এক মহিমান্বিত সাম্রাজ্যের মুকুটমণি হামপি

0
518

প্রায় সবটুকুই আজ ধ্বংসপ্রাপ্ত, এই অঞ্চলটি ছিল রামায়ণ থেকে জানা বহু দৃশ্যাবলীর পটভূমি আর বিজয়নগর রাজ্যের রত্ন কেন্দ্র পম্পা ক্ষেত্র অথবা কিস্কিন্ধ্যা নামে মহাভারত, রামায়ণ এবং বহু পুরাণে হাম্পি অঞ্চলটির উল্লেখ আছে। বর্তমানে ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে অবস্থিত।
ভ্রমন বৃত্তান্তগুলি নেওয়া হয়েছে জন হাউলি (জড় ভরত) প্রণীত ‘ইন্ডিয়া’গ্রন্থ থেকে যা কৃষ্ণ ডট কম্ স্টোরে পাওয়া যায়।
বিশ মিটার পথ পেরিয়েই আমরা বাইশ ফুট লম্বা একটি প্রস্তরখণ্ডে খোদিত ভগবান শ্রীনরসিংহের একটি মূতির সামনে এসে গেলাম-সেটি রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের শাসনকালে গড়া হয়েছিল। এখন আর নরসিংহের আরাধনা সেখানে হয় না উন্মুক্ত প্রান্তরে তিনি বসে রয়েছেন, হানাদারদের আক্রমণে বিধ্বস্ত সব কিছু তাঁর চারিপাশে পড়ে রয়েছে।তিনি শেষনাগের কুন্ডলীর ওপরে উপবিষ্ট রয়েছেন-নাগরাজের সাতটি ফণা তাঁর পেছন থেকে উঠে চন্দ্রাতপের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। বাঁদিকে রয়েছেন বড়ভিলিঙ্গ নামে দশ ফুট লম্বা শিবলিঙ্গ। পথে আরও এগিয়ে হেমকুট পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছবার আগেই দটি গণেশ মন্দিরে থেমেছিল। সেখান থেকে দক্ষিণদিকে কৃষ্ণমন্দিরে এবং নরসিংহ বিগ্রহের আর উত্তরদিকে তুঙ্গভদ্রা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে পেয়েছিলাম, আর দেখেছিলাম হামপি বাজার এবং বিরূপাক্ষ মন্দির।
হামপি বাজারে পশ্চিম কোনে বিরূপাক্ষ মন্দিরের প্রবেশপথে দশতলা উঁচু তোরণদ্বার রয়েছে, তাতে বহু ভাস্কর্য খোদিত আছে। মূল শ্রীবিগ্রহটি পাথরের তৈরি শিবলিঙ্গ রূপে আবিভূত হয়ে রয়েছেন। হেমকুট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত মন্দিরটিতে অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবাদিব শিব, তিনি এখানে তপস্যা করেছিলেন এবং কামদেবকে ভস্ম করে দিয়েছিলেন। এখানেই দেবাদিদেব শিবের পত্নী পদ্মাবতীর নামে পীঠস্থান আছে, যেখানে ১৩৩৬ খ্রিষ্টাব্দে বিজয়নগরের প্রতিষ্ঠাতা হরিহর ও বুক্ক নামে দুই ভাই পূজা-অর্চনা করতেন। লক্ষ্মীমন্দিরটির ভাস্কর্য দেখলে বোঝা যায় যে, বিজয়নগর রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগেই সেটির অস্তিত্ব ছিল। নিম্নে প্রকোষ্ঠে একটি পীটভূমি রয়েছে, মের চেয়েও পম্পাক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠত্বই সমধিক।
