কৃষ্ণভাবনার অমৃত

0
32

১৯৭৪ সালে বোম্বাইয়ে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণাবিন্দ

ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ প্রদত্ত প্রবচন।

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ॥

(গীঃ ৪/৭)

“যখনই ধর্মের গ্লানি হয়ে অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, হে ভারত, তখন আমি প্রকাশিত হই। ”

এটি ভগবদ্গীতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক। এখানে যে ধর্মের কথা বলা হয়েছে, তা কোন বিশেষ ধরনের বিশ্বাস নয়। বিশ্বাস বহু রয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সার্বজনীন ধর্ম একটিই। আপনি এক ধরনের বিশ্বাস গ্রহণ করতে পারেন, আমি অন্য ধরনের বিশ্বাস গ্রহণ করতে পারি, আর অন্য কেউ আর এক ধরনের বিশ্বাস গ্রহণ করতে পারে, এবং সকলের বিশ্বাসই যদি সমানভাবে সন্তোষজনক হত, তা হলে শ্রীকৃষ্ণকে এই পৃথিবীতে অবতরণ করতে হত না।

যখন ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয়, তখন ভক্তদের রক্ষা করার জন্য এবং দুষ্কৃতকারীদের দন্ডদান করার জন্য ভগবান এই ধরাধামে অবতরণ করেন। আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এই উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়ে ভগবান কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে ভগবদ্গীতার বাণী শুনিয়েছিলেন, যাতে প্রতিটি বদ্ধ জীবই তার সুযোগ গ্রহণ করতে পারে এবং যথার্থ ধর্মের পথ অবলম্বন করে ভগবদ্ধামে ফিরে গিয়ে নিত্য আনন্দের স্বাদ আস্বাদন করতে পারে।

অনেকে বলেন, “আমার কাছে আপনার ধর্ম পছন্দ না হতে পারে এবং আপনার কাছে আমার ধর্মও পছন্দ না হতে পারে, তবে সকলের ধর্মই ঠিক। ” কিন্তু সকলের ধর্ম-বিশ্বাসই যদি ঠিক হত, তা হলে শ্রীকৃষ্ণকে এখানে অধর্মের বিনাশ করতে আসতে হচ্ছে কেন ? সেই কথাটা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। ধর্ম যদি আমাদের পছন্দ বা মতামতের উপর নির্ভরশীল হত, তা হলে অধর্মের কেন প্রশ্নই ওঠে না। যেমন, কিছু মানুষ মনে করে যে, তাদের ধর্মে পশু-হত্যার অনুমোদন করা হয়েছে, আর অন্য কেউ মনে করতে পারে যে, পশুহত্যা করাটা অধর্ম। তা হলে কে ভুল আর কে ঠিক ? তা শ্রীকৃষ্ণই কেবল স্থির করতে পারেন।

সুতরাং, ধর্ম তৈরি করা যায় না– এটি এমন কোন জিনিস নয় যা বাড়িতে বসে জল্পনা-কল্পনা করে তৈরী করা যায়, অথবা সভা-সমিতির মাধ্যমে অনুমোদন করা যায়। পৃথিবীর বহু দেশে, এমন কি ভারতেও সরকারের সভায় যখন কোন আইন অনুমোদন করা হয়, তখন তাকে ধর্ম বা অনুশাসন বলে স্বীকার করা হয়। তবে শ্রীকৃষ্ণ সেই রকম ধর্মের কথা বলছেন না। না– যে কথা শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে– ধর্মং তু সাক্ষাদ্ ভগবৎ-প্রণীতম্– অর্থাৎ, “ধর্ম হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের দেওয়া আইন।”

