এথেন্সে কৃষ্ণ ধ্যান

0
137

গ্রীসের রাজধানী এথেন্স শহরে অবস্থানকালে কৃষ্ণভাবনামৃতের দর্শন

তত্ত্ববিধ দাস

গত বছর আমি এথেন্স পরিদর্শনে গিয়েছিলাম এবং সেখানে ঐতিহাসিক পনিক্স পাহাড় পরিদর্শন করেছিলাম। পাহাড়টির আবহাওয়া ছিল বেশ চমৎকার এবং এক্সোপোলিস্ ও পার্থেননের মনোরম দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব। এখানে অবস্থিত মন্দিরটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার পতনের কাহিনি। হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সদস্যদের নিয়ে স্থানটি পরিদর্শনের মাধ্যমে গ্রীক সভ্যতা এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্বন্ধ সম্পর্কে কিছু অবগত হই। আমি এর মাধ্যমে প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা এবং একই সাথে ভারতের বৈদিক সংস্কৃতি সম্বন্ধে যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্যসমূহ রয়েছে সে সম্পর্কে জানতে পারলাম। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন যে, প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রে ভারত ও গ্রীসের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে কিছু উল্লেখ রয়েছে। আত্মার এবং দেহ থেকে আরেক দেহে পরিভ্রমণ, সৃষ্টি এবং সবকিছুর পরম কারণ ও প্রকৃত সত্য সম্পর্কে উপলব্ধির গুরুত্ব এই সবকিছুই প্লেটোর দর্শন এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কিত তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

আত্মা

বিখ্যাত লেখক ট্যাড নান Routledge Encyclopedia philosophy তে উল্লেখ করেছেন: “আত্মা হল ব্যক্তিসত্তার প্রকৃত পরিচয়, তাই দেহের মঙ্গল সাধনের চেয়ে আত্মার সামগ্রিক মঙ্গল সাধন করাই হল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।…. কর্মানুসারে এর বিচার কার্য সম্পন্ন হয় এবং হয়তো তার পুনর্জন্ম ঘটে।
এই একই বিষয়টি ভগবদ্‌গীতায় উল্লেখ রয়েছে। কৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেছেন, আমরা ভগবানের নিত্য অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বিভিন্ন দেহে আত্মার পরিভ্রমণ ঘটার ব্যাপারটি তখনই সমাপ্তি ঘটে যখন তাঁর প্রতি প্রীতিপূর্ণ সেবা সম্পাদন করা হয়। পরমেশ্বর ভগবানের সাথে আমাদের নিত্য সম্পর্ক রয়েছে এবং যখন যথাযথভাবে আমরা তাঁকে অনুসরণ করি তখন তাঁর প্রতি শুদ্ধ প্রেম জাগরিত হয়। প্রাচীন গ্রীকে বৈদিক সাহিত্যে প্রদত্ত জ্ঞানের এরকম পরিশোধিত তত্ত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

