় হবে। তাই তোমরা যতক্ষণ একটি মানুষকে অনেক কথা বলবে তারচেয়ে বরং তাকে একটি গ্রন্থ দাও, তাহলে তোমার এতগুলো কথা বলার সার্থকতা নিহিত হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রচারের অর্থ হল- কেবলমাত্র কাউকে তর্কের দ্বারা পরাজিত করা নয় বরং তার হৃদয় পরিবর্তন করা, আর কারো হৃদয় যদি পরিবর্তন করতে চাও তাহলে অবশ্যই তাকে একটি গ্রন্থ দাও। অবশ্যই তার অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের দর্শন সঠিকভাবে পরিবেশন করব না সকল ভক্তদের গুরুমহাজের গ্রন্থ পাঠ করতে এবং সম্পূর্ণ বুঝতে হবে তা বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
আর গ্রন্থ প্রচারের ব্যাপারে শ্রীল প্রভুপাদ কিভাবে প্রচার করতে হবে তা শেখার জন্য প্রত্যেক ভক্তকে নিয়মিত গ্রন্থ অধ্যয়ন করার জন্য বলতেন। আর সেই গ্রন্থ থেকে তা অন্যদের মাঝে বিতরণ করার জন্য তিনি অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করতেন।
তাই শ্রীল প্রভুপাদ এ কথার অনুপ্রেরণায় যারা কৃষ্ণভাবনাময় ভক্ত তারা দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে শ্রীল প্রভুপাদের মনোবৃত্তিকে সম্পূর্ণ করতে ইস্‌কনের প্রতিটি ভক্ত তাদের স্বীয় বৃত্তি অনুসারে সেবা সম্পাদনের জন্য তাদের পরিশ্রম, মেধা, সময় ইত্যাদি সমস্তকিছুই তারা নিয়োজিত করেছেন।
তাই ইস্‌কনে প্রতিটি ভক্ত গ্রন্থ প্রচারকে একজন পিয়নের মত মনে করেন অর্থাৎ প্রচারের সময় একজন পিয়ন এর মত আমাদের কেবলমাত্র ভগবান এবং পূর্বতন আচার্যদের বাণীগুলো পুনরাবৃত্তি করা উচিত। আমাদের কখনোই ভাবা উচিত নয় যে প্রচার কিভাবে করতে হবে তা আচার্যদের থেকে আমি বেশি জানি। তাই সে সর্বাঙ্গীণ প্রচেষ্টাকে সফল করার জন্য ইস্‌কন যুব গোষ্ঠী এই সুন্দর আয়োজনে সামিল হয়েছিলেন। আর শ্রীল প্রভুপাদ এর মনোভাব ছিল অবিচলিতভাবে এই গ্রন্থ বিতরণ করার মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন এর ভক্তরা শ্রীকৃষ্ণের সেবারূপ সর্বশ্রেষ্ঠ দিব্য আনন্দ আস্বাদন করুক।
“ভগবানকে দেখার চেষ্টা করো না, শ্রীল প্রভুপাদ এর গুরুদেব প্রায়ই বলতেন, পক্ষান্তরে এমনভাবে আচারণ করো যাতে ভগবান তোমাকে দেখেন।” অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের দাসানুদাসের শরণাগত হয়ে তার নির্দেশ অনুসারে ভগবানের সেবা করার মাধ্যমে শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্যরা যে শ্রীকৃষ্ণের স্নেহভাজন হয়েছিল সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই।
শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন, সবচাইতে তাড়াতাড়ি শ্রীকৃষ্ণের মনোযোগ আকর্ষণ করার পন্থা হচ্ছে অন্য মানুষদের কৃষ্ণভাবনায় উদ্ধুদ্ধ করা। তাই গ্রন্থ বিতরণকারীরা তাদের গুরুদেবের সঙ্গে এক বিশেষ অন্তরঙ্গ ভাব অনুভব করে এবং তাই তাদের গ্রন্থ বিতরণের মাধ্যমে ভগবানের সেবা করতে অনুপ্রাণিত করে।
সারা বিশ্বে এমন কঠিন পরিস্থিতির সময় ইস্‌কন যুব প্রচারক, চট্টগ্রাম এর ভক্তরা অক্লান্ত পরিশ্রম ও নির্ভীক সৈনিক এর মত প্রতি দ্বারে দ্বারে গিয়ে গ্রন্থ প্রচার করেছেন।
চট্টগ্রাম ইস্‌কন যুব গোষ্ঠী নন্দনকানন কর্তৃক আয়োজিত গ্রন্থ বিতরণের উৎসব ২৪টি টিমে বিভক্ত হয়ে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থী এই ম্য্রাাথনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেন। একমাসব্যাপী এই ম্যারাথনে ১৯,৮৭৭ টি গ্রন্থ প্রচার করা হয় যার মধ্যে শ্রীমদ্ভাগবতম ১৯৯ সেট, শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত ৫৭ সেট, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (বড়) ৩৬৩টি, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (ম্যারাথন) ২২৫৮টি, অন্যান্য