একটি জাহাজ ও একজন মেসেঞ্জার

0
520

১৯৬৬ সালে জুলাইয়ের এ মাসটিতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকনের জন্ম হয়। শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ এক কঠোর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যদিও তার সেই কঠোর সংগ্রামের ইতিকথা প্রায় সবারই জানা তবুও সংক্ষিপ্তভাবে সেই সাফল্যের চমকপ্রদ ইতিকথা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরা হলো ভিন্নআঙ্গিকে। এর সঙ্গে গত ৬০-৭০ এর দশকে এই সংস্থাটি কিভাবে সারাবিশ্বে প্রশংসার ঝড় তুলেছিল এবং অবিস্মরণীয়ভাবে ইসকন খুব দ্রুত সারাবিশ্বে প্রসার লাভ করেছিল তারও সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো। মূলত শ্রীল প্রভুপাদ তার পরমারাধ্য গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের নির্দেশে ১৯৬৫ সালে সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকায় পৌছেন ভগবৎবাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে। আমেরিকায় পৌছানোর কাহিনীটিও খুবই রোমাঞ্চকর। তৎকালীন সময়ে ‘সিন্দিয়া স্টিমশীপ কোম্পানীর’ প্রধান শ্রীমতি সুমতি মোবারজীর সহায়তায় একটি মালবাহী জাহাজে করে আমেরিকার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন আর হাতে অর্থ ছিল সর্বসাকুল্যে মাত্র ৪০ রুপি। সে সময় ঐ জাহাজে তাকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয় কেননা তাকে হার্ট অ্যাটাকসহ (২দিনে ২বার) বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তিনি তার ব্যক্তিগত এক ডায়েরীতে ১৪ তারিখে (১৯৬৫) সালে লিখেছিলেন, “সামুদ্রিক পীড়ায় ভুগছি, মাথা ঘুরাচ্ছে, বমি হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। শরীর আরও খারাপ”। কিন্তু নানা প্রতিকুল থাকা সত্ত্