গীতা জয়ন্তি স্পেশাল: গীতায় ভগবানের ১১টি প্রতিশ্রুতি

0
48

শ্রীমৎ ভক্তিবিজয় ভাগবত স্বামী মহারাজ

শাস্ত্রে বলা হয়েছে:

কৃষ্ণভুলি যেই জীব অনাদি বহির্মূখ।
অতএব মায়া তারে দেয় সংসার দুঃখ ॥

কৃষ্ণকে ভুলে যাওয়ার জন্যই আমরা এই সংসার কারাগারে আবদ্ধ হয়ে দুঃখ-কষ্ঠ ভোগ করছি। সরকারের আইন লঙ্ঘন করলে মানুষকে কারা যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়, ঠিক তেমনি এ জগৎ হল দূরতিক্রম্য কারাগার। যাতে জীব জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিরূপ চতুর্ধা দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে। কি আইন আমরা লঙ্ঘন করেছি যার জন্য এত অবাঞ্ছিত দুঃখ- তার স্পষ্ট উত্তর প্রদান করে বলছেন যে, আমরা ভগবৎ অংশ জীব, ভগবৎ সেবাই আমাদের একমাত্র কর্তব্য, কিন্তু আমাদের স্বতন্ত্র ভোগ বাসনা, প্রভু হওয়ার বাসনাই আমাদেরকে এই কারাবাসে বাধ্য করেছে। ভগবদ্গীতায় বর্ণনা করা হয়েছে, ভগবানের স্বীয় মায়া ত্রিগুণাত্মিকা দ্বারা পরিচালিত এই জড় জগৎরূপী কারাগারকে অতিক্রম করা খুবই কঠিন। ‘দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া’– এই শ্লোকে তাকে অতিক্রম করা দুরতীক্রমনীয়া বলা হয়েছে। জীব নিজের চেষ্টায় কিংবা সমস্ত শক্তিশালী দেব দেবীদের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠাতেও তা সম্বব নয়। কিন্তু শ্লোকের শেষাংশ ভগবান বলছেন, “কেবলমাত্র আমার ইচ্ছামাত্র অর্থাৎ আমিই জীবকে মুক্তি প্রদান করতে সক্ষম” ‘মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে’ (গীতা ৭/১৪) কেবলমাত্র আমার শরণাগত জীবকেই আমি এ সংসার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি প্রদান করি। শ্রীচৈতন্য ভাগবতে বলা হয়েছে- যেই বাঁধয়ে ছাড়য়ে সেই যে। আর সেই জন্যই পরম করুণাময় পরমপিতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জীবের প্রতি তাঁর অপার করুণাবশতঃ এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে কারামুক্তির শিক্ষা প্রদান করেন, যে শিক্ষার আশ্রয় গ্রহণ করে আমরা আমাদের নিত্যস্বরূপ আনন্দময় জীবন অধিষ্ঠিত হতে পারি। গীতা মাহাত্ম্যে বলা হয়েছে-

এলিনে মোচনং পুংসাং জলস্নানং দিনে দিনে।
সকৃদ্ গীতামৃতস্নানং সংসারমলানাশনম্ ॥

‘আমরা প্রত্যহ জলে স্নান করে শরীর পরিচ্ছন্ন করি, ঠিক তেমনিভাবে ভগবৎ প্রদত্ত ভগবদ্গীতার শিক্ষা যদি কেউ নিজের জীবনে প্রয়োগ করেন তাহলেই সংসাররূপ এই কারাবাস থেকে অনায়াসেই মুক্তি লাভ করা সম্ভব।’
সাধারণ জীবের ভূমিকায় সংসার জ্বালায় বিষাদগ্রস্ত অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রের মাঠে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই অমৃতময় শিক্ষা প্রদান করেছিলেন। ভগবান বলেছেন-

প্রথমত: ভগবান বলেছেন-অর্জুন! তোমার প্রতি এই সর্বশ্রেষ্ঠ, সমস্ত শিক্ষার রাজশিক্ষা এবং অতি পবিত্রময় বস্তু-‘রাজবিদ্যা রাজগুহ্যং পবিত্রমিদমুত্তমম’ –এই জ্ঞান তোমাকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধি প্রদান করবে ও তোমাকে অত্যন্ত সুখ প্রদান করবে, যা হল ধর্মের প্রকৃত রহস্য ও নিত্য আনন্দময় জীবন।–‘প্রত্যক্ষাবগমং সুসুখং কর্তুমব্যয়ম,’ (গীতা ৯/২)।

