কিভাবে বন্ধুত্ব করতে হয়?

0
59

অস্থায়ী বন্ধুত্বে গড়ে তোলার পরিবর্তে, চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য বৈদিক শাস্ত্র ও আচার্যগণ খুব সুন্দর দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে

রোহিনীনন্দন দাস


লন্ডনে কয়েক বছর পূর্বে আমি কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন প্রথম শুরু করি। একবার একটি মেয়ের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তখন একটি জনবহুল সড়কে অবস্থান করার পরও আমার একাকিত্ব অনুভব হচ্ছিল। প্রথমে তার সঙ্গে কথা বলতে না চাইলেও এক পর্যায়ে কথা বলতে বলতে আমাদের মধ্যে খুব দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভীতিপ্রদ ব্যাপার হল মোহ ও ব্যাথা পাওয়ার আশঙ্কা। আমরা বেশ কিছুক্ষণ একত্রে লন্ডনের বিভিন্ন স্থান দর্শন করলাম।
আমরা সেন্ট পলের ক্যাথেড্রলে উঠেছিলাম এবং সেখান থেকে শহরের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করেছিলাম। কয়েক ঘন্টা পর আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। ট্রেনে উঠার সময় সে বলছিল আমি নাকি তার ভাই এর মত দেখতে। এরপর তার প্রস্থানের সময় আমি পরবর্তী ট্রেনে উঠার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু কোনভাবে আমি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করি। আমি ভাবি এটি কি অন্যের সাথে ভাব বিনিময়ের খুঁতবিহীন কোন আদান-প্রদান? আসলে সেটি খুঁতবিহীন ছিল না কারণ সেখানে বিচ্ছেদের ব্যাথা ছিল সম্পর্কটি ক্ষণিকের হলেও। সবাই বন্ধুত্ব চায়। আমরা একান্ত কারো সাথে আমাদের সবকিছু শেয়ার করতে চাই। এরকম প্রবৃত্তি ভগবানের রয়েছে, কারণ আমরা তো তাঁরই অংশ। কৃষ্ণ সর্বদা সখা ও ভক্ত পরিবৃত হয়ে থাকেন।
এ জড় জগৎ চিন্ময় জগতের বিকৃত প্রতিফলন। আমরা কি কামনা করি তারই আংশিক প্রতিফলন সেই সম্পর্কে ফুটে উঠে। তথাপিও আমরা এর পূর্ণতার জন্য চেষ্টা করি।


বিমান উড্ডয়নের পূর্বে পাইলটরা একত্রে বসে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রাপ্ত হন। ঠিক তদ্রুপ মৃত্যুর সময় যখন আমরা অবশেষে এই দেহের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারাব তখন বাহ্যিকভাবে আমরা একা হয়ে যাব। কিন্তু যেহেতু পারমার্থিক সম্পর্ক দেহেরও ঊর্ধ্বে তাই ভক্ত সেই অবস্থায় পারমার্থিক সান্নিধ্য লাভ করেন।

জড় জগৎ কারো সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধি নিষেধ আরোপ করে। কারণ আমরা স্বেচ্ছায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। আমরা পারমার্থিক ভালোবাসা উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা প্রাপ্ত না হওয়ার মনোব্যাধিতে ভুগছি। নানা রকম কামনা-বাসনা আমাদের চারপাশ আবদ্ধ করে রেখেছে। আমরা এক পার্টনার থেকে অন্য পার্টনারের দিকে ধাবিত হচ্ছি।
