গো-রক্ষা ও প্রতিপালন

প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৯:২০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৯:২০ পূর্বাহ্ণ

এই পোস্টটি 314 বার দেখা হয়েছে

গো-রক্ষা ও প্রতিপালন

ঐশ্বর্য এবং শক্তি যদি ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি, ভগবৎ চেতনা এবং গো-রক্ষার জন্য ব্যবহৃত না হয়, তা হলে গৃহ এবং রাজ্য অবশ্যই বিধির বিধানে নষ্ট হয়ে যায়৷

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

গো-রক্ষার প্রয়োজনীয়তা কেন? “ব্রাহ্মণ, গাভী এবং রক্ষকহীন প্রাণীরা আমার শরীর। পাপের ফলে যাদের বিচার-বুদ্ধি নষ্ট হয়ে গেছে, তারা এঁদেরকে আমার থেকে ভিন্ন বলে মনে করে। তারা ঠিক ক্রুদ্ধ সর্পের মতো, এবং পাপীদের দণ্ডদাতা যমরাজের শকুনিসদৃশ দূতেরা ক্রুদ্ধ হয়ে তাদের চঞ্চুর দ্বারা তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে।
ব্রহ্মসংহিতার বর্ণনা অনুসারে রক্ষকহীন প্রাণীরা হচ্ছে গাভী, ব্রাহ্মণ, স্ত্রী, শিশু এবং বৃদ্ধ। এই পাঁচটির মধ্যে ব্রাহ্মণ এবং গাভীদের কথা এই শ্লোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কেননা ব্রাহ্মণ এবং গাভীদের হিত সাধন করার জন্য ভগবান সর্বদাই উৎকন্ঠিত থাকেন। তাঁর প্রতি প্রার্থনায়ও সেই কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ভগবান বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কেউ যেন এই পাঁচটির প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ না হয়, বিশেষ করে গাভী এবং ব্রাহ্মণদের প্রতি। কোনো কোনো শ্রীমদ্ভাগবতের সংস্করণে দুহতীঃ শব্দটির পরিবর্তে দুহিতৃঃ শব্দের ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু অর্থ একই । দুহতীঃ মানে হচ্ছে গাভী, এবং দুহিতৃঃ শব্দটিও গাভী অর্থে ব্যবহার করা যায়, কেননা গাভীকে সূর্যদেবের কন্যা বলে মনে করা হয়। ঠিক যেমন পিতা-মাতা শিশু-সন্তানদের দেখাশুনা করেন, তেমনই পিতা, পতি অথবা প্রাপ্তবয়স্ক পুত্রের দ্বারা রমণীসমাজ রক্ষিত হওয়া উচিত। যারা অসহায়, তাদের দেখাশুনা তাদের অভিভাবকদের করা উচিত, তা না হলে পাপীদের কার্যকলাপ নিরীক্ষণ করার জন্য ভগবান কর্তৃক নিযুক্ত যমরাজের দ্বারা সেই সমস্ত অভিভাবকেরা দণ্ডিত হবেন। যমরাজের সহকারী বা দূতদের এখানে শকুনির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং যারা তাদের অধীনস্থ ব্যক্তিদের রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব পালন করেন না, তাদের সর্পের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। শকুনি সর্পের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর ব্যবহার করে, তেমনই যমদূতেরা দায়িত্বহীন অভিভাবকদের প্রতি কঠোর ব্যবহার করবে।” শ্রীমদ্ভাগবত (৩/১৬/১০)
গো-রক্ষার অর্থ হচ্ছে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পুষ্টি সাধন করা, যার ফলে ভগবৎ চেতনার উন্মেষ হয় এবং মানব সমাজের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য সাধিত হয়। কলিযুগের লক্ষ্য হচ্ছে জীবনের উচ্চ আদর্শগুলি বিনষ্ট করা এবং মহারাজ পরীক্ষিৎ যদিও প্রবলভাবে কলিকে এই পৃথিবীর ওপর তার প্রভাব বিস্তার করা থেকে নিরস্ত করেছিলেন, কিন্তু উপযুক্ত সময়ে কলির প্রভাব প্রকট হয়েছিল, যার ফলে মহারাজ পরীক্ষিতের মতো একজন মহানুভব রাজাও সামান্য ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় উত্তেজিত হয়ে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অবমাননা করেছিলেন। মহারাজ পরীক্ষিত সেই আকস্মিক ঘটনার জন্য অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন যে, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্ত না হওয়ার ফলে তাঁর রাজ্য, ঐশ্বর্য এবং পরাক্রম যেন ব্রহ্মতেজে দগ্ধ হয়ে যায়।
