কাটা বনাম ফুল (শেষ পর্ব) শ্রীজগন্নাথের কৃপা

0
16

কে জগন্নাথের অহৈতুকি কৃপার কথা উপলব্ধি করতে পারে? ঔরঙ্গজেবের প্রাণপণ প্রচেষ্ঠা সত্ত্বেও জগন্নাথের লক্ষ লক্ষ ভক্ত পেলেন এমন এক উপহার যা বহুদিন যাবৎ তাদের অভিলাষিত ছিল– ভগবানের দিব্যরূপের দর্শন।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পুরীতে তখন আধ্যাত্মিক ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা চলছে। এইসময় ভগবান নৃসিংহদেবের একজন পরম ভক্ত শ্রীরাম দৈয়িত গোস্বামী যিনি দীননাথ নামে পরিচিত, তিনি পুনরায় রথযাত্রা শুরু করার অনুমতি প্রার্থনায় সম্রাটের কাছে গেলেন। ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেব একটি স্বপ্ন দেখলেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন ভগবান শ্রীজগন্নাথ তাকে রথযাত্রা উৎসব পুনরায় শুরু করার আদেশ জারি করার জন্য নির্দেশ দিলেন। পরদিন ঔরঙ্গজেব যখন তার পূর্বের রাত্রীর স্বপ্নাদেশ সর্ম্পকে ভাবছিলেন তখন রাম দৈয়িত গোস্বামী সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে রথযাত্রা উৎসবের অনুমতি প্রদান করার জন্য অনুরোধ জানালেন। তৎক্ষণাৎ ঔরঙ্গজেব উপলব্ধি করলেন কয়েকদিন যাবত তার সাথে ঘটা সকল অদ্ভুত ঘটনা প্রকৃতপক্ষে জগন্নাথের কৃপা, নির্দেশ ও ইঙ্গিত। এরপর ঔরঙ্গজেবের হৃদয় পরিবর্তিত হল। তিনি তাঁর সকল অপরাধের জন্য অনুশোচনা করতে লাগলেন। তখন তিনি অপরাধমুক্তির উদ্দেশ্য শ্রীজগন্নাথ মন্দিরকে মার্কেন্ডপুর তাহসিলের (বর্তমানে খুরদা রেল স্টেশন জাংশন) কিছু সম্পত্তি প্রদান করেন। একসময় যিনি জগন্নাথ মন্দিরকে ও জগন্নাথকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন তিনি হঠাৎ জগন্নাথের কৃপায় পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে গেলেন। ঔরঙ্গজেব কর্তৃক জগন্নাথ মন্দিরকে প্রদান করা সম্পত্তি দানের কাগজটি এখনো উড়িষ্যা সরকারী আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে।
১৭০৩ সালে মুরশিদ কুলি খান যখন উড়িষ্যার গর্ভনর হন তখন তিনি রথযাত্রার উপর সকল নিষেধাজ্ঞা তুলে দেন। তখন গজপতি দিব্যসিংহ দেব আনন্দের সাথে নতুন রথ তৈরি করে এবং অত্যন্ত চমৎকারভাবে রথযাত্রা উৎসবের আয়োজন করেন। সেই বছর পুরীর ৫৯টি মঠের বৈষ্ণবেরা রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করে একটি পরম উদ্দীপনাময় সংকীর্তন শোভাযাত্রা উপহার দেন।

১৭০৭ সালে ৮৮ বছর বয়সে এক অজানা কারণে মৃত্যুবরণ করেন মোঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব। তার সমগ্রজীবনের নানা কার্যাবলী জানা সত্ত্বেও তার কিছু শেষ উক্তি সত্যিকার আকর্ষণীয়–
“আমি একাকী এসেছি এবং আমি একজন অপরিচিতের মত চলে যাব। আমি জানি না আমি কে এবং আমি কি করছি তাও আমি জানি না। আমি অনেক গুনাহ্ (পাপকর্ম) করেছি এবং আমি জানি না আমার জন্য কি শাস্তি অপেক্ষা করছে।” (মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে তাঁর ২য় পুত্র মোহাম্মদকে জানানো মন্তব্য)
“এই কয়েকদিনের যাত্রীকে (ঔরঙ্গজেব) সমাহিত করবে একটি বিচ্যুত উপত্যকার সামনে থাকা পথে এবং মাথাটি রাখবে উন্মুক্ত। কেননা সকল মহা গুনাহ্কারীদের যদি সর্বশক্তিমান শাসক খোঁদার সম্মুখে উন্মুক্ত মস্তকে সমাহিত করা হয় তবে সে অবশ্যই ক্ষমার যোগ্যতা প্রাপ্ত হয়।” (স্বয়ং ঔরঙ্গজেবের শেষ উইলের ৪র্থ নির্দেশনা)
স্বয়ং ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর আগের এই বক্তব্যসমূহ দেখে আশ্চর্য হতে হয়। ঔরঙ্গজেবের এই নিদারূণ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনাময় দৈন্যতা এবং মর্মভেদী অনুতাপ কি কৃষ্ণচিন্তার ফল নয়; যদিও যার ছিল কৃষ্ণবিদ্বেষের ভাব? এই বিশেষ ভাব কি পরম কৃপাময় শ্রীজগন্নাথের স্বপ্নাদর্শন তথা অপরিসীম কৃপার ফল? তিনি সমগ্রজীবন ভগবানের মন্দির ধ্বংসের কথা চিন্তা করতে করতে পরোক্ষভাবে ভগবানের চিন্তায় মগ্ন ছিলেন।
এটি অবশ্যই অচিন্তনীয় নয় যে সর্বময় কৃপার সাগর পরম ঈশ্বর সর্বাপেক্ষা পাপী ও তাঁকে শক্র মনে করা ব্যক্তির প্রতি কৃপা প্রদর্শন করতে পারেন। কংসও কৃষ্ণের প্রতি ভয়ের কারণে কৃষ্ণকৃপা লাভ করেন। শিশুপাল ও অন্যান্য রাজাগণ কৃষ্ণের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে কৃপা লাভ করেন। নারদ মুনী যুধিষ্টির মহারাজকে বলেন (শ্রীমদ্ভাগবত ৭/১/২৯)–
এবং কৃষ্ণে ভগবতি মায়ামনুজ ঈশ্বরে।
বৈরেণ পূতপাপানস্তমাপুরনুচিন্তয়া ॥
অনুবাদ: বদ্ধ জীবেরা যদি কোন না কোনও মতে কেবল সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করেন, তা হলে তাঁরাও তাঁদের সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হবেন। আরাধ্য ভগবানরূপেই হোক অথবা শত্রুভাবেই হোক, নিরন্তর তাঁর চিন্তা করার ফলে তাঁরা চিন্ময় দেহ প্রাপ্ত হবেন।

মাসিক চৈতন্য সন্দেশ ও ব্যাক টু গডহেড এর ।। গ্রাহক ও এজেন্ট হতে পারেন

প্রয়োজনে : 01820-133161, 01758-878816, 01838-144699

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here