দ্বিতীয়ত: অর্জুন! তথাকথিত আত্মীয়তী পরিজনের প্রতি মিথ্যাসক্তির মোহের জন্য তোমাকে এতটাই শোকে সতত নিমজ্জিত করছে (গীতা ২/২)। সে কথা অর্জুন নিজেই গীতার প্রথম অধ্যায়ে খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করেছেন, এও বলেছেন যে এর থেকে ম্ক্তু হওয়া উপায় আমাকে বলুন, আমি আমার কর্তব্য সম্বন্ধে দ্বিধাগ্রস্থ, আমি সম্পূর্ণরূপে আপনার শরণাগত। উত্তরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শিষ্যরূপে অর্জুনকে আত্মতত্ত্বজ্ঞান প্রদান করলেন এবং তিনি বললেন এই শিক্ষা অর্থাৎ আত্মজ্ঞানই তোমাকে মোহরূপ শোকাগার থেকে মুক্ত করবে ‘যজ্জ্ঞা ত্বা ন পুনর্মোমেবং যাস্যসি পাণ্ডব। (গীতা ৪/৩৫)। কেননা তুমি প্রকৃতই উপলব্ধি করবে তোমার ও সমস্ত জীবের প্রকৃত স্বরূপ কি?
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ। (গীতা ১৫/৭) এই জগতে সমস্ত জীবই আমার সনাতন বিভিন্নাংশ কিন্তু জড়া প্রকৃতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তারা বেঁচে থাকার জন্য কঠোর সংগ্রাম করছে।

তৃতীয়ত: তুমি যে শুধু তোমার স্বরূপ জানতে পারবে তাই নয়, আমাকেও স্বরূপত জানবে। কেননা আমি প্রকৃতই সমস্ত জীবের প্রতি অত্যন্ত করুণাময় কেননা আমি হচ্ছি প্রত্যেক জীবের আসল পিতা। তাসাং ব্রহ্ম মহদ্যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা ॥ (গীতা ১৪/৪)। তাই সন্তানদের আমার ধামে ফিরিয়ে আনার জন্যই এই ধরাধামে জন্ম ও লীলা বিলাস, এই সমস্ত তত্ত্ব তুমি যদি যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পার, তাহলে তুমি আমার নিত্য ধাম লাভ করতে সক্ষম হবে।

জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্তা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি ‘সোহর্জুন ॥
(গীতা ৪/৯)

চতুর্থত: অতি সুদক্ষ সাঁতারু যেমন সাঁতার কেটে সমুদ্র পার হতে পারে না, তেমনি জড় জগতে জীবন সংগ্রাম দুরতিক্রম্য। মাঝসমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে যে মানুষ, তার উদ্বারের একমাত্র উপায় হলো যদি কেউ এসে তাকে তুলে নেয়, তেমনি হে অর্জুন এই দুরন্ত ভবসমুদ্র থেকে উদ্ধারের জন্য এই ভগবদ্গীতার জ্ঞানরূপ তরণীতে আরোহন করো তাহলেই তুমি এই দুঃখ সমুদ্র অবশ্যই পার হতে সক্ষম হবে। –সর্বং জ্ঞানপ্লবেনৈব বৃজিনং সন্তরিষ্যসি’। (গীতা ৪/৩৬)

পঞ্চমত: বলা যেতে পারে ভগবদ্গীতার ৮ম অধ্যায়ে ভগবান বলেছেন, আমাদের ভোগ বাসনা ও অন্তিম কালীন চিন্তাই আমাদের বিভিন্ন প্রকার শরীর ধারণ করতে বাধ্য করা হয়।

যং যং বাপি স্মরণ্ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্।
তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ ॥
(গীতা ৮/৬)।

কিন্তু এই শরীরে আমরা যদি এই শিক্ষা ও ভক্তিযোগের অনুশীলন করি তাহলে আমরা আমাদের চেতনা শুদ্ধ করতে পারি।

তস্মাৎ সর্ব্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুধ্য চ।
ময্যার্পিতমনোবুদ্ধির্মামেবৈষ্যস্যসংশয়ঃ ॥
(গীতা ৮/৭)

অর্থাৎ সর্বদা শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণে রেখে যদি আমরা আমাদের কর্তব্যকর্মে যুক্ত থাকি তাহলে আমাদের চেতনা কলূষমুক্ত হয়ে ভগবৎ চরণে যুক্ত হবে এবং অন্তিমে অর্থাৎ মৃত্যুর সময় যদি আমাকে স্মরণ করে মৃত্যুবরণ করার কৌশলটি আয়ত্ব করে নিতে পার তাহলে তুমি অবশ্যই কলুষময় জীবন পরিত্যাগ করে আমার কাছে আসবে। তোমার প্রতি আমার এই প্রতিশ্রুতিতে তুমি সন্দেহ করো না। ÑÑ অন্তকালে চ মামেব স্মরন্মুক্ত¦া কলেবরম্। যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যতি নাস্ত্যত্র সংশয় ॥ (গীতা ৮/৫)

