গিরিবরধারী গোপাল

0
32

সনাতনগোপাল দাস ব্রহ্মচারী: কার্তিক মাসের অমাবস্যার পরদিন শুক্লা প্রতিপদে ইন্দ্ৰযজ্ঞ বাদ দিয়ে ব্রজবাসীরা গোবর্ধন পূজা করেছিলেন । সেই কথা চর মুখে শুনে স্বর্গরাজ ইন্দ্র অত্যন্ত কৃপিত হয়ে সাম্বতক মেঘকে ডেকে বৃন্দাবন জল প্লাবিত করে প্রলয় ঘটাতে চাইলেন। প্রচণ্ড বাদলা ও বন্যায় ব্রজের মানুষ, পশুপাখী সবাই অস্থির হয়ে উঠলে সাত বছরের বালক কৃষ্ণ গিরিরাজ গোবর্ধনকে ছাতার মতো করে বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে তুলে ধরলেন।
তৃতীয়া থেকে শুরু করে নবমী তিথি পর্যন্ত সাতদিন, সাতরাত গোবর্ধন পর্বত ধরে থাকলেন। গবাদি পশুসহ, খাদ্য শস্যাদি সহ ব্রজবাসীরা পর্বতের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দশমীতে বন্যার জল সরে যায়। ব্রজবাসীরা কৃষ্ণের নির্দেশে পর্বতের নিচ থেকে বাইরে বেরিয়ে বাড়ির দিকে যেতে লাগলেন।
তারা অনেকেই নন্দ মহারাজকে ঘিরে বলতে লাগলেন, হে ব্রজরাজ, কী রকম অদ্ভুত ঘটনা! আপনার পুত্র কৃষ্ণ এক আশ্চর্যজনক বালক। কেমন ভাবে বিশাল পর্বতটিকে সে ধরেছিল। কিছুতেই তার ভার বোধ হচ্ছিল না। পর্বতের ভেতরে বৃষ্টির ছটাও ছিল না, বন্যায় জলও ঢোকেনি। প্রত্যেক ব্যক্তিই আপনার পুত্রের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত। আমরা কেউই কিছুতেই আপনার পুত্রকে ছেড়ে থাকতে পারি না। হে ব্রজরাজ, আপনার পুত্রেরও আমাদের সবার প্রতি অনুরাগ রয়েছে। আমাদের সবার উপরে তার অতিশয় অনুরাগ আছে। সেই কথা কখনও ভুলবার নয়। অবিরাম একটানা নিরবচ্ছিন্নভাবে আমরা তার কথা স্মরণ করতে করতে আমাদের কোনও ভাষা, কোনও যুক্তি, কোন কথা, কিছুই স্থির করতে পারছি না। আমরা এখন কেবল ‘হে কৃষ্ণ, হে গিরিধারী, হে দয়াময়’ বলেই গান করছি। আচ্ছা, বলুন তো, হে ব্রজরাজ, আপনার পুত্র সম্বন্ধে আপনার কি ধারণা?
তাদের নম্রভাব বিনয়ী কথাবার্তা শুনে নন্দ মহারাজের আনন্দ হলো। তিনি বলতে লাগলেন, হে গোপগণ, আমার কথা শোনো। মহামুনি গগাচার্য ওই শিশুর নামকরণের সময় কয়েকটি উপদেশ দিয়ে প্রস্থান করেছিলেন। তখন আমি জানতে পেরেছি যে, এই শিশু নারায়ণী শক্তি দিয়ে অদ্ভুত কাজ করতে পারবে।
এই কথা যখন চলছিল তখন কৃষ্ণ, বলরাম ও তাদের সাথী ছেলেরা সেখানে এসে পৌঁছল । অমনি অন্যান্য ব্রজবাসী সব লোক দলে দলে এসে সেখানে সমবেত হলো। তাদের সবার হাতে সাদা, হলুদ, নীল প্রভৃতি রঙের চওড়া বস্ত্র, দামী দামী গয়না প্রভৃতি। সেই সমস্ত পোশাক ও গয়না দিয়ে তারা কৃষ্ণকে, বলরামকে, নন্দ মহারাজকে সাজাতে লাগলেন। ঘরের মধ্যে সমস্ত মহিলারা এসে যশোদাকে, রোহিণীদেবীকে শাড়ি প্রভৃতি পোশাক এবং গয়না দিয়ে সাজিয়ে দিতে লাগলেন। এভাবে বাইরে ও ঘরে সমানভাবে মহোৎসব চলতে লাগলো। সকলে বালক কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিয়ে তাঁকে ঘিরে নৃত্য ও গান করতে লাগলেন-

