কৃষ্ণভক্তি স্বরূপা শ্রীমতি রাধারাণী

0
25

এই জড় জগত সৃষ্টির পূর্বের কথা। অনন্ত কোটি বৈকুণ্ঠ লোকের ঊর্ধ্বে গোলোক বৃন্দাবনে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সচ্চিদানন্দময় অঙ্গের বাম অংশ হতে বিবিধ রত্নালংকারে ভূষিতা হয়ে হ্লাদিনী শক্তিসম্ভূত তপ্তকাঞ্চনবর্ণ শ্রীমতি রাধারানী প্রকাশিত হলেন (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ)। আর দ্বাপর যুগে বৃন্দাবনের রাভেল নামক গ্রামে ধর্মপ্রাণ বৃষভানু মহারাজ  কীর্তিদাসুন্দরীর কন্যা রূপে ভাদ্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে সোমবারে দুপুর বেলায় সর্বদিক আমোদিত করে গোলোকধাম হতে কৃষ্ণশক্তি রাধারাণী আবির্ভূত হলেন। কৃষ্ণকে দর্শনের আগপর্যন্ত শিশু রাধারাণী চক্ষু উন্মীলন করেননি। অন্ধত্বলীলা প্রদর্শন করেছিলেন। কারণ কৃষ্ণশক্তি রাধা জগতে কৃষ্ণ ছাড়া কিছুই দর্শন যোগ্য বলে মনে করেন না। জগতের দর্শনের মধ্যে কৃষ্ণকে দেখার জন্য তিনি যত্নশীলা। কৃষ্ণ সেবা, কৃষ্ণ প্রসাদ সেবন, কৃষ্ণ চিন্তা ছাড়া কৃষ্ণ-আরাধিকা শক্তি রাধিকার অন্যত্র মতি থাকে না। সমস্ত জগতে শিব, ব্রহ্মা, নারদাদি যত ভক্ত আছেন, তাঁদের ভক্তি-কণার উৎস হচ্ছেন পরম ভক্তি স্বরূপা শ্রীরাধারাণী। শ্রীমতি রাধারাণী সম্পর্কে দেবাদিদেব শিব, “উর্ধ্বতমন্য তন্ত্র”এ বন্দনা করেছেন – “হে বৈদিক যাগযজ্ঞের রাণী, হে সর্বশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ সেবিকা সর্বজগতের অধিশ্বরী, হে সমস্ত দেবদেবীর মাতাস্বরূপা, হে সমস্ত বৈদিক পাণ্ডিত্যের রাণী, হে সমস্ত দিব্য জ্ঞানের রাণী, হে সহিষ্ণুতার রাণী, হে বৃন্দাবনের রাণী, হে ব্রজের রাণী, হে ব্রজের সম্রাজ্ঞী, হে শ্রী রাধিকা আপনাকে নমস্কার”
শ্রীমতি রাধারাণী দেবাদিদেব শিবের ও উপাস্য। যেখানে তিনি দেবাদিদেব শিবের উপাস্য হতে পারেন তাহলে এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অন্য সকলের কথা তো বলাই বাহুল্য। সমস্ত দেবদেবীরাও রাধারাণীর কৃপা লাভের জন্য তাঁর বন্দনা করে থাকেন। রাধা নামটি প্রকাশিত হয়েছে আরাধনা শব্দ থেকে, যাঁর অর্থ হচ্ছে উপাসনা করা। যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনায় সর্বশ্রেষ্ঠা, তাঁরই নাম রাধা। শ্রীমতি রাধারাণী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এক পরম বিশুদ্ধ ও অনন্য ভক্ত এবং শ্রীকৃষ্ণের অলৌকিক প্রেমের প্রকাশ বিগ্রহ, ‘হ্লাদিনী শক্তি’। পূর্ণরূপে শ্রীমতি রাধারাণীর শরণাগত হলে রাধারাণী সেই শরণাগত ভক্তের ভক্তির প্রগতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপা প্রাপ্ত হওয়ার জন্য প্রথমে শ্রীমতি রাধারাণীর শরণাগত হওয়া পরম আবশ্যক। অন্যথায়, শ্রীকৃষ্ণের কৃপা প্রাপ্ত হওয়া সম্ভব না ও হতে পারে। তাই ভগবানের যে কোন শুদ্ধ ভক্ত (গুরুদেব) যদি কারো উপর প্রসন্ন হন তাহলে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ করার জন্য প্রথমে তিনি শ্রীমতি রাধারাণীর মাধ্যমে ভগবানের কাছে যাওয়ার সুপারিশ করে থাকেন।