ঐশ্বর্য এবং শক্তি যদি ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি, ভগবৎ চেতনা এবং গো-রক্ষার জন্য ব্যবহৃত না হয়, তা হলে গৃহ এবং রাজ্য অবশ্যই বিধির বিধানে নষ্ট হয়ে যায়।
প্রতিটি রাষ্ট্র এবং গৃহকে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রসার, আত্মোপলব্ধির জন্য ভগবৎ চেতনার প্রচার এবং এক যথার্থ সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে দুধ ও উত্তম আহার্য লাভের উদ্দেশ্য গো-সংরক্ষণের প্রচেষ্টা অবশ্যই করতে হবে। শ্রীমদ্ভাগবত (১/১৯/৩)
মহাপ্রভু বললেন, “আপনি গরুর দুধ খান; সেই সূত্রে গাভী হচ্ছে আপনার মাতা। আর বৃষ অন্ন উৎপাদন করে, যা খেয়ে আপনি জীবন ধারণ করেন; সেই সূত্রে সে আপনার পিতা।” (চৈ. চ.আদি ১৭/১৫৩)
ভগবদ্‌গীতায় ভগবান গো-রক্ষার উপদেশ দিয়েছেন। গো-পালন করা উচিত, গাভী থেকে দুগ্ধ দোহন করা উচিত এবং সেই দুগ্ধ থেকে বিভিন্নভাবে নানা প্রকার খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন করা উচিত। যথেষ্ট পরিমাণে দুধ পান করা উচিত এবং তার ফলে মানুষের আয়ু বৃদ্ধি হয়, মস্তিষ্ক উর্বর হয়, ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন সম্ভব হয় এবং চরমে ভগবানের কৃপা লাভ করা যায়। মাটি খনন করে যেমন অন্ন এবং জল প্রাপ্ত হওয়া আবশ্যক, তেমনই গো পালন করে গাভী থেকে অমৃততুল্য দুগ্ধ প্রাপ্ত হওয়া উচিত।
এই যুগের মানুষেরা বিলাসবহুল জীবন যাপনের জন্য যান্ত্রিক উন্নতির ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী, কিন্তু ভগবদ্ভুক্তির অনুশীলনের ফলে যে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া যায়, সেই অনুষ্ঠানে তারা আগ্রহী নয়। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ন তে বিদুঃ স্বার্থগতিং হি বিষ্ণুং দুরাশয়া যে বহিরর্থমানিনঃ । আধ্যাত্মিক শিক্ষার অভাবে মানুষ জানে না যে, জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য হচ্ছে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়া। দুর্ভাগ্যবশত জীবনের সেই লক্ষ্য বিস্মৃত হওয়ার ফলে, তার নৈরাশ্যের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করে (মোঘাশা মোঘকর্মাণো মোঘজ্ঞানা বিচেসঃ)। তথাকথিত বৈশ্য বা ব্যবসায়ীরা বড় বড় কলকারখানা তৈরি করে বিশাল উদ্যোগে লিপ্ত হয়েছে, কিন্তু তারা অন্ন এবং দুগ্ধ উৎপাদনে আগ্রহী নয়। কিন্তু এখানে বলা হয়েছে যে, মরুভূমিতেও মাটি খনন করে জল পাওয়া যায় এবং অন্ন উৎপাদন করা যায়। আমরা যখন অন্ন এবং শাক সবজি উৎপাদন করি, তখন অনায়াসে গো-রক্ষা করতে পারি। গো-রক্ষার ফলে গাভী থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাওয়া যায়; এবং দুধ, অন্ন ও শাক সবজির সমন্বয়ে শত শত অমৃততুল্য আহার্য উৎপাদন করা যায়। আমরা মহা আনন্দে সেই খাদ্য আহার করতে পারি এবং তার ফলে শিল্প উদ্যোগ ও বেকারত্ব পরিহার করতে পারি।
“পরীক্ষিত মহারাজের জন্ম অত্যন্ত আশ্চর্যজনক, কেননা তিনি যখন তাঁর মাতৃগর্ভে ছিলেন তখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে রক্ষা করেছিলেন। তার কার্যকলাপও অত্যন্ত অদ্ভুত, কেননা গাভী হত্যা করতে উদ্যত কলিকে তিনি দণ্ডদান করেছিলেন। গো-হত্যা করা হলে মানব সমাজের সর্বনাশ হয়। গাভী-হত্যা করতে উদ্যত পাপের প্রতিনিধির হাত থেকে তিনি গাভীকে রক্ষা করেছিলেন।” শ্রীমদ্ভাগবত (১/৪/৯)