সৃষ্টি

বৈদিক শাস্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা ও প্লেটোর সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনার মধ্যে একটি সমান্তরাল আবহ বিদ্যমান। বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মাধ্যমে বেদসমূহ ব্রহ্মার কাছে সরবরাহ করা হয়। ব্রহ্মা হলেন এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক সৃষ্টিকর্তা। শ্রীমদ্ভাগবত অনুসারে, ভগবানের নির্বিশেষ ব্রহ্মজ্যোতিতে সমস্ত জীবের বীজ বিদ্যমান। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে এই বীজের আগমন ঘটে। ভগবদ্‌গীতার ৭/১০, ১০/৩৯ এ ভগবান বলেছেন, “আমিই সর্ব জীবের বীজ প্রদানকারী পিতা।” ভগবদ্‌গীতায় ১৪/২৭ এ বলা হয়েছে, নির্বিশেষ জ্যোতি রয়েছে সেটিও ভগবান শ্রীকৃষ্ণে অবস্থান করে, যিনি হলেন চরম সত্যের আধার এবং সবকিছুর আদি উৎস। ব্রহ্মা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি করেন ব্রহ্মজ্যোতিতে বিদ্যমান বীজ থেকে। শ্রীল প্রভুপাদ এই বিষয়টি শ্রীমদ্ভাগবতের ২/৫/১১ এ তাৎপর্য অংশে ব্যাখ্যা করেছেন।
“ঠিক যেমন একটি ক্ষুদ্র বটগাছের বীজে বিশাল বটবৃক্ষ সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে, তেমনই ভগবান তাঁর ব্রহ্মজ্যোতি (স্ব-রোচিষা) দ্বারা বিভিন্ন প্রকার বীজ উৎপন্ন করেন যা ব্রহ্মার মতো ব্যক্তি কর্তৃক জল সিঞ্চনের ফলে বিকশিত হয়। ব্রহ্মা-বীজ সৃষ্টি করতে পারেন না, কিন্তু তিনি বীজকে বৃক্ষে পরিণত করতে পারেন, ঠিক যেমন একজন মালী জল সিঞ্চনের দ্বারা বাগানে তরু-লতাদের বর্ধিত করে।” একইভাবে, দার্শনিক প্লেটো এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন যে, একজন সৃষ্টিকর্তা ভগবান যিনি একটি নির্বিশেষ স্ব-অস্তিত্বময় পরম উৎস প্রদান করেছেন এবং সে সাথে পরিবর্তনশীল আদর্শ রূপের একটি জগৎ প্রদান করেছেন এবং তারপর পূর্ব থেকেই অস্তিত্ব রয়েছে এমন পদার্থে সেই রূপসমূহ প্রকাশিত হতে সমর্থ হয়। প্লেটো অবশেষে ব্যক্ত করেন যে, সমস্ত রূপ বা আকৃতিরই একটি স্বতন্ত্র, চরম উৎস অবশ্যই রয়েছে যিনি সমস্ত সারতত্ত্বের সার। প্লেটো সদ্গুণময়, চরম সত্য ও সুন্দর হিসেবে বিষয়টিকে নিয়ে গবেষণা করেছেন।

চরম সত্যকে উপলব্ধি

জনৈক ধর্মপ্রচারক ফ্রেড্রিক কপলেস্টন মধ্য উনিশ শতকে নয় স্কন্ধে দর্শন বিষয়ক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি প্লেটো যে রূপ বা আকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রদান করেছেন সে সম্পর্কে বলেন, “আমরা এর এর মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে উদ্দেশ্যমূলক ও চিন্ময় মূল্যবোধসম্পন্ন আদর্শ ও চরম জ্ঞানের স্তরে উপনীত হতে পারব।”
অপ্রাকৃত লক্ষ্য ও মূল্যবোধ হল চরম সত্যের একটি অংশ এবং এর অনুসন্ধান করা হল মানব জীবনের জন্য অত্যন্ত আবশ্যকীয় বিষয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার শ্রীল ব্যাসদেব বিরচিত বেদান্ত সূত্রে এ বিষয়টি বলা হয়েছে, অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা : “এই মানব জীবনের অর্থই হল পরম সত্যের অনুসন্ধান করা।”
যখন লোকেরা এই অপ্রাকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রতি প্রয়াসী হয় না তখন তাদের বুদ্ধিমত্তা আহার, নিদ্রা, মৈথুন ও ভয়ের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। এভাবে তখন নিত্য চিন্ময় আত্মা পুনঃ পুনঃ ইন্দ্রিয় তৃপ্তিময় জীবনের বন্ধনে বদ্ধ হয়ে থাকে।

