কাঞ্চিপুরম্

0
26

আশীর্বাদ প্রদানকারী রাজাদের আলয়

দক্ষিণ ভারতের রাশি রাশি মন্দিরের এই শহরটি সহস্র বছরের প্রাচীন পরম মহিমাময় বৈষ্ণব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।

অদ্ভুত হরি দাস

ভগবান ভরদ্রাজ পেরুমলের অপ্রাকৃত বিগ্রহ সঙ্গে রয়েছে অন্য বিগ্রহ পেরুনদেবী থ্যায়ার (বামে)

শহরটির নাম কাঞ্চিপুরম। শহরটি একদিকে বহন করছে তার সুপ্রাচীন রেশম শিল্পের ঐতিহ্য, অন্যদিকে বহন করছে এক মহান সন্ত ও তাঁর আরাধ্য দেবতার অপূর্ব সব লীলাকথা। সেই মহান সন্ত তথা পরম বৈষ্ণব হলেন শ্রীরামানুচার্য। এই শহরটি শ্রী রামানুচার্য ও তাঁর আরাধ্য দেব ভগবান শ্রী ভরদ্রাজের জন্য সারা ভারতবর্ষে সুপরিচিত। তামিলনাড়ুর ঠিক উত্তরের এই শহরটিতে প্রায় একশ মন্দির আছে। এই মন্দিরগুলোর আকর্ষণে সারা বছরেই তীর্থযাত্রীদের ভীড় যেন লেগেই থাকে এই শহরে। এর মধ্যে পনেরটি মন্দির যা রামানুচার্য কর্তৃক প্রবর্তিত শ্রী সম্প্রদায়ের। এই পনেরটি মন্দির যে জায়গায় অবস্থিত সেই স্থানটিকে বলা হয় দিব্য দেশামস্ (বিশেষ চিন্ময় স্থান)। এই মন্দিরগুলো নির্মিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪২০০ থেকে ২৭০০ এর মধ্যে এবং এগুলো নির্মাণ করেছিলেন দক্ষিণ ভারতের মহান বৈষ্ণব আচার্যরা, যাদের আলোয়ার নামে ডাকা হত। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু ও মাধবাচার্য শহরটি বিজয় করেছিলেন। এই শহরটির আরেকটি পরিচয় হলো এটি মৌর্য সাম্রাজ্যের মন্ত্রী ও নীতি শাস্ত্রের রচয়িতা শ্রী চাণক্য পণ্ডিতের আবির্ভাবস্থলী। এটি বেদান্ত দেশীকারও আবির্ভাবস্থলী যিনি শ্রী সম্প্রদায়ের আরেক আচার্য। তিনি রামানুচার্যের পরে আচার্য পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। কথিত আছে যে, কাঞ্চিপুরমের আরাধ্য দেব শ্রী ভরদ্রাজ রামানুচার্যের গুরু হিসেবে রামানুচার্যকে বিশেষ্টাদ্বৈতবাদ তত্ত্বের অন্যতম তত্ত্বগুলো প্রদান করেছিলেন।
আমি এমন এক বিশেষ সময়ে কাঞ্চিপুরমে এসেছিলাম যখন তাতাচার সম্প্রদায়ের আরেক আচার্য তাতা দেশিকার আবির্ভাব বার্ষিকীর উৎসব চলছিল। সেই সময়ে তাতা দেশিকার যথেষ্ট প্রভাব চিল কাঞ্চিপুরমে। আমি আবির্ভাব উৎসবে যোগ দেবার জন্য কালবিলম্ব না করে উৎসবে স্থানে গেলাম। আমি যখন উৎসব অঙ্গনে গেলাম তখন হাজার হাজার ভক্তের ভিড়। তাদের উচ্চারিত নমঃ নারায়ণায় মন্ত্রে সারা উৎসব অঙ্গন মুখরিত। দেখলাম, সমাধি মন্দিরের সামনে হাজার হাজার মানুষের ভীড়। কিছু যুবকদের দেখতে পেলাম যারাও এই উৎসবে যোগ দিতে এসেছে তাদের মধ্যে একজন হলেন কৃষ্ণ, আমি তাকে এখানে এত জনসমাগমের হেতু জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি জানালেন কিছু কিছু বিশেষ উৎসবে মন্দিরের বিগ্রহগণ মন্দির ছেড়ে বের হয়ে আসেন। সেই রকম আজ এক উৎসব। তাতা দেশিকার সমাধি মন্দিরের সামনে তাতা দেশিকাকে দর্শন দান করার জন্য বিগ্রহগণ মন্দির ছেড়ে বের হবেন আজ এরকম একটি বিশেষ দিন। কারণ পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে তাতা দেশিকা দক্ষিণ ভারতের অনেকগুলো মন্দিরের কার্যনীতি ও স্থাপত্য শৈলীর চরম উৎকর্ষতা সাধন করেন। তাঁর আবির্ভাব দিবসে তাঁর সমাধি ক্ষেত্রে বিশেষ পূজা ও আচার অনুষ্ঠান পালিত হবে।