রাষ্ট্রে সরকার আইন প্রণয়ন করে। বাড়িতে বসে কেউ আইন তৈরি করতে পারে না। সেটা কখনই সম্ভব নয়। যেমন, কোন দেশের আইন হচ্ছে “রাস্তার বাঁদিকে দিয়ে গাড়ি চালানো,” এবং অন্য কোন দেশের আইন হচ্ছে “রাস্তার ডানদিক দিয়ে গাড়ি চালানো। ” এখন কেউ ভুল আর কে ঠিক– বাঁদিক দিয়ে গাড়ি চালাতে হবে না ডানদিক দিয়ে ? তারা উভয়েই ঠিক, তবে সেটি নির্ভর করছে কোন্ সরকারের তত্ত্বাবধানে তারা রয়েছে তার উপর। সরকার যদি বলে, “ডানদিক দিয়ে গাড়ি চালাতে হবে,” তা হলে সেটিই ঠিক, এবং আমাদের সেটি মেনে নিতেই হবে। আর সরকার যদি বলে, “রাস্তার বাঁদিক দিয়ে গাড়ি চালাতে হবে,” তা হলে সেটি ঠিক। আমরা বলতে পারি না, “আমাদের দেশে আমরা বাঁদিকে গাড়ি চালাই, সুতরাং আমরা এখানে ডানদিক দিয়ে চালাব কেন ?” না। সেই তর্ক খাটবে না। তেমনি, ভগবান যা বলেন, সেটিই হচ্ছে ধর্ম এবং সেটি আমাদের স্বীকার করতেই হবে।

তার পরবর্তী শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ (ভঃ গীঃ ৪/৮) বলেছেন–

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।

ধর্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥

অর্থাৎ, “যখন ধর্মের গ্লানি হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন ভক্তদের রক্ষা করার জন্য আমি অবতীর্ণ হই। ” এটি ঠিক সরকারের আইন অমান্যকারীদের দন্ডদান করার মতো এবং আইন মেনে চলে যে নাগরিক, তাদের রক্ষা করার মতো। এই দুটি হচ্ছে সরকারের মুখ্য কর্তব্য। আর এই ধারণাটি আসছে কোথা থেকে ? পরম সরকার– পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে।

ধর্ম কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘স্বাভাবিক বৃত্তি’। যেমন, চিনি মিষ্টি; তাই চিনির ধর্ম হচ্ছে মিষ্টতা। লঙ্কা ঝাল; তাই লঙ্কার ধর্ম হচ্ছে ঝাল। চিনি যদি ঝাল হয় অথবা লঙ্কা যদি মিষ্টি হয়, তা হলে সেটি অধর্ম। জীবের ধর্ম বা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে শরণাগত হওয়া। আমরা যদি বিশ্লেষণ করি, তা হলে দেখতে পাব যে, আমরা সকলেই কারো না কারোর অথবা কোন না কোন-কিছুর শরণাগত। তা সে পত্নী হতে পারে, পরিবার হতে পারে, সমাজ হতে পারে, জাতি হতে পারে, রাজনৈতিক দল হতে পারে। যেখানেই আমরা যাই, সেখানেই, দেখতে পাই যে, জীবের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে শরণাগত হওয়া। সেটি না করে সে থাকতে পারে না।

মস্কোতে প্রফেসর কটভ্-স্কির সঙ্গে আলোচনার সময় আমি তাঁকে বলেছিলাম, “আপনাদের কমিউনিস্ট দর্শন রয়েছে এবং আমাদের ‘ভগবৎ-দর্শন’ রয়েছে, কিন্তু আমরা উভয়েই এক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছি। আপনি মার্কস এবং লেনিনের বশ্যতা স্বীকার করেছেন, আর আমি শ্রীকৃষ্ণের বশ্যতা স্বীকার করেছি। সেটিই হচ্ছে পার্থক্য। ”

সুতরাং সকলকেই বশ্যতা স্বীকার করতে হয়। কেউ যদি যোগ্য ব্যক্তিটির বশ্যতা স্বীকার করেন, তা হলে সব কিছু সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়; কিন্তু কেউ যদি অযোগ্য ব্যক্তির বশ্যতা স্বীকার করেন, তা হলে তাকে নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যোগ্য ব্যক্তিটি কে ? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথায়, “জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্য দাস”– অর্থাৎ, আমরা সকলেই হচ্ছি শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সেবক। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে তাঁর শরণাগত হওয়া বা বশ্যতা স্বীকার করা।

