কেমন হওয়া উচিত দূর্গা পূজা?

0
42

লেখক: প্রণয় কুমার নাথ


বর্তমান সময়ে পূজা একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে ভক্তিচর্চার পরিবর্তে চলছে আচারসর্বস্ব সংস্কৃতির চর্চা। তা-ও ভালো হতো যদি সংস্কৃতিটা আদর্শ হতো; কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, তা ক্রমশ খারাপ হতে হতে অপসংস্কৃতির রূপ ধারণ করেছে। পূজা নয়, যেন ডেকোরেশন আর লাইটিং-এর তুমুল প্রতিযোগিতা, উঠতি ছেলেমেয়েদের বিকৃত আনন্দ-উল্লাস। উগ্র শব্দে উগ্র গান চালিয়ে তারা মদ-গাঁজা খেয়ে অশালীন ভঙ্গিতে মায়ের সামনেই নৃত্য করে। যেকোনো সাধারণ ভদ্রলোকও সে নৃত্য দেখে মুখ না লুকিয়ে পারবেন না, তা উপভোগ করা তো দূরের কথা।
অপসংস্কৃতির দ্বারা মোহিত হয়ে বর্তমানে যারা এভাবে মায়ের পূজা করছে, প্রকৃতপক্ষে একে পূজা বলা যায় না। বৈদিক শাস্ত্রে কোথাও এভাবে মায়ের পূজা করার নির্দেশ দেয়া হয়নি। কেউ কি নিজের মায়ের সামনে মদ-গাঁজা খেয়ে এভাবে অশালীন ভঙ্গিতে নৃত্য করতে পারে? যে কারো মা, এমনকি বোনের সামনেও যদি কেউ নেশাগ্রস্ত হয়ে মাতলামি করে, অশালীন ভঙ্গিতে নৃত্য করে, তবে তা কি কেউ সহ্য করবে? তাহলে যিনি জগজ্জননী, তাঁর সামনে কি এমন আচরণ করা যায়. এটা কখনো মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন হতে পারে না। এটা জগন্মাতাকে অপমান করা। অতিথি যদি জানতে পারে যে, তাকে বাড়িতে ডেকে এনে অপমান করা হবে, তবে কি তিনি সেখানে যাবেন?
এমনকি পারিবারিক বা সামাজিকভাবেও ভদ্রপরিবারে এ ধরনের আচরণ শোভনীয় নয়। আর যদি তা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা মন্দির, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই সবাই নির্মল পরিবেশ আশা করেন, সেখানে যদি এধরনের আচরণ করা হয়, তাহলে অবশ্যই তা নিন্দনীয়।
ক’দিন আগে আমাদের সাথে অন্য ধর্মাবলম্বী জনৈক পুলিশ অফিসার পূজা মণ্ডপে কর্তব্যরত অবস্থার অভিজ্ঞতা বলছিলেন, “যখন সকালবেলা দেবীর পূজা হয়, দেবীকে ধূপ-দীপ, ফুল ইত্যাদি দেয়া হয়, তখন আমার মনেও এরকম পবিত্র পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধার উদয় হয়। কিন্তু যখন সন্ধ্যা হতেই লাইটিং আর উগ্র গানের সাথে নাচবাজনা শুরু হয়, তখন এর প্রতি শ্রদ্ধা তো দূরের কথা বরং ঘৃণা হয়।” প্রকৃত সংস্কৃতি চর্চা হলে সবাই সনাতনী সংস্কৃতির
প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, কিন্তু তা বিকৃত হলে, সকলেই ঘৃণা করবে, এটাই স্বাভাবিক।
তাই যদিও শ্রীবিগ্রহের বহু গুণ-মহিমা শাস্ত্রে কীর্তিত হয়েছে, তবু, যদি যথাযভাবে বিগ্রহকে মর্যাদা না দেয়া হয়, তবে সেখানে দেবী অবস্থান করতে পারেন না। মন্ত্রপাঠ করে যতই আহ্বান করা হোক, বিধি মোতাবেক মায়ের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শিত না হলে মা কখনোই মূর্তির মধ্যে অধিষ্ঠান করবেন না।
পূজা প্রকৃতপক্ষে কী?