প্রজাতির বিস্তার

প্লেটো উল্লেখ করেন, সৃষ্টিকর্তা ভগবান নক্ষত্ররাজি, গ্রহপুঞ্জ এবং চিন্ময় ঈশ্বরদের তৈরী করেছেন এবং সে সব ঈশ্বরদের নিয়োজিত করেছেন বিভিন্ন আত্মার বিস্তারের জন্য। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হচ্ছে, ব্রহ্মা নির্দিষ্ট উচ্চতর জীবদের প্রতি প্রভাব বিস্তার করেছেন বিভিন্ন প্রজাতির জীবদের প্রজন্ম বিস্তারের জন্য। এ বিষয়ে আধুনিক আধিপত্যমূলক দর্শনের চেয়ে প্রাচীন কালে প্রচলিত মতবাদ অনেক ভিন্ন ছিল। গ্রীকদের দর্শন বৈদিক দর্শনের সাথে অনেকাংশই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সদাপুত দাস (দিব্যলোকগত বিশিষ্ট গণিতবিদ রিচার্ড এল থম্পসন) এই ম্যাগাজিনে এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন :
‘প্রাচীন গ্রীক লেখক আরাটোস, কন্যারাশি (virgo) সম্পর্কে একটি কাহিনি বর্ণনা করেন। কন্যারাশি নক্ষত্ররাজির পরিচালনায় রয়েছেন, তিনি প্রাচীন নক্ষত্রসমূহের প্রপিতামহ। স্বর্ণযুগের সময় তিনি একজন বিচারক হিসেবে মানব সমাজে বাস করতে লাগলেন এবং লোকেদেরকে সত্যের প্রতি নিবদ্ধ করতেন। সে সময় সাধারণ জনগণ শান্তিময় জীবন যাপন করছিল, তখন কোনো দ্বন্ধ বা কলহ ছিল না পরবর্তীতে রৌপ্য যুগে, তিনি নিজেকে পর্বতে লুকিয়ে রাখলেন, কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি লোকেদের খারাপ কর্মের শাস্তি প্রদানের জন্য পর্বত থেকে নেমে আসেন। অবশেষে তাম্র যুগের আগমন ঘটে। লোকেরা তখন তলোয়ার আবিষ্কার করল এবং তারাই প্রথম গো-মাংসের ভক্ষণ করতে শুরু করল। এই অবস্থায় কন্যারাশি উর্ধ্বলোকে গমন করল, এরপর আসল লৌহ যুগ। এখানে লক্ষণীয় যে, আরাটোসের এই কাহিনিতে গোমাংস ভক্ষণের বিষয়টিকে পাপকর্ম হিসেবে অভিহিত করা হয় যার ফলে দিব্য জীবদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই বর্ণনাটি প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যে গো রক্ষার সঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায়।”
কন্যারাশি এর বর্ণনায় এটি প্রদর্শিত হয় যে, গ্রীক সভ্যতায় চতুর্যুগ সম্পর্কে বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। বৈদিক দর্শনেও এই চতুর্যুগ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। কৃষ্ণ বলেছেন যে, এরকম এক হাজার চতুর্যুগ নিয়ে ব্রহ্মার একটি দিন গঠিত হয়, যা ভগবদ্‌গীতার (৮/১৭) নং শ্লোকে বর্ণিত আছে। বৈদিক জ্যোতির্বিদ্যা সূর্য সিদ্ধান্তে তার দিনের পরিধি গণনা করা হয়েছে ৮.৬ বিলিয়ন বছর।