দুর্ভাগ্যবশত, যদিও আমরা সকলেই কারো না কারোর বশ্যতা স্বীকার করছি, কিন্তু আমরা শ্রীকৃষ্ণের বশ্যতা স্বীকার করছি না। সেটিই রোগ। কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন এই রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করছে। মানুষ যখন শ্রীকৃষ্ণের বশ্যতা স্বীকার করে না, তখন তারা কত রকমের ‘ভগবান’ তৈরি করে– তারা কত সমস্ত পাষন্ডীর বশ্যতা স্বীকার করে। সেটিই হচ্ছে অধর্ম। ধর্ম মানে হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের বশ্যতা স্বীকার করা, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের বশ্যতা স্বীকার না করে যদি কুকুর, বেড়াল ইত্যাদির বশ্যতা স্বীকার করা হয়, তা হলে সেটি অধর্ম এবং তা সংশোধন করার জন্যই শ্রীকৃষ্ণ আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে এই ধরাধামে অবতরণ করেছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণ তথাকথিত হিন্দুধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য আসেননি। শুদ্ধ ধর্ম হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়া। এখন আমরা জানি না কার শরণাগত হওয়া উচিত। সেটিই হচ্ছে সমস্যা এবং যেহেতু এই শরণাগতির প্রবণতা বিপথে পরিচালিত হচ্ছে, তাই সারা পৃথিবী জুড়ে আজ দুর্দশা দেখা দিয়েছে।

আমরা এক বস্তু থেকে আরেক বস্তুর শরণাগত হচ্ছিঃ কংগ্রেস পার্টির দরকার নেই; এখন কমিউনিস্ট পার্টি চাই। এই দল, ওই দল– এইভাবে দল পরিবর্তন করে কি লাভ ? এই দলের শরণাগত হোন অথবা ঐ দলের শরণাগত হোন, আপনি শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হচ্ছেন না, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না, আপনি শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হচ্ছেন, ততক্ষণ আপনি শান্তি পাবেন না। সেটিই হচ্ছে বক্তব্য। বাঘের মুখ থেকে রক্ষা পেয়ে কুমিরের মুখে গিয়ে পড়লে সেটি কি রক্ষা পাওয়া হল ?

তাই ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের চরম উপদেশ হচ্ছে–

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥

(ভঃ গীঃ ১৮/৬৬)

অর্থাৎ, “সব রকমের অর্থহীন কার্যকলাপ পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে রক্ষা করব; ভয় করো না। ” এটিই হচ্ছে যথার্থ ধর্ম। শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/৬) বর্ণনা করা হয়েছে– স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে– অর্থাৎ, “সর্বোত্তম ধর্ম হচ্ছে অধোক্ষজ ভগবানের শরণাগত হওয়া। ” ‘অধোক্ষজ’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘পরম চিন্ময়’ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ। তারপর শ্রীমদ্ভাগবতে আরও বলা হয়েছে যে, সেই শরণাগতি বা ভক্তি যেন অবশ্যই অহৈতুকী এবং অপ্রতিহতা হয়। অহৈতুকী মানে হচ্ছে ‘কোন রকম ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য রহিত। ’ আমাদের মনে করা উচিত নয়, “শ্রীকৃষ্ণ যদি আমাকে এই এই জিনিসগুলি দেন, তা হলে আমি তাঁর বশ্যতা স্বীকার করব। ” না, আমাদের ভক্তি যেন অহৈতুকী হয়; এবং তারপর অপ্রতিহতা– আমাদের ভক্তি যেন অপ্রতিহত হয়। কোন কিছু যেন তাকে প্রতিহত করতে না পারে। আমরা যদি সত্যি সত্যি শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হতে চাই, তা হলে কোন কিছুই তাতে বাধা দিতে পারে না। সর্ব অবস্থাতেই তা সম্পাদন করা যায়। তারপর, যয়াত্মা সুপ্রসীদতি– এইভাবে যদি শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়া যায়, তা হলে আত্মা, মন এবং দেহ প্রসন্ন হয়। এটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত।

দুর্ভার্গবশত, শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টি-বিধানের জন্য তাঁর শরণাগত না হয়ে আমরা আমাদের নিজেদের সন্তুষ্টি-বিধানের জন্য কত লোকের শরণাগত হচ্ছি। আমরা কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দিই, যাতে আমরা কিছু ক্ষমতা পেতে পারি অথবা মন্ত্রী হতে পারি। সেটিই হচ্ছে আসল উদ্দেশ্য– দেশের সেবা করার উদ্দেশ্য সেখানে গৌণ। দু’একজনের সেই সদিচ্ছা থাকতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ লোকেরই আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা অর্জন করা। সুতরাং আমরা দেশের বা দলের সেবা করছি না। আমরা আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষার সেবা করছি।

