গিরিরাজ গোবর্ধনের গুহ্য মহিমা

0
941

 গোবর্ধন পূজা, অন্নকূট মহোৎসব এবং গো-পূজা

এই তিনটি অনুষ্ঠান একই দিনে উদ্‌যাপিত হয়। গোবর্ধন পর্বতের পূজার মাধ্যমে বহুবিধ নৈবেদ্য দিয়ে গোবর্ধন পর্বত’ তৈরি করুন। তারপর সেই প্রসাদ-পর্বতটি পরিক্রমা করুন। তারপর জনে জনে সকলকে এই মহাপ্রসাদ বিতরণ করুন।

“ভক্তগণের মধ্যে এই গোবর্ধন পর্বত শ্রেষ্ঠ । হে সখীগণ , এই পর্বত গোবৎস ,গাভী গোপগণের সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলরামকে পানীয় জল ,অত্যন্ত কোমল ঘাস ,গুহা ,ফল ,ফুল ও শাক-সবজি-সমস্ত রকমের প্রয়োজনীয় দ্রব্যই সরবরাহ করে । এভাবে এ পর্বত ভগবােনকে  শ্রদ্ধা নিবেদন করছে । কৃষ্ণ ও বলরামের চরণপদ্মের স্পর্শ লাভ করার ফলে গোবর্ধন পর্বতকে অত্যন্ত উৎফুল্ল মনে হচ্ছে ।” (শ্রীমদ্ভাগবতম ১০.২১.১৮)

বর্তমান ভারতের মথুরা রাজ্য হতে ২০ কি.মি. পশ্চিমে গোবর্ধন পর্বত  অবস্থিত । এটি ব্রজমন্ডল বৃন্দাবনের অধিক পরিদর্শনীয় স্থান গুলোর একটি । কারণ বর্তমানে ৫০০০ বছর পূর্বের পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাবিলাসের স্থান গুলোর মধ্যে মাত্র তিনটি স্থান অবিকল বর্তমান রয়েছে । সেগুলো হল বৃন্দাবনের ধূলিকণা , যমুুনা নদী এবং গোবর্ধন পর্বত ।

শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঘোষনা করেছেন যে , তিনিই স্বয়ং গিরিরাজ গোবর্ধন। তাই কৃষ্ণভক্তরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে গোবর্ধন পূজা করে থাকেন । যার সূচনা হয়েছে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাধ্যমে । সেই লীলাটি অত্যন্ত দিব্য মনোহরপূর্ণ । বৃন্দাবনে একবার স্বর্গাধিপতি ইন্দ্রের পূজার প্রস্তুতি চলছিল । কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনবাসীদের ইন্দ্রের পরিবর্তে গিরিরাজ গোবর্ধন পূজা করার সুপরামর্শ দিলেন । এতে তারা সম্মত হলেন এবং মহাসমারোহে গোবর্ধনের পূজা ও প্রদক্ষিণ করলেন । কিন্তু এতে দেবরাজ ইন্দ্র রুষ্ট হলেন এবং শ্রীকৃষ্ণকে সাধারণ বালক বলে মনে করে , বৃন্দাবনবাসীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে ভীষন ঝড়বাদলের সৃষ্টি করলেন । কিন্তু বালকরুপী শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনবাসীকে রক্ষার্থে একটি ছোট মাশরুম উত্তোলনের ন্যায় সমগ্র গোবর্ধন উত্তোলন করলেন । অনবরত সাত দিন , সাত রাত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  তাঁর বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল দ্বারা গোবর্ধনকে ধারন করে ছিলেন । এই সাতদিন যাবত বৃন্দাবনবাসী কোন রকম ক্ষুধা তৃষ্ণা অনুভব করলেন না। তারা কেবল অপলক দৃষ্টিতে ছোট কৃষ্ণের গোবর্ধন উত্তোলনের অপূর্ব দৃশ্য অবলোকন  করলেন । তখন থেকেই গোবর্ধন পূজা উৎসব শুরু হয় । যা এখনও সারাবিশ্বব্যাপী পালিত হয় । এছাড়া  গোবর্ধন পর্বতে স্থায়ীভাবে ষড়ঋতুর অবস্থান নেওয়া শুরু হয়।

ব্রজে গোবর্ধনের অাবির্ভাব

গর্গ সংহিতা মতে, সত্যযুগে সোমালি দ্বীপের সন্নিকটে পর্বতরাজ দ্রোণাচল বাস করত । তাঁর পুত্র হলেন গোবর্ধন পর্বত । একবার পুলস্ত্য মুনি দ্রোণাচলের নিকট আসেন । তখন পুলস্ত্য মুনি গোবর্ধনকে দেখে ভাবলেন যে শান্তিপূর্ণ সাধনভজনের জন্য তিনি কাশীতে  (বর্তমান বেনারসী) গোবর্ধনকে  নিয়ে যাবেন । পুলস্ত্য মুনি দ্রোণাচলকে এই প্রস্তাব দিলে অভিশাপের ভয়ে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে মুনির সাথে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দেন। অন্যদিকে গোবর্ধন পবত একটি শর্তে মুনির সাথে যেতে রাজি  হন । শর্তটি হল মুনি তাকে যেখানে প্রথম   রাখবেন গোবর্ধন সেখানেই বিরাজ করবেন এবং অন্যত্র গমন করবেন না । পুলস্ত্য তাতে রাজি হলেন এবং তাঁর যোগশক্তি বলে হাতের তালুতে গোবর্ধন পর্বতকে তুলে কাশীর উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করলেন । কিন্তু নিত্য ধাম ব্রজে প্রবেশ করা মাত্রই গোবর্ধনের মনে কৃষ্ণ বিরহ উৎপত্তি হল এবং  তিনি অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠলেন । পুলস্ত্য কোন প্রকারেই তাকে বহন করতে না পেরে অগ্যতা সেখানেই তাঁকে রাখলেন। এরপর পুলস্ত্য স্নান, আহার ও বিশ্রাম সম্পন্ন করে পুনরায়  গোবর্ধনকে তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও তুলতে পারলেন না। গোবর্ধন সেই স্থান । গোবর্ধন সেই স্থান পরিত্যাগ্য করতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করল।