উৎসব শুরু হয় ঊষালগ্নে ভগবান বিষ্ণু তথা শ্রী ভরদ্রাজ ও তাঁর নিত্যসঙ্গী শ্রীমতি লক্ষ্মীদেবী ও ভূ-দেবীকে বিশেষ একপ্রকার অন্ন ও ফল নিবেদনের মাধ্যমে। এরপরে শুরু হয় অভিষেক অনুষ্ঠান, অভিষেক অনুষ্ঠানে পুরোহিত কর্তৃক উচ্চারিত হয় তৈত্তরিয় উপনিষদ, পুরুষসুক্ত ও তিরুপাবায়। পুরোহিতগণ বিগ্রহকে রাজভোগ, চন্দন ও তুলসী মঞ্জুরী অর্পণ করেন। তারপর তা সমাধি মন্দিরের বাম ও ডানপার্শ্বে ছড়িয়ে থাকা ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিতরিত হয়। মধ্যাহ্নে বিগ্রহগণ শোভাযাত্রা সহকারে মন্দিরে প্রস্থান করে। শোভাযাত্রাটি নিয়ন্ত্রিত হয় ব্রাহ্মণদের দুইটি দল দ্বারা। একদল যারা সামনে যায় তারা দিব্য প্রবন্ধ (তামিল ভাষায় বৈদিক মন্ত্র) উচ্চারণ করে। আর পিছনের দশটি সংস্কৃত বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে। বিগ্রহের শিবীকাটি (পালকি) যখন সেবকেরা বহন করে নিয়ে যায় তখন বিগ্রহগুলো সামনে পিছনে আলতোভাবে ঢুলতে থাকে, সমগ্র শোভাযাত্রাটি এক অনিন্দ্য সুন্দর ফুলের বাগানের মধ্য দিয়ে সুদর্শন নৃসিংহ মন্দিরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ফুলের বাগানের পাশে একটি সরোবর। কথিত আছে পুরণদেবী তাইয়ার (লক্ষ্মীদেবী) এই সরোবরের এক স্বর্ণপদ্মের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে শোভাযাত্রাটি এগিয়ে যায় রামানুচার্যের সমাধি মন্দিরের দিকে। সেখানে শোভাযাত্রাটি কিছু সময়ের জন্য থামে যাতে শ্রীরামানুচার্য বিগ্রহগণকে দর্শন ও তাদের কৃপা আশীর্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। রামানুচার্য তাঁর জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়েছেন শ্রী ভরদ্রাজের অপ্রাকৃত সেবা সম্পাদনের মাধ্যমে। তিনি তাঁর গুরুদেব শ্রী যমুনাচার্য ও সহাপুরণের সাথে এই স্থানেই সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। এই ভাবে সমগ্র শোভাযাত্রা পরিক্রমা করে এসে শেষ হয় যেখান থেকে এটি শুরু হয়েছিলে সেই তাতা দেশিকার সব মন্দিরে। এই জায়গায় বিগ্রহগণ কিছু সময় বিশ্রাম করেন।
সন্ধ্যার সময় আরেকটি শোভাযাত্রা শুরু হয় মন্দিরের প্রধান সড়ক ধরে, তখন ব্রাহ্মণ ও পূণ্যার্থীরা নিরাপত্তা প্রহরীর মত জমকালো সাজে সজ্জিত বিগ্রহগণকে ঘিরে রেখে অগ্রসর হতে থাকে।
তখন ভগবান শ্রীভরদ্রাজ যেসব অলঙ্কারে সুসজ্জিত থাকেন তার মধ্যে একটি বিশেষ অলঙ্কার হলো লর্ড ক্লাইভের হার। লর্ড ক্লাইভ ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম নবাব আরকাডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পর শ্রীভরদ্রাজকে এই হারটি উপহার হিসেবে দেন। তখন তিনি মাদ্রাজের গভর্নর, নবাব আরকাডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রার সময় ক্লাইভের যুদ্ধ বহর কাঞ্চিতে এসে থেমে যায়। ক্লাইভ বেশ কয়েকদিন পেটের অসহ্য যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে থাকেন। লর্ড ক্লাইভ তার আগত যুদ্ধ সম্পর্কে খুবই শঙ্কিত হয়ে উঠেন। এই সময়ে এক পুরোহিত যাচ্ছিল সেই যুদ্ধ বহরের পাশ দিয়ে, লর্ড ক্লাইভের অসহ্য যন্ত্রণা দর্শন করে কৃপাপরবশ হয়ে তাকে ভগবান শ্রী ভরদ্রাজের চরণামৃত মহাপ্রসাদ দেন। লর্ড ক্লাইভ তা গ্রহণ করার পর সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পান। লর্ড ক্লাভের হৃদয় ভরে উঠে কৃতজ্ঞতায় । তিনি প্রতিজ্ঞা করেন নবাবের সাথে যুদ্ধ জয় করে ফেরার পথে তিনি অবশ্যই ভগবান শ্রীভরদ্রাজের মন্দিরে আসবেন এবং নবাবের ধন ভাণ্ডারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটি ভগবানকে উপহার হিসেবে প্রদান করবেন। এটাই হলো সেই লর্ড ক্লাইভ হার।
আরেকবারের ঘটনা, সেবার ভগবান শ্রীভরদ্রাজের সেবকরা গরমের সময় তাকে পাখা দ্বারা ব্যজন করছিলেন। সে সময় লর্ড ক্লাইভ এসেছেন মন্দিরে, তিনি বিগ্রহকে ব্যজন করছে দেখে বিস্মিত হলেন, তিনি ভাবলেন বিগ্রহতো পাথরের তৈরি। তাঁর আবার গরম লাগবে কেন? তখন তিনি তার