এক মহাজ্ঞানী পন্ডিত বলেছেন, কামাদীনাং কটি ন কটিধা পালিতা দুর্নিদেশাঃ অর্থাৎ, আমাদের তথাকথিত সেবা হচ্ছে, কামাদীনাং– কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এবং মাৎসর্যের সেবা, এরাই হচ্ছে আমাদের প্রভু। কেউ তার কামের সেবা করছে, কেউ আবার ক্রোধের সেবা করছে, কেউ তার লোভের সেবা করছে, এই রকমই চলছে। এইভাবে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়ের সেবা করে চলেছি, কোন বিশেষ ব্যক্তির নয়। আমরা যখন অফিসে যাই, তখন আমাদের কর্তব্য হচ্ছে মালিকের সেবা করা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা মালিকের সেবা করি না, তিনি যে বেতন দেন, তার সেবা করি। যখনই তিনি বলেন, “কাল থেকে আমি আপনাকে টাকা দিতে পারব না,” তখন আমরা বলি, “ঠিক আছে, আমি চললাম।” সুতরাং আমরা টাকার সেবা করছি। আর আমরা টাকার সেবা করি কেন ? কেননা টাকা আমাদের ইন্দ্রিয়-লালসা চরিতার্থ করতে সাহায্য করে। তাই চরমে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়ের সেবা করছি।

সকলেই তার ইন্দ্রিযের সেবা করছে, এবং সেই সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলেছেন, ধর্মস্য গ্লানিঃ– অধর্ম। আমরা যখন আমাদের ইন্দ্রিয়ের সেবা করি, তখন সেটি হচ্ছে অধর্ম এবং যখন আমরা শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রিয়ের সেবা করার বাসনা করি, সেটি হচ্ছে ধর্ম। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ এই উপদেশ দিয়েছেন।

ভগবদ্গীতার শুরুতে অর্জুন তাঁর ইন্দ্রিয়ের সেবা করার যুক্তি দেখাচ্ছিলেন– “হে কৃষ্ণ, আমি যদি আমার আত্মীয়-স্বজন, আমার গুরুদেব দ্রোণাচার্য এবং অন্যান্যদের হত্যা করি, তা হলে আমার পাপ হবে। তা হলে আমি নরকে যাব।” তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, “আমি যুদ্ধ করব না। ” কিন্তু অর্জুন তাঁর নিজের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, “এদের হত্যা করার ফলে আমি খুব শোকগ্রস্ত হব। ” অর্থাৎ, তিনি তাঁর নিজের ইন্দ্রিয়ের সেবা করছিলেন।

তাই শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে নির্দেশ দিলেন, “তুমি ক্ষত্রিয়। তোমার কর্তব্য যুদ্ধ করা। তোমার কর্তব্য শত্রুকে হত্যা করা। তোমার বিবেচনা করা উচিত নয় যে, তুমি তোমার পিতামহকে হত্যা করছ, না ভাইকে হত্যা করছ। যখনই কেউ তোমার বিরোধিতা করবে, তখন তোমাকে তার সঙ্গে যুদ্ধ করতেই হবে। ” এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণ চেয়েছিলেন অর্জুন যেন তাঁর (শ্রীকৃষ্ণের) ইন্দ্রিয়ের সাধন করেন, আর অর্জুন চেয়েছিলেন তাঁর নিজের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন করতে। সেটিই ছিল বিতর্কের বিষয়। কিন্তু যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, তাই তাঁর ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন করতে হবে। এটিই হচ্ছে ভগবদ্গীতার তাৎপর্য। প্রথমে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে অস্বীকার করেন। তারপর শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বলেন, “এই কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধের আয়োজন আমি করছি। তুমি কেবল নিমিত্ত মাত্র (নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচীন)। ” শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্য ছিল, পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্- ভক্তদের রক্ষা করা এবং অসুরদের বিনাশ করা। শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা এবং মূর্তিমান অধর্ম দুর্যোধনকে সদলবলে বিনাশ করা। সেটিই ছিল শ্রীকৃষ্ণের পরিকল্পনা। তাই শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আয়োজন করেছিলেন এবং তিনি অর্জুনের সাহায্য চেয়েছিলেন, কারণ অর্জুন তাঁর সখা এবং ভক্ত।

