এলিয়েন ও ফ্লাইং সসার (২য় পর্ব) হারানো প্রযুক্তি : বৈদিক বিমান

0
74

সদাপৃত দাস

বৈদিক সাহিত্যে বিভিন্ন প্রকারের উড়ন্ত যন্ত্রের বর্ণনা রয়েছে যাদের বিমান বলা হয়। সেগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। ১. মানুষের তৈরি উড়োজাহাজ যেটি পাখির মতো ডানা রয়েছে । ২. অদ্ভূত আকৃতির বাহন যা রহস্যময় পদ্ধতিতে চলে এবং এটি মানুষের দ্বারা তৈরি নয়। প্রথম ভাগের যন্ত্র সমূহের বর্ণনা রয়েছে সাধারণত মধ্য যুগের সংস্কৃত ভাষায় বিভিন্ন শাস্ত্রে বিশেষতঃ যে সমস্ত শাস্ত্র স্থাপত্য বিদ্যা, যন্ত্র বিদ্যা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগের যন্ত্রের কথা উল্লেখিত হয়েছে সুপ্রাচীন ঋগবেদ, মহাভারত, রামায়ণ এবং বিভিন্ন পুরাণ ৷ বিভিন্ন শাস্ত্রের বর্ণনা থেকে বিমানের যে বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় তা বর্তমানের UFO এর কথা মনে করিয়ে দেয়। “বৈমানিক শাস্ত্র নামে একটি প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থ রয়েছে, যেখানে সুবিস্তৃতভাবে উপরিউক্ত দু’প্রকারের বিমানের কলা কৌশল বর্ণিত হয়েছে। এখন এখানে সে মধ্য যুগের বিমান সাহিত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হল।


প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় ভারতের যন্ত্র

সংস্কৃত ভাষায় মেশিনকে বলা হয় যন্ত্র। এই যন্ত্র শব্দটি ব্যাখ্যা করা হয়েছে সমারঙ্গনা সূত্রধর গ্রন্থে যেখানে রাজা ভোজ যন্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, “যেটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং নির্দিষ্ট দিকে ঘুড়ানো যায়, একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় এবং স্বাভাবিক প্রকৃতি অনুসারে যার বেগ কাজ করে সেটি যন্ত্র।” বিভিন্ন প্রকারের যন্ত্র রয়েছে একটি হল তৈল যন্ত্র, যেখানে একটি হুক থাকে এবং যেটি বৃত্তাকারে ষাঁড় কর্তৃক ঘুরানো হয়। এটি সাধারণত বীজ ভাঙ্গন এবং তেল নির্গমনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়া যুদ্ধ যন্ত্রের কথা উল্লেখিত হয়েছে কৈতিয়ার ‘অর্থশাস্ত্রে’। এই গ্রন্থটি খ্রিষ্টের জন্মের তিনশত বছর পূর্বে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। এখানে বেশ কিছু যন্ত্রের কার্যাবলী বর্ণিত হয়েছে যেমন ‘সর্বতোভদ্র’ এটি হচ্ছে একটি ঘূর্ণায়মান চাকা যেখানে পাথরকে দ্রুতবেগে নিক্ষেপ করা হয়। ‘ষড়যন্ত্র’ প্রাচীন তীর নিক্ষেপকারী যন্ত্র। ‘উদঘটিমা’ এই যন্ত্র দ্বারা যেকোনো দেয়াল মুহূর্তেই ধ্বংস করা যায়, কেননা এটি তৈরি হয়েছে বিভিন্ন লোহাখণ্ড দ্বারা। এছাড়া আরেকটি যন্ত্র রয়েছে যেটি প্রবল ঝড় তৈরি করতে পারে যাতে শত্রুপক্ষের সৈন্য সমাবেশে আঘাত হানতে পারে। তৃতীয় শতকের রোমান লেখক ফ্লেবিয়াস ফিলোসট্রেটাস্ বর্ণনা করেছেন, ভারতের সাধুগণ সাধারণত বাইরে থেকে আগত কোনো শত্রুপক্ষের সাথে সরাসরি যুদ্ধ করেন না তার পরিবর্তে তারা দিব্য কামান থেকে বজ্রপাত সৃষ্টি করেন এবং এতে শত্রুপক্ষ সহজেই ভীত হয়। তৎকালীন মনিষীদের এমনই উচ্চতর ক্ষমতা ছিল। ফিলোসট্রেটাস্ আরো বলেন যে, মিশরের হারকিউলিস যখন ভারত আক্রমণ করেন তখন এই সাধুগণ বিভিন্ন অগ্নি ও বায়ু অস্ত্রের দ্বারা তাদের পরাজিত করেন। এছাড়া আলেকজান্ডার একবার তার শিক্ষক এরিস্টেটলকে বলেছিলেন, তিনিও ভারতে এমন অস্ত্রের সম্মুখীন হয়েছিলেন।
আধুনিক শিক্ষাবিদগণ ফিলোসট্রেটাস্ এর বর্ণনা সমূহকে কাল্পনিক বলে মনে করেন। কিন্তু বর্ণিত হয়েছে যে, তৎকালীন সময়ে অধিকাংশ রোমানিয়ানরা ভারতের এই অদ্ভূত অগ্নি ও বায়ু অস্ত্রের কথা জানতো। মহাভারতে বায়ু অস্ত্রের কথা উল্লেখ রয়েছে যাকে বলা হয় ‘বায়ুভয় অস্ত্র’ এবং অগ্নি অস্ত্রের কথা উল্লেখ রয়েছে যার নাম ‘শতাগ্নি’ (একশটি অগ্নি অস্ত্র)। প্রাচীন সকল প্রকারের অস্ত্রসমূহ এতই শক্তিশালী ছিল যে, তা বর্তমানে কল্পনাতীত। প্রাচীন ভারতের বৈদিক শাস্ত্রজ্ঞদের অস্ত্র-শস্ত্র, গোলা বারুদ সম্পর্কে খুব , গভীর জ্ঞান ছিল যা ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। এই বিষয়টি গাস্টব ওপার্ট তার এক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

