একটি বিমান ভ্রমণ

0
407

সুবর্ণ রাধিকা দেবী দাসী: আমি আমার সিটটিকে পিছন থেকে হেলিয়ে চোখ দুটি মুদ্রিত করে বসেছিলাম। আমি যে বিমানে ভ্রমণ করছিলাম সেই বিমানটি দিল্লির আকাশে চক্কর দিচ্ছিল এবং অবতরণের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ আমার মনে টিকিট কেনা হতে শুরু করে গন্তব্য পৌঁছার সম্পূর্ণ বিমান ভ্রমণের প্রক্রিয়াটি বিদ্যুতের ঝলকানির মতো বয়ে গেল।
বিমানের আসন সংরক্ষণ:
আমরা খুব সতর্ক থাকি যখন ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত বিমানগুলোর তালিকা অনুসন্ধান করি এবং তার মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত সেটিই ভ্রমণের জন্য নির্বাচন করি। আমাদের আসন সংরক্ষণের জন্য যে সময় নির্ধারিত থাকে তার পূর্বেই আসনটি সংরক্ষণ করতে চেষ্টা করি। কেননা এর ফলে খুব ভাল দামেই এটি পাওয়া বা টিকেটটি নিশ্চিত করণের পর বিমানটিও ভ্রমণ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্যাবলী আরও একবার চেক করে নিই। যেমন ফ্লাইট নাম্বার, ভ্রমণের তারিখ, ছেড়ে যাওয়ার সময়, গন্তব্য এই সব বিষয়গুলো, এই জড় জাগতিক ভ্রমণের মতো আমাদের আধ্যাত্মিক ভ্রমণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে এই রকম সতর্কতা অবলম্বন করা কী আমাদের উচিত নয়? আমরা অনেক আধ্যাত্মিক গুরুদেব ও মত-পথকে অনুসরণ করতে পারি। আমাদের জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন সবগুলো পথের অন্তিম গন্তব্য কী একই? সকল বিমান কী আপনাকে এই একই নগরীতে নিয়ে যায়? না, বিভিন্ন বিমানের গন্তব্য বিভিন্ন নগরীতে। তেমনি সকল আধ্যাত্মিক পথের অন্তিম গন্তব্যও ভিন্ন। আমাদের কী একই রকম একটি পথ নির্বাচন করা উচিত নয় যেটি আমার জন্য সর্বোত্তম সুবিধাজনক যার অনুশীলন পদ্ধতিও সহজসাধ্য?
চলুন বিমান ভ্রমণের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির সাথে আমাদের জীবনের বিভিন্ন ধাপের তুলনামূলক বিচার করি।
সমগ্র প্রক্রিয়াটির মধ্যে শুদ্ধতা নিশ্চিত করণের পরীক্ষা:
বিশেষ করে বিমান বন্দরে কর্মচারীরা এই ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে। যেমন মালপত্রগুলো স্ক্যানিং করা, পরিচয়পত্র চেক করা, সমস্ত শরীর স্ক্যানিং করা ইত্যাদি। এই সমস্ত প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একটি, যাতে বিমানটি কোনে দুর্বৃত্ত দ্বারা ছিনতাই না হয়। যা বিমানের সমস্ত যাত্রীর জন্য বিপদ বয়ে নিয়ে আসতে পারে। বিমানটিকে তার গন্তব্য পথ হতে চ্যুত করতে পারে এবং ভিন্ন একটি গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে। ছিনতাইকারীর মতো জীবকে আবদ্ধ ও বিভ্রান্তকারী শক্তি হলো ‘মায়া’ যা আমাদের একমাত্র গন্তব্য ও উদ্দেশ্যে কৃষ্ণভাবনামৃতের অমৃতময় পথ থেকে চ্যুত করতে সর্বদাই চেষ্টা করে। এই মায়া আমাদের মনের ওপর জড় জগতকে উপযোগকারী বিভিন্ন বিষয় যেমন শব্দ, গন্ধ, স্বাদ গ্রহণ, স্পর্শজনিত অভিজ্ঞতা ইত্যাদি দ্বারা এক অভেদ্য আবরণ তৈরি করার চেষ্ঠায় সর্বদা উদ্‌গ্রীব থাকে। কিন্তু এই ক্ষণস্থায়ী উপভোগ আমাদের কৃষ্ণ হতে অনেক দূরে সরিয়ে দেয়, তাই বিমান বন্দরের কর্মচারীদের মতো আমাদেরও সর্বদা সতর্ক থাকা উচিত যখন আমাদের আধ্যাত্মিক বিমানটি নির্বাচন করব এবং আমাদের চেতনা সুক্ষ্মাতিসূক্ষ বিচার ও বিশ্লেষণ করা অতীব জরুরী যে সব বিষয়গুলো আমাদের চেতনা কলুষিত করে তা তৎক্ষণাৎ নির্মূল করা উচিত।
যখন আমরা টেলিভিশন, ইন্টারনেট জাগতিক নাচ, গান এবং নিষিদ্ধ খাবারগুলো বর্জন করব তখন এটি আমাদের মনের চারদিকে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করবে, যা আমাদের মায়ার হাত থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করবে। কেননা এই বিষয়গুলো আছে যেমন, কাম, ক্রোধ, মদ্, মোহ, লোভ ও মৎসর্য্যকে অতিমাত্রায় বৃদ্ধি করে। আমাদের হৃদয়ে সেই সমস্ত ভাব দ্বারা পূর্ণ করা উচিত যা আমাদের মনে কৃষ্ণস্মৃতি, আধ্যাত্মিক বার্তা, ভক্তি ও কৃষ্ণের করুণাকে জাগরিত করে। আমরা যদি এই আধ্যাত্মিক শক্তিকে লাভ করতে চাই তবে আমাদের অবশ্যই ভগবানের দিব্যনাম অত্যন্ত মনযোগের সাথে জপ করা উচিত, প্রতিদিন কৃষ্ণভাবামৃতের দর্শন পড়া ও শ্রবণ করা এবং আধ্যাত্মিক বিধি নিষেধগুলো অনুসরণ করা উচিত।
