কারা ভগবানকে জানতে পারে?

0
542

কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
পূযন্নেকর্সে যম সূর্য প্রাজাপত্য
ব্যূহ রম্মীন্‌ সমূহে তেজো।
যৎ তে রূপং কল্যাণতমং তৎ তে পশ্যামি
যোহসাবসৌ পুরুষঃ সোহহমস্মি॥

অর্থাৎ, “হে প্রভু, হে আদি কবি ও বিশ্বপালক, হে যম শুদ্ধ ভক্তদের পরমগতি এবং প্রজাপতিদের সুহৃদ–কৃপা করে আপনার অপ্রাকৃত রশ্মির জ্যোতি অপসারণ করুন যাতে আপনার আনন্দময় রূপ আমি দর্শন করতে পারি। আপনি সনাতন পুরুষোত্তম ভগবান। সূর্য ও সূর্যকিরণের সম্বন্ধের মতো আপনার সাথে আমি সম্বন্ধযুক্ত।”
সূর্য এবং সূর্যকিরণের সূর্যকিরণ গুণগতভাবে এক ও বিভিন্ন। সেইরকম গুণগত বিচারে ভগবান ও জীব এক এবং অভিন্ন। সূর্য একটি, কিন্তু সূর্য কিরণের কণাগুলি অসংখ্য। সূর্যরশ্মি সূর্যেরই অংশ, আর সূর্য ও তাঁর রশ্মি সম্মিলিতভাবেই পূর্ণসূয। সূর্যলোকের মধ্যেই সূর্যদেব বসবাস করেন, এবং সেই রকম যেখানে থেকে ব্রহ্মজ্যোতি নিঃসৃত হয়, সেই চিন্ময় পরম গ্রহলোকে লোলোক বৃন্দাবনেই সনাতন ভগবান বসবাস করেন, যেমন ব্রহ্মসংহিতায় প্রতিপন্ন হয়েছে-

চিন্তামণিপ্রকরসদ্মসু কল্পবৃক্ষ
লক্ষাবৃতেষু সুরভীরভিপালয়ন্তম্।
লক্ষ্মীসহস্রশতসম্ভ্রমসেব্যমানং
গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥

“যিনি লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষ দ্বারা আবৃত, চিন্তামণির দ্বারা রচিত ধামে, সমস্ত বাসনা পূরণকারী সুরভী গাভীদের পালন করছেন এবং যিনি নিরন্তর শত শত লক্ষ্মীদেবীর দ্বারা সম্ভ্রম সহকারে পরিসেবিত হচ্ছেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।” (ব্রহ্মসংহিতা ৫/২৯)
ব্রহ্মসংহিতায় ব্রহ্মজ্যোতি সম্বন্ধেও বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে বলা হয়েছে যে, সূর্যগোলক থেকে যেমন সূর্যকিরণ বিচ্ছুরিত হয়, ঠিক তেমনভাবেই পরমচিন্ময় গ্রহলোক গোলোক বৃন্দাবন থেকে ব্রহ্মজ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়। এই ব্রহ্মজ্যোতির তীব্র আলোক অতিক্রম না করা পর্যন্ত ভগবৎ ধামের সন্দান পাওয়া যায় না। নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতি উপলব্ধির দ্বারা ভগবানের মঙ্গলময় দিব্য অনুভূতি হয়, কিন্তু স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবানের মুখোমুখি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ভক্ত ভগবানের সবচেয়ে মঙ্গলময় রূপকে অনুভব করেন। যেহেতু তিনি আদি কবি, জগতের প্রতিপালক ও সুহৃদরূপে অভিহিত হন, তা পরমতত্ত্ব নির্বিশেষরূপে গণ্য হতে পারে না। এটিই হচ্ছে শ্রীঈশোপনিষদের নির্দেশ। এই মন্ত্র পূষণ্ শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পূষন্ অর্থ প্রতিপালক। কথাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কেননা যদিও ভগবান সকল প্রাণীদের প্রতিপালক করেন। নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতি অতিক্রম করার পর এবং ভগবান সবিশেষ সর্বমঙ্গলময় রূপ দর্শন করে, ভক্ত পরমতত্ত্বকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করেন।
ভগবৎ সন্দর্ভে শ্রীল জীব গোস্বামী বলেছেন–“পরমেশ্বর ভগবানের মধ্যে পরমতত্ত্বের পূর্ণ ধারণা উপলব্ধি করা যায, কারণ তিনি হচ্ছেন সর্বশক্তিমান এবং সমস্ত অপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী। ব্রহ্মজ্যোতি মধ্যে পরমতত্ত্বের পূর্ণ শক্তি উপলব্ধি করা যায় না; তাই ব্রহ্ম-উপলব্ধি হচ্ছে পুরুষোত্তম মধ্যে ভগবানের কেবলমাত্র আংশিক উপলব্ধি। হে জ্ঞানবান ঋষিগণ, ভগবান্্ শব্দের প্রথম অক্ষরটি দুটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ-প্রথমত ‘যিনি সম্পূর্ণরূপে প্রতিপালন করেন’ এই অর্থে এবং দ্বিতীয়তঃ ‘অভিভাবক’ অর্থে। দ্বিতীয় অক্ষর (গ) অর্থ পথপ্রদর্শক, পরিচালক বা স্রষ্টা। ব শব্দটি ইঙ্গিত করছে যে, সমস্ত জীবেরা তাঁর মধ্যে বাস করে এবং তিনিও সমস্ত জীবের মধ্যে বাস করেন। পক্ষান্তের, অপ্রাকৃত শব্দ ভগবান সম্পূর্ণভাবে জড় হেয়তাশূণ্য অসীম জ্ঞান, বিভূতি, শক্তি, ঐশ্বর্য, বল এবং প্রতিপত্তির প্রতীক।”
ভগবান তাঁর শুদ্ধ ভক্তবৃন্দকে পূর্ণভাবে প্রতিপালন করেন এবং ভগবদ্ভক্তির সাফল্যের পথে ক্রমশ উন্নতি সাধনের জন্য তিনি তাঁদেরকে পরিচালিত করেন। তাঁর ভক্তদের পরিচালক হিসাবে নিজেকে স্বয়ং তাদের দান করে, তিনি চরমে ভগবদ্ভক্তির বাঞ্ছিত ফল প্রদান করেন। ভগবানের অহৈতুকী কৃপায় ভগবদ্ভক্তেরা সরাসরিভাবে ভগবানকে চাক্ষুষ দর্শন করেন, এভাবেই সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রহলোকে গোলক বৃন্দাবন পৌঁছতে ভগবান তাঁর ভক্তদের সহায়তা করেন। ¯্রষ্টা হওয়ার ফলে তাঁর ভক্তদের