রোবট এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র

বৈদিক শাস্ত্রে রোবটের কথা বর্ণিত। হয়েছে যার নাম ‘যন্ত্রপুররুষ’ অথবা ‘মেশিন ম্যান’। যেটি মানুষের মতোই আচরণ করে। যেমন বৈশ্বর্যবাস্তু গ্রন্থে উল্লেখ আছে, একজন চিত্রশিল্পী একবার যবন দেশে গিয়ে যন্ত্রাচার্যের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। যিনি ছিলেন একজন যন্ত্রকলাবিদ। সেখানে তিনি একটি যন্ত্র বালিকা দেখেন যে তার চরণ ধুয়ে দেয়। সেই যন্ত্র বালিকা দেখতে অবয়ব মানুষের মতো এবং তার আচরণ মানুষের মতো। কিন্তু তিনি পরবর্তীতে বুঝতে পারেন যে সেই যন্ত্র বালিকা কথা বলতে পারে না। এছাড়া প্রাচীন শাস্ত্রাদিতে বিভিন্ন সম্পদশালী রাজার প্রসাদে বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র থাকার কথা উল্লেখিত আছে যেমন গায়ক ও নৃত্যক পাখি, নৃত্যক হস্তী, সঠিক কাল নিরূপক যন্ত্র যা গজদন্ত দ্বারা তৈরি, এছাড়া একটি মহাকাশ যন্ত্র যা গ্রহগুলোর গতিপথ সঠিকভাবে বর্ণনা করতে সক্ষম।
দ্বাদশ শতকে লিখিত ‘সমারঙ্গনা সূত্রধর’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে – “পুরুষ এবং নারী যন্ত্র সমূহ নকশা করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্য সমাধানের জন্য। এসকল যন্ত্রের প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বিশেষত বিভিন্ন ছিদ্র পিনসমূহ, চোখ, ঘাড়, হাত, বাহু, আঙ্গুলসমূহ প্রয়োজন অনুসারে কাজ করতে পারে। এছাড়া বাকি অংশগুলো মূলত কাষ্ঠ দিয়ে মোড়ানো। কিন্তু বাইরের অংশটি সম্পূর্ণরূপে চামড়া দ্বারা আবদ্ধ করা হয় যাতে তাদেরকে মানুষরূপে চিহ্নিত করা যায়। প্রত্যেকটি হাত এবং পায়ে থাকা রডের মাধ্যমে যন্ত্রটি নাড়াছাড়া করে। এটি আয়নার দিকে তাকানো, সঙ্গীত বাদ্য বাজানো অন্যকে স্পর্শ করা, মনিবের ইচ্ছানুযায়ী কার্য সমাধা করা এমনকি প্রণাম নিবেদনও করতে পারে।”
শুধুমাত্র জাগতিক কার্যসমাধানই নয়, এই সমস্ত রোবটসমূহ মানুষকে আত্মা ও দেহের মধ্যকার সম্বন্ধ সম্পর্কে উপলব্ধিতে সহায়তা করত। তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “হে অর্জুন! পরমেশ্বর ভগবান সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থান করছেন এবং সমস্ত জীবকে দেহরূপ যন্ত্রে আরোহণ করিয়ে মায়ার দ্বারা ভ্রমণ করান।” (গীতা-১৮/৬১) প্রাচীন বৈদিক যুগে মানুষেরা ভগবানের ভাবনায় এতই মগ্ন ছিল যে তারা তাদের যন্ত্রসমূহকেও শুধুমাত্র ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করতো। লেখক রাঘব লিখেছেন, প্রাচীন সময়ে সোমদেব এবং ভোজ যারা যন্ত্র সম্পর্কে বিভিন্ন শাস্ত্রাদি লিখেছেন তারাও একজন নিয়ন্ত্রক দ্বারা যন্ত্র পরিচালনাকে নিজের দেহ আমাদের ইন্দ্রিয় দ্বারা পরিচালনার সাথে তুলনা করেছেন।