শ্রীকৃষ্ণ সেই বিজয় গৌরব অর্জুনকে দান করতে চেয়েছিলেন। ভক্ত যেমন শ্রীকৃষ্ণের মহিমা প্রচর করতে চান, শ্রীকৃষ্ণও তেমন তাঁর ভক্তের মহিমা প্রচার করতে চান। এটিই হচ্ছে ভক্তের সঙ্গে ভগবানের সম্পর্ক। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই সবকিছু করতে পারতেন। তিনি সর্বতোভাবে যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তিনি অজুনকে সেই কৃতিত্ব দান করতে চেয়েছিলেন। সেটিই ছিল তাঁর পরিকল্পনা।

আমাদের শিক্ষার জন্য ভগবদ্গীতায় অর্জুন একজন সাধারণ মানুষের মতো অভিনয় করেছেন। প্রকৃতপক্ষে অর্জুন জানতেন, “শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান; আমার কর্তব্য হচ্ছে তাঁর সেবা করা। ” অর্জুন ছিলেন ভক্ত– ভগবদ্ভক্ত। অর্থাৎ তিনি সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, ভগবদ্গীতার শেষে তিনি শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশ মেনে নিয়েছিলেন–“হ্যাঁ,” অর্জুন বলেছিলেন, “আমি সব রকম মোহ ত্যাগ করে যুদ্ধ করব। ”এটিই হচ্ছে প্রকৃত ভক্তি।

সর্বোপাধিবিনির্মুক্তং তৎপরত্বেন নির্মলম্।

হৃষীকেণ হৃষীকেশ-সেবনং ভক্তিরুচ্যতে ॥

 

অর্থাৎ, “ভক্তির অর্থ হচ্ছে সব রকমের উপাধি মুক্ত হয়ে আমাদের ইন্দ্রিয়গুলির দ্বারা ইন্দ্রিয়ের অধীশ্বর হৃষীকেশের সেবা করা। ” সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে সব রকমের উপাধি থেকে মুক্ত হওয়া– ‘আমি আমেরিকান,’ ‘আমি ভারতীয়,’ ‘আমি ব্রাহ্মণ,’ ‘আমি ক্ষত্রিয়’ ইত্যাদি সমস্ত উপাধি থেকে মুক্ত হওয়া। কারণ এই সমস্ত উপাধিগুলি দেহকেন্দ্রিক। আমাদের জানতে হবে, “আমি এই দেহ নই; আমি হচ্ছি চিন্ময় আত্মা (অহং ব্রহ্মাস্মি)।” এবং যখন কেউ বুঝতে পারে, “এই দেহটি আমার স্বরূপ নয়, আমার স্বরূপে আমি হচ্ছি ভগবানের অংশ আত্মা”, সেটিই হচ্ছে যথার্থ আত্মোপলব্ধি। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তার দেহাত্ম বুদ্ধিতে মগ্ন থাকে, ততক্ষণ সে একটি পশু ছাড়া আর কিছু নয়। পশুদের ধর্ম আচরণ করার কোন প্রশ্ন ওঠে না। তাই যতক্ষণ আমরা দেহাত্ম বুদ্ধিতে মগ্ন থাকি, ততক্ষণ আমরা আমাদের প্রকৃত ধর্ম সম্বন্ধে অজ্ঞ থাকি, এবং আমরা যাই করি না কেন, তা হয় আমাদের নিজেদের স্বার্থে অথবা অন্য কারো স্বার্থে।

এখন সমস্ত পৃথিবীর মানুষ দেহাত্ম বুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হয়ে নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে। তারা নানা রকমের উপাধি গ্রহণ করেছে– ‘আমি ভারতীয়’, ‘আমি আমেরিকান’, ‘আমি এই, আমি সেই’ ইত্যাদি এবং এই ভ্রান্ত উপাধির ভিত্তিতে তারা নানা রকম ‘ধর্মের’ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই ধর্মগুলো প্রকৃত ধর্ম নয়। তাই ভগবদ্গীতার শেষে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ– ‘এই সমস্ত অর্থহীন ধর্মগুলি বর্জন করে কেবল আমার শরণাগত হও। ’