কাঞ্চিপুরম্‌ মন্দিরের ছাদে সিলভার ও স্বর্ণের দুটি টিকটিকি রয়েছে। দর্শনার্থীরা এগুলোকে স্পর্শ করে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনা করে।

সন্দেহ পূজারীদের জানালেন, তখন পূজারীরা একটি শুকনো তোয়ালে দ্বারা বিগ্রহের মুখমণ্ডল মুছে তা লর্ড ক্লাইভকে দেন। লর্ড ক্লাইভের বিস্ময়ের সীমা থাকলো না যখন তিনি তোয়ালেটিকে ভেজা দেখতে পেলেন।
সন্ধ্যার কিছু সময় পর বিগ্রহগণকে মূল মন্দিরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কিছু সময় আগে আমি শ্রীধর বাড়াপুরামের সাথে বিগ্রহগণকে দর্শন করতে গেলাম। শ্রীধর হলেন শ্রী সম্প্রদায়ের একজন বৈষ্ণব যার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল মন্দিরগুলো পরিক্রমার সময়। শ্রীধর প্রভু আমাকে শ্রীবিগ্রহের মুখমণ্ডলের ঠিক সামনে নিয়ে গিয়ে হাজির করলেন। আমি ভগবানকে হৃদয় ভরে দর্শন করলাম। ইতিহাস অনুসারে শ্রী ভরদ্রাজ যজ্ঞ হতে আবির্ভূত হয়েছিলেন আর সেই যজ্ঞ সম্পন্ন করেছিল স্বয়ং ব্রহ্মা, শ্রীধর প্রভু বললেন, শ্রী ভরদ্রাজের মুখে বেশ কিছু গোলাপী আভাযুক্ত দাগ আছে যা তিনি যজ্ঞ হতে প্রকটিত হওয়ার সময় প্রাপ্ত হয়েছিলেন। শ্রীধর প্রভু অতি উৎসাহের সাথে ভগবানের কথা আমার সাথে আলাপ করছিলেন। আমি তাকে কাঞ্চিপুরমের অন্যান্য মন্দিরগুলো ভ্রমণের সময় আমার সাথী হওয়ার জন্য বিনীত প্রার্থনা জানালাম।
কাঞ্চীপুরমের বিচিত্র তথ্যের সন্ধানে আমার যাত্রা চলতে থাকলো। পরদিন শ্রীধর প্রভু আমাকে বললেন, প্রথমেই আমাদের ভরদ্রাজ মন্দিরের আদিকথা, তার মধ্যস্থ মন্দির ও মন্দিরের যে স্থাপত্য শৈলী সে সম্পর্কে জানা উচিত। তারপর আমা

