কলিকালোচিত প্রসঙ্গ

0
27

জগদ্গুরু ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর: কলির নানাপ্রকার দোষ থাকলেও একটি মহৎ গুণ আছে। সেটি নামকীর্তন। সুতরাং নাম কীর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দোষগুলিও গুণ হয়ে পড়ে মনে করে কোন কোন ভক্তাভিমানী কলির অবস্থিতি পাঁচটিকেও ‘ভজনাঙ্গ’ মনে করেন।

কলি যেখানে অবস্থান করে, সেখানে পাপ বিরাজমান। যেখানে পাপ, সেখানে নাম-কীর্তন প্রবল হতে পারে না। কীর্তনের ছলে পাপাচরণ নামাপরাধের অন্যতম। পাশাখেলা, নেশাকরা, অবৈধ যৌনসঙ্গ, আমিষাহার এবং ঐগুলো ইন্দ্রিয়তর্পণের মানসে অর্থসংগ্রহ–এই পাঁচটি কলিজনোচিত পাপ। নামবলে এই পাঁচটি পাপ হজম করার চেষ্টাই ‘নামাবলে পাপাচরণ’ নামক অপরাধ। ঐটি নাম-কীর্তন নহে।

‘নামে রুচি’ থাকলে নাম ও নামীতে ভেদ বুদ্ধি থাকে না। কল্পনা প্রভাবে ‘আমি নাম রচনা করতে পারি’ মনে করা অহঙ্কারের পরিচয়। যাঁরা অহংকার-বিমূঢ়াত্মা তারা প্রতিষ্ঠা লাভের বশবর্তী হয়ে নাম-ভজন-প্রণালী কল্পনা করেন। সাধুরা সেগুলোকে পছন্দ করেন না। এজন্য আচার্য শ্রীল গোপালভট্ট গোস্বামীপাদ বলেন, সাধুগুরু- -নির্দেশ ব্যতীত নামের রচনাকারী হওয়া উচিত নহে। গুরুর উপদেশক্রমেই জীবের অনুগ্রহ দীক্ষালাভ ঘটে। স্বয়ং কল্পনা করে স্বপ্নলব্ধ মন্ত্র প্রভৃতির রচনাও গুরু অবজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। বৈষ্ণবের উহা ধর্ম হতে পারে না। ভুঁইফোড় বিশৃঙ্খল অভক্ত, গুরু পরিহার করে নিজের প্রতিষ্ঠাশা কামনা করে। তা তর্কপন্থা বা ব্যতিরেকে পন্থা। সেটি ভক্তির প্রতিকূল বিচার। বৈষ্ণবের বেশধারণ করে, ভগবন্নামাদিতে বিভূষিত হয়ে হরিভজনের পরিবর্তে অন্য কিছু করা উচিত নহে।

বৈষ্ণবের দীনবেশের সাথে পাশাত্রীড়া শোভা পায় না। দাবা-তাস-পাশা পরমার্থীর ভজনের উপকরণ নহে। তাম্বুল-চর্বণ ও নানাপ্রকার ইন্দ্রিয়তর্পণ বৈষ্ণবজীবনে শোভা পায় না।

রাধাকুণ্ড, কুসুমসরোবর, গোবর্ধন, নন্দীগ্রামাদি ব্রজবীথিসমূহের প্রেমে যারা পড়েছেন তাঁরা কখনো পারফিউম, সুগন্ধি তৈল ব্যবহারে আগ্রহী হন না। তাদেরকে পাশাক্রীড়া ও নেশামত্ত হতে দেখা যায় না। যেখানে সেরূপ ভজনবিরোধী চেষ্টাসমূহ ছলকীর্তনকারীকে গ্রাস করে তাদেরকে সহজিয়াগণ গুরুপদে স্থাপিত করে তাদের পদলেহন করেন; তারা কখনো হরিগুরু-বৈষ্ণবের কৃপালাভে সমর্থ হন না।

অর্বাচীন, কপট, মূৰ্খ, অজ্ঞগণ এরূপ ক্রীড়াপাগল বিলাসী নেশাখোরদিগকে ধর্মপরায়ণ বলে আদর্শ জ্ঞান করে তাদের মুখোচ্চারিত নামাপরাধকে ‘নামকীর্তন’ বলে চালাতে চাইলে তা ভগবানের ও ভক্তের প্রীতি উৎপন্ন করতে কখনো সমর্থ হয় না। গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণ কখনো দ্যূতক্রীড়াসক্ত, আমিষভোজী, ইন্দ্রিয়পরায়ণ, জিহ্বালোভী, যক্ষনামধারী, অধিক অর্থলোভী, ভণ্ড বৈরাগিগণকে ‘গৌড়ীয়’ বলে স্বীকার করেন না।

কপটরা নিজ নিজ দুর্বলতা ও মূর্খতা দ্বারা চালিত হয়ে প্রচারের মানসে ভ্রষ্টাচারিগণকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে নিজেকেও স্ত্রৈণ, নেশাখোর, প্রবঞ্চক ও ইন্দ্রিয়ের দাস করে ফেলেন। কোন আচার্য নিজ প্রতিষ্ঠার জন্য পাপাচারীগণকে ‘গৌড়িয়’ সংজ্ঞায় অভিহিত করে তাদের মঙ্গলাকাঙ্খা করা দূরে থাকুক তাদের চাটুকারসূত্রে পাপাদির প্রশ্রয় দেন মাত্র। আবার কেউ কেউ তাদের পাপকার্যে সাহায্য করার জন্য ‘পরমার্থী’ বলে তাদের পক্ষ সমর্থন করেন।

ধর্মের ছলনায় যে কৈতব, ধর্ম নামে চলছে তা উপেক্ষা করাই সত্যনিষ্ঠের ধর্ম। কিন্তু তা গোপন করার উদ্দেশ্যে বৈষ্ণবনিন্দা বা পরচর্চা করা নীতিবিরুদ্ধ–এই ছলনা যারা বিস্তার করে তাদের কপটতা সকলেই অনায়াসে ধরে ফেলতে পারেন। সমন্বয়বাদী নিজের ভেজাল জিনিসকে খাটি বলে চালাতে গিয়েই সমন্বয়ের ছলনা বিস্তার করেন।

মানুষ নিজের দোষ ঢাকতে গিয়ে যে ছলনা করেন তা দক্ষ ধার্মিক ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ বুঝতে পারে না। পরচর্চা করা পাপের অন্তর্গত, কিন্তু চিকিৎসক রোগীর রোগের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে তার পাপের পূর্ব ইতিহাস সংগ্রহ করেন বা সমাজহিতৈষী সামাজিক অসুবিধা দূর করতে গিয়ে যে পাপের প্রতিকারের জন্য পরচর্চা করেন, সেটি পরচর্চা নয়।

 

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৩ সালে প্রকাশিত ।। ১ম বর্ষ ।। সংখ্যা ১।।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here