আমরা যখন কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ করি তখন এর মাধ্যমে পুনরায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মধুর প্রেমময়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলি। এর মাধ্যমে জড় ও পারমার্থিক দৃষ্টি বিষয়ে একটি স্বচ্ছতা ফুটে উঠে। আমাদের জীবন ভগবান কেন্দ্রিক এবং যখন আমরা উপলব্ধি করি যে, তিনিই হলেন সবকিছুর পরম নিয়ন্তা ও ভোক্তা এবং আমাদের সুহৃদ তখন আমাদের সমস্ত জড় দুঃখ-দুর্দশার অবসান হয়। তখন আমরা জীবনকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সংগ্রাম করি না বরং জীবনকে এমনভাবে পরিচালিত করি যেন সবকিছু ভগবানের নির্দেশনা অনুসারে সাধিত হয়। নিজ ইন্দ্রিয় তৃপ্তির চেয়েও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রীতিবিধানই হলো আমাদের মনোভাব। ভগবানের সার্বক্ষণিক সান্নিধ্য লাভের ফলে একাকিত্ব দূর হয়।
একজন আত্ম-তত্ত্ব ব্যক্তি স্বার্থপর বাসনার দ্বারা পরিচালিত হন না। প্রকৃতপক্ষে একজন কৃষ্ণভাবনাময় ব্যক্তি সবাইকে কৃষ্ণভাবনার সাথে সম্পর্কিত করতে পারে। শ্রীল প্রভুপাদ সবাইকে অনুরোধ করতেন নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ পালনের জন্য। তাঁর শিষ্যরা জানতেন, প্রভুপাদ যা কিছু করছেন কৃষ্ণের জন্য করেছেন। এজন্যে তারা প্রভুপাদের নির্দেশ পালন করতেন।
শ্রীল প্রভুপাদ সর্বদা গুরু ও কৃষ্ণের সাথে যুক্ত থাকতেন। তিনি অস্থায়ী বিষয়ের জন্য কখনো আবেগতাড়িত হতেন না। এর মধ্যেও তিনি কোমলতা থেকে শুরু করে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কঠোরতা প্রদর্শন করে সমস্ত ধরনের আবেগ প্রদর্শন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে আমার দেখা কোন ব্যক্তি হলেন তিনি যিনি এত ব্যাপকভাবে আবেগ প্রদর্শন করেন। তিনি কোন শিষ্যের সঙ্গে আবেগের বন্ধনে আবদ্ধ হন নি। এমনকি যদি শিষ্যরা তার অপ্রসন্নতায় হতাশ হন তা সত্ত্বেও এ প্রকার হতাশা আরো আন্তরিক সেবার পথে পরিচালিত করত, যার মাধ্যমে শিষ্যরা পারমার্থিক আনন্দ ও অনুপ্রেরণা লাভ করতেন।
যখন কোন একজন শিষ্য প্রভুপাদের বিরহে পত্র লিখে তখন প্রভুপাদ এর প্রত্যুত্তর দেন যে, “আমার শারীরিক অনুপস্থিতে তুমি যে বিরহ অনুভব করছ তা ভালো লক্ষণ। যত বেশি তুমি এই প্রকার বিরহ অনুভব করবে, তত বেশি তুমি কৃষ্ণভাবনাময় হবে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও বিচ্ছেদ বিরহ অনুভব করেছিলেন এবং কৃষ্ণকে প্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে তার পন্থাটি হল শ্রীকৃষ্ণের প্রতি বিরহ অনুভব করা।” প্রভুপাদ আরো ব্যাখ্যা করেছেন যে, পারমার্থিক বিচ্ছেদ বিরহের আরেকটি বিষয় হল ভক্তসঙ্গ। তাই তার শিষ্যরা কেবলমাত্র শারীরিক উপস্থিতির চেয়েও বরং অধিক অর্থপূর্ণ ও স্থায়ী পন্থায় তার সান্নিধ্য লাভ করতেন। সংক্ষেপে বললে, তিনি আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, কিভাবে যথার্থ পারমার্থিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়।
জাগতিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের চেয়ে কৃষ্ণভাবনাময় সম্পর্কের ভিন্নতা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে শ্রীল প্রভুপাদ বিমানের পাইলটের দৃষ্টান্ত দিয়েছিলেন। বিমান উড্ডয়নের পূর্বে পাইলটরা একত্রে বসে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা প্রাপ্ত হন। ঠিক তদ্রুপ মৃত্যুর সময় যখন আমরা অবশেষে এই দেহের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারাব তখন বাহ্যিকভাবে আমরা একা হয়ে যাব। কিন্তু যেহেতু পারমার্থিক সম্পর্ক দেহেরও ঊর্ধ্বে তাই ভক্ত সেই অবস্থায় পারমার্থিক সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি মৃত্যুর সময় তার পরম সুহৃদ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করার চেষ্টা করে হরিনাম জপ করতে থাকেন।