প্রাচীন প্রেক্ষাপট

শ্রীল প্রভুপাদ গ্রীস এবং ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, অনেক কারণে বৃহত্তর ভারত থেকে সংস্কৃতিতে অগ্রসরমান প্রাচীন জনগণ ইউরোপে গমন করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, যখন ভগবান পরশুরাম উপমহাদেশে ক্ষত্রিয় নিধন করতে শুরু করলেন তখন তাদের অনেকে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যবর্তী তুর্কী ও গ্রীসে স্থলাভিষক্ত হয় । সম্ভবত গ্রীস ও ভারতে তখন একই সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিল দর্শনমূলক ও জ্যোতির্বিদ্যার জ্ঞান যা এ দুটি অঞ্চলে অনুশীলন হচ্ছিল। পরবর্তীতে সময়ের আবর্তে, বিভিন্ন বৈচিত্র্যে সংস্কৃতির আবির্ভাব ঘটে, কিন্তু অনেক সংস্কৃতি তখনও বংশগত প্রেক্ষাপট প্রচলন ছিল। প্রভুপাদ বলেন যে, গ্রীকরা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ রেখেছিল, বিভিন্ন ভগবানের আরাধনার মাধ্যমে। তাদের আরাধ্য ভগবানের মধ্যে বেদে বর্ণিত দেব-দেবীদের সঙ্গে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় ।
এউইন ব্রাইয়ান্ট রুটজাবস্ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম বিষয়ক একজন সহযোগী অধ্যাপক। তিনি লিখেছেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন একজন চিন্ময় পুরুষ যার প্রাচীন স্থাপত্য শৈলীর প্রমাণ হল হেলিয়োডোরাস যা ১০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে উত্তর কেন্দ্রীয় ভারতের বেসনগরে স্থাপিত হয়েছিল। এই স্তম্ভের ওপর এমন কিছু নিদর্শন রয়েছে যা উল্লেখ করে যে, একজন গ্রীক ব্যক্তি হেলিওডোরাস এই সময়ে ভাগবত ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। বিদেশীরাও তখন এ ভাগবত ধর্মে ধর্মান্তরিত হন। খ্রীস্টপূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষ দিকে এ প্রকার ধর্মান্তরকরণের বিষয়টির মাধ্যমে এটি প্রতিপন্ন হয় যে, কৃষ্ণের ঐতিহ্য তখন লক্ষ্যণীয়ভাবে এত ব্যাপক ছিল যে, তা বিদেশী কূটনীতিকদের আকর্ষণ করতো।
রোমের পতনের পর আলেক্সান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরিটি পুড়ে যায় এবং ফলশ্রুতিতে প্রাচীন গ্রীক ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সম্বন্ধ সূচক অনেক প্রাচীন দলিলের অনেকাংশই ধ্বংস হয়ে যায়।
বিভিন্ন কারণে, পশ্চিমারা শুরুর দিকে গ্রীক উপলব্ধি থেকে পৃথকীভূত হয়ে যায় এবং প্লেটোর দর্শনের বিপরীতে অবস্থান করে। কিন্তু যারা প্লেটোর উচ্চতর লক্ষ্য সম্পর্কে গবেষণা করে তারা কিছু ঐতিহাসিক আত্মজ্ঞান লাভ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে নতুন অন্তদর্শন অর্জিত হবে।
ভারতে প্রাচীন ঐতিহাসিক জ্ঞান খুব কমই পরিবর্তিত হয়েছে। অতএব, এখন যেহেতু কৃষ্ণভাবনামৃতের শিক্ষা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছে। তার মাধ্যমে পশ্চিমারা প্রকৃত সংস্কৃতির উচ্চতর লক্ষ্য পারমার্থিক প্রগতি অর্জনের জন্য অনুপ্রানিত হবেন।


তত্ত্ববিধ দাস ১৯৭৪ সালে জানুয়ারি মাসে ক্যালিফোর্নিয়াতে ইসকনে যোগ দেন। তিনি ঐ বছরেই গ্রীষ্মে শ্রীল এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে ফিলাডেলফিয়াতে পাঁচ বছরের জন্য ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিনের একজন সেবক হিসেবে নিযুক্ত হন। তিনি ব্যাক টু গডহেডে এ পর্যন্ত ১৫টি প্রবন্ধ লিখেছেন এবং অনেক গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। ২০০২ সালের শুরুতে, চার বছরের জন্য তিনি রাধাদেশে অবস্থিত ভক্তিবেদান্ত কলেজে শিক্ষকতা করেন। 


 

 

ত্রৈমাসিক ব্যাক টু গডহেড, এপ্রিল – জুন ২০১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here