গো-অঙ্গে যত লোম, তত সহস্র বৎসর।
গোবধী রৌরব-মধ্যে পচে নিরন্তর ॥

“গাভীর শরীরে যত লোম আছে তত হাজার বছর গোহত্যাকারী রৌরব নামক নরকে অকল্পনীয় দুঃখ যন্ত্রণা ভোগ করে। (চৈ.চ.আদি ১৭/১৬৬)
বুদ্ধদেবের দর্শনকে ব্যবহারিক পরিভাষায় ‘প্রচ্ছন্ন নাস্তিক্যবাদ’ বলে বর্ণনা করা হয়। কেননা এই মতবাদে পরমেশ্বর ভগবানকে স্বীকার করা হয়নি এবং বেদের প্রামাণিকত্ব স্বীকার করা হয়নি। কিন্তু আসলে তা হচ্ছে নাস্তিকদের বিমোহিত করে ভগবন্মুখী করার একটি ব্যবস্থা। বুদ্ধদেব হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের অবতার। প্রকৃতপক্ষে তিনিই হচ্ছে বৈদিক জ্ঞানের আদি প্রবর্তক। তাই তিনি বৈদিক তত্ত্বদর্শন কখনই অস্বীকার করতে পারেন না। বাহ্যিকভাবে তিনি তা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু ‘সুর-দ্বিষ’ বা অসুরদের জন্য, যারা সব সময় ভগবদ্বিদ্বেষী এবং যারা বেদের অজুহাত দেখিয়ে গো-হত্যা অথবা পশুহত্যা সমর্থন করতে চায়, তাদের সেই জঘন্য কার্যকলাপ রোধ করবার জন্য বুদ্ধদেবকে সর্বতোভাবে বেদের প্রামাণিকতা অস্বীকার করতে হয়েছিল। তাঁর কার্য-সিদ্ধির জন্য কেবল তিনি এটি করেছিলেন। তা না হলে তাঁকে ভগবানের অবতার বলে স্বীকার করা হতো না; তা না হলে জয়দেব আদি বৈষ্ণব আচার্যরা তাঁর অপ্রাকৃত মহিমা কীর্তন করতেন না। বুদ্ধদেব বেদের প্রারম্ভিক সিদ্ধান্ত তৎকালীন জনসাধারণের উপযোগী করে প্রচার করেছিলেন বেদের যথার্থ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা কারার জন্য (এবং শ্রীপাদ শঙ্করাচার্যও তাই করেছিলেন) এইভাবে বুদ্ধদেব এবং শঙ্করাচার্য ভগবৎ-বিশ্বাসের পথ প্রশস্ত করে গিয়েছিলেন এবং বৈষ্ণব আচার্যরা, বিশেষ করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পুর্ণরূপে ভগবৎ-চেতনা বিকাশের পথে মানুষকে পরিচালিত করেছিলেন।
মানুষ যে বুদ্ধদেবের অহিংস আন্দোলনের প্রতি উৎসাহ প্রদর্শন করছে, তা দেখে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হচ্ছি। কিন্তু তারা কি এই বিষয়টি যথার্থ ঐকান্তিকতা সহকারে গ্রহণ করবে এবং সমস্ত কসাইখানাগুলি বন্ধ করবে? তা যদি না হয়, তা হলে অহিংসার বাণীর কোনো অর্থ হয় না।
