কে ভগবানকে বাঁধতে পারে?

0
1007

ড. প্রেমাঞ্জন দাস:  শিশু কৃষ্ণ একদিন এক গোপীর ঘরে মাখন চুরি করতে গেল। টের পেয়ে সেই গোপী চুপিসারে এসে অকস্মাৎ কৃষ্ণের হাত চেপে ধরল। “আজ ধরেছি চোর– একেবারে হাতে নাতে”– চোর ধরার আনন্দে গোপীর মুখ থেকে খই ফুটতে লাগল, “কতদিন কতজন মিলে যশোদাকে নালিশ করেছি যে, তোমার ছেলে দিনকে দিন পেশাদার চোর হয়ে উঠছে। কিন্তু পুত্র স্নেহে অন্ধ যশোদার বিশ্বাসই হয় না যে তার ছেলে আদৌ চুরি করতে পারে। আজ বহু প্রতীক্ষার পর তোকে ধরলাম, একেবারে হাতে নাতে। চল এক্ষুনি, চল তোর মার কাছে”– এই বলে গোপী কৃষ্ণের হাত ধরে টানা হ্যাঁচরা লাগল। কৃষ্ণ কিছুতেই মার কাছে যাবে না। আর গোপী কিছুতেই প্রমাণ না করবে ছাড়বে না। কৃষ্ণের হাত ধরে টানতে টানতে গোগী গিয়ে উঠল যশোদার ঘরের সামনে। শুরু করল চিৎকার চেঁচামেছি। যশোদা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে না আসতেই শিশু কৃষ্ণ তার রূপ পরিবর্তন করে সেই গোপীর ছেলের রূপ ধারণ করল। কালো কৃষ্ণ ফর্সা হয়ে গেল। গোপীর ছেলে দেখতে যেমনটি, ষোল আনা সেই রূপ ধারণ করল। যশোদা ঘর থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করল; “কী হল, এত চিঃকার করছ কেন?” গোপী উত্তর দিল–“এই যে তোমার ছেলে, আজ একেবারে হাতে নাতে ধরেছি–আমার বাড়িতে মাখন চুরি করছিল।” যশোদা: এ যে দেখছি তোমার ছেলে। আমার ছেলে কৃষ্ণ তো ঐ বসে আছে বারান্দায়। ঐ দেখো খেলছে।
গোপী যেন আকাশ থেকে পড়ল। এ কি করে সম্ভব! সত্যিই তো! ঐ যে কৃষ্ণ বারান্দায় বসে খেলছে! আর আমি তো আমার ছেলেকেই ধরে আছি। কী করে কী হল? হায় কী হল? হায় কী হল? যশোদা তখন তাকে পাল্টা বকে দিলেন। তোমার ছেলে যখন চুরি করে, তখনও তোমরা কৃষ্ণকে দোষী কর। কৃষ্ণকে দোষী করতে করতে তোমাদের কৃষ্ণ রোগ হয়ে গেছে। গোপী কোনও মতে যশোদার কাছে ক্ষমা চেয়ে সেদিনের মত ছেলেকে কাঁধে করে বাড়ি ফিরতে শুরু করল। এদিকে কিছুদূর যেতে না যেতেই শিশু কৃষ্ণ পুনরায় নিজের রূর ধারণ করে সেই গোপীর মাথায় বাজনা বাজিয়ে ডাকতে লাগলঃ দ্যাখ, দ্যাখ। গোপী উপরের দিকে চোখ ঘুরাতেই দেখল, কই গেল তার ছেলে–এ যে দেখছি কৃষ্ণ। সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণকে মাটিতে নামিয়ে গোপী থ হয়ে মাটিতে বসে পড়ল। কৃষ্ণ বললঃ আর কোনও দিন যাবে মার কাছে নালিশ করতে? আজ তো তোমার ছেলে হয়ে দেখালাম। আবার যদি এরকম নালিশ করতে যাও, তো তোমার স্বামী হয়ে দেখাব। খবরদার!
আচ্ছা শিক্ষা পেল সেই গোপী। কৃষ্ণকে ধরা কি এতই সহজ!