উড়োজাহাজ

মধ্য ভারতীয় সাহিত্যে উড়ন্ত যন্ত্রের কথা বিভিন্ন ঘটনায় বর্ণিত হয়েছে। যেমন ‘বন হর্ষচরিত’ গ্রন্থে একটি ঘটনা রয়েছে যেখানে যবন একটি গোলাকৃতির যন্ত্র তৈরি করেন যেটি একটি রাজাকে অপহরণ করতে ব্যবহার করেন। এরপর ধনদীন এর অবন্তী সুন্দরীর কথায় উল্লেখিত আছে। মান্দাতা নামে এক স্থাপত্যবিদ ছিলেন। যিনি উড়ন্ত যন্ত্রের সাহায্যে বহু দূর পাড়ি দিয়ে তার পুত্রকে দেখতে গিয়েছিলেন। তার পুত্র ছিলেন একজন বিখ্যাত যন্ত্র প্রকৌশলী যিনি যন্ত্র পুরুষ তৈরি করতেন শত্রুদের যুদ্ধে পরাস্ত করার জন্য। এছাড়া তিনি যান্ত্রিক কৃত্রিম মেঘ তৈরি করে ঝড়ো বর্ষন করতে পারতেন। নবম ও দশন শতকে বুদ্ধভুষ্মিনের ‘বৃহৎ কথা’ গ্রন্থে আকাশ যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেছেন ।
ভোজ কর্তৃক লিখিত ‘সমারঙ্গনা সূত্রধর’ এ আকাশ যন্ত্রের বিভিন্ন কাঠামোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যন্ত্রটি বাইরের অংশটি হালকা কাঠ অর্থাৎ লঘু দারু নির্মিত। সম্পূর্ণ কাঠামোটি একটি বৃহৎ পাখির মতো যার উভয় পাশে ডানা রয়েছে। এই যন্ত্রের গতি লাভ করে একটি অগ্নি প্রকোষ্ঠ থেকে। যেখানে পারদ মিশ্রিত অগ্নি শিখা থাকে। যখন পারদসমূহ অত্যধিক অগ্নিতে জ্বলে উঠে তখন শক্তি সঞ্চারিত হয় এবং চালক নিজেই যন্ত্রের ডানা ঝাপটানোর মাধ্যমে বাতাসকে নিয়ন্ত্রণ করে। এভাবে যন্ত্রটি আকাশে উড়তে সক্ষম হয়। ডানা ঝাপটানোর মূল উদ্দেশ্য হলো সঠিক দিকে গমন। এছাড়াও ভারি কাষ্ঠনির্মিত অর্থাৎ অলঘু দারু নির্মিত বিমানের বর্ণনা রয়েছে। যেখানে চারটি কলসাকৃতির পারদ নির্মিত এবং লৌহদণ্ড দিয়ে তৈরি বস্তু রয়েছে যখনই লোহা নির্মিত চুল্লির মধ্যে পারদ মিশ্রিত জালানি জ্বলতে থাকে তখন একটি বিকট শব্দের সঞ্চারণ হয়। এই শব্দটি যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় হাতিদের তাড়ানোর উদ্দেশ্যে। বিশেষ পারদ মিশ্রিত প্রকোষ্ঠ নির্মাণের মাধ্যমে যন্ত্রের গর্জন আরো বাড়ানো যায় যাতে হাতি সমূহ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। ভোজ কর্তৃক বর্ণিত বিমানের গঠন আধুনিক UFO এর সাথে মিলে যায়। রাঘবন বলেছেন যে, পারদ মিশ্রিত ইঞ্জিনসমূহ তৎকালীন বিমানের শক্তির উৎস ছিল। রজার বেকন বলেছেন, উড়ন্ত যন্ত্রে ঘুর্ণায়মান একটি ইঞ্জিন রয়েছে যার সাহায্যে জাহাজের ডানাগুলো ঝাপটাতে পাড়তো। “সমরঙ্গন সূত্রধর” গ্রন্থে উল্লেখিত বিভিন্ন বৈমানিক মডেলসমূহ দেখে আমরা খুব সহজেই ধারণা করতে পারি যে, সেগুলো বাস্তবিকভাবে তৈরি করা হয়েছিল। সূর্য সিদ্ধান্ত গ্রন্থে একটি পারদ ইঞ্জিনের কথা উল্লেখ রয়েছে যেটি বৃত্তাকারে প্রচণ্ড গতিতে ঘুর্ণায়মান থাকে এবং এটি গোলা যন্ত্রের যাবতীয় শক্তিত উৎস। এই শাস্ত্রে আরো উল্লেখিত আছে যে, প্রাচীন এই বৈমানিক জ্ঞানসমূহ সাধারণত গোপনীয় রাখা হতো। শুধুমাত্র গুরু শিষ্য পরম্পরায় এই ধরনের উন্নত জ্ঞান প্রদান করা হত। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এক সময় এই পরম্পরা ছিন্ন হয়ে গেলে বৈমানিক শাস্ত্রের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার চিরতরে হারিয়ে যায়। এছাড়াও আকাশ যন্ত্র সম্পর্কে বৈদিক শাস্ত্রে আর যে সকল উল্লেখ পাওয়া যায় তা হলো –
১২ শতকে ভোজ কর্তৃক যুক্ত কল্পতরু
১২ শতকে ময়দানব কর্তৃক ময়ামাতম
১০ শতকে কথাসুহৃদসাগর
৩ শতকে অবদান সাহিত্য
২ শতকে ভাসের অভিমকর ও জাতক
১ শতকে কালিদাসের রঘুবংশ ও অভিজ্ঞাংশকুন্তলম