যে ঘৃণ্য, ক্রূর ব্যক্তি পরের প্রাণ বধ করে স্বীয় প্রাণ পরিপোষণ করে, তাকে বধ করাই মঙ্গলজনক, তা না হলে তার সেই পাপের ফলে সে নরকগামী হবে।
যে মানুষ অপরকে হত্যা করে অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং নির্লজ্জভাবে জীবনধারণ করে, তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়াই উপযুক্ত শাস্তি । রাজ্য-শাসনের নীতি হচ্ছে নিষ্ঠুর হত্যাকারীকে নরক থেকে উদ্ধার করার জন্য প্রাণদণ্ড দেওয়া। সরকার যে হত্যাকারীকে প্রাণদণ্ড দান করে তার পক্ষে তা মঙ্গলজনক, কেননা তা না হলে তার পরবর্তী জীবনে তার সেই পাপের ফল তাকে ভোগ করতে হবে। হত্যাকারীকে এইভাবে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা যদিও সব চাইতে কঠোর দণ্ড, তবুও সেটা তার মঙ্গলেরই জন্য। স্মৃতি শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, রাজা যখন হত্যাকারীকে এই দণ্ড দান করেন, তার ফলে সে তার সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়। এমনকি তার ফলে সে স্বর্গলোকেও উন্নীত হতে পারে। ধর্মনীতি এবং সমাজনীতির প্রণেতা মনু নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, পশুঘাতকদেরও হত্যাকারী বলে বিবেচনা করতে হবে, কেননা পশুর মাংস উন্নত মানুষদের আহার্য নয়। মানুষের মুখ্য কর্তব্য হচ্ছে ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। তিনি বলেছেন যে, পশুহত্যা সংঘবদ্ধভাবে চক্রান্ত করে মানুষ হত্যা করারই মতো এবং তার ফলে তাদের সকলকে দণ্ডভোগ করতে হবে। পশুহত্যায় যে অনুমতি দেয়, যে পশুকে হত্যা করে, যে পশু-মাংস বিক্রয় করে, পরিবেশন করে, তারা সকলেই হচ্ছে ঘাতক এবং প্রকৃতির নিয়মে তাদের সকলকেই দণ্ডভোগ করতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি সত্ত্বেও কেউই আজ পর্যন্ত একটি জীবও তৈরি করতে পারেনি এবং তাই কোনো প্রাণীকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই।


যে মানুষ অপরকে হত্যা করে অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং নির্লজ্জভাবে জীবনধারণ করে, তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়াই উপযুক্ত শাস্তি। রাজ্য-শাসনের নীতি হচ্ছে নিষ্ঠুর হত্যাকারীকে নরক থেকে উদ্ধার করার জন্য প্রাণদণ্ড দেওয়া।