লহ্মীদেবীর বিগ্রহ

দের অন্য মন্দিরে যাওয়া উচিত। আমি সানন্দে রাজি হলাম। সকাল বেলাটা আমাদের শুরু হলো এক অপ্রাকৃত স্বাদযুক্ত প্রসাদ দিয়ে যা বিতরিত হচ্ছিল মন্দিরের মূল ফটকে। প্রসাদরূপী ভগবানের অপ্রাকৃত কৃপা গ্রহণ করার পর আমি এক অনির্বচনীয় আনন্দ অনুভব করলাম। এরপর আমরা একটি হলের দিকে এগিয়ে গেলাম। হলটির একশটি স্তম্ভ আছে। আর স্তম্ভগুলো সৌন্দর্য ও তার কারুকার্য যে কাউকেই বিমোহিত করবে। স্তম্ভগুলো একটি মাত্র কষ্টি শিলা হতে দক্ষ কর্মীর হাত দিয়ে অপূর্ব সুন্দর কারুকার্য শোভিত হয়ে বের হয়ে এসেছে। সমগ্র হলটি জুড়ে মানুষেরা বিভিন্ন ধরনের মুখোশ পরে নৃত্য করছে। কেউ বা অশ্বারোহী, কেউ বা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর বিভিন্ন অবতারের বেশে, কেউ বা রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্রের বেশে। সমস্ত হলটি জুড়ে তানপুরার সুরের মূর্ছনা। হলটির শেষ প্রান্তে আছে একটি বিশাল প্লাটফরম যা ব্যবহৃত হয় একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে। এই বেদীতেই ভগবান শ্রী ভরদ্রাজ ও শ্রীমতি লক্ষ্মীদেবীর বিবাহ সম্পন্ন হয়। পরবর্তীতে হলের পিছনের দিকে অনন্ত তীর্থম্ নামে এক সরোবরের নিকট গেলাম। এই সরোবরটি স্বয়ং অনন্তদেব প্রকটিত করেন স্বয়ং বরাহদেবের সম্মুখে। অনন্তদেব হলেন ভগবান শ্রীবিষ্ণুর অবতার। তিনি সর্পাসন রূপে ভগবানের সেবা করে থাকেন। মন্দিরের আসল বিগ্রহটি এই সরোবরের নিচে একটি মন্দিরের মধ্যে রক্ষিত রূপার বাক্সে থাকে।