প্রকৃতপক্ষে এই জগতে কৃষ্ণভাবনাময় সম্পর্ক হল চিন্ময় জগতে ভগবান ও তার ভক্তদের সান্নিধ্য লাভের জন্য একটি প্রস্তুতি স্বরূপ। যিনি এই কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা দৃঢ়ভাবে গ্রহণ করবে তার জন্য এরকম অপূর্ব সান্নিধ্য প্রতীক্ষা করছে।
শ্রীল প্রভুপাদ ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানুষ সামাজিক জীব। আর যদি আমরা কৃষ্ণভাবনাময় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সন্তুষ্টি অর্জন করতে না পারি, তবে নিশ্চিতভাবে অন্য কোথাও সম্পর্কের অনুসন্ধন করব। আমরা যদি পারমার্থিক জীবনে অনুন্নত ব্যক্তির সঙ্গ করি তবে আমাদের কৃষ্ণভাবনাও অত উন্নত হবে না।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তের সংজ্ঞা বিষয়ে বলেন, ‘একজন ভক্ত হল তিনিই, যিনি অভক্ত সঙ্গ বর্জন করেন।” অভক্তদের প্রতি আসক্তি ও তাদের অভ্যাসসমূহ জাগতিক জীবনের দ্বার উন্মোচন করে দেয়, পক্ষান্তরে আত্ম-তত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গ লাভ করার ফলে পারমার্থিক বাস্তবতার দ্বার উন্মোচন হয়। বলা হয় যে, “একজন মানুষকে চেনা যায় তার সঙ্গ লাভের ধরণ অনুসারে।”
যদি ভক্তদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ কম থাকে তবে আশেপাশে এরকম ব্যক্তিদের অনুসন্ধান করার চেষ্টা করতে হবে যাতে তাদেরকে পারমার্থিক জীবনে ঐকান্তিক করে গড়ে তোলা যায়। যদিও এটি কিছুটা কষ্টসাধ্য হতে পারে। শ্রীল প্রভুপাদের মত শুদ্ধভক্ত পাশ্চাত্যে একাকী ভ্রমণ করে যেখানে কোন কৃষ্ণভক্ত ছিল না। তবুও তিনি অন্যদেরকে কৃষ্ণভক্ত হওয়ার পথে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। যেহেতু আমরা পারমার্থিক উপলব্ধির স্তরে পরিচালিত তাই আমাদের পারমার্থিক সঙ্গ প্রয়োজন। অন্যথা আমরা কৃষ্ণভাবনাময় হতে পারব না এবং অন্যদেরকেও তা দিতে পারব না।
পারমার্থিক সঙ্গের একটি কৌশল সম্পর্কে শাস্ত্রে বর্ণিত আছে। যদি আমাদের এমন কারো সাথে সাক্ষাৎ ঘটে যিনি আমাদের চেয়েও পারমার্থিকভাবে কম অগ্রসরমান, তখন তাদের প্রতি অনুকম্পা পরায়ন হওয়া উচিত। যদি আমরা সমগুণসম্পন্ন কারো সঙ্গ করি তবে, তার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা উচিত। যদি উন্নত ভক্তের সঙ্গ করি তবে উচিত হবে তার কাছ থেকে শ্রদ্ধার সহিত শ্রবণ করা ও তার সেবা করা।
যদি আমরা অন্যের সঙ্গ করার কৌশল সম্পর্কে যথাযথ শিখতে পারি, তখন আমরা দেখব যে, প্রতিটি সম্পর্কই কৃষ্ণভাবনাময় উন্নতির জন্য বিরাট প্রনোদনার সৃষ্টি করবে। যে সমস্ত ব্যক্তি কৃষ্ণভাবনার প্রতিকূল তাদের সঙ্গ পরিহার করা উচিত কারণ তারা আমাদের বিশ্বাস ও ভক্তিকে বিনাশ করবে।