যারা মাংসাহারী তাদের জন্য যজ্ঞে পশুবলি দিয়ে কেবল সেই মাংস আহার করার অনুমতি শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে এবং এই ধরনের অনুমোদন পশুহত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নয়, পক্ষান্তরে কসাইখানায় ইচ্ছামত পশুবলি দেওয়া বন্ধ করার জন্য। যজ্ঞবেদিতে পশুবলি দেওয়া হলে সেই পশু সরাসরিভাবে মনুষ্য স্তরে উন্নীত হয় এবং পশু-মাংস আহারীও তার পাপ থেকে মুক্ত হয়। জড় জগৎ সর্বদাই নানা রকম উৎকণ্ঠায় পূর্ণ এবং পশুহত্যার ফলে সেই পরিবেশ অত্যন্ত কলুষিত হয়ে উঠেছে এবং তার ফলে যুদ্ধ, মহামারী, দুর্ভিক্ষ এবং নানা রকমের প্রাকৃতিক গোলযোগ দেখা দেবে।” শ্রীমদ্ভাগবত (১/৭/৩৭)

গো-রক্ষা ও অর্থনীতি উন্নয়ন

“সমস্ত মানুষের জীবিকা, অর্থাৎ শস্য উৎপাদন এবং প্রজাদের মধ্যে তার বিতরণ করার বৃত্তি ভগবানের বিরাটরূপে ঊরুদ্বয় থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই কার্য সম্পাদন করার ভার গ্রহণ করেন যে সমস্ত ব্যবসায়ী মানুষ, তাঁদের বলা হয় বৈশ্য।
মানবসমাজের জীবিকা নির্বাহের উপায়কে এখানে স্পষ্টভাবে বিশ, বা কৃষি ও বাণিজ্যকে বোঝানো হয়েছে। কৃষিকার্যের মাধ্যমে খাদ্য-শস্য উৎপাদন এবং সেইগুলির সরবরাহ, অর্থের লেনদেন ইত্যাদি তার অন্তর্গত।
যান্ত্রিক উদ্যোগ হচ্ছে জীবিকা নির্বাহের কৃত্রিম উপায়, এবং বিশেষভাবে বড় বড় কলকারখানাগুলি হচ্ছে সমাজের সমস্ত সমস্যার উৎস। ভগবদ্‌গীতাতেও কৃষি, গো-রক্ষা এবং বাণিজ্য বৈশ্যদের বৃত্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি যে, মানুষ নির্ভয়ে তার জীবিকা নির্বাহের জন্য গাভী এবং কৃষিযোগ্য ভূমির ওপর নির্ভর করতে পারে।
অর্থের লেনদেন এবং তার সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদনের বিনিময় হচ্ছে এই প্রকার জীবিকার একটি শাখা। বৈশ্য সম্প্রদায় কতকগুলি শাখায় বিভক্ত—যথা, ক্ষেত্রী বা ভূমিপতি, কৃর্ষণ বা ভূমি কর্ষণকারী, তিলবণিক বা শস্য উৎপাদক, গন্ধ বণিক বা মশলার ব্যাপারি, সুবর্ণ-বণিক বা