ভগবদ্গীতার ধর্ম হিন্দু ধর্ম বা খ্রিস্টান ধর্ম অথবা মুসলমান ধর্ম নয়। তা হচ্ছে জীবের স্বরূপগত ধর্ম– পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে জীবের স্বাভাবিক সম্পর্ক। পূর্ণ পুরুষোত্তম ভগবানের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন অংশ জীবাত্মার স্বাভাবিক আত্মীয়তা রয়েছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমাদের প্রভু বলে স্বীকার করে নেওয়া, শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে শরণাগত হওয়া– এটিই হচ্ছে ভক্তি অথবা প্রকৃত ধর্ম।

মানুষ যখন এই ধর্মের কথা ভুলে যায়, তখন মানুষ ভগবৎ-বিদ্বেষী হয়ে ওঠে। তারা নাস্তিক হয়ে যায়, তারা মনে করে যে, তারা ভগবানের মতো সব কিছু উপভোগ করতে পারবে। সেটিই হচ্ছে ধর্মস্য গ্লানিঃ বা অধর্ম।

স্বাভাবিকভাবে আমরা সকলেই এই জড় জগতে এসেছি আনন্দ উপভোগ করার জন্য। কিন্তু জড় আনন্দ নয়, প্রকৃত আনন্দ হচ্ছে চিন্ময় আনন্দ, যা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়ার মাধ্যমে লাভ করা যায়। যখন ধর্মস্য গ্লানিঃ হয়, আমাদের চিন্ময় স্বরূপ উপলব্ধির অভাব হয়, তখন মানুষ এই প্রকৃত আনন্দ উপভোগের কথা ভুলে যায়, এবং তাই শ্রীকৃষ্ণ আসেন তাঁর ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য।

ভগবদ্গীতার শুরুতে শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেন যে, ‘আমাদের স্বরূপে আমরা এই জড় দেহ নই, আমাদের স্বরূপে আমরা হচ্ছি চিন্ময় আত্মা। ’ সেটিই হচ্ছে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। যখন কেউ তা বুঝতে পারে, তখন তার ভগবদ্ভক্তির শুরু হয় এবং সে তখন আনন্দময় হয় (ব্রহ্মভূত প্রসন্নাত্মা)। যেহেতু আমরা অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন, তাই আমরা আনন্দময় নই; আমরা সর্বদাই নিরানন্দ। আমরা যদিও আমাদের পরিবারের সেবা করছি, আমাদের সমাজের সেবা করছি, আমাদের সরকারের সেবা করছি, বা আরও অনেক কিছুর সেবা করছি, তবুও আমরা সুখী হতে পারছি না, প্রসন্ন হতে পারছি না। কারণ, সেটি আমাদের যথার্থ ধর্ম নয়। যখন আমরা আমাদের এই সেবা প্রবৃত্তির দ্বারা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মের সেবা করতে শুরু করি’ তখন আমরা প্রসন্ন হই, আনন্দিত হই।

জড় সেবার দ্বারা কারোরই সন্তুষ্টি বিধান করা যায় না। মহাত্মা গান্ধী ভারতবর্ষের যথেষ্ট সেবা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তবুও, তিনি সকলকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি, একজন তাঁকে হত্যা করেছিল। তাই, যতক্ষণ আমরা জড়জাগতিক সেবায় যুক্ত থাকি– তা সে সমাজ, পরিবার অথবা দেশ হোক্, যাই হোক না কেন– আমরা কাউকেই সন্তুষ্ট করতে সক্ষম হব না। কেউই বলবে না, এখন আমি সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত।