বিরাম ঘরে অবস্থান:
সমস্ত কিছু চেক করার পর কিছু সময় আমরা অপেক্ষা করি। বিমান প্রায় বিলম্ব করে (বিশেষ করে আমি যে বিমানে ভ্রমণ করি সেটি) বিমানের প্রতিটি কর্মচারী সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাতে ভ্রমণটি নির্বিঘ্ন হয় কিন্তু কুয়াশা, খারাপ আবহাওয়া বিমানের রুটজনিত জটিলতা, অন্য বিমানের দেরিতে অবতরণ ইত্যাদি কারণে বিমানগুলোর দেরি হয়। এইরকম আমাদের জীবনেও ঘটে, আমাদের কোনো বিষয় বা ঘটনা যাতে নির্বিঘ্নে ঘটে তার জন্য যথাসর্ব চেষ্টা করি। কিন্তু খুব কমেই ঘটে যেভাবে আমরা ঘটনাটিকে ঘটাতে চেয়েছিলাম। এমন একটি শক্তি আছে যা সর্বদাই আমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। পরমেশ্বর ভগবান এই জগত সৃষ্টি করেছেন, এই বিষয়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তুমি নিয়ন্ত্রক নও। জড় প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা আমাদের প্রতিনিয়ত অশান্তির আগুনে দ্বগ্ধ করে। আমাদের সবসময় বিশ্বনিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণ করা উচিত এবং জীবনের প্রতিটি অবস্থায় তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞচিত্ত হওয়া উচিত। আমরা শুধুমাত্র চেষ্টা করতে পারি নিরবিচ্ছিন্নভাবে আমাদের নির্ধারিত সেবাটি করে যাওয়ার ও ক্রমান্বয়ে তাঁর ঘনিষ্ট হওয়ার।
বিমানের মধ্যে:
আমরা সিটবেল্টটি দৃঢ়ভাবে বাঁধলাম। বিমান ওপরে উঠতে শুরু করলো। বেশীরভাগ যাত্রীই নিদ্রাদেবীকে আলিঙ্গন করল। আমাদের অতি ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল যখন আমরা সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে প্রায় ৩৫,০০০ ফুট ওপরে অবস্থান করছিলাম এবং বিমানটি প্রায় ঘন্টায় একশর’ও বেশী মাইল বেগে যাচ্ছিল, সব কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে যদি কোনো বিপত্তি না ঘটে, মিলিয়নের ওপর বিষয় ভুল পথে পরিচালিত হয়, তাই নয় কী? যেকোনে একটি যন্ত্রাংশের যান্ত্রিক গোলযোগ আমাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই অবস্থায়ও আমরা শান্তিতে ঘুমাচ্ছি। আমাদের কী ভাবা উচিত নয় কোনো ধরনের বিপত্তি যদি ঘটে তখন সেই বিপত্তিকালীন সময় আমরা কীভাবে আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করব। হায় কেউ আমরা এই বিষয়টি ভাবি না। কিন্তু কেন আমরা এই বিষয়টি উদ্বিগ্ন নয়। কেননা আমাদের চালকের ওপর বিশ্বাস আছে। আছে বিমানের ক্রটি ও বিমান নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের ওপর। আমাদের সমগ্র এয়ার লাইনটির দক্ষতার ওপর বিশ্বাস আছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে বিমানটি মাঝপথে বিধ্বস্ত হবে না এবং পাইলট নির্বিঘ্নেই আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিবে।
তাই আমরা ঘুমাই শুধুমাত্র এই বিশ্বাসের ওপর কিন্তু বিমানে উঠার পূর্বে এই লোকগুলোকে কী আমি চিনতাম? আমি কী বিমানের পাইলটের দক্ষতার কোনো পরীক্ষা নিয়েছি? আমি কী বিমান নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত? তাহলে কীভাবে আমি তাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করছি, আমি কী বোকা? এটি কী তাহলে আমাদের অন্ধ বিশ্বাস? না, এই হলো সমগ্র বৈমানিক ব্যবস্থার ওপর আমাদের একটি আস্থা আমরা জানি প্রতিদিন হাজার হাজার বিমান পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে যায় এবং দুর্ঘটনার সংখ্যাও কম।