ভরদ্রাজ মন্দিরের অনন্ত তীর্থ সরোবর

শ্রীধর প্রভু আমাকে বললেন, একবার গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের সময় ভগবান শ্রী ভরদ্রাজ খুব গরম অনুভব করছিলেন। তিনি তাঁর এক সেবককে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে বললেন আমাকে পানির নিচে রেখে আস। প্রতি চল্লিশ বছর অন্তর বিগ্রহ পানির বাইরে উত্থিত হন এবং আটচল্লিশ দিন যাবৎ পূজিত হন। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো আমি সেই সময়েই মন্দিরে এসেছিলাম।
শ্রীধর প্রভু আর আমি এগিয়ে যেতে থাকলাম, শ্রীভরদ্রাজের মূল মন্দিরের চারদিকে বিভিন্ন মন্দির আছে। ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির, দর্পণ মহল, শ্ৰী বিগ্রহের রন্ধনশালা, এগুলো মূল মন্দিরকে ঘিরেই অবস্থান করে। শ্রীধর প্রভু আমাকে বললেন, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও শুদ্ধ উপকরণ এই রন্ধনশালায় ব্যবহৃত হয়। জ্বালানী কাঠ, দস্তা ও রূপার তৈজসপত্র এবং সর্বোপরি পানীয় জল সবকিছুই নিজস্ব উৎস হতে সরবরাহ করা হয় নিজস্ব খামারে উৎপাদিত শস্য ফলমূল বিগ্রহের রন্ধনকক্ষে সরবরাহ হয়ে থাকে।
পরিক্রমার তৃতীয় ধাপে আমরা গমন করলাম আন্দল মন্দির এবং ভগবান শ্রী ভরদ্র্যাজের নিত্য সহচরী শ্রী পুরণদেবী তাইয়ার (লক্ষ্মীদেবী) মন্দিরে। পরবর্তীতে আমরা গমন করলাম নৃসিংহদেবের মন্দিরে, যার কাছে আমরা ভক্তিপথের প্রতিবন্ধকতা হতে রক্ষার জন্য প্রার্থনা করি। ভগবান শ্রীনৃসিংহদেব পূজিত হচ্ছে এক বিশাল পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত এক গুহার মধ্যে যা নির্মাণ করেন চোলা রাজ। এটি নৃসিংহক্ষেত্র নামে পরিচিত। এই ভগবান শ্রীনৃসিংহ ব্রহ্মাকে তাঁর উদ্দেশ্যে যজ্ঞ সম্পাদন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। 