বৈমানিক শাস্ত্র

বৈমানিক শাস্ত্রে বিমান সম্পর্কে গভীর জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে এবং এর উল্লেখ বিভিন্ন গ্রন্থ এবং আর্টিকেলে রয়েছে। কানিশাক নাথান বিমান শাস্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, “বিমান শাস্ত্রে এমন এক প্রযুক্তির কথা বর্ণিত হয়েছে যা সময়াতীত বিজ্ঞানের প্রয়োগ এমনকি প্রাচীন ভারত সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক কল্পনাতীত কিছু বিষয়। যেমন সৌরশক্তি ও ফটোগ্রাফীর প্রয়োগ।”
জে.আর.জসইয়ার এর অনুদিত গ্রন্থ বৈমানিক শাস্ত্রের সূচনা পর্বে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন যে, প্রাচীনকালে ভারতে শ্রবণের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ করা হতো। কিন্তু এক সময় এই পরম্পরা ছিন্ন হয়ে যায় এরপর গাছের পাতায় লিখার কাজ শুরু হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ গাছের পাতার গ্রন্থ বেশি দিন স্থায়ী হয় না। এই কারণে বহু গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্র গ্রন্থ চিরতরে হারিয়ে গেছে। একজন বিখ্যাত বৈমানিক শাস্ত্রবিদ সুবরয় শাস্ত্রী বলে “বৈমানিক শাস্ত্র” গ্রন্থটি মহাঋষি ভরদ্ররাজ কর্তৃক লিখিত “যন্ত্র সর্বস্ব” গ্রন্থের একটি ছোট শাখা মাত্র। মহাঋষি ভরদ্ররাজ এর বিভিন্ন অসাধারণ সৃষ্টিকর্মগুলো মহাভারত ও অন্যান্য বৈদিক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। “যন্ত্র সর্বস্ব” গ্রন্থটি বর্তমানে পাওয়া যায় না।
বৈমানিক শাস্ত্র গ্রন্থে বিমান চালকদের জন্য ৩২টি রহস্যময় প্রযুক্তির উদাহরণ উপস্থাপন করা হয়েছে যা প্রত্যেক চালকের জানা উচিত। তার মধ্যে দশটি আশ্চর্যময় প্রযুক্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপস্থাপন করা হল:
১. গুধা : ‘বায়ুতত্ত্ব-প্রকারণা’, গ্রন্থে উল্লেখিত আছে যে, আমাদের এই পৃথিবী যশ, বিযশ এবং প্রযশ নামে ৮টি বায়ুমণ্ডলীয় আবরণে ঢাকা আছে। সৌররশ্মির মধ্যে একটি অন্ধকারময় বস্তু রয়েছে যা ব্যবহার করার মাধ্যমে তৎকালীন বিমানসমূহ তাদের শত্রুপক্ষের অগোচরে নিজেদের অদৃশ্য করতে পারতো।
২. দৃশ্য : যান্ত্রিক শক্তি এবং বায়ুমণ্ডলের বায়ু শক্তির মধ্যকার সংঘর্ষের ফলে একটি দ্যুতি উৎপন্ন হয় যার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যাবে বিশ্বক্রিয়া দর্পন তথা এক বিশেষ আয়নায় যা বিমানের সম্মুখে স্থাপন করা থাকে এবং এই প্রযুক্তিটি যদি দক্ষতা সহকারে ব্যবহার করা হয় তবে উক্ত বিমানটি একটি মায়া বিমান তথা অদ্ভূত কার্যে সক্ষম বিমানে পরিণত হয়।
৩. অদৃশ্য : ‘শক্তিতন্ত্র’ মতে ব্যানার্থ বিকিরণ শক্তি এবং সৌর জগতের মধ্যে অবস্থিত অন্যান্য শক্তির ফলে সমগ্র আকাশ জুড়ে একটি অতি সূক্ষ্ম বেগের সৃষ্টি হয়। এই শক্তিকে যদি বলাহা বিকিরণ শক্তির সাথে মিশ্রিত করা হয় এবং বিমানটির আবরণ যদি সাদা রঙের হয় তবে বিমানটিকে অদৃশ্য করা যাবে। এখানে বিমানকে অদৃশ্য করার জন্য তিনটি পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে এবং এর বাস্তবিক প্রয়োগ পাওয়া যায় বিভিন্ন পুরাণ ও মহাভারতে। প্রাচীন সেই বর্ণনার সাথে আধুনিক UFO সাথে মিলে যায় ।
৪. পরো : মেঘোৎপত্তি প্রকারণ অর্থাৎ মেঘের উৎপত্তির বিজ্ঞানানুসারে যদি বিমান মেঘের অভ্যন্তরের দ্বিতীয় আবরণে প্রবেশ করে এবং এর মধ্যকার শক্তিকে আকর্ষণ করে শক্তি আকর্ষণ দর্পণ অর্থাৎ বিমানে থাকা শক্তি আকর্ষক আয়নার মাধ্যমে এই শক্তিকে বর্ণবলয় সৃষ্টিতে ব্যবহার করা হয় এবং যদি এই শক্তি অন্যকোন শত্রুপক্ষের বিমানের ওপর প্রয়োগ করা হয় তবে সেই বিমানটি পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়ে অর্থাৎ তার সমস্ত কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