‘পূজা’ শব্দটি শোনা মাত্রই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে কোনো দেবপ্রতিমা বা ফুল-তুলসী-বিল্বপত্র ও শঙ্খ-ঘন্টা দ্বারা সজ্জিত ধাতবপাত্র, আল্পনা, ঘট অথবা ধূপ-দীপ সমন্বিত আরতির দৃশ্য ইত্যাদি। তখন স্বাভাবিকভাবেই হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও পবিত্রতা অনুভব হয়। কিন্তু বর্তমানে সমাজে পূজা মানে পার্টি, বিনোদন বা উৎসবমাত্র। আবার, কারো কাছে পূজা মানে খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোর আর নতুন পোশাক পড়ে ঘোরাঘুরি, সমাবেশ অথবা আড্ডা দেয়া। প্রকৃতপক্ষে পূজার অর্থ তাদের হৃদয়ঙ্গম হয়নি বলা যায়। পূজার উদ্দেশ্য হলো পূজনীয় ব্যক্তির সন্তুষ্টি বিধান করবে, উপাস্যের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাযুক্ত হবে। বৈদিক সংস্কৃতিতে এমন আয়োজনই স্বীকৃত। তাই পূজা মানে শুধু আচারসর্বস্বতা নয়, সেখানে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও গভীর শ্রদ্ধা-ভক্তির সমন্বয় থাকতে হবে।
আবার, পূজা বলতে কেবলই শ্রীবিগ্রহের উদ্দেশ্যে পুষ্পার্পণ নয়। ‘পূজা’ শব্দের বিভিন্ন আভিধানিক অর্থ, যেমন-অর্চনা, শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা, সম্মাননা বা সংবর্ধনা দেওয়াও বোঝায়, অর্থাৎ শ্রদ্ধাপূর্বক কাউকে সম্মাননা বা সংবর্ধনা দেয়াও পূজা। সন্তান পিতা-মাতাকে, ছাত্র শিক্ষককে, অধঃস্তনও ঊর্ধ্বতনকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। এটাই সভ্য সমাজের নীতি। দেশের পতাকাকে কে সম্মান করে না? যে তা না করে, তাকে সুনাগরিক বলে বিবেচনা করা হয় না। আবার, প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিকে যখন মাল্যদান করা হয় অথবা অন্য যেকোনোভাবে সম্মান প্রদর্শন করা হয়, তাতেও প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির পূজা করা হয়। শহীদদের উদ্দেশ্যে যখন পুষ্পস্তবক অর্পন করা হয়, তাতেও নিশ্চয়ই শহীদদের পূজা হয়। সুতরাং, প্রত্যেকেই কারো না কারো পূজা করছে এবং এভাবে পূজাকে কেউ ঘৃণার চোখে দেখছে না। কেননা, যোগ্যতা বিচারপূর্বক পূজা মহৎ কার্য; আর যে তা না করে, সে অকৃতজ্ঞ। এ কারণে, সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ কৃতজ্ঞতাবশত বিভিন্ন দেবদেবী এবং পরমেশ্বর ভগবান পূজা করে থাকেন।
কেমন হবে পূজা উদ্যাপন?