ষষ্ঠত: বলা যেতে পারে ভোগবাদী লোকেরা প্রায়ই প্রশ্ন করে, কেবল হরিভজনা কি আমাদের জীবনের খাদ্য দ্রব্যের সমাধান করে দিতে পারে? আমাদের অবশ্যই কর্ম করতে হবে। পিতা যেমন সন্তানদের ভরণ পোষণাদির চিন্তা করেন ঠিক তেমনি পরমপিতা জীব সৃষ্টির সাথে সাথে জীবের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার সমস্ত সুবন্দোবস্ত করেছেন (গীতা ৩/১৪-১৬)। ভগবান বলছেন যে কর্ম অবশ্যই করতে হবে তবে কর্ম কৌশলটি জানতে হবে। কেবলমাত্র তুমি আমার জন্যই কর্ম করো, তা না হলে এই কর্মই তোমার বন্ধনের মেয়াদ বৃদ্ধি করবে,

যজ্ঞার্থাৎ কর্মনোহন্যত্র লোকহয়ং কর্মবন্ধনঃ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর ॥
(গীতা ৩-৯)

আর অর্জুন! ভক্ত যেহেতু আমার চিন্তায় মগ্ন, আমার সেবায় নিরন্তর যুক্ত তাই সে নিজের ও পরিবারের ভরণ-পোষণ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন, সেহেতু আমি নিজে তার সংসারের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করি। তার প্রয়োজনীয় দ্রব্য সমূহ আমি নিজেই বয়ে নিয়ে যাই। শুধু তাই নয় আমি তার সংরক্ষণও করি-
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে। তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্্ ॥
(গীতা ৯/২২)

সপ্তমত: তাই ভক্তের ভরণ পোষণের কোন সমস্যাই থাকে না। হে অর্জুন! আমার নাম, গুণ কীর্তন ও অনুস্মরণে আমার সান্নিধ্য লাভ করার ফলে ভক্ত দিব্য আনন্দ আস্বাদন করেন-

মচ্চিত্তা মদ্‌গতপ্রানা বোধয়ন্ত পরস্পরম্।
কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যং তুষ্যান্তি চ রমন্তি চ ॥
(গীতা ১০/৯)

অষ্টমত: অর্থাৎ ভক্তের ইহ জীবনে কোন প্রকার অভাব থাকবে না পরন্তু ভগবানের বিশেষ প্রতিশ্রুতি হলো পরবর্তী জীবনে তোমাকে আমার ধামে আমরা সান্নিধ্যে নিয়ে আসব। যেখানে অক্ষয়, অনন্ত সুখ ও আনন্দময় জীবন প্রাপ্ত হবে-

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো
মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি যুক্তৈ
মাত্মানং মৎপরায়ণঃ ॥
(গীতা ৯/৩৪)

নবমত: আমার সেই অপ্রাকৃত ধাম দিব্যজ্যোতিতে উদ্ভাসিত। সেই ধামে উত্তীর্ণ ভক্তকে আর এই দুঃখময় জগতে ফিরে আসতে হয় না-

ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো
ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ।
যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে
তদ্ধাম পরমং মম ॥
(গীতা ১৫/৬)।

কেননা তা হচ্ছে জীবের প্রকৃত আলয় (বাড়ি)। দুর্বৃত্ত সন্তান পিতাকে ভুল থাকতে পারে কিন্তু প্রকৃত পিতা সন্তানের এই দুঃখ সহ্য করতে পারেন না তাই তিনি কতভাবে তাঁর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। ভক্তিযোগ অধ্যায়ে বলতে বলতে তিনি কতটাই নিজে আমাদের জন্য সুুলভ করে দিয়েছেন। হে অর্জুন! যারা সমস্ত কর্ম সমর্পণ করে, মৎপরায়ণ হয়ে অনণ্য ভক্তিযোগের দ্বারা আমার ধ্যান উপাসনা করেন, সেই আবিষ্টচিত্ত ভক্তকে আমি মৃত্যুময় সংসার থেকে উদ্ধার করি (গীতা ১২/৬,৭)-

যে তু সর্বানিকর্মাণি
ময়ি সংন্যস্য মৎপরা।
অনন্যেনৈব যোগেন
মাং ধ্যায়ন্ত উপাসতে ॥
তেষামহং সমুদ্ধর্তা
মৃত্যুসংসারসাগরাৎ।
ঋবামি ন চিরাৎ পার্থ
ময্যাবেশিতচেতসাম্ ॥