তিনি সকল প্রকার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা প্রদান করতে পারেন, যাতে ভক্ত পরিশেষে তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারেন। ভগবান সর্বকারণের কারণ, এবং যেহেতু তাঁর কোন কারণ নেই, তাই তিনি হচ্ছেন আদি কারণ। সুতরাং তাঁর নিজের অন্তরঙ্গা শক্তিকে আত্মমায়া প্রকাশ করে তিনি নিজেকেই উপভোগ করেন। বহিরঙ্গা শক্তি ঠিক তাঁর দ্বার প্রকাশিত হয় না, কেননা তিনি নিজেকে পুরুষরূপে বিস্তার করেন এবং এই সকল রূপেই তিনি জড় প্রকাশকে প্রতিপালন করেন। এই অংশ-বিস্তার দ্বারা তিনি জড় জগৎ সৃষ্টি, পালন ও ধ্বংস করেন।
জীবেরাও ভগবানের বিভিন্ন অংশ এবং যেহেতু তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রভু হওয়ার ও পরমেশ্বর ভগবানকে অনুকরণ করার বাসনা পোষণ করে, তাই প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব করার তাদের প্রবণতাকে পূর্ণরূপে কাজে লাগানোর জন্য তিনি তাদেরকে পছন্দ করার অনুমতি দেন। তাঁর অবিচ্ছিন্ন অংশ জীবদের উপস্থিতিতে দৃশ্যমান সমগ্র জগৎ ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার দ্বারা আলোড়িত হয়। এভাবেই জড়া প্রকৃতির ওপর প্রভুত্ব করার সব সুযোগই জীবদের প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু পরম নিয়ন্তা হচ্ছেন পরমাত্মা ভগবান স্বয়ং এবং পরমাত্মা একজন পুরুষাবতার। তাই জীব বা আত্মা এবং পরম নিয়ন্তা পরমাত্মার মধ্যে অনেক ভেদ আছে। পরমাত্মা হচ্ছেন নিয়ন্তা এবং আত্মা হচ্ছে নিয়ন্ত্রিত জীব; তাই তাঁরা একই স্তরের নয়। পরমাত্মা যেহেতু আত্মার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করেন, তাই তিনি জীবাত্মার সর্বক্ষণের সহচর রূপে পরিজ্ঞাত।
ভগবানের সর্বব্যাপী রূপ–সুপ্ত, জাগ্রত ও অব্যক্ত সর্ব অবস্থায় যা বর্তমান এবং যা থেকে বদ্ধ ও মুক্ত-আত্মারূপে জীবশক্তির সৃষ্টি হয়–তাকেই ব্রহ্ম বলে। ভগবান যেহেতু পরমাত্মা ও ব্রহ্মের উৎস, তাই তিনি হচ্ছেন সমগ্র জীবকুল ও অস্তিত্বশীল সব কিছুরই উৎস। যিনি এটি জানেন, তিনি তৎক্ষণাৎ ভগবৎ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এই রকম শুদ্ধ ও সম্পূর্ণরূপে অভিজ্ঞ ভগবানের একজন ভক্ত সর্বান্তঃকরণে তাঁর প্রতি সম্পূর্ণরূপে আসক্ত হন এবং যখনই এই প্রকার ভক্ত স্বজাতীয় স্নিগ্ন ভক্তদের সমাবেশে মিলিত হন, তখন তিনি ভগবানের অপ্রাকৃত লীলার গুণকীর্তন ছাড়া আর কিছু করেন না। যারা শুদ্ধ ভক্ত নয় এবং যারা কেবলমাত্র ভগবানের ব্রহ্ম বা পরমাত্মা উপলব্ধি করেছে, তারা শুদ্ধ ভক্তদের ক্রিয়াকলাপ হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। ভগবান শুদ্ধ ভক্তদের হৃদয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞান প্রদান করে সর্বদাই তাঁদের সাহায্য করেন; এভাবেই তাঁর বিশেষ অনুকম্পাবশত সমস্ত অজ্ঞানের অন্ধকার বিদূরিত হয়। মনোধর্মী জ্ঞানীরা এবং যোগীরা এটি চিন্তা করতে পারে না, কারণ তারা কম-বেশি নিজেদের শক্তির ওপরই নির্ভরশীল। কঠোপনিষেদে বলা হয়েছে, “যাঁদেরকে তিনি অনুগ্রহ করেন, একমাত্র তাঁরাই ভগবানকে জানতে পারেন, অন্য কেউ নয়। এই প্রকার অনুগ্রহ একমাত্র তাঁর শুদ্ধ ভক্তদের ওপর অর্পিত হয়। শ্রীঈশোপনিষদ ভগবানের অনুগ্রহ এভাবেই উল্লেখ করেছে, যা ব্রহ্মজ্যোতির সীমানার ঊর্ধ্বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here