স্বর্ণের ব্যাপারি এবং সাহুকার ইত্যাদি। ব্রাহ্মণেরা হচ্ছেন শিক্ষক এবং পারমার্থিক গুরু, ক্ষত্রিয়েরা চোর এবং দুষ্কৃতকারীদের হাত থেকে নাগরিকদের রক্ষা করেন, আর বৈশ্যদের দায়িত্ব হচ্ছে উৎপাদন এবং বিতরণ করা। শুদ্র বা বুদ্ধিহীন শ্রেণীর মানুষেরা, যারা স্বতন্ত্রভাবে উপরোক্ত বৃত্তির কোনটি করতে সক্ষম নয়, তাদের কর্তব্য হচ্ছে তিনটি উচ্চতর বর্ণের সেবা করার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা।
পুরাকালে ক্ষত্রিয় এবং বৈশ্যরা ব্রাহ্মণদের সমস্ত প্রয়োজনীয় বস্তু প্রদান করতেন, কেননা ব্রাহ্মণদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সেই সমস্ত বস্তু সংগ্রহের সময় ছিল না। বৈশ্য এবং শূদ্রদের থেকে ক্ষত্রিয়েরা কর আদায় করতেন, কিন্তু ব্রাহ্মণেরা সব রকম আয়কর অথবা ভূমিকর থেকে মুক্ত ছিলেন। মানবসমাজের এই ব্যবস্থা এত সুন্দর ছিল যে, তখন কোনো রকম রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক আন্দোলন ছিল না। তাই, বিভিন্ন প্রকার বর্ণ-বিভাগ মানবসমাজের শান্তিপূর্ণ স্থিতির জন্য অনিবার্য। শ্রীমদ্ভাগবত (৩/৬/৩২)
“গো-রক্ষার ফলে কত সুযোগ-সুবিধা লাভ করা যায়, কিন্তু মানুষেরা সেই বিদ্যা ভুলে গেছে। তাই শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় গো-রক্ষার মাহাত্ম্য সম্বন্ধে গুরুত্ব দিয়েছেন (কৃষিগোরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্)। বৃন্দাবনের আশেপাশের গ্রামগুলিতে গ্রামবাসীরা এখনও কেবলমাত্র গো রক্ষার দ্বারা সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করে। তারা গোবর শুকিয়ে তা জ্বালানীরূপে ব্যবহার করে। তাদের গৃহে যথেষ্ট পরিমাণ শস্য সঞ্চিত থাকে, এবং গো-রক্ষার ফলে তারা সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য প্রাপ্ত হয়। কেবলমাত্র গো-রক্ষার দ্বারা গ্রামবাসীরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপন করে। এমনকি গোবর এবং গোমূত্রেও ঔষধি গুণ রয়েছে।” শ্রীমদ্ভাগবত (১০/৬/১৯)

