রথযাত্রার সুযোগটি গ্রহণ করুন

0
591

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী শ্রীল প্রভুপাদএই রথযাত্রা মহোৎসব অন্তত পাঁচ হাজার বছরেরও আগের প্রাচীন উৎসব। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রাদেবীকে নিয়ে রথারোহন করে দ্বারকা থেকে কুরুক্ষেত্রে গিয়েছিলেন এবং এই উৎসবটি শ্রীকৃষ্ণের পরিজনবর্গসহ রথারোহনেরই স্মারক। ভারতবর্ষের শ্রীজগন্নাথ পুরীতে প্রতি বৎসর এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এবং সেখানে সেটি একটি বিরাট উৎসব। এখন আমরা হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে এই রথযাত্রা উৎসবকেও পাশ্চাত্য জগতে পরিচিত করছি কেননা এই আন্দোলনের স্রষ্টা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই উৎসবে এক সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতেন। তাই, আমরা তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করছি। লন্ডনে এই অনুষ্ঠান পালনের সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে তা সানফ্রান্সিসকো, বাফালো, মেলবোর্ন, টোকিও, কলকাতা এবং আরো অন্যান্য স্থানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই উৎসবে যোগদান করার অর্থ হচ্ছে আমাদের আত্মোপলব্ধির পথে এক পদক্ষেপ এগিয়ে থাকা। রথেচগমনং দৃষ্টা পূর্ণজন্ম ন বিদ্যতে “কেবলমাত্র রথারূঢ় পরমেশ্বর শ্রীভগবানকে দর্শন করার মাধ্যমে একজন জন্ম-মৃত্যুর পৌনপুনিকতা রুদ্ধ করার পথে অগ্রগতি লাভ করে।” তাই আপনারা অনেক কষ্ট স্বীকার করেও এখানে এসেছেন বলে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। দয়া করে এখন ভক্তসঙ্গে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করুন এবং প্রসাদ গ্রহণ করুন। আমাদের হরেকৃষ্ণ আন্দোলন তিনটি মূল ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত কীর্তন, নৃৃত্য ও প্রসাদ গ্রহণ অত্যন্ত আনন্দদায়ক। যদি মনে করেন তবে আপনারা কৃষ্ণভাবনামৃতের তত্ত্ব শ্রবণ করতে পারেন। কিন্তু আপনারা যদি তত্ত্বটি হৃদয়ঙ্গম না করেন অথবা আপনারা যদি কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রন্থ পাঠ না করেন, যদি আপনারা কেবল হরেকৃষ্ণ কীর্তন, নৃত্য ও প্রসাদ গ্রহণ, এই তিনটি ব্যাপারে অংশগ্রহণ করেন, তাহলেও ধীরে ধীরে পারমার্থিক উন্নতি লাভ করবেন। আপনারা যদি এই পন্থা নিয়মিত অভ্যাস করেন তবে একদিন আসবে এমনকি যেদিন আপনারা শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করবেন। অবশেষে এই দেহটি ত্যাগ করার পর সরাসরিভাবে ভগবদ্ধামে গমন করবেন। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতায় (৪/৯) এ কথা বর্ণনা করেছেন
জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ

ত্যক্তা দেহং পূর্ণজন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন ॥
শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহ, আর্বিভাব, অপ্রকটত্ব কেবলমাত্র শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমে আপনারা মৃত্যুর পর শ্রীকৃষ্ণলোকে ফিরে যাবার জন্য নিশ্চিত হতে পারেন। এই রথযাত্রা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহের একটি। সুতরাং রথযাত্রা উৎসবে অংশগ্রহণের অর্থ হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ সঙ্গ লাভ করা। এইভাবে আমরা যদি, শ্রীকৃষ্ণের দিব্য নাম, শ্রীকৃষ্ণের রূপ, শ্রীকৃষ্ণের গুণ, শ্রীকৃষ্ণের লীলাদির সঙ্গ করি তবে ক্রমান্বয়ে এই জড় অস্তিত্বকে অতিক্রম করব এবং মৃত্যুর পর আমাদের আর এখানে ফিরে আসতে হবে না। এই দেহটি একদিন আমাদের ত্যাগ করতেই হবে। কিন্তু কৃষ্ণভাবনায় উন্নীত হবার পর যদি আমরা এই দেহ ত্যাগ করি তাহলে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন পূর্ণজন্ম নৈতি। অর্থাৎ “তোমাকে আর অন্য কোন জড় দেহ গ্রহণ করতে হবে না।” তাহলে আমরা কোথায় যাবো? শ্রীকৃষ্ণ বলছেন মামেতি “তুমি আমার কাছে আসবে।” এই জড় আকাশের পরেও আর একটি আকাশ রয়েছে। শ্রীমদ্ভগবদ্্গীতায় বর্ণনা করা হয়েছে পরস্তস্মান্ত ভাবোহন্যোহ ব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতন-আরেকটি আকাশ রয়েছে, যা হচ্ছে নিত্য।” এই আকাশটি অনিত্য। আপনাদের দেহ, আমার দেহ, এই জড় জগতের সমস্ত কিছুই অনিত্য বা ক্ষণস্থায়ী। একটি নির্দিষ্ট সময়ে এর জন্ম হচ্ছে, এর বৃদ্ধি হচ্ছে, কিছুকাল অবস্থান করছে, প্রজন্মের সৃষ্টি করছে এবং তারপর ক্ষয় হয়ে অবশেষে অন্তর্হিত হচ্ছে। এই হচ্ছে জড়া প্রকৃতি। কিন্তু আরেকটি প্রকৃতি রয়েছে সেটি হচ্ছে চিন্ময় প্রকৃতি। এমনকি এখানে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও সেই প্রকৃতি অবিনশ্বর থাকে। ভগবদ্‌গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, পরা প্রকৃতি অথবা চিন্ময় আকাশে কোন সূর্যালোক, চন্দ্রলোক ও বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না, প্রকৃতপক্ষে সেই দিব্য জগত স্ব উদ্ভাসিত। তাই আমাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে নিজেদেরকে এই আকাশ থেকে ঐ আকাশে স্থানান্তরিত করা। এই হচ্ছে বৈদিক বিধান- ‘তমসো মা জ্যোর্তিগময়ো’-“এই অন্ধকার জগতে থেকো না, আলোকের জগতে এসো।” সুতরাং আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা, কি করে এই অন্ধকার জগৎ থেকে গোলোক বৃন্দাবন নামক আলোকের জগতে নিজেকে স্থানান্তরিত করতে হয়, আমরা সেই শিক্ষা প্রদানের চেষ্টা করছি। আমাদের একান্ত অনুরোধ আপনারা যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, যখনই সময় পাবেন কেবলমাত্র ষোলটি শব্দ সমন্বিত- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। এই মহামন্ত্র কীর্তন করতে চেষ্টা করুন। আর আপনাদের সেই সময়ও রয়েছে পথে চলতে চলতে, বাসে ভ্রমণ করতে করতে মহামন্ত্র জপ করুন অথবা যখন আপনি একা বসে থাকেন সেই সময়েও আপনি হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে পারেন। এর কোন কুফল নেই, বরং এক বৃহৎ সুফল রয়েছে। তাই আমাদের একমাত্র অনুরোধ আপনারা এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রকে গ্রহণ করুন। যেমন আজ আমরা রথযাত্রা উৎসব উদ্‌য্যাপন করছি তেমনি, সময়ে সময়ে উৎসবাদির মাধ্যমে আমরা আপনাদের নাম কীর্তনের কথা মনে করিয়ে দেব। আপনারা আমাকে কিছু বলার জন্য আপনাদের যে অমূল্য সময় প্রদান করেছেন, তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমাদের অনেক গ্রন্থ রয়েছে এবং আপনাদের যেকোন প্রশ্নের উত্তর দিতে আমাদের ভক্তবৃন্দ আনন্দিত হবে। দয়া করে এই সুযোগ গ্রহণ করে আপনাদের জীবনকে সার্থক করুন। হরে কৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ পত্রিকা ২০১১ সালে জুলাই প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here