কেন শ্রীকৃষ্ণ চোখ বন্ধ করেছিল?

0
39

ছোট চেলেমেয়ে হত্যা করার উদ্দেশ্যে খুঁজতে খুঁজতে পুতনা নন্দ মহারাজের গৃহে কোন প্রতিবন্ধবন্ধকতা ছাড়াই প্রবেশ করেছিলেন এবং নন্দ মহারাজের কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি দেখলেন কৃষ্ণ বিছানার উপর শুয়ে আছে, সে অবস্থায় অগ্নি যেমন ধুষ দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে ঠিক তেমনি তাঁর অপরিসীম শক্তিও আচ্ছাদিত ছিল। তাকে দর্শন করা মাত্রই পুতনা বুঝতে পেরেছিলেন শিশুটি সাধারণ কেউ নয় বরং অসুর সংহারের নিমিত্তেই তাঁর আগমন।
শ্রীকৃষ্ণ যিনি পরমাত্মারূপে সর্বত্র বিরাজমান, তিনি সাধারণ মানব শিশুর মতো বিরাজমান, তিনি সাধারণ মানব শিশুর মতো বিছানায় শুয়ে ছিলেন। কৃষ্ণ তখন বুঝতে পেরেছিলেন শিশু হত্যাকারী পুতনা তাঁকে হত্যা করার জন্য এসেছেন। তাই তিনি যেন তার ভয়ে ভীত হয়েছেন এমনভাবে কৃষ্ণ তাঁর চোখ বন্ধ করেছিলেন। পুতনা শিশু কৃষ্ণকে তার কোলে এমনভাবে নিলেন যেরকম একজন মূর্খ ব্যক্তি একটি নিদ্রিত সাপকে দড়ি মনে করে কোলে তুলে নেয়।
শ্রীল জীব গোস্বামী কৃষ্ণের চোখ বন্ধ রাখার তাৎপর্য মন্তব্য করেছেন কয়েকভাবে:
১. তিনি তার মধ্যে চরম শিশুসুলভ ও ভীতিপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেতে চেয়েছিলেন।
২. তিনি এরকম একজন দুষ্ট জীবকে দর্শন করা থেকে বিরত থাকতে চেয়েছিলেন।
৩. তিনি পুতনার বন্ধুসুলভ মায়াবী দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
৪. মাতৃরূপী কাউকে হত্যা করতে এমন ভেবে কৃষ্ণের মধ্যে যে লজ্জ্বা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল তা লুকিযে রাখার জন্য তিনি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। যদিও সেই হত্যা পক্ষান্তরে পুতনার কল্যাণ বয়ে এনেছিল। এর কারণ কৃষ্ণ হলেন সমগ্র সদ্গুণাবলীর আধার।
লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ গ্রন্থের ‘পুতনা বধ’ অধ্যায়ে শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন: “একটি ছোট্ট শিশুর মতো শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চোখ দুটি বন্ধ করলেন, যেন তিনি পুতনার মুখ দর্শন করতে চাইলেন না। ভগবদ্ভক্তরা বিভিন্নভাবে শ্রীকৃষ্ণের এই চোখ বন্ধ করার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন। অনেকে বলে যে, অসংখ্য শিশুঘাতিনী পুতনা যে এখন তাঁকে হত্যা করবার অভিপ্রায় নিয়ে এসেছে, সেই পাপিনী পুতনার মুখ দর্শন করতে চাননি বলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চোখ বন্ধ করেছিলেন।”
ভয়ংকর বিপদজ্জনক সেই রাক্ষসী কৃষ্ণকে কোলে তুলে নিয়ে তার স্তন শ্রীকৃষ্ণের মুখে প্রবেশ করালেন। তার স্তনবৃত্তে মারাত্মক বিষ মাখানো ছিল কিন্তু পরমেশ^র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার প্রতি অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে তার স্তনকে ধরে রেখেছিল এবং দুই হাত দিয়ে শক্তভাবে চেপে রেখেছিল। এভাবে কৃষ্ণ সেই বিষ ও পুতনার প্রাণ দুটিই চুষে নিয়েছিলেন।
শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর তার সারার্থ দর্শিনী গ্রন্থে এ সম্পর্কে ভাষ্য প্রদান করেছেন এভাবে: “পুতনা যে তার বিষ মাখানো স্তনের মাধ্যমে ব্রজের ছেলে-মেয়েদের হত্যার জন্য পরিকল্পনা করেছেন তা জ্ঞাত হয়ে কৃষ্ণ অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন। তাই, কৃষ্ণের সংহার শক্তি পুতনার অপবিত্র প্রাণ শুষে নিয়েছিল। কৃষ্ণে ব্যক্তিগতভাবে পুতনাকে হত্যা করেন নি। যদিও আমরা বলি একজন মানুষ বৃক্ষটি কেটেছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানুষটির কুঠারই বৃক্ষটি কেটেছে। তদ্রুপ বিবৃত হয় যে, কৃষ্ণ পুতনার প্রাণ বায়ু শুষে নিয়েছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁর সংহার শক্তিই এই কার্য করেছিলেন।”
স্তনের প্রত্যেক গুরুত্বপুর্ণ অংশ কৃষ্ণ এমনভাবে চেপে রেখেছিলেন যে, তখন পুতনা ক্রন্দন করতে শুরু করলেন, “দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও! আর আমার স্তন পান করো না!” তিনি প্রচণ্ডভাবে ঘামাছিলেন তার চোখ দুটি বিস্তৃত হয়েছিল এবং তার বাহুযুগল ও পা আন্দোলিত হচ্ছিল। এভাবে তিনি পুনঃ পুনঃ অত্যন্ত সশব্দে ক্রন্দন করছিলেন। যখন পুতনা উচ্চৈস্বরে ও প্রবল বেগে চিৎকার করছিল, তখন পর্বতরাজি সম্বলিত পৃথিবী ও অগণিত গ্রহসম্বলিত মহাশূন্য কেঁপে উঠেছিল। নিম্ন গ্রহসমূহ ও সমস্ত দিক প্রকম্পিত হয়েছিল এবং তাদের অধিবাসীরা বজ্রপাতের ভয়ে নুইয়ে পড়েছিলেন। এভাবে রাক্ষসী পুতনা অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন কেননা কৃষ্ণ তার স্তন আক্রমণ করেছিল এবং তার প্রাণ বায়ু নিস্তেজ হচ্ছিল। মুখ বিস্তৃত করে হাত, পা ও বেশ বিস্তৃত করে পুতনা তখন তার আসল রাক্ষসী রূপ ধারণ করে গো-চারণভূমিতে পতিত হয়েছিলেন। যেরকম বৃত্রাসুর ইন্দ্রের ব্রজাঘাতের দ্বারা নিহত হয়ে পতিত হয়েছিল।
শ্রীল প্রভুপাদ এ সম্পর্কে ভাষ্য দিয়েছেন: “পুতনা ছিলেন অনেক বড় এক রাক্ষসী যে অদ্ভুত শক্তির দ্বারা তার আসল রূপকে আবৃত রাখার কৌশল জানতেন। কিন্তু তিনি যখন নিহত হন তখন তার সেই শক্তি তাকে অর্থাৎ তার আসল রূপকে আর আবৃত রাখতে পারেনি।” শ্রীধর স্বামী এর সম্পর্কে ভাষ্য দিয়েছেন যে, পুতনা তার আসল রূপ প্রকাশিত করেছিল কেননা মৃত্যুর সময় প্রতারণা করা যথার্থ নয়।” জীব গোস্বামী ব্যক্ত করেছেন, “ ‘নিজ রপং’ অর্থ হল ‘তার স্বরূপ’ এবং ‘উলুকি-স্বরূপং’ অর্থ হল “একটি পেঁচার মতো’। অর্থাৎ পুতনা ঠিক এ রূপ প্রকাশিত হয়েছিল।”

সূত্র: মাসিক চৈতন্য সন্দেশ 
মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ও ব্যাক টু গডহেড এর ।। গ্রাহক ও এজেন্ট হতে পারেন
প্রয়োজনে : 01820-133161, 01758-878816, 01838-144699

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here