গো-দুগ্ধ

“বৃষ হচ্ছে নীতিসূত্রের প্রতীক এবং গাভী হচ্ছে পৃথিবীর প্রতিভূ। যখন বৃষ এবং গাভী হর্ষোৎফুল্ল থাকে, বুঝতে হবে যে, জগৎবাসীরাও হর্ষোৎফুল্ল আছে। তার কারণ হচ্ছে এই যে, কৃষিক্ষেত্রে শস্যাদি উৎপাদনে সহায়তা করে থাকে বৃষ, এবং সুষম খাদ্য-মূল্যমানের বিস্ময়কর সৃষ্টি যে দুধ, তার জোগান দেয় গাভী। তাই তারা যাতে সর্বত্রই প্রফুল্লতা নিয়ে চরে বেড়াতে পারে, সেই জন্য মানব-সমাজ এই দুই দরকারী প্রাণীকে অতি যত্ন সহকারে পালন করে থাকে।
কিন্তু এই কলিযুগে বর্তমানে বৃষ এবং গাভী দু’টিকেই এখন জবাই করা হচ্ছে আর ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি যারা জানে না, সেই শ্রেণীর মানুষেরা ওদের খাদ্যের মতো খেয়ে ফেলছে।
সব রকম সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের সর্বোত্তম সার্থকতা অর্জন করতে গেলে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমে সমগ্র মানব-সমাজের কল্যাণার্থে বৃষ আর গাভীকে রক্ষা করতে পারা যায়। এই ধরনের সংস্কৃতির গ্রগতির মাধ্যমেই, সমাজের নীতিবোধ যথাযথভাবে অক্ষুণ্ণ রাখা যায়, এবং তার ফলে অযথা ব্যর্থ প্রচেষ্টা ছাড়াই শান্তি ও সমৃদ্ধিও অর্জন করা চলে। ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির যখন অবনতি ঘটে, গাভী এবং বৃষ তখন দুর্ব্যবহার পায়, আর তারই পরিণাম প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি প্রকটিত হয়।” শ্রীমদ্ভাগবত (১/১৬/১৮)
“কলিযুগের পরবর্তী লক্ষণটি হচ্ছে গাভীর দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা। দুগ্ধ যেন তরল ধর্মনীতি, আর তা যেন গাভীর থেকে দোহন করা যায়। মহান্ মুনি ঋষিরা কেবল দুধ পান করে জীবন ধারণ করতেন। শ্রীল শুকদেব গোস্বামী দুগ্ধ দোহন কালে গৃস্থদের গৃহে যেতেন এবং জীবন ধারনের জন্য একটু মাত্র দুধ ভিক্ষা করে নিতেন। এমন কি, প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেও, কেউ কোনো সাধুকে দু’-এক কেজি দুধ থেকে বঞ্চিত করতেন না, এবং প্রতিটি গৃহস্থই জলের মতো দুগ্ধ দান করতেন।
কিন্তু কলিযুগে গো-বৎসদের যত শীঘ্র সম্ভব গাভীদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। অশ্রুসিক্তা গাভীর থেকে শূদ্র গোয়ালা কৃত্রিমভাবে দুগ্ধ আহরণ করে, যখন আর দুগ্ধ পাওয়া যায় না, তখন গাভীটিকে জবাই করার জন্য কসাইখানায় পাঠানো হয়।
বর্তমান সমাজের সমস্ত দুর্দশার কারণ হচ্ছে এই সমস্ত অতি পাপপূর্ণ কার্যকলাপ। অর্থনৈতিক উন্নতির নামে মানুষ যে কি করছে, তা তারা জানে না। কলির প্রভাবে তারা সকলেই অজ্ঞানতার অন্ধকারে আচ্ছন্ন। শান্তি এবং সমৃদ্ধির সমস্ত চেষ্টার মাঝেও গাভী আর বৃষদের সকল রকমের সুখী করে রাখার দিকেও তাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। মূর্খ মানুষেরা জানে না, কিভাবে গাভী এবং বৃষকে সুখী রাখার মাধ্যমে অনায়াসে সুখ অর্জন করা যায়, অথচ সেটাই প্রকৃতির বিধি। মানব সমাজের সর্বাঙ্গীণ সুখ এবং শান্তি সম্পাদনের জন্য শ্রীমদ্ভাগবতের নির্দেশে এই পন্থা আমাদের গ্রহণ করা উচিত।” শ্রীমদ্ভাগবত (১/১৭/৩)
“আমরা যদি দুধ পান করতে চাই, তা হলে আমাদের একটি গরু পালন করতে হবে এবং তাকে দুধ দেওয়ার উপযুক্ত করে রাখতে হবে। দুধ পান করা খুবই ভাল; তা আনন্দদায়কও।” শ্রীমদ্ভাগবত (৩/২৫/১৩)