পারমার্থিক সম্পর্কের মৌলিক আদর্শ হল বিনিময় ও প্রদান করা, কেবল গ্রহণ করা নয়। প্রায়শই এই শোষনের বিশ্বে এক অন্যের সাথে সব প্রকারের বিনিময় বা আদান-প্রদান আদর্শ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিপরীত। যদি একজন জাগতিক ব্যক্তি তার চেয়ে কম যোগ্যতা সম্পন্ন কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন সে সুখী হয়। সে মনে করে, “এই ব্যক্তিটি তার সঙ্গে প্রতিযোগীতার জন্য কম যোগ্যতাসম্পন্ন।” যখন তার সমপর্যায়ভুক্ত কোন ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করে তখন সে তা ভীতিপ্রদ বা হুমকি স্বরূপ অনুভব করে এবং সে তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। আর যখন তার চেয়ে অধিক গুণসম্পন্ন বা যোগ্যতাসম্পন্ন কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে, সে তার সমালোচনা করবে এবং তাকে যেকোনভাবে নীচে নামিয়ে আনার চেষ্টা করবে। যখন কোন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির পতন ঘটে তখন অন্য এক জাগতিক ব্যক্তি উৎফুল্ল অনুভব করে কেননা এর মাধ্যমে তার জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ।
পক্ষান্তরে, একজন ভক্ত কারো কার্যকলাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন না, কারণ তিনি জানেন কৃষ্ণ অসীম এবং তার সাথে সম্পর্কিত সব কিছুই অসীম। তিনি জানেন তার পারমার্থিক জ্ঞানের সম্পদ তখনই বর্ধিত হবে যখন অন্যদের সাথে সবকিছু বিনিময় করার চেষ্টা করা হয়। যদি উন্মুক্তভাবে পারমার্থিক জ্ঞান বিতরণ করা না হয়, তবে সেই জ্ঞান শুকিয়ে যাবে। তিনি জানেন তার গুরু ও কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হবেন তখনই যখন তিনি অনুন্নত ও কম সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের মাঝে কৃষ্ণভাবনা পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। যদি কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হয়, তবে আর কি অর্জন করার বাকি থাকে?
একজন ভক্ত দলের একজন বিনম্র সদস্য হিসেবে কাজ করতে পছন্দ করে এবং এর মাধ্যমে তিনি অন্য ভক্তদের সঙ্গে আনন্দের সহিত সঙ্গ করেন এবং সম্মিলিতভাবে কৃষ্ণসেবা করেন। তারা একত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মহিমা শ্রবণ ও কীর্তনের মাধ্যমে আস্বাদন করে। কৃষ্ণভাবনায় উন্নতি করার জন্য ভক্তদের সান্নিধ্য লাভের কৌশল ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে যথাযথ ব্যক্তি থেকে শ্রবণ করার কৌশল সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করা উচিত। একজন ভক্ত ভগবানের কোন উন্নত ভক্তকে গ্রহণ করার মাধ্যমে উৎফুল্ল হন। কাউকে টেনে নীচে নামানোর বদলে তিনি অন্য ভক্তের আরো উন্নতি কামনা করেন। তিনি ভাবেন, “কত সুন্দরভাবে এই ভক্ত কৃষ্ণসেবা করছে। আমিও যেন তার মত কৃষ্ণসেবা করতে পারি।”
উপদেশামৃতে শ্রীল রূপগোস্বামী ৬টি পন্থা সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে ভক্ত পারমার্থিক সম্পর্ক আস্বাদন করতে পারেন, প্রথম দুটি হল “ভগবদ্ভক্তকে প্রয়োজনীয় দ্রব্য প্রীতিপূর্বক দান, তার নিকট হতে কোন দ্রব্য গ্রহণ।” পরবর্তী দুটি হল, “নিজের মনের কথা ভক্তের নিকট ব্যক্ত করা এবং তার নিকট হতে ভজন বিষয়ক গুহ্য তথ্যাদি জিজ্ঞাসা করা।” আমরা উন্মুক্তভাবে বন্ধুদের সাথে ভাব বিনিময় করতে পারি। একে অপরের স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর নেওয়া উচিত কারণ শরীরের অভ্যন্তরে রয়েছে চিন্ময় আত্মা।