বড় গ্রন্থ ৭১০টি, মাঝারি গ্রন্থ ২৭০৯টি, ছোট গ্রন্থ ১৩৫৭৭টি, যা ছিলো ২০১৯ সালের তুলনায় ৪২ শতাংশ বেশি। এই গ্রন্থ বিতরণের সুন্দর প্রচার দেখে ইস্‌কনের অন্যতম আচার্য শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী অনেক উৎসাহ উদ্দীপনা সহকারে সবাইকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সবাইকে আশীর্বাদ করে তিনি বলেছেন যারা এত পরিশ্রম করে তিনি বলেছেন যারা এত পরিশ্রম করে এ গ্রন্থে বিতরণ করেছেন তারা অবশ্য কৃষ্ণের কৃপা লাভ করবেন।
তাদের কৃষ্ণমতি হবে। শ্রীমৎ ভক্তি পুরুষোত্তম স্বামী মহারাজ বলেন আমি অত্যন্ত প্রসন্নতা লাভ করছি। এবার যা গ্রন্থ বিতরণ হয়েছে আগামী বার তার দ্বিগুণ হবে। এছাড়াও কিভাবে গ্রন্থ বিতরনের বৃদ্ধি করা যায় বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা জানান শ্রীমৎ ভক্তিবিজয় ভাগবত স্বামী।
ইস্‌কন বাংলাদেশ অন্যতম সন্ন্যাসী শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী, তোমরা যদি আমাদেরকে আরো বেশি উৎসাহ প্রদান করো তাহলে আমরাও তোমাদের মত অনেক বেশি গ্রন্থ প্রচার করতে পারব। ইস্‌কন নন্দনকানন মন্দিরের সভাপতি শ্রীপাদ পণ্ডিত গদাধর দাস ব্রহ্মচারী তিনি সবাইকে এ মহৎ কার্য সাধন করার জন্য অসংখ্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতেও যেন আর উত্তর গ্রন্থ বিতরণ এর পরিধি বৃদ্ধি পায় সে বিষয়ে সুন্দর পরিকল্পনা রচনা করার জন্য সবাইকে অনুরোধ জানান। এছাড়াও তিনি যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে গ্রন্থ বিতরণ ব্যবস্থাপনাকে সুন্দর মত পরিচালিত করেছেন তাদেরকে অনেক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। এছাড়াও সাধারণ সম্পাদক শ্রীমান তারণ নিত্যানন্দ দাস ব্রহ্মচারী প্রভু তিনি সবাইকে এই গ্রন্থ বিতরণ কার্যক্রমকে সফল করার জন্য প্রত্যেক ভক্তকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। যুগ্মসাধারণ সম্পাদক শ্রীমান মুকুন্দ ভক্তি দাস ব্রহ্মচারী প্রভু সবাইকে গ্রন্থ বিতরণের নতুন কিভাবে প্ল্যান করা যায় সে সম্পর্কে সবাইকে অনুপ্রেরণা প্রদান করেন। গ্রন্থ বিতরণকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বরত শ্রীমান রণবীর মাধব দাস ব্রহ্মচারী তার সুদক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য সমস্ত গ্রন্থ প্রচারকদের চরণে বিনম্র ক্ষমা প্রার্থনা করে সবাইকে উৎসাহ প্রদান করলেন এবং পরবর্তী বছরের জন্য সবাইকে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে পরবর্তী বছর গ্রন্থ বিতরণ যেন আরো বেশি বেশি করা যায় তার জন্য অনেক উৎসাহ ব্যঞ্জক বক্তব্য তিনি সবার মাঝে পরিবেশন করেন। এই মহতী অনুষ্ঠান। আধ্যাত্মিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমরা সারা জগতে কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃতকে আরো প্রসারিত করা যায় সেজন্য সবাই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
প্রথম স্থান অধিকার করেছেন অদ্বৈত ভয়েস। এই টিম ২৬৪১ পয়েন্টের গ্রন্থ প্রচার করেছেন। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন বলেদেব ভয়েস। এই টিম ২১০১ পয়েন্ট এর গ্রন্থ প্রচার করেছেন। তৃতীয় স্থান অধিকার করেছেন কৃষ্ণ বলরাম দল। এই টিম ১৭৩৪ পয়েন্টে গ্রন্থ প্রচার করেছেন।
অন্যান্য সকল টিমকে বিশেষ পুরষ্কারে ভূষিত করে। এর ফলে সমস্ত ভক্ত অত্যন্ত আনন্দিত, উৎসাহিত ও উল্লাসিত। সুস্বাদু কৃষ্ণ প্রসাদ এর মাধ্যমে এই গ্রন্থ বিতরণের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

চৈতন্য সন্দেশে‘র প্রকাশিত ডিসেম্বর ২০২০। হরেকৃষ্ণ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here