তুঙ্গভদ্রা নদীর দিকে আমরা চলতে চলতে একটা প্রাচীন সেতুর ভগ্নাবশেষের কাছে পৌঁছে গেলাম। সেখান খেকে আমরা নদীর ওপারে কিস্কিন্ধ্যা দেখতে পেলাম। আরও দেখতে পেলাম প্রাচীন পর্বতটি যার ওপরে বীর হনুমানের জন্ম হয়েছিল। নদীর তীর ধরে এগুতে সামনেই দেখলাম সুগ্রীবের পর্বতগুহাটি লাল আর সাদা রঙ দিয়ে সোজা সোজা দাগ কাটা রয়েছে। এখানেই বানররাজ সুগ্রীব রেখে দিয়েছিল সীতার পরিত্যাক্ত গহনাগাটি- যেগুলি সীতা খুলে ফেলতে ফেলতে চলে গিয়েছিলেন রাবণের কবলে অপহূতা হওয়া সময়ে।
সুগ্রীব গুহার কাছেই রয়েছে কোদন্ড রাম মন্দির (কোদ- মানে ‘ধনুর্বাহী’) ঐ মন্দিরটিতেও কালো পাথরে খোদাই করা সীতা- রাম, লক্ষণ এবং হনুমানের অপূর্ব মূর্তি রয়েছে। মন্দিরটির ওপরে একটি গুহার মধ্যে যন্ত্রোদর মন্দির নামে আরও একটি হনুমান মন্দির রয়েছে, সেটিকে সবাই বলে ‘যন্ত্রোদর-অঞ্জনেয় মন্দির। বিশেষ বিনয়নম্র ভদ্রাচারী পূজারী শ্যামচর প্রতিদিন কাছের একটা গ্রাম থেকে মন্দিরে শ্রীহনুমানের পূজা করতে আসেন;তিনি আমাদের বললেন যে,এই জায়গাটিতেই আচার্য ব্যাসতীর্থ মুনি ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন এবং এগারদিন পরে শ্রীহনুমান তাঁকে সাক্ষাৎ দিয়েছিলেন। তিনি ব্যাসতীর্থকে অনুরোধ করেন যেন, তিনি ঐ পর্বতটির ওপরে তাঁর একটি প্রতিকৃতি নির্মান করে দেন, কারণ ঐ পর্বতটির ওপরেই শ্রীরামচন্দ্র এবং লক্ষণকে তিনি বসে থাকতে দেখেছিলেন। সেই জায়গাটি পাহাড়ের কুড়ি মিটার নিচে চক্রতীর্থ নামে তুঙ্গভদ্রা নদীর তীরে একটি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ।
নদীর ধার ঘিরে বড়বড় পাথর দিয়ে ঘেরা পথ বেয়ে আমরা হাম্পি বাজারে ফিরে গিয়েছিলাম।
মলয়বন্ত পথ বেয়ে গাড়ি চালিয়ে আমরা নেমে এসেছিলাম মধুবনে। সীতাকে খুঁজে পাওয়ার পরে, বানরেরা এখানে থেমেছিল এবং রাজ-উদ্যানে পরিপূর্ণ মধু আর ফল ভক্ষণ করেছিল। আজও সেখানে ছোট একটি হনুমান মন্দির রয়েছে। পূজারীরা আমাদের দুপুরের আহারের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তাই আমরাও খুশিমনে বসে গেলাম-মধুবন উদ্যানের পরিবেশে উপায়ে প্রসাদ সেবনের আনন্দ নিয়ে।
একটি সেতু পার হয়ে আমরা আনেণ্ডণ্ডি গ্রামে পৌছেছিলাম, সেটাই প্রাচীন কিস্কিন্ধ্যা। গ্রামটিতে প্রাচীন রঙ্গনাথ মন্দিরে এখনও পূজা-অর্চনা হয়ে চলেছে। কাছেই রয়েছে মধ্বাচার্যের শিষ্য নরহরি তীথের স্মতি সমাধি। ফিরলাম।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীরামচন্দ্রের নাম স্মরণ করে তাঁরা শাসনকার্য পরিচালনার মাধ্যমে সুচারুভাবে তাঁদের প্রজাদের জাগতিক এবং পারমার্থিক উন্নতি বিধানে সর্বাঙ্গণ সার্থকতা অর্জন করেছিলেন এই অতুলনীয় মনোরম স্থানটিতে। হরে কৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জানুয়ারী ২০১২ সালে প্রকাশিত) 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here