আর একদিনের ঘটনা। আর একজন গোপী টের পেল কৃষ্ণ মাখন চুরি করতে এসেছে। বড়ই দক্ষতার সঙ্গে গোপী ধরে ফেলল শিশু কৃষ্ণকে। এক গাদা দড়ি নিয়ে এল কৃষ্ণকে বাঁধতে। ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্ঠা করেও সে কৃকে বাঁধতে পারল না। কৃষ্ণ খুব মিষ্টি করে বলতে লাগলঃ “তুমি জানই না কী করে আমাকে বাঁধতে হয়। চল, তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছি।”
গোপী যেই না সরল মনে শিখতে চাইল, কৃষ্ণ মুহুর্তের মধ্যে সেই গোপীকে দড়ি দিয়ে বেশ শক্ত করে ঘরের একটি থামের সঙ্গে বেঁধে ফেলল। “এবার তুমি থাক এখানে । আমি তাহলে আসি।” –বলেই কৃষ্ণ দৌড়ে চলে গেল। গোপী রইল তাঁর নিজের ঘরে বন্দী হয়ে। কৃষ্ণকে বাঁধা কি এতই সহজ?
আসলে কৃষ্ণের অনুমতি ছাড়া কেউ কৃষ্ণকে বাঁধতে পারে না। দুর্যোধন বহু চেষ্টা করেও কৃষ্ণকে বাঁধতে পারেনি। প্রেম পর্যাপ্ত না হলে কৃষ্ণকে বাঁধা যায় না। এবার শোনা যাক, মা যশোদা কী করে কৃষ্ণকে বাঁধলেন।
একসময় মা যশোদা উনুনে দুধ জ্বাল দিতে বসিয়ে কৃষ্ণকে তাঁর বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। কৃষ্ণলীলার সঙ্গে সংযুক্ত সবকিছু চিন্ময়। তাই সেই উনুনের দুধটাও চিল চিন্ময়। উনুনে বসানো দুধটা ভাবতে লাগল, কৃষ্ণ যদি মা যশোদার বুকের দুধ খেয়ে তৃপ্ত হয়ে যায়, তাহলে আমার অস্তিত্বের কী মূল্য রইল? যদি কৃষ্ণ সেবায় না-ই লাগতে পারলাম, তো আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া বরং ভাল–এরকম ভাবতে ভাবতে অভিমানী দুধটা উনুন থেকে উতলে পড়তে শুরু করল। মা যশোদা ভাবল, “আমার বুকের দুধ কৃষ্ণের স্বাস্থ্য রক্ষার পক্ষের যথেষ্ট নয়। তাই উনুনের দুধটা যদি কৃষ্ণের উথলে পড়ে যায়, তাহলে সে খাবেটা কি। তাই মা যশোদা অকস্মাৎ কৃষ্ণকে কোল থেকে নামিয়ে উনুনের দুধটা বাঁচাতে দৌড়ে গেল। এদিকে কৃষ্ণ একজন সাধারণ শিশুর মত রেগে উঠল–কেন মা আমাকে এরকম অবহেলা করল। রাগ ধরতে না পেরে কৃষ্ণ একটি শিলনোড়া হাতে নিয়ে একটি দৈ-এর পাত্রে আঘাত করল। পাত্র ভেঙে দৈ গড়িয়ে পড়ল চারদিকে। মুহুর্তের মধ্যেই কৃষ্ণ বুঝতে পারল যে মা এসে বকা দিবে। সে দৌড়ে পালিয়ে গেল। অন্য একটি অন্ধকার ঘরে বসে পুরনো মাখনের পাত্র খুলে কিচু পুরনো মাখন খেতে শুরু করল এবং বানরদের মধ্যেও বিতরণ করতে শুরু করল। গোটা ব্যাপারটাই ছিল প্রেমের অভিমান: “মা, তুমি আমাকে বুকের দুধ খেতে দাও নি, তাই আমি নষ্ট মাখন খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ব। তখন বুঝবে মজাটা। আমাকে বুকের দুধ খেতে না দিলে আমি ঘরের সব মাখন বানরকে বিলিয়ে শেষ করে দেব………….।”