এতটা সম্ভবপবনা হলে অর্জুন অভ্যাস যোগ অনুশীলন কর। তাও যদি না পার আমার জন্য কর্ম কর, না হলে তুমি তোমার কর্মের ফল আমাকে প্রদান কর (গীতা ১২/৯-১১)। অর্থাৎ আমাতে সর্বতোভাবে আশ্রয় কর, আমি তোমাকে বুদ্ধি প্রদান করে তোমাকে পথ দেখাব-

‘তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্।
দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মামুপযান্তি তে ॥’  (১০/১০)

যাতে তুমি জীবনের সমস্ত প্রকার সিদ্ধি লাভ করতে পারবে।

দশমত: সুতরাং জাগতিক ও পারমার্থিক উভয় বিচারেই আমরা দেখি যে ভগবদ্গীতায় এই ভগদ্বাক্যে যদি আমরা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি তাহলে অবশ্যই আমরা উভয়দিকেই সুফল অর্জন করতে পারব। কেননা শ্রদ্ধাবানই কেবলমাত্র এই সমস্ত প্রাপ্তির অধিকারী-

শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানং তৎপরঃ সংযতেন্দ্রিয়ঃ।
জ্ঞানং লব্ধা পরাং শান্তিমচিরেণাধিগচ্ছতি ॥
(গীতা ৮/৩৯)