এই বিষয়ে মহান বৈষ্ণবাচার্য ভক্তি বিনোদ ঠাকুর বলেন

রাধাপদ বিনা কভু কৃষ্ণ নাহি মিলে।
রাধার দাসী কৃষ্ণ সর্ববেদে বলে ৷

শ্রীমতি রাধারানীর কৃপা প্রাপ্ত হওয়ার সবচেয়ে সরলতম উপায় হচ্ছে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ বা কীর্তন করা।“হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।” অর্থাৎ, “হে ভগবান, হে শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি (হরা) বা অন্তরঙ্গা শক্তি শ্রীমতি রাধারাণী, আপনি আমায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেম-ভক্তিতে রত হওয়ার যোগ্যতা প্রদান করুন। আপনি আমায় ভক্তিপূর্ণ সেবায় নিয়োজিত করুন” । কৃষ্ণ শক্তিমান

শ্রীমতি রাধারাণী কে

রাধা শক্তি। শ্রীমতি রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণের নিত্যলীলা সঙ্গিনী। (চৈ. চ ১/৪/৮৩) –

রাধাপূর্ণ শক্তি কৃষ্ণ পূর্ণ শক্তিমান। দুই বস্তু ভেদে নাহি শাস্ত্রের প্রমাণ ॥ পদ্মপুরাণে আরো উল্লেখ আছে রাধারাণী নারদ মুনিকে বলেন –
“অহং চ ললিতাদেবী রাধিকা য চ গীয়তে।
অহং চ বাসুদেবাখ্যে নিত্যং কামকলাত্মকঃ ॥
সত্যং যোষিৎ স্বরূপোহা্ম যোষিতাচ্ছাহম্ সনাতন।
অহং চ ললিতাদেবী পুংরূপ কৃষ্ণবিগ্রহ ॥
উভয়োহন্তরং নাস্তি সত্যং সত্যং হি নারদ।”

অর্থাৎ, “রাধিকা বলে যাঁকে অভিহিত করা হয়, সেই আমি ললিতাদেবী নামেও আখ্যাত হই। আমিই সত্য রমণীস্বরূপা- নিত্যকাল রমণী। আমি ললিতা এবং পুরুষ স্বরূপে আমিই কৃষ্ণ। হে নারদ! আমি তোমাকে সত্যপূর্বক বলছি যে কৃষ্ণ ও আমার মধ্যে কোন ভেদ নেই”। এখানে, ‘পুংরূপ কৃষ্ণবিগ্রহ’ কথাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটির দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাধারাণীই স্বয়ং পুরুষ রূপে শ্রীকৃষ্ণ। তাই এই জড় জগতে যারা রাধা এবং কৃষ্ণের সম্বন্ধে ভ্রান্তধারণা পোষণ করেন, তাদের বোঝা উচিত যে, সূর্য এবং সূর্য রশ্মির মধ্যে যেমন কোন পার্থক্য নেই, তেমনি আমাদের সকলের পরম পিতা ও মাতা স্বরূপ রাধাকৃষ্ণে কোন ভেদ নেই। শাস্ত্রে বারবার এই সাবধানবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে যে, কোন মানুষ যেন কোন জাগতিক বিষয়ের দৃষ্টি-ভঙ্গিতে শ্রীমতি রাধারাণী ও শ্রীকৃষ্ণের সম্বন্ধটিকে কখনো বিচার না করেন ।
আমরা শ্রীমতি রাধারাণীর সম্বন্ধে আপনাদের যেটুকু জানাচ্ছি তা শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেই জানাচ্ছি। তাই শ্রীল প্রভুপাদ যেটুকু আমাদের জানিয়েছেন তার চেয়ে বেশি রাধারাণী সম্বন্ধে জানার উৎসুক না হওয়ায় ভক্তি জীবনে শ্রেয়। শ্রীমতি রাধারাণী আমাদের সকলের পরম পূজনীয় মাতা। আমাদের সকলের উচিত রাধারাণীর চরণ কমলে শরণাগত হওয়া।
২২শে ভাদ্র, ৮ই সেপ্টেম্বর শ্রীমতি রাধারাণীর আবির্ভাব তিথি বা শ্রীরাধাষ্টমী তিথি। শ্রীমতি রাধারাণী হচ্ছেন পরম করুনাময়ী, তাই সকল ভক্তের উচিত ঐ দিন প্রাতঃকাল হতে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত অর্থাৎ ১২ টা পর্যন্ত উপবাস ব্রত পালন করা। জয় শ্রীমতি রাধারাণী কি জয়! হরে কৃষ্ণ।


চৈতন্য সন্দেশ সেপ্টেম্বর-২০০৮ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here