কৃষ্ণসেবায় কোন জড় কামনা থাকা উচিত নয়

0
40

হরেকৃষ্ণ আন্দোলনে তরুণ ভক্তরা নিরন্তÍর ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করে। এই মন্ত্র যদি জড় হত, কতক্ষণই বা তারা তা কীর্তন করতে পারত? দীর্ঘ সময় ধরে জড় নাম উচ্চারণ করা সম্ভব নয়, কারণ তা ক্লান্তিময় ও শ্রমসাপেক্ষ। চিন্ময় না হলে কারও পক্ষে ‘হরেকৃষ্ণ’ কীর্তন করে তুষ্ট হওয়া সম্ভব নয়। আমরা কারও নাম বারবার উচ্চারণের ঘণ্টাখানেক পর বিরক্তি বোধ করব। কিন্তু, যতই আমাদের পারমার্থিক উন্নতি লাভ হবে, ‘হরেকৃষ্ণ’ কীর্তনে আমাদের দিব্য আনন্দ বৃদ্ধি পাবে। কৃষ্ণের সান্নিধ্যে আমরা প্রকৃষ্ট আনন্দ লাভ করতে পারি। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমরা দাস, সখা, পিতা, মাতা বা প্রেমিকরূপে সঙ্গ করতে পারি। ভক্তিরাজ্যে মূলত শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুর্য- এই পাঁচ রকম সম্বন্ধ বা রস আছে। আবার ইহলোকে, এই ভব সংসারেও এই একই সম্বন্ধগুলি রয়েছে। কারও সঙ্গে আমরা পিতা, পুত্র, প্রেমিক, প্রেমিকা, প্রভু, .ভৃত্য বা অন্য কোন সম্পর্কে সম্বন্ধযুক্ত। এইগুলি চিন্ময় লোকে আমাদের সঙ্গে কৃষ্ণের যে নিত্য সম্বন্ধ দেখতে পাওয়া যায়, তারই বিকৃত প্রতিফলন মাত্র। আজ ইহলোকে পুত্রস্নেহে যে বাৎসল্য ভাব আস্বাদন করছি, আগামী ১ দিনে সেই পুত্রই আমার শত্রু হয়ে উঠতে পারে। একই রকম লৌকিক প্রীতি বা রস নিত্য নয়, শাশ্বত নয়, আর পুত্র শত্রু না হলেও, সে একদিন মারা যাবে। আজ আমি একজন পুরুষ বা নারীর প্রতি অনুরক্ত হতে পারি, কিন্তু আগামীকাল আমাদের প্রীতির সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। জড় জগতের দোষ-ত্রুটিই এই সব ঘটার মূল কারণ। পক্ষান্তরে, চিন্ময় জগতে এই সম্পর্ক কখনও বিচ্ছিন্ন হয় না। চিৎ জগতে এই সম্বন্ধ উত্তরোত্তর আরও অন্তরঙ্গ হয়। এই অবস্থাকেই সিদ্ধি বা তত্ত্বত কৃষ্ণপ্রাপ্তি বলা হয়। সুরভি গাভী চরাতে শ্রীকৃষ্ণ খুবই ভালবাসেন, কিন্তু মায়াবাদীদের কাছে এই সব কৃষ্ণলীলা দুর্বোধ্য। মায়াবাদীরা প্রশ্ন করে শ্রীকৃষ্ণ আবার কে? এমন কি, ত্রিজগতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব ব্রহ্মা পর্যন্ত এই বিষয়ে জড় মায়া দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে প্রশ্ন কারেন, “এই সামান্য ব্রজবালক সকলের উপাস্য কেন। -তাঁকে সবাই পরমেশ্বর ভগবান বলে কেন ঠিক সেই রকম স্বর্গরাজ ইন্দ্রের কাছেও শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা বিভ্রান্তিকর। অতএব আমরা যদি জড় মায়া দ্বারা বিমোহিত। হওয়ার অভিলাষী না হই, তা হলে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বা কৃষ্ণশ্রেষ্ঠ তাঁর প্রতিনিধির কাছে তত্ত্বত শ্রীকৃষ্ণকে উপলব্ধি করতে হবে। কৃষ্ণলীলা সাধারণ নয়, তা দিবা। এই উপলব্ধি হওয়া মাত্র, অচিরেই আমরা ভববন্ধন মুক্ত হব। এই জন্য আমাদের প্রয়োজন শুধু গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত লীলারহস্য উপলব্ধি করা। এই সব ভগবৎ-লীলা অপ্রাকৃত তত্ত্ব। এই জড় জগতে একজন যুবক বহু যুবতীর সঙ্গে নৃত্য করতে চায়, আবার শ্রীকৃষ্ণও নৃত্য করেন। কিন্তু এই দুটি এক তত্ত্ব নয়। জনগণের কৃষ্ণতত্ত্ব জানা না থাকায়, শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোপীদের নৃত্য বা রাসলীলাকে এক রকম নৈতিক অনুমোদন মনে করে তারা বলে, “এখন আমরাও যুবতীদের সঙ্গে অবাধে নৃত্য করতে পারি।” এইভাবে জনসাধারণও স্বাভাবিকভাবেই নিরয়গামী হয়ে নরকগতি লাভ করে। অতএব প্রকৃষ্ট অধিকারীর কাছে আমাদের কৃষ্ণলীলা-তত্ত্ব শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। নিগূঢ় তত্ত্ব হওয়ায়, প্রথমেই আমাদের রাসলীলা শিক্ষণীয় নয়। শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে এই বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে এর দ্বারা সূচিত হয় যে, পূর্ববর্তী নয়টি স্কন্ধ প্রথমে পাঠ করে শ্রীকৃষ্ণকে যথাযথরূপে বুঝতে হবে। শ্রীমদ্ভাগবতের এই প্রথম নয়টি স্কন্ধ বুঝতে পারার পর আমরা দশম স্কন্ধ পাঠ করতে পারি। এইভাবে আমরা অনুভব করতে পারি যে, কৃষ্ণলীলা প্রাকৃত নয়, তা দিব্য। এই অনুভূতি হওয়া মাত্র আমাদের ভববন্ধন মোচন হবে। আমরা কৃষ্ণকথা শ্রবণ, কৃষ্ণনাম কীর্তন, কৃষ্ণার্চন বা শ্রীকৃষ্ণকে বন্দনা করতে পারি। সকল অবস্থায় সদ্বগুরু  বা স্বয়ং কৃষ্ণোপদেশ অনুযায়ী আমাদের হরিসেবা করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ ভক্তশ্রেষ্ঠ হনুমানজী কেবল ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের আদেশ পালন করেছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে হনুমানজী কোন বৈদিক শিক্ষা করেননি। তাই তিনি বেদান্ত শিক্ষাও দিতে পারতেন না, কিন্তু শুধু ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের আদেশ পালন করেই তিনি ভগবানের পাদ গ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে, অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে সবচেয়ে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেন। অর্জুন বৈদান্তিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর বা রণবীর।
যুদ্ধ রাজনীতিতেই তিনি নিয়োজিত ছিলেন, বেদান্ত অধ্যয়নে তাঁর সময় ছিল না, তবুও তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণভক্ত। লোকে বলতে পারে, অর্জুন বৈদান্তিক নয়, এমন কি ব্রাহ্মণ বা সন্ন্যাসী নয়, অথচ শ্রীকৃষ্ণ তাকে প্রিয়তম ভক্তরূপে গ্রহন করলেন কেন?” ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, অর্জুন তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু ও প্রিয়তম ভক্ত ভক্তোহসি মে সখা চেতি। ভজনকারীকে কোন জড়জাগতিক বিঘ্ন প্রতিহত করতে পারে না। বস্তুত হরিভজন স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। কৃষ্ণসেবায় কোন জড় কামনা থাকা উচিত নয়, আর তা থাকলেও কৃষ্ণসেবা সব সময়ই শুভদা। কোন রকম বৈষয়িক জড় কামনা নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হলেও কৃষ্ণভজনকারী মাত্রই নিঃসন্দেহে পুণ্যাত্মা বলে গণ্য হবেন। যেমন, প্রথমে ধ্রুব মহারাজ জড় বাসনা নিয়েই কৃষ্ণোপাসনা করেছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণভজনে সিদ্ধি প্রাপ্তির পর তাঁর জড় বাসনা অন্তর্হিত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করে তিনি বলেন, আমি আর কিছুই চাই না; আপনার সেবা ছাড়া আমি অন্য কোন আশীর্বাদ প্রার্থনা করি না।” শ্রীকৃষ্ণের নানাবিধ দিব্য গুণরাজি শ্রবণের পর যে কোন ভাবেই হোক কৃষ্ণ-ভজনে আমরা আকৃষ্ট হলে, আমরা পরম সিদ্ধি প্রাপ্ত হব। তস্মাৎ কেনাপ্যুপায়েন মনঃ-কৃষ্ণে নিবেশয়ে-“যে কোন উপায়েই হোক আমাদের মনকে কৃষ্ণভাবনায় আসক্ত করতে হবে।” (ভাঃ ৭/১/৩২) তখন অন্তর্যামী শ্রীকৃষ্ণ আমাদের বুদ্ধিযোগ দান করে সহায়তা করবেন। তাই গীতায় (১০/১০) শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেনÑ

তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্।
দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মামুপযান্তি তে।।

“যারা সতত ভক্তিযোগে প্রীতিপূর্বক আমার প্রেমময়ী সেবায় নিযুক্ত, আমি তাদের বুদ্ধিযোগ প্রদান করি যাতে আমাকে লাভ করতে পারে।” এই হচ্ছে অনন্য বুদ্ধিযোগ। ভক্তিযোগের অর্থই বুদ্ধিযোগ, কারণ সুমেধাগণই একমাত্র কৃষ্ণভজন-পরায়ণ। এইভাবে শাস্ত্র ও সদ্্গুরুর আনুগত্যে ভগবস্তুজনে ব্রতী হয়ে জীবনে অস্তিম সিদ্ধি লাভ করা যায়।


মাসিক চৈতন্য সন্দেশ সেপ্টেম্বর ২০২২ হতে প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here