৫. অপরো : ‘শক্তিতন্ত্র’ মতে, সুর্যের রোহিনী রশ্মি প্রয়োগের মাধ্যমে যেকোনো অদৃশ্য বিমানের অস্তিত্ব খুঁজে বের করা সম্ভব। UFO এর ক্ষেত্রেও একই প্রকারের পক্ষাঘাতী শক্তি প্রয়োগের বিভিন্ন ঘটনার কথা জানা যায়। কিন্তু বৈদিক বিমান সমূহে বিমানের চারদিকে বর্ণমালার সৃষ্টি একটি অদ্ভূত মজার বিষয়।
৬. বিরূপ কারণ : ‘ধূমা প্রকারণ’ মতে, বিভিন্ন যান্ত্রিক উপায়ে ৩২ প্রকারের ধোঁয়া উৎপন্ন করা যায় এবং এটি আকাশ পথে উৎপন্ন হয় উষ্ণ তরঙ্গের ফলে। যন্ত্রের কার্যপ্রণালীর মাধ্যমে উৎপন্ন এই ধোঁয়া বিমানের পদ্মচক্র ছিদ্র দিয়ে বাইরে উন্মুক্ত করা হয়, এই পদ্মচক্র সাধারণত বিমানের উপরিভাগে অবস্থিত থাকে ।
৭. রূপান্তর : ‘তৈলপ্রকারণ,’ অর্থাৎ গৃদ্ধরাজওয়া, কুম্ভীনি এবং কাজঙ্গা তেল বিমানের জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো বিমানে ব্যবহৃত হলে ১৯ রকমের ধোঁয়া উৎপন্ন হয় এবং এগুলো বিমানকে কুন্ডল শক্তি প্রদান করে। ধোঁয়াগুলো সাধারণত বিভিন্ন আকৃতির হয় যেমন বাঘ, গন্ডার, সাপ, পর্বত, নদী আকৃতির এর ফলে শত্রুপক্ষের বৈমানিকরা হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং তারা বুঝতে পারে না তাদের সম্মুখে কি রয়েছে।
৮. সৰ্পর্গমন : দন্তবক্র এবং অন্যান্য বায়ুর সাতটি শক্তিকে সূর্য রশ্মির সাথে একীভূত করে সেই মিশ্রিত শক্তিকে যদি বিমানের মধ্যমভাগে প্রয়োগ করা হয় তাহলে বিমান সাপের মতো গতি পথ ও শক্তি লাভ করে।
৯. রূপ আকর্ষণ : বিমানের প্রাচীন আলোকচিত্র সংগ্রহক যন্ত্রের মাধ্যমে টেলিভিশনের মতো আশেপাশের যেকোনো জিনিস স্পষ্টভাবে দেখা যেতো।
১০. ক্রিয়াগ্রহণ : বিমানের নিম্নভাগের একটি বিশেষ যন্ত্র চালু করলে বিমানে একটি সাদা কাপড় আবির্ভূত হয়। বিমানের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তিনটি এসিডকে বিদ্যুতায়িত করে এর শক্তিতে ত্রিশীর্ষ দর্পনের মধ্য দিয়ে সাত প্রকারের সূর্যরশ্মি নিক্ষেপনের মাধ্যমে সাদা কাপড়ের পর্দায় ভূপৃষ্ঠে চলমান সকল ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করা যায়।
এখানে একটি মজার বিষয় হলো উপরোক্ত রূপ আকর্ষণ প্যারাতে উল্লেখিত টেলিভিশন সদৃশ যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা আধুনিক টেলিভিশন আবিষ্কারের বহু বছর পূর্বের কথা। উক্ত সংস্কৃত গ্রন্থটি ১৯২৩ সালে লিপিবদ্ধ করা হয় যা টেলিভিশন আবিষ্কারের বহু পূর্বে রচিত।
ভাগবত পুরাণ, মহাভারত ও রামায়ণ হল বৈদিক সাহিত্যর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এই তিনটি গ্রন্থে বিমান সম্পর্কিত ব্যাপক তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। এমনকি বিমান পরিচালনাকারী বিভিন্ন মানব ও মানব সদৃশ ব্যক্তিদের কথা উল্লেখিত হয়েছে।
যদিও বৈদিক বিমানের সকল আশ্চর্যময় ক্ষমতাসমূহ স্বাভাবিক বিচারে কল্পনাপ্রসূত বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে আমরা হয়তোবা বর্তমানে সেই উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার ধারণার সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হইনি এখনো। ঠিক যেমন আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে হয়তোবা কেউ ভাবতে পারেনি যে মানুষ আজকের প্রযুক্তির উৎকর্ষতার স্তরে উপনিত হতে পারবে। বৈদিক বিমানের জ্ঞানের ব্যাপক গবেষণা ও বিস্তৃতি আমাদের কল্পনাতীত প্রযুক্তিগত শিক্ষার পথ উন্মোচন করতে পারে।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৭ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here