জয় জয় নন্দ-যশোদা দুলাল
গিরিবরধারী গোপাল ৷৷

অপরদিকে স্বর্গরাজ ইন্দ্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে স্বর্গে গিয়ে আর রাজসভায় বসলেন না। পত্নী শচীদেবীর কাছেও থাকলেন না। কোনও দেবসভাতেও গেলেন না। দুঃখিত চিত্তে একাকী এক নির্জন স্থানে গিয়ে বসেছিলেন। দেবগুরু বৃহস্পতি লক্ষ্য করলেন ইন্দ্রের করুণ দশা। যেন তিনি বাঁচতে ইচ্ছা করছেন না। অবশ্য ভগবানের বিরুদ্ধে দেবরাজ ইন্দ্র যে সমস্ত কাজ করেছেন, তাতে দেবগুরু বৃহস্পতিরও অপমান করা হয়েছে, সেজন্য বৃহস্পতি বিষণ্নমনা ইন্দ্রের কাছে গিয়ে নির্জনে তিরস্কার করতে লাগলেন।
বৃহস্পতি বললেন, হে ইন্দ্র! তুমি শ্রীহরিকে ভজনা করছ না, সেই জন্যই তোমার উন্নতি হবে না। দেখো, এই সমস্ত বৃক্ষলতা চন্দ্ৰ বিনা জীবনীশক্তি লাভ করতে পারে না। সেই রকম সুন্দরভাবে থাকতে হলে শ্রীহরির কৃপা প্রয়োজন। তুমি সহস্ৰলোচন বটে। কিন্তু ভালো কিছু দেখতে পাও না। তুমি মদমত্ত লোকের মতো অভিভূত হয়ে কি সমস্ত উল্টাপাল্টা কর্ম করলে। কারণ, তুমি সুরেশ। সুর+ঈশ- দেবতাদের ঈশ্বর। আবার সুরা+ঈশ – সুরার ঈশ্বর। সুরাপানে মত্ততা অসম্ভব নয়। তুমি অমৃতপতা, অমৃতপান করেছিলে । কিন্তু কিভাবে মৃতপতা হলে, মৃতদেহ রক্ষক চণ্ডাল ভাব গ্রহণ করলে? যে ব্যক্তি সজ্জনগণের ভয়দাতা এবং যে ব্যক্তি মৃতদেহ আলিঙ্গন করে থাকে তারা অস্পৃশ্য। হে পুঙ্গব, এও তোমার আচরণে ঘটেছে। ভগবানের বিরুদ্ধ আচরণ করেই তুমি উন্মত্ত বলে কথিত হয়েছ।
বৃহস্পতির তিরস্কার বাক্য শুনে ইন্দ্র বললেন, আমি বিচার না করেই এইরকম কাজ করেছি। কিন্তু আপনি এখন যোগ্য বিষয়ের উপদেশ দিন। বৃহস্পতি বললেন, হে ইন্দ্ৰ! এখন এসমস্ত বৈষম্য ঘটলে কেবল ব্রহ্মাই ধৈর্য সম্পাদন করবেন। তাই তাঁর অনুসরণ করাই তোমার একমাত্র উপায় দেখছি।
ইন্দ্র ব্রহ্মার কাছে গিয়ে দুঃখিত চিত্তে অসংকোচ নিজের অপরাধের কথা বললেন। ব্রহ্মা বললেন, হে ইন্দ্ৰ, তুমি দেবতা ও পণ্ডিতদের অধিপতি হয়েও তুমি অজ্ঞের মতো অতিযত্ন সাধ্য গুরুতর অপরাধ করেছ, যা অমার্জনীয়। তবুও সৃষ্টি বিধান ইচ্ছা বিষয়ে আমার বিধান থাকাতে একটা উপদেশ দিচ্ছি। তুমি নিত্য গাভীদেরকে খাবার দিবে, তাদের গলা চুলকিয়ে দেবে এবং প্রদক্ষিণ করবে। গাভীরা প্রসন্ন হলে গোপালও প্রসন্ন হয়ে থাকেন।
তারপর দেবরাজ ইন্দ্র স্বয়ং গাভীদের সেবা করতে লাগলেন। বিশেষত গো-জাতির মাতা সুরভীর সেবায় নিযুক্ত হলেন।
প্রাচীন ব্যক্তিরা বলেন, যে সমাজে গো জাতির রক্ষণাবেক্ষণ সুষ্ঠুভাবে হয় না, যে সমাজে ভক্তদের মর্যাদা লঙ্গন করা হয়, সেই সমাজ শান্তি ও স্বস্তি বর্জিত হয়, আর কোনো না কোনো দুর্বুদ্ধির আমদানী হয়। হয়তো বা সেই জন্য শ্রীভগবানের প্রণাম মন্ত্র এভাবে উল্লেখিত আছে-

নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গোব্রাহ্মণ হিতায় চ।
জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ ৷৷

ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি সম্পন্ন ব্যক্তিদের আরাধ্যদেব, গাভী, ব্রাহ্মণদের হিতকারী, এবং জগতে কল্যাণকারী শ্রীকৃষ্ণকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নিবেদন করি। শ্রীকৃষ্ণ ও গোবিন্দ নামে পরিচিত সেই পরমেশ্বর ভগবানকে আমি বারংবার প্রণাম করি।


 

নভেম্বর ২০১৮ মাসিক চৈতন্য-সন্দেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here