মূল মন্দিরের আলোক ঝলকানী

আচার্য বেদান্ত দেশাই

মূল ভরদ্রাজ মন্দিরের আশেপাশেই এসব মন্দিরগুলো অবস্থিত ছিল তাই ক্রমান্বয়ে মন্দিরগুলো দর্শন করার পর আমরা আবার ফিরে যাচ্ছি ভগবান শ্রী ভরদ্রাজের মন্দিরে। মূল মন্দিরে পৌছানোর জন্য আমাদের পেরোতে হবে কয়েক ধাপ সিঁড়ি। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকলাম, যখন আমরা মূল মন্দিরের প্রথম তলায় আসলাম হঠাৎ আলোর ঝলকানীতে চোখ বিমুগ্ধ হয়ে গেল। প্রবেশ পথের প্রতিটি সিঁড়িতে ভগবান শ্রী ভরদ্রাজের উদ্দেশ্যে ঘৃত প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়েছে, এটি দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্য। অভ্যাগতকে অভিবাদন জানানোর প্রথা।
ভগবান শ্রী ভরদ্রাজ যাঁর নামের অর্থ হলো যিনি সকল বর প্রদানের সিদ্ধহস্ত। তিনি তাঁর তিনটি হাতে ধারণ করে আছেন শঙ্খ, চক্র ও গদা। তাঁর নিচে ডানদিকে হাতটি প্রসারিত হয়ে আছে আশীর্বাদ প্রদানের ভঙ্গিতে যা প্রকাশ করছে মা সূচঃ অর্থাৎ (দুশ্চিন্তা করো না) যার অর্থ তিনি তাঁর শরণাগত সকল ভক্তকে সর্বতোভাবে রক্ষা করছেন। ভগবান খুব রাজসিকভাবে সজ্জিত থাকেন। তাঁকে বিভিন্ন মনি মুক্তা, হীরার অলঙ্কার দ্বারা সজ্জিত করা হয়। তাঁর গলায় ঝুলতে থাকে এক সোনার হার যেটিতে ভগবানের বিষ্ণুর সহস্ৰ নাম খোদিত আছে।
আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম। একজন পুরোহিত ভগবানের চরণে নিবেদিত তুলসী পত্র ও চরণামৃত আমাদের দেন এবং ভগবান ও তাঁর ভক্তদের সম্পাদিত বিভিন্ন লীলা আমাদের কাছে বর্ণনা করেন। তিনি রামানুচার্য ও তাঁর গুরু কাঞ্চিপুরানার মহিমার কথা বললেন। যাঁরা তাঁদের সরল ও শুদ্ধ ভক্তির প্রভাবে স্বয়ং ভগবানের সাথে কথা বলতে পারতেন। তিনি রামানুচার্যের আরেক শিষ্য কুরেসার কথা বললেন। একবার অত্যাচারী রাজা কৌচালোঙ্গা বৈষ্ণবদের বিরুদ্ধে খুব অত্যাচারী হয়ে তাকে পাপাচারের দণ্ড হিসেবে অন্ধ করে দেন তার তপশক্তির বলে। কুরেসা তার গুরুদেবের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। গুরুর প্রতি অকৃত্রিম সেবা ও সমর্পণের পুরস্কার হিসেবে ভগবান তাকে তাঁর নিজ আলয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
শ্রীধর প্রভু আর আমি বাকরুদ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ যাবৎ ভগবান ও তাঁর ভক্তের লীলার কথা শ্রবণ করছিলাম। শ্রবণ করতে করতে আমাদের মনে হচ্ছিল তাঁর শক্তির প্রভাবে আমরা এস্থানে প্রোথিত হয়ে গেছি। নড়াচড়ার শক্তিও আমাদের ছিল না।
পরের দিন শ্রীধর প্রভু আর আমি শহরের অন্যান্য মন্দির ও বৈষ্ণবীয় স্থানগুলো দর্শন করতে বেরুলাম, শহরের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা রীতিমত যেন প্রতিযোগিতায় নামলাম। একদিকে মানুষের ঢল অন্যদিকে কিছু কিছু মন্দির পুরোহিতদের কারণে খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়ও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। তখনই আমাদের পরিক্রমা সার্থকতার মুখ দেখবে যখন কাঞ্চিপুরম্ নগরীর সমস্ত বিষ্ণু বিগ্রহের মন্দিরগুলো নির্বিঘ্নে দর্শন সমাপ্ত করতে পারবো। তবে শহরের সকল বিষ্ণু বিগ্রহের মধ্যে আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু ও চব্বিশ ফুট প্রশস্ত বিশিষ্ট ভগবান শ্রী তিরিঙ্গম এর বিগ্রহ এবং তার সাথে সাথে পঁচিশ ফুট উঁচু পাণ্ডব দূত নামে একটি বিগ্রহ। সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো,