একজন কৃষ্ণভাবনাময় ব্যক্তি যেকোন কিছু নিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু সে কথোপকথনের ভিত্তি হল সর্বদা কৃষ্ণ। একবার ইংল্যান্ডে শ্রীল প্রভুপাদ, এক রেইস্ কার ড্রাইভে গ্রাহাম হিল এর সঙ্গে কথা বলছিলেন, যিনি পারমার্থিক জীবন সম্পর্কে জানতেন না। তাদের মধ্যে আধ ঘন্টা পর্যন্ত কার রেইসিং নিয়ে সুন্দর কথোপকথন হয়। এর পরই মি. ডহল উল্লেখ করছিলেন যখন তার কারটির গতি অনেক বেশি হয়ে যায় তখন তার মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি মৃত্যু থেকে এক চুল দূরে রয়েছেন। তা শুনে শ্রীল প্রভুপাদ আরো অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন, যা হল মি. হিল বর্তমান শরীরের ঊর্ধ্বে তার নিত্য অস্থিত্ব সম্পর্কে এবং খুব দক্ষতার সহিত তাকে উচ্চতর চেতনায় উপনীত করে। বন্ধুত্বের এই হল প্রকৃত অর্থ-সাধারণ বিষয়ের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির মাঝে আত্মবিশ্বাস ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলার প্রতি অনুপ্রেরণা প্রদান করা এবং এর মাধ্যমে তাকে সঠিক পথের সন্ধান প্রদান করা।
রূপ গোস্বামী শেষ দুটি বিষয় ব্যক্ত করেছেন, “ভক্ত প্রদত্ত প্রসাদ গ্রহণ এবং ভক্তকে প্রীতিপূর্বক কৃষ্ণ প্রসাদ ভোজন করান।” উপহার হিসেবে খাদ্যের আদান-প্রদান বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষন। বৈদিক সংস্কৃতি অনুসারে একজন ব্যক্তি তার পরিবারের সাথে একাকী আহার করে না। তিনি তার আহারের সময় কোন অতিথিকে কামনা করেন।


একজন ভক্ত কারো কার্যকলাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন না, কারণ তিনি জানেন কৃষ্ণ অসীম এবং তার সাথে সম্পর্কিত সব কিছুই অসীম। তিনি জানেন তার পারমার্থিক জ্ঞানের সম্পদ তখনই বর্ধিত হবে যখন অন্যদের সাথে সবকিছু বিনিময় করার চেষ্টা করা হয়। যদি উন্মুক্তভাবে পারমার্থিক জ্ঞান বিতরণ করা না হয়, তবে সেই জ্ঞান শুকিয়ে যাবে।

ঐতিহ্যগতভাবে, একজন অতিথির অনুপস্থিতিতে একজন গৃহস্থ রাস্তায় গিয়ে কোন ক্ষুধার্ত ব্যক্তিকে ভোজনের জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন।
আমার পিতা আমাকে একবার বলেছিলেন, জীবনে যদি এক বা দুইজন প্রকৃত বন্ধু বানাতে পারি তবে আমি সৌভাগ্যবান হব। যখন আমি ইস্কনে যোগদান করি, আমি ভাবতাম, “আমি এখন হাজার হাজার বন্ধু প্রাপ্ত হয়েছি।” একটি আদর্শ পারমার্থিক সমাজে, সন্দেহ নেই যে কেউ হাজার হাজার বন্ধু পেতে পারে, কিন্তু পারমার্থিক পরিপক্কতার জন্য প্রয়োজন গভীর পারমার্থিক ও স্থায়ী বন্ধুত্ব, বন্ধু প্রাপ্ত হওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, ভালোবাসার সুনির্দিষ্ট বস্তু থাকতে হবে। যদি আমাদের বন্ধুত্ব কোন জড় অভিসন্ধী বিনা শুধুমাত্র কৃষ্ণকে প্রসন্ন করার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে একটি প্রকৃত ও যথাযথ বন্ধুত্ব অর্জনের আশা গড়ে উঠে। যে পরিমানে স্বার্থপরতা পোষণ করি সম্পর্কের বন্ধন তত ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ শ্রীকৃষ্ণ হল সমস্ত আনন্দের আধার, তার ভক্ত তাঁর দিব্য সহচর্যে পরিপূর্ণভাবে সন্তুষ্ট হয়, ভক্ত সেই আনন্দ সর্বদা অন্যের মাঝেও নিঃস্বার্থভাবে বিতরণ করেন। এই হল পারমার্থিক বন্ধুত্বের ভিত্তি।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here