একাদশত: ভগবান স্বরাট পুরুষ, তিনি সবকিছুতেই সমর্থ একথা তিনি গীতায় বহুস্থানে ব্যক্ত করেছেন। পরন্তু এত কিছু বলা সত্ত্বেও যদি আমরা সন্দেহ বা ভগবদ্ধাক্যে অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি তাহলে আমরা ইহলোকেও ও পরলোকে সুখ বা শান্তি লাভে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হব।
‘অজ্ঞশ্চাশ্রদ্ধধানশ্চ সংশয়াত্মাঃ ॥’ (গীতা ৪/৪০) শুধু তাই নয় তারা বার বার এই মুত্যুময় জগতে অধঃপতিত হয়ে দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে। ‘অপ্রাপ্যমাং নিবর্তন্তে মৃত্যুসংসারবর্ত্মনি।’ (গীতা ৯/৩)
প্রতিটি ব্যক্তিই ভগবদ্গীতর জ্ঞানের সংস্পর্শে অর্থাৎ ভগবানের সংস্পর্শে আসার ফলে অচিরেই শুদ্ধ হয়ে ওঠে। সে প্রতিশ্রুতির কথা বলতে গিয়ে ভগবান (গীতা ৯/৩০) ব্যক্ত করেছেন– ‘অপিচেৎ সুদুরোচারো ভজতে মামনন্যভাক্। সাধুরের স মন্তব্যঃ সম্যগ ব্যবসিতো হি সঃ ॥ ভগবান বলছেন, অতি দুরাচারী ব্যক্তিও যদি অনন্যভক্তি সহকারে আমাকে ভজনা করেন, তাহলেও তাকে সাধু বলে সম্মান করবে। কারণ তাঁর দৃঢ় সংকল্পের জন্য তিনি যথার্থ মার্গে অবস্থিত। ভগবানের সংস্পর্শে আমার ফলে তিনি ধীরে পবিত্র হয়ে উঠেন কেননা ভগবান হচ্ছেন পরম পবিত্র-
‘পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরং ভবান্্।’ (গীতা ১০/১২)। ভগবান যেহেতু সকল জীবের হৃদয়ে অবস্থান করছেন তাই, জীব যখন ভগবৎ ভজনে উন্মুখ হন তখন ভগবান তার হৃদয় থেকে তাকে অনুপ্রেরণা ও ভগবানের স্বভাবশতঃ তাঁর ক্রিয়াশক্তির দ্বারা শুদ্ধ করে তোলেন।
ইংরেজী ভাষায় ভগবানকে এড়ফ বলে সম্বোধন করা হয়। ‘এ’ অর্থে এবহবৎধঃড়ৎ অর্থাৎ তিনি স্রষ্টা, ‘ঙ’ অর্থে ঙঢ়বৎধঃড়ৎ অর্থাৎ তিনি সৃষ্টিকে পালন করেন আর ‘উ’ অর্থে উবংঃৎড়ুবৎ অর্থাৎ তিনি ধ্বংস করেন।
তাঁর এই ক্রিয়াশক্তি দ্বারা তিনি ভক্ত হৃদয় থেকে সমস্ত সদ্্গুণের সৃষ্টি বা বিকাশ সাধন করেন। আর পালন অর্থে তিনি ভক্তে সমস্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে পালন করেন। তা আগেই বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। আর ধ্বংস অর্থে তিনি ভক্তের সমস্ত প্রকার কলুষ নাশ করে ভক্তকে শুদ্ধ করে তোলেন। এভাবে করুণাময় ভগবান তাঁর সৃষ্ট জীবকে জড় জগতের দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করার জন্য কতটাই না করেছেন।
এখানে আর একটি বিশেষ উল্লেখ্য যে ভগবান বলেছেন যে, যেহেতু ভক্তের সমস্ত দায়িত্ব আমার সেহেতু আমি নির্দেশ করছি যে, ভজনকারী ব্যক্তির পূর্বের দোষক্রটি বিচার না করে অবশ্যই তাঁকে সাধু বলে সম্বোধন করবেন -‘সাধুরের স মন্তব্যঃ।’ আচার্যগণ এই কথার উপর বহু টীকা দিয়ে সতর্কতা করেছেন যে–এই কথার অবমানা করে আমরা যেন ভগবৎ চরণে অপরাধী না হই। পূর্ববর্তী আচার্যগণ আর এক দৃর্ষ্টিকোণ দিয়ে এই শ্লোকের (গীতা ৯/৩০) আরো বিচার দিয়েছেন।
বিচার এই যে, ভজন- সাধনে যুক্ত ভক্ত পূর্ব অভ্যাসবশতঃ হঠাৎ কোন কারণে যদি দুরাচারী কার্য করে ফেলেন বা দুরাচারী কার্যে যুক্ত হয়ে পড়ে, তাহলেও ভগবান বলছেন যে, সেই ভক্তকে তুমি তাঁর সাধুত্ব সম্মান প্রদান অবশ্যই করবে। ইস্্কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য ও ভগবদ্গীতা যথাযথ গ্রন্থের ভাষ্যকার শ্রীল প্রভুপাদ একটি ছোট উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের এ বিষয়ে স্পষ্টীকরণ করে দিয়েছেন ।
তিনি বলেছেন পাখার ইলেকট্রিক সুইজ অফ করলেও পাখাটি তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায় না। ধীর গতিতে গতিবেগ কমতে কমতে একসময় তা বন্ধ হয়। সেইভাবে ভগবৎ ভজনে যুক্ত ব্যক্তি ক্রমগতিতে দুরাচার কর্ম থেকে মুক্ত। তাছাড়াও ভগবান পরের শ্লোকে (গীতা ৯/৩১) বলছেন–আমিই তাকে ধর্মাত্মার স্তরে উন্নীত করে তুলি-
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি ।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি ॥
হঠাৎ তাঁর এই দুষ্কর্মের জন্য তাঁকে শেষ হয়ে যেতে হয় না । আমি যেহেতু তাঁর রক্ষক, তাই হে অর্জুন তুমি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা কর যে আমার ভক্তের কখনো বিনাশ হয় না। তার দুষ্কর্মের জন্য নরকযন্ত্রণা ভোগ করতে হয় না বা এই জগতের কোন শক্তি দ্বারা তাঁকে শাস্তি ভোগ করতে হয় না।
এখানে আরো উল্লেখ্য যে একথা তিনি নিজে ঘোষণা না করে তাঁর ভক্ত অর্জুনকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন–“অর্জুন তুমি ঘোষণা কর।” কারণ ভক্তের বাক্য বা ভক্তের প্রতিশ্রুতি ভগবান সর্বদা রক্ষা করেন।
ইস্্কন প্রতিষ্ঠাতা আচার্য জগৎগুরু শ্রীল প্রভুপাদ ভগবানের মুখনিঃসৃত এই ভগবদ্বাক্য ভগবদ্গীতাকে সহজ করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই সরল শিক্ষা সারা বিশ্বে প্রায় ১০০টির বেশী ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রচার হচ্ছে। এবং তাঁরই শিক্ষার উপর আধারিত বর্তমান শিক্ষার সাথে উপযোগ করার স্বার্থে ইস্্কন কর্তৃপক্ষ এর উপর একটি পাঠ্যক্রম তৈরী করেছেন।
এই ভগবদ্গীতা স্টাড কোর্সটির মাধ্যমে আপনি পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে অবস্থান করলেও এই শিক্ষাটি আয়ত্ব করতে সক্ষম হবেন এবং আপনার জীবনের সমস্ত প্রয়োজন প্রাপ্ত হবেন ও অন্তিম লক্ষ্য প্রাপ্ত হবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here