কেন তিনি ঝাড়ুদার?

0
110

১৯৯১ সাল। পুরির রাজা শোভাযাত্রায় উপস্থিত হলেন। তিনি মন্দির প্রাঙ্গণের সম্মুখে হেঁটে গেলেন এবং ১টি স্বর্ণের হাতল বিশিষ্ট ঝাড়ু দ্বারা রথ মার্জন করেন এবং চন্দন কাষ্ঠের সুগন্ধি মিশ্রিত জল তাতে ছিটিয়ে দেন। অতঃপর তিনি মন্দির প্রাঙ্গণে তিন বার প্রদক্ষিণ করেন সেই সাথে প্রতিটি রথ তিনবার করে প্রদক্ষিণ করেন। ২০০১ সালে উক্ত কার্যটি ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় এবং সুনির্দিষ্ট সময়ানুক্রমে সমস্ত সেবা সম্পন্ন হয়। এটি অত্যন্ত দর্শনীয় যে, যেভাবে রাজা রথ মার্জন করেছেন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ কিভাবে বছরের পর বছর ধরে উক্ত উৎসবটি পরিবর্তন হচ্ছে। যদি চৈতন্য চরিতামৃতে বর্ণিত রথযাত্রার চিত্রপট ও বর্তমান রথযাত্রার অবস্থা বিবেচনা করি তবে ৫০০ বছর পূর্বে অনুষ্ঠিত রথযাত্রা ও বর্তমান রথযাত্রার মধ্যকার এক বৈসাদৃশ্য পরিলক্ষণ করব। তখন রাজারা রথের অগ্রভাগের রাস্তা মার্জন করতেন এবং সমস্ত শহরে যতটুকু পর্যন্ত রথ গমন করত ততটুকু রাস্তা মার্জন করতেন। বর্তমান রাজাদের এই ধরনের সেবাকার্য সম্পন্ন করার নেপথ্যে একটি ঘটনা রয়েছে একদা পুরীর রাজা পুরুষোত্তম দেব কাঞ্চি রাজার শ্যালক নরসিংহের কন্যাকে বিবাহ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। রথযাত্রা তখন নিকটস্থ, এ কারণে, রাজা পুরুষোত্তম দেব কাঞ্চির রাজা নরসিংহকে উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু রাজা নরসিংহ তার প্রতিনিধিরূপে মন্ত্রি চিন্নভট্ট গধারঙ্গকে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রেরণ করেন। যখন মন্ত্রি উক্ত অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন তখন তিনি দেখলেন যে রাজা পুরুষোত্তম দেব রথের সামনের রাস্তা মার্জন করছেন। তিনি রাজার ভক্তিমূলক সেবাকর্ম দেখে অভিভূত হন। কিন্তু রাজা হয়েও রাস্তার ঝাড়দান করার মত কর্মকে তিনি সমর্থন দিতে পারেন নি। মন্ত্রি রাজ্যে ফিরে গিয়ে রাজা নরসিংহকে সবিস্তারে সকল ঘটনা উল্লেখ করলে রাজা নরসিংহ রাজা পুরুষোত্তম দেব কর্তৃক প্রেরিত বিবাহ প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এই বলে যে, “ঝাড়ুদারের সাথে তার কন্যাকে বিবাহ দিতে রাজি নন।” এইভাবে প্রত্যাখাত হয়ে শ্রীজগন্নাথের ভক্ত রাজা পুরুষোত্তমদেব অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে সৈন্য সামন্ত নিয়ে কাঞ্চির রাজা নরসিংহকে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজা পুরুষোত্তম দেব চরমভাবে পরাজিত হন। এভাবে পরাজিত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় পুরীতে প্রত্যাবর্তনের সময় রাজা সৈকত আচার্য নামক এক জগন্নাথের ভক্তের বাসায় অবস্থান করে তাকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। তখন ঐ ভক্ত রাজাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি জগন্নাথের জন্য যুদ্ধ করতে যাওয়ার পূর্বে জগন্নাথ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন?’ রাজা তখন তার ভুল স্বীকার করেন এবং অনুতাপ করতে থাকেন। গভীর রাত পর্যন্ত রাজা জগন্নাথের মন্দিরে অবস্থানপূর্বক ক্রন্দন করতে থাকেন। হঠাৎ তিনি একটি দৈববাণী শুনতে পান ‘কেন তুমি একটি সামান্য বিষয় নিয়ে এত বিমর্ষ হচ্ছ?’ তুমি সৈন্য সামন্ত সংগ্রহ করে পুণরায় যুদ্ধে গমন কর, আমরা দুই ভাই (কৃষ্ণ ও বলরাম) যুদ্ধ সম্পন্ন করতে আসছি। কৃষ্ণ ও জগন্নাথদেবের স্বয়ং যুদ্ধে আগমনের সংবাদ শুনে তরুন থেকে বৃদ্ধ সকলে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধে যাবার জন্য সকলে যখন প্রস্তুত। রাজা অত্যন্ত সন্ধিগ্ধচিত্তে চিন্তা করছিলেন সত্যিই কৃষ্ণ বলরাম যুদ্ধে আসবেন কিনা? দু’জন সৈন্য একজন কালো ঘোড়ায় ও অন্যজন সাদা ঘোড়ায় চড়ে চিলিকা হ্রদের তীরে অবস্থান করে তৃষ্ণা নিবারণ করেন এবং মনিকা নামের এক ভক্ত থেকে কিছু ফল ক্রয় করেন। মনিকা নামক ভক্তটি তাদেরকে অর্থ পরিশোধ করতে বললে তারা বলেন, তাদের কাছে কোন অর্থ নেই। তারা ঐ মনিকাকে একটি রত্ন প্রদান করে বলেন, এটি যদি রাজাকে প্রদান করেন তবে রাজা তাকে উপযুক্ত অর্থ প্রদান করবেন। কিছুক্ষণ পর যেহেতু ভক্ত মনিকা রাজার উদ্দেশ্যে পতাকা নাড়ছিলেন। উক্ত পতাকা রাজার দৃষ্টিগোচর হলে রাজা ভক্ত মনিকার নিকট আসেন এবং তার পতাকা নাড়ানোর কারণ জিজ্ঞাসা করেন। ভক্ত মনিকা রাজাকে উক্ত রত্ন প্রদান করে বলেন, দু’জন সৈন্য একজন কালো ঘোড়ায়, অন্যজন সাদা ঘোড়ায় চড়ে তার কাছে এসে তৃষ্ণা নিবারণ করে ও ফলমূল ক্রয় করে উক্ত রত্ন প্রদান করে বলেন যে, উক্ত রত্নটি রাজাকে প্রদানপূর্বক উপযুক্ত অর্থ গ্রহণ করতে। রাজা রত্নটি দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হন। কেননা রত্নটি ছিল রত্নমুদ্রিকা রত্ন। যেটি স্বয়ং জগন্নাথের পরিধেয় আংটি। উক্ত ঘটনা রাজাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং যুদ্ধে গমন পূর্বক রাজা নরসিংহকে পরাস্ত করে তার কন্যাকে নিয়ে আসেন। কিন্তু রাজা পুরুষোত্তম তাকে বিবাহ করেননি। তিনি তার মন্ত্রিকে নির্দেশ দেন এই কন্যার বিবাহ দানের জন্য রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ঝাড়ুদার নির্বাচন করতে। এক বছর ধরে মন্ত্রি রাজ্যের ঝাড়ুদার নির্বাচন করতে লাগলেন। এক বছর পর রাজা পুরুষোত্তম দেব যখন জগন্নাথের রথের সামনে ঝাড়ু দিতে লাগলেন তখন মন্ত্রি চিন্তা করতে থাকেন এই জগতে যিনি জগন্নাথের সামনে ঝাড়ু দেয়ার যোগ্যতা রাখেন তিনিইতো শ্রেষ্ঠ ঝাড়ুদার। তখন তিনি রথযাত্রায় সকল জনগণের সামনে পুরুষোত্তম দেবই ঘোষণা করেন রাজা হচ্ছেন যোগ্যতাসম্পন্ন ঝাড়ুদার। অবশেষে রাজা সবচেয়ে পুরুষোত্তম দেব ও রাজকুমারির বিয়ে হয় এবং তারা শ্রীচৈতন্যদেবের এক মহান ভক্ত রাজা প্রতাপ রুদ্রের জন্মদান করে। সেই থেকে পুরীর রাজারা রাস্তায় ঝাড়ু দেয়ার পরিবর্তে রথ ঝাড়ু দেয়ার প্রচলন করেন। হরে কৃষ্ণ।


 

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, জুন-২০১২ ইং সংখ্যায় প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here