সমগ্র এয়ারলাইন শিল্পটি কতগুলো সুদৃঢ় নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং এই সুদৃঢ় নীতি অবলম্বন করে বলেই প্রতিটি বিমান নির্বিঘ্নে উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। অনুরূপভাবে আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃতের সমগ্র প্রক্রিয়াটির ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত। আমরা সরাসরি কৃষ্ণকে দেখতে ও তার সাথে কথা বলতে পারি না এবং যিনি ধর্মগ্রন্থ সংকলন করেন তার সাথেও দেখা করতে পারি না। কিন্তু আমরা তাদের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি কেননা কৃষ্ণভাবনামৃত পৃথিবীর অগণিত মানুষের জীবনপদ্ধতি পরিবর্তন করেছে, সহায়তা করেছে অনেককে তাদের সীমাবদ্ধগুলোকে অতিক্রম করতে, তাদের বদঅভ্যাস ত্যাগ করতে, সর্বোপরি শুদ্ধ ও প্রীতিময় জীবন যাপন করতে এবং এটি এমন কোনো বিষয় নয় যা সম্প্রতি আবিস্কৃত হয়েছে। এটি একটি সময়াতীত প্রক্রিয়া যা সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য প্রতিবিধানযোগ্য। যেকোনে সময় কেউ যদি সে তার পাপময় অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করে, মহামন্ত্র জপ শুরু করে তবে তা তার জীবনে প্রভাব বিস্তার করে। কৃষ্ণ ও ভাগবত গ্রন্থের ওপর বিশ্বাস কুসংস্কার নয়। এটি যদি অন্ধভাবে বিশ্বাস বলে মনে করা হয়, তবে বিমানের ক্রটি ও কর্মকর্তাদের ওপর বিশ্বাস করাও অন্ধবিশ্বাসের সামিল।

আমাদের সবার উচিত বিশ্বাস আরো গাঢ় করা এবং দৃঢ় সংকল্প বদ্ধ হয়ে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন করা। তবেই আমাদের আধ্যাত্মিক বিমানটি অতি শীঘ্রই অভিষ্ট গন্তব্যে অবতরণ করবে।
সময় অতিদ্রুত অতিক্রান্ত হচ্ছে:
যদি আমরা বিমানে ভ্রমণের বিষয়টি আরেকবার বিবেচনা করি তবে এখানে আরও একটি আধ্যাত্মিক বিষয় রয়ে যায়। আমরা সবাই বিমানের মধ্যে, কেউ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছি, ভেসে যাওয়া তুলার মত নরম মেঘগুলোকে দেখছি, বিমানবালারা খুব মনোমুগ্ধকারী, তারা হাসিমুখে আমাদের কাছে এসে আমরা যা চাইছি তাই দিয়ে যাচ্ছে। সময় পার করার জন্য আমরা কেউ পড়ছি, কেউ বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছি, আবার কেউ তার পাশের যাত্রীর সাথে আলাপ করছে। কিছুক্ষণ পর বিমানের নির্ধারিত কর্মচারী ঘোষণা করলো অনুগ্রহপূর্বক অবতরণের জন্য আপনার প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। তখন আমাদের মনে হলো কীভাবে দুই ঘন্টা সময় পার হয়ে গেল। আমরা টেরই পেলাম না। হরেকৃষ্ণ!

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ জানুয়ারি ২০১৪ প্রকাশিত)


এরকম চমৎকার ও শিক্ষণীয় প্রবন্ধ পড়তে চোখ রাখুন ‘চৈতন্য সন্দেশ’‘ব্যাক টু গডহেড’

যোগাযোগ: ০১৮৩৮-১৪৪৬৯৯

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here