কিন্তু আমরা যদি শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার চেষ্টা করি, তিনি এতই কৃপাময় যে, অল্প একটু সেবার ফলে আমাদের জীবন সার্থক হয়ে ওঠে। সেই সম্বন্ধে আমি একটি দৃষ্টান্ত দেব। শ্রীকৃষ্ণ যখন একটি ছোট্ট শিশু, তখন পুতনা রাক্ষসী এসেছিল তাঁকে হত্যা করার জন্য (সেটি হচ্ছে অসুরদের পরিকল্পনা– যেভাবেই হোক না কেন, ভগবানকে মেরে ফেলতে হবে)। পূতনা মনে করেছিল, “আমি আমার স্তনে উগ্র বিষ মাখিয়ে তা কৃষ্ণকে পান করতে দেব এবং তার ফলে সে মরে যাবে। ” সেটি ছিল তার পরিকল্পনা। কিন্তু সে যখন শ্রীকৃষ্ণকে তার কোলে নিয়ে তাঁকে তার স্তন্যদান করে, তখন শ্রীকৃষ্ণ সেই বিষের সঙ্গে পুতনার প্রাণবায়ুও শুষে নেন। সেটি হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা। শ্রীকৃষ্ণ মনে করেছিলেন, “এই রাক্ষসীটি যদিও আমাকে হত্যা করতে এসেছে, কিন্তু তবুও আমি তার স্তন্যপান করেছি। তাই সে আমার মাতৃস্থানীয়া, এবং তাই চিজ্জগতে সে আমার মাতৃপদ প্রাপ্ত হবে। ” শ্রীকৃষ্ণ এতই কৃপাময় যে, আমরা যদি কোন না কোন কোনভাবে তাঁর সেবা করার চেষ্টা করি, তা সে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে হলেও তিনি আমাদের সেই সেবা গ্রহণ করবেন। সুতরাং তাঁর সেবা বাদ দিয়ে সকলের অন্য সেবা করার কি প্রয়োজন ?

আর তা ছাড়া শ্রীকৃষ্ণের সেবা করলে, আপনা থেকেই সমস্ত সেবা সম্পাদিত হয়ে যায়– সমাজ সেবা, পরিবারের সেবা ইত্যাদি,– কেন? কারণ শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সব কিছুর উৎস। গাছের গোড়ায় জল দিলে যেমন সমস্ত গাছটির পুষ্টিসাধন হয় (যথা তরোরমূলনিষচনেন তৃপ্যন্তি তৎস্কন্ধভুজোপশাখাঃ), তেমনই শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা হলে, সকলেরই সেবা করা হয়ে যায়। কারণ শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন হচ্ছেন সব কিছুর মূল (অহং সর্বস্য প্রভবঃ)।

এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা– সেটিই হচ্ছে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য– এবং তা করার ফলে আপনা থেকেই সমাজ-সেবা করা হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে ? কারণ যখনই কেউ কৃষ্ণভাবনাময় হন, তখনই তিনি সমস্ত প্রকার নেশা, অবৈধ স্ত্রী-সঙ্গ, আমিষ আহার এবং জুয়া, পাশা ইত্যাদি অবৈধ খেলা থেকে বিরত হন। সেটি কি সমাজ-সেবা নয় ? এটিই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ সমাজ-সেবা। মার্কিন সরকার আমাদের এই আন্দোলনের প্রশংসা করছেন, কারণ সেখানে বহু অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েরা এল,এস,ডি, আদি অতি উগ্র মাদক দ্রব্যের নেশায় আসক্ত। আর সরকার দেখছে যে, যখনই কেউ এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে যোগ দেয়, তখন সে এই সমস্ত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বর্জন করে। আমেরিকান সরকার যদিও কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছেন, কিন্তু তবুও তাঁরা এই নেশা বন্ধ করতে পারছেন না। কিন্তু আমরা সেই সমস্ত ছেলেমেয়েদের কৃষ্ণভাবনার অমৃত দান করে তাদের সেই নেশা থেকে বিরত করছি।

সুতরাং, শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়ার এই ধর্ম গ্রহণ করলে পৃথিবীর সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে। তাই কৃষ্ণভাবনামৃতের এত প্রয়োজন, এবং এই শিক্ষা মানুষকে দান করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ আসেন (যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত)। শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ অভিন্ন। আমাদের মনে করা উচিত নয় যে, শ্রীকৃষ্ণ এখন উপস্থিত নেই। তিনি তাঁর বাণীর মাধ্যমে– ভগবদ্গীতার মাধ্যমে এখনও তিনি বর্তমান। তাঁর উপদেশ গ্রহণ করুন, সেই উপদেশগুলি আপনাদের জীবনের প্রয়োগ করুন, এবং তা হলে আপনারা সুখী হবেন। সেটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনার অমৃত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here