ভগবান ভরদ্রাজ বিগ্রহকে মন্দিরের পূজারীরা ভ্রমনে নিয়ে যাচ্ছেন

এই সকল বিগ্রহগুলো একটি মাত্র শিলা খণ্ড হতে প্রকটিত হয়েছে। আরেকটি বিগ্রহ ছিল এয়াতাকারী তিনি নিজেকে শায়িত অবস্থা সকলকে দর্শন দিচ্ছেন। আমরা প্রায় সকল মন্দিরেই সচরাচর বিষ্ণু বিগ্রহকে শায়িত অবস্থায় দেখে থাকি বাম পাশে, কিন্তু এখানে তিনি ডানে শায়িত অবস্থায় থেকে সকল ভক্তবৃন্দকে আকর্ষণ করছেন তাঁর নিজের দিকে। এই বিগ্রহ ও মন্দির নিয়ে আছে অনেক মজার কাহিনী। কথিত আছে একবার কাঞ্চি রাজা কর্তৃক ভগবানের মহান ভক্ত তিরুমালসাই আলবর ও তাঁর শিষ্য কনকানন কাঞ্চি হতে বহিস্কৃত হন। তাঁদের অপরাধ ছিল তাঁরা রাজাকে অভিষ্ট বর প্রদান করতে অসমর্থ ছিলেন। বৃদ্ধ রাজা তাঁদের কাছে অনন্ত যৌবন প্রার্থনা করেছিলেন। কেননা এই বৃদ্ধ শরীরে তিনি যৌন আনন্দ উপভোগ করতে পারছিলেন না। তিনি যৌবন প্রার্থনা করেছিলেন যাতে তিনি তার ইচ্ছামত যৌন আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। কিন্তু আলবর তাতে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। যার ফলশ্রুতিতে এই দণ্ড। আলবর ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলেন, হে প্রভু! আমি আপনাকে ছাড়া কী করে জীবন ধারণ করবো? সাথে সাথে উত্তর এল, হে আলবর আমিও তোমার সাথে এই মন্দির ও শহর ত্যাগ করবো।
ভগবান তাঁর ভক্তের সঙ্গে মন্দির ত্যাগ করার সাথে সাথে সমগ্র শহর অন্ধকারে ছেয়ে গেল । যখন রাজার কাছে এই সংবাদ পৌছালো তখন রাজা তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং তার কর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তাকে পুনরায় শহরে ফিরে আসার জন্য অনুরোধ করলেন। আলবর আবার মন্দিরে ফিরে আসলেন। মন্দিরের প্রবেশের সাথে সাথে বিগ্রহ বেদীতে প্রকটিত হলো এবং তৎক্ষণাৎ অন্ধকারও দূরীভূত হল। এরপর আমরা গেলাম কামাক্ষি মন্দিরে, এখানে ভক্তগণ দুর্গা দেবীকে কামাক্ষি দেবী রূপে অর্চন করে। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে এই কামাক্ষি দেবীর মহিমার কথা ভগবান শ্রী হয়গ্রীব ঋষি অগস্ত্যের কাছে প্রকাশ করেন। ভগবান হয়গ্রীব অযোধ্যার রাজা ও শ্রীরামচন্দ্রের পিতা দশরথকে এই স্থানে এসে দেবী কামাক্ষির কাছে সন্তান কামনা করতে বলেছিলেন। আমরা দিব্য দেশমের শেষ মন্দির বিজয়া রাঘব মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। একটি লোকাল বাসে চেপে তিরুপত কুলির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম যা কাঞ্চিপুরম হতে সাত কিলোমিটার দূরে। বামন পুরাণ অনুসারে ভগবান শ্রীরামচন্দ্র বৃদ্ধ জটায়ুর উদ্দেশ্যে শেষকৃত্য এই স্থানেই করেছিলেন। জটায়ু (একটি বিশাল পাখী) রাবণ যখন সীতা হরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন তার সাথে ভীষণ যুদ্ধ করেন এবং অবশেষে মৃত্যুমুখে পতিত হন। আমরা মন্দিরে পুকুরের বিপরীত পাশে এক স্মৃতি বিজরিত সভাকক্ষে গেলাম। এই জায়গায় শ্রীরামানুচার্য যাদব প্রকাশকে অদ্বৈতবাদ তত্ত্ব প্রদান করেন। কিন্ত যাদব প্রকাশ তাঁর গুরু কর্তৃক প্রদত্ত নির্বিশেষবাদ তত্ত্ব নিয়ে এতটাই বিমোহিত ছিলেন যে, তিনি তা প্রত্যাখান করেন এবং রামানুচার্যকে আশ্রম হতে বহিস্কার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তার ভুল বুঝতে পারেন এবং রামানুচার্যের চরণে পতিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করেন। প্রায় সপ্তাহকাল কাটালাম কাঞ্চিপুরমে ।
ভগবানের এই দিব্য লীলাস্থলী ছেড়ে আমার আসতে মন চাইছিল না। আমি প্রতিদিনই নতুন নতুন নিত্য লীলার সন্ধান পাচ্ছিলাম এখানে যা সম্পাদিত হয়েছিল, স্বয়ং ভগবান ও তাঁর ভক্তের মধ্যে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, অনেক লীলার কথা আমার স্মরণে নেই। ভগবানের দিব্য মুখশ্রী যখন আমার নয়নপটে উদ্ভাসিত হয় তখন আমি রোমাঞ্চিত হই। যা আমার চেতনাকে করে শাণিত এবং আত্মাকে করে পরিশুদ্ধ। আমি আজ হৃদয়ে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি ভগবান শ্রী ভরদ্রাজের অনিন্দনীয় হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী। আমি বার বার ফিরে যাব সেখানে আমার হৃদয়ে এই দিব্যভাব জাগরিত রাখার মানসে। 


 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here