আধুনিকতার সংস্পর্শে সবাই যে অপসংস্কৃতির চর্চা করছে, তা কিন্তু নয়। এখনো অনেকে রয়েছেন, যাঁরা খুব শুদ্ধতা সহকারে শ্রীবিগ্রহের সেবা করেন।
প্রথমত, শাস্ত্রবিধি অনুসারে দেবীর বিগ্রহ তৈরি করতে হবে এবং সেই সাথে চাই প্রতিমাশিল্পী ও ব্রাহ্মণের শুদ্ধতা এবং সঠিকভাবে মন্ত্রপাঠ। পূজায় জাগতিক হিন্দি বা ইংরেজি গানের পরিবর্তে মায়ের বন্দনামূলক সংগীত বাজানো উচিত। পূজায় সাউন্ড সিস্টেমের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অনুষ্ঠানের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মাকে তাঁর বন্দনা গীতি শোনানো, নিজেরা উগ্রভাবে নৃত্য করা নয়। ডেকোরেশন বা লাইটিং লোকের মনোরঞ্জন বা প্রতিযোগিতার জন্য নয়, মায়ের সন্তুষ্টি বিবেচনা করেই হওয়া উচিত। তাছাড়া পূজার অবশ্যই শুদ্ধ ও সাত্ত্বিক আহারের ব্যবস্থা করা উচিত। মদ্যপান ও সকল প্রকার নেশা বর্জন করা উচিত। অশ্লীন নৃত্য পরিবেশন থেকে বিরত হওয়া উচিত। পূজাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি যেন না হয়, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত এবং প্রত্যেক পূজা কমিটির উচিত মায়ের সেবার গুণগত মান যেন নিশ্চিত হয়, সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকা। এই নৃত্য, গীত, সাজসজ্জা, ভোজন ইত্যাদি বৈদিক সংস্কৃতির অঙ্গ হলেও সবকিছুর উদ্দেশ্য উপাস্যদেবীর সন্তুষ্টিবিধানে হওয়া উচিত। পূজার চাঁদার অর্থ ব্যক্তিস্বার্থে অথবা মদ-মাংসের পেছনে ব্যয় না করে, দেবতার উদ্দেশ্যেই ব্যয় করা উচিত এবং পূজাবিধি আচরণের ক্ষেত্রে কারো মানসিক জল্পনা-কল্পনাকে গুরুত্ব না দিয়ে শাস্ত্রসিদ্ধান্ত অনুযায়ীই সবকিছু করা উচিত। কারণ, শাস্ত্রবিরুদ্ধ কর্ম আসুরিক বলে গণ্য হয়। শাস্ত্রানুযায়ী কলিযুগে যজ্ঞে পশুবলি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যেহেতু পশুকে পুনর্জীবন দান করা সম্ভব হয় না। তাই মাংসাহার, নেশা ইত্যাদি তামসিক আচার সম্পূর্ণরূপে বর্জনপূর্বক শুদ্ধ-সাত্ত্বিকভাবে পূজা উদ্যাপন করা উচিত।
বিধিহীনমসৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনমদক্ষিণম।
শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞ তামসং পরিচক্ষতে॥
তামসিক যজ্ঞ উৎসবগুলো বিধিহীনম্- শাস্ত্রবিধি বর্জিত। অসৃষ্টান্নম- প্রসাদ বিতরণ করা হয় না। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন যে, দেবতারা সন্তুষ্ট হয়েই আমাদের প্রার্থিত বস্তু দান করেন। যার ফলে মানুষ সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন যাপন করতে পারবে। অতএব, পূজাপার্বণে তামসিকতা পরিত্যাগপূর্বক শুদ্ধ-সাত্তিকভাবেই পূজা উদ্যাপন করা উচিত।
মূর্তি বিসর্জন
এ ব্যাপারে শ্রীমদ্ভাগবতে (১১/২৭/১৩-১৪) বলা হয়েছে- “সমস্ত জীবের আশ্রয় ভগবানের বিগ্রহ দুইভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন- ক্ষণস্থায়ী অথবা স্থায়ী। স্থায়ী বিগ্রহকে আহ্বান করে আনার পর তাঁকে আর বিসর্জন দেয়া যায় না। কিন্তু ক্ষনস্থায়ী বিগ্রহকে আহ্বান করা ও বিসর্জন দেয়ার সুযোগ থাকে।” পূজা সাধারণত দুইভাবে হয়ে থাকে। একটি নিত্য পূজা, অন্যটি নৈমিত্তিক পূজা। ভক্তরা ভগবানের বা দেবদেবীর শ্রীবিগ্রহে নিত্য অর্থাৎ প্রতিদিন যে পূজা অর্চনা করেন, তা নিত্যপূজা। আবার, যখন কোনো বিশেষ নিমিত্তে বা তিথিতে ঘটে বা মূর্তিতে দেব-দেবীকে আহ্বান জানানো হয়, তাকে বলা হয় নৈমিত্তিক পূজা। নিত্যসেবার বিগ্রহ কখনো বিসর্জন দেয়া যায় না। কিন্তু নৈমিত্তিক সেবার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তিথি শেষে দেবী ঐ বিগ্রহ থেকে অপ্রকট হন এবং তাঁর বিগ্রহকে জলে বিসর্জন দেয়া হয়। তবে অবশ্যই যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম সহকারে বিসর্জন দেয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here