গো-চরণ ভূমি

সাধারাণত গো-বৎস এবং গাভীদের আলাদাভাবে চরানো হয়। বয়স্ক গোপেরা গাভীদের চারণ করেন এবং শিশুরা বৎসদের দেখাশোনা করে, কিন্তু এখন গোবর্ধন পর্বতের নীচে বৎসদের দেখা মাত্রই গাভীরা আত্মবিস্মৃত হয়েছিল এবং তারা ঊর্ধ্বপুচ্ছ হয়ে এবং তাদের সামনের পা ও পিছনের পা একত্রে অত্যন্ত দ্রুতবেগে তাদের বৎসদের অভিমুখে ধাবিত হয়েছিল।” শ্রীমদ্ভাগবত (১০/১৩/৩০)
জমদগ্নি কামধেনু থেকে প্রাপ্ত ঘি-এর দ্বারা অগ্নিহোত্র যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার ফলে কার্তবীর্যার্জুনের থেকেও অধিক শক্তিশালী ছিলেন। সকলের পক্ষে এই ধরনের গাভী প্রাপ্ত হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তা হলেও, একজন সাধারণ মানুষ একটি সাধারণ গাভীর অধিকারী হয়ে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে তার থেকে যথেষ্ট পরিমাণে দুগ্ধ প্রাপ্ত হতে পারে এবং অগ্নিহোত্র যজ্ঞ অনুষ্ঠান করার জন্য সেই দুধ থেকে মাখন এবং ঘি প্রাপ্ত হতে পারে। তা সকলের পক্ষেই সম্ভব। এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, ভগবদ্‌গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেন গোরক্ষ্য। এটি অত্যন্ত আবশ্যক, কারণ যথাযথভাবে গো-রক্ষা করা হলে যথেষ্ট পরিমাণে দুধ প্রাপ্ত হওয়া যায়। আমরা ব্যবহারিকভাবে তা আমেরিকার বিভিন্ন ইস্কন ফার্মে দেখতে পাচ্ছি। সেখানে আমরা যথাযথভাবে গাভীর রক্ষণাবেক্ষণ করার ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে দুধ পাচ্ছি। সেখানকার অন্য ফার্মের গাভীরা আমাদের গাভীর মতো এত পরিমাণে দুধ দেয় না; কারণ আমাদের গাভীরা জানে যে, আমরা তাদের হত্যা করব না, তাই তারা সুখী এবং তার ফলে তারা প্রচুর পরিমাণে দুধ দিচ্ছে। অতএব শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশ দিয়েছেন যে, মানব সমাজে গো-রক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সারা পৃথিবীর মানুষদের শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করা কর্তব্য কিভাবে শস্য উৎপাদন (অন্নাদ্ ভবন্তি ভূতানি) এবং গো-রক্ষার মাধ্যমে সব রকম অভাব থেকে মুক্ত হয়ে সুখী জীবন যাপন করতে হয়। কৃষিগোরক্ষাবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্। মানব-সমাজের তৃতীয় বর্ণের মানুষ বৈশ্যদের কর্তব্য হচ্ছে জমিতে শস্য উৎপাদন করা এবং গাভীদের রক্ষা করা। এটিই ভগবদ্‌গীতার নির্দেশ।
গো-রক্ষার ব্যাপারে মাংসাহারীরা প্রতিবাদ করতে পারে, কিন্তু তার জবাব হচ্ছে যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু গো-রক্ষার এত গুরুত্ব দিয়েছেন, তাই যারা মাংস আহার করতে চায় তারা শূকর, কুকুর, ছাগল, ভেড়া আদি নিকৃষ্ট স্তরের পশুদের মাংস আহার করতে পারে, কিন্তু তারা যেন কখনও গাভীদের জীবন স্পর্শ না করে, কারণ তা হলে মানব-সমাজের আধ্যাত্মিক উন্নতি বিনষ্ট হবে।” শ্রীমদ্ভাগবত (৯/১৫/২৫)


 

এপ্রিল-জুন ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

সম্পর্কিত পোস্ট

‘ চৈতন্য সন্দেশ’ হল ইস্‌কন বাংলাদেশের প্রথম ও সর্বাধিক পঠিত সংবাদপত্র। csbtg.org ‘ মাসিক চৈতন্য সন্দেশ’ এর ওয়েবসাইট।
আমাদের উদ্দেশ্য
■ সকল মানুষকে মোহ থেকে বাস্তবতা, জড় থেকে চিন্ময়তা, অনিত্য থেকে নিত্যতার পার্থক্য নির্ণয়ে সহায়তা করা।
■ জড়বাদের দোষগুলি উন্মুক্ত করা।
■ বৈদিক পদ্ধতিতে পারমার্থিক পথ নির্দেশ করা
■ বৈদিক সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।
■ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশ অনুসারে ভগবানের পবিত্র নাম কীর্তন করা ।
■ সকল জীবকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করানো ও তাঁর সেবা করতে সহায়তা করা।