আবার মনে মনে উদ্বেগও রয়েছে। কৃষ্ণ তার চোখ আর কান দিয়ে তীক্ষ্ণ প্রহরা দিতে রাগল, কখন আবার মা চলে আসে আমাকে শাসন করতে। এদিকে মা যশোদাও কৃষ্ণকে খুঁজতে খুঁজতে হাতে একটি লাঠি নিয়ে কৃষ্ণের কাছে চলে এল। শুরু হল দৌড়ের প্রতিযোগিতা। ঐটুকুন দুধের শিশুর সঙ্গে মা যশোদা পেরে উঠল না। দৌড়াতে দৌড়াতে মা যশোদা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। মুখ থেকে ঘাম ঝড়তে রাগল। তা দেখে কৃষ্ণের দয়া হল। পিছন ফিরে তাকাতেই মা যশোদা কৃষ্ণকে ধরে ফেলল।
মার হাতে লাঠি দেখে কৃষ্ণ ভয় পেয়ে গেল। কাঁদতে লাগল। অন্য দিন কৃষ্ণ যখন কাঁদে মা যশোদা আদর করে তার চোখ মুছে দেন। আজ কিন্তু মা আদরও করেননি, চোখও মুছে দেয় নি। কৃষ্ণ ভাবল, মা হয়তো ভুলে গিয়েছে। তাই মাকে তা মনে করানোর জন্য কৃষ্ণ নিজেই নিজের হাতে তার চোখ মুছতে লাগল। কিন্তু তাতেও কাজ হল না। এবার কৃষ্ণ বুঝতে পারল, আজ ব্যাপার গুরুতর।
সে ভয় পেয়ে আরও কাঁদতে লাগল। মা ভাবলেন, অতিরিক্ত ভয় শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। তাই তিনি তার হাতের লাঠিটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তিনি কৃষ্ণকে বকতে লাগলেন–বানরদের সঙ্গে ভাব করে করে তুইও বানর হয়ে গেছিস। বনে গিয়ে বাঁনরদের সঙ্গে থাকাই তোর পক্ষে ঠিক হবে…….। পরক্ষনেই মা যশোদা ভাবলেন, হায় হায়, আমি কী বললাম–এখন আমার ছেলে যদি রাগ করে বনে চলে যায়। এদিকে গৃহস্থলীর কাজও পড়ে রয়েছে অনেক। মা যশোদা তাই ভাবলেন, কষ্ণকে এবার দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখব। প্রচণ্ড ভারী এক উদুখলের সঙ্গে কৃষ্ণকে বাঁধার জন্য মা যশোদা চেষ্টা করতে লাগলেন। একহাতে কৃষ্ণকে ধরে রেখে তিনি অনেক দড়ি নিয়ে এলেন। একটা শিশুর কোমড় আর কত বড়! কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, অনেক লম্বা দড়ি দিয়েও কৃষ্ণকে বাঁধা গেল না। দড়িটা কেমন করে যেন দুই আঙুল ছোট হয়ে গেল। দেখতে দেখতে অনেক গোপীদের ভীড় হয়ে গেল। সবাই মজা করে কৃষ্ণের অসহায় অবস্থা আস্বাদন করতে লাগল এবং নানা জায়গা থেকে দড়ি সংগ্রহ করে মা যশোদার হাতে অনেক অনেক দড়ি তুলে দিতে লাগল। কৃষ্ণের কোমড় কিন্তু যেমনটি ছিল, তেমনটিই রয়েছে। একটা বাচ্চার কোমড় যেমনটি হয়। একটুও বড় হয়নি। অতচ আশ্চর্যের ব্যাপার শত শত হাত সুদীর্ঘ দড়ি দিয়েও বাঁধা গেল না সেই অদ্ভুত কোমড়। মা যশোদার জেদ চেপে গেল–কী পেয়েছে এই বাচ্চা? দেখে নেব আজ কত বড় তার কোমড়। কিন্তু হায়! সুদীর্ঘ প্রয়াসের পরও, একের পর এক শত দড়ি সংযোজন করেও সেই দুই আঙ্গুলের ঘাটতি আর গেল না।
অবশেষে যশোদার ক্লান্তি দেখে কৃষ্ণের দয়া হল। অন্তর থেকে অনুমতি দিল মাকে। শোনা যায় সে সময় রাধারাণী সেখানে ছিল। সে তার খোঁপা থেকে ফিতা খুলে মা যশোদার হাতে তুলে দিল। অবশেষে মা যশোদা কৃষ্ণকে বাাঁধতে পাললেন। ভগবানকে বাঁধতে পাললেন। অনন্ত কোটি বছরেও এই অতলান্ত লীলার অন্ত খুঁজে পাবে না কেউ।
নারদ মুনির অভিশাপে কুবেরর দুই পুত্র নন্দ মহারাজের গৃহ প্রাঙ্গণে অর্জুন বৃক্ষ রূপ দেহের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল বহু বছর ধরে। এবার এই দুই বন্দীকে দয়া করলেন বন্দী শ্রীকৃষ্ণ। বন্দী হলে বন্দীর দরদ বোঝা যায়। এ কেমন বন্দী যে অন্যকে মুক্তি দিতে সক্ষম? জগৎবাসী সকলেই আমরা মায়ার বন্ধনে দূর্গার জেলখানায় বন্ধী হয়ে আছি। চলুন সবাই সে বন্ধী শ্রীকৃষ্ণের পূজা করি। স্বয়ং বন্দী অবস্থায় নিশ্চয়ই ভগবান দামোদর আমাদের বন্ধনের জ্বালা বুঝতে পারবেন। দামোদর কথাটির অর্থ হল, যার উদরে দাম (দড়ি) বাঁধা রয়েছে। দুই অর্জুন বৃক্ষের মাঝখান দিয়ে কৃষ্ণ তার উদুখল সহ হামাগুড়ি দিতে লাগল। উদুখল আটকে গেল পাথরের মতো শক্ত সেই দুই অর্জুন বৃক্ষের মাঝখানে। তবে কি দড়ি ছিড়ে যাবে? যশোদার স্নেহের দঢ়ি বেশী শক্ত নাকি অর্জুন গাছের কাঠ বেশী শক্ত? মড় মড় করে ভেঙে পড়ল সেই প্রচণ্ড শক্ত দুই অর্জুন গাছ। ভেতর থেকে কুবেরর দুই অভিশপ্ত পুত্র বের হয়ে এল জ্যোতিমৃয় রূপে। বহু প্রার্থনা নিবেদন করে তারা উর্ধ্বলোকে ফিরে গেল। যশোদার বাৎসল্য প্রেমের শক্ত দড়ি বুঝি প্রলয় কালেও ছিঁড়বে না।
কিছুক্ষণ পরে বলরাম এসে কৃষ্ণকে বন্দী দেখে চিৎকার শুরু করল। “আমি সঙ্কর্ষণ, আমি অনন্ত শেষ। আমি সমস্ত অবতারের উৎস। যে আমার ভাইকে বেঁধেছে, তাকে আজ ধ্বংস করে দেব ইত্যাদি। পরে বলরাম যখন বন্ধুদের কাছে শুনল, মা যশোদার কৃষ্ণকে বেঁধেছে, তখন সর্বশক্তিমান বলরাম, দাঁড়া এক্ষুণি তোকেও বাঁধব, দেখাচ্ছি তোর অবতারগিরি…।
সর্বশক্তিমান বলারাম ভয়ে দৌড়াতে লাগল। কৃষ্ণ আর বলরাম দুজনেই কাঁদতে লাগল। এই হচ্ছে ভগবানের একমাত্র দুর্বলতা। সর্বশক্তিমান হওয়া সত্ত্বেও, প্রেমের কাছে কৃষ্ণ বলরাম দুর্বলের থেকেও দুর্বল। প্রেম ছাড়া কৃষ্ণকে দুর্বল করার আর কোনও অস্ত্র নেই। প্রেমের কাছে ভগবান অসহায়। তাই বলা হয়, শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেম কৃষ্ণের থেকেও বড়। হরেকৃষ্ণ!

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ্ পত্রিকা অক্টোবর ২০১৮ প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here