এতে পুলস্ত্য মুনি রেগে গিয়ে গোবর্ধনকে  অভিশাপ দিলেন যে, প্রতিদিন গোবর্ধনের আকৃতি থেকে তিলবৃক্ষের (সরিষা) বীজসম অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। কৃষ্ণলীলা সন্নিকটে বুঝতে পেরে গোবর্ধন এই অভিশাপ মাথা পেতে নিলেন। তখন থেকেই কৃষ্ণ বিরহে ও ঋষির অভিশাপের কারণে গোবর্ধন প্রতিদিন হ্রাস প্রাপ্ত হচ্ছে। সেই সময় গোবর্ধনের আকৃতি ছিল দৈর্ঘ্য-১১৫ কি.মি (৬৪ মাইল) বিস্তৃত, ৭২ কি.মি (৪০ মাইল)। এবং উচ্চতা ২৯ কি.মি. (১৬ মাইল)। বর্তমানে গোবদ্ধনের উচ্চতা মাত্র ২৫ মিটার এবং বিস্তৃতি ২৯ কি.মি. (১৬ মাইল)। 

আদি বরাহপুরাণ অনুসারে, পরবর্তীতে ত্রেতাযুগে লঙ্কায় গমনের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র বানরগণ সেতু নির্মাণ করছিলেন। ভক্তশ্রেষ্ঠ হনুমান রামচন্দ্রের নির্দেশে সেতু নির্মাণের উদ্দেশ্য গোবর্ধনের নিকট গমন করেন। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সেবার উদ্দেশ্যে গিরিরাজ তৎক্ষনাৎ হনুমানের সাথে গমন করতে সম্মত হন। কিন্তু সেতুর সন্নিকটে পৌঁছানোর পূর্বেই দৈববাণী ধ্বনিত হয় যে, “সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং আর কোন পাথরের প্রয়োজন নেই।” দৈববাণী শ্রবণ করে হনুমান ব্যথিত হন এবং গোবর্ধনকে স্ব-স্থানে রেখে আসেন। এতে গিরিরাজ অসুখী হলেন এবং বললেন, “তুমি আমাকে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের চরণকলের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করেছে”। গিরিরাজ তৎক্ষণাৎ অভিশাপ দিতে উদ্যত হলেন। হনুমান ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। গিরিরাজের কষ্ট উপলদ্ধি করে শ্রীরামচন্দ্র তৎক্ষণাৎ ঘোষণা করলেন” এই সকল সেতুর পাথরগুলো আমার চরণপদ্মের স্পর্শ লাভ করছে। হে গোবর্ধন, দ্বাপর যুগের শেষে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং অবতীর্ণ হয়ে তোমার নিকটে সখাপরিবৃষ্ট হয়ে খেলায় মত্ত হবেন এবং হাতের স্পর্শে তোমাকে উত্তোলনের মাধ্যমে ইন্দ্রদর্প চূর্ণ করবেন, তোমার পূজা আরম্ভ করবেন এবং কলিযুগে তোমার আরাধনায় ভক্তরা দিব্য প্রেমভক্তি লাভ করবে।”

গোবর্ধনের আকৃতি

গোবর্ধনের আকৃতি ময়ূরের মতো। রাধাকুণ্ড ও শ্যামকুণ্ড হচ্ছে তাঁর চোখ। ডানঘাটি ও মানসীগঙ্গ হচ্ছে তাঁর দীর্ঘ গলদেশ। মুখারবিন্দ স্থান হচ্ছে তাঁর মুখ। কুসুম সরোবর হচ্ছে তাঁর মুখমণ্ডল এবং পুনচেরী হচ্ছে তাঁর পিঠ এবং লেজের পালক।  

আশা করি আপনারা সকলে গোবর্ধন পূজা ও অন্নকূট উৎসবে অংশগ্রহণ করে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বিশেষ কৃপা প্রাপ্ত হবেন।

দ্রষ্টব্য: ১১/১১/২০১৮ রবিবার শ্রীশ্রী রাধামাধব মন্দির (নন্দনকানন, চট্টগ্রাম) ও ইস্‌কন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দির (পাঁচলাইশ, চট্টগ্রাম) অন্নকূট মহোৎসব অনুষ্ঠিত হবে এতে আপনারা সকলেই নিমন্ত্রিত।


(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত)

এরকম চমৎকার ও শিক্ষণীয় প্রবন্ধ পড়তে চোখ রাখুন ‘চৈতন্য সন্দেশ’‘ব্যাক টু গডহেড’

যোগাযোগ: ০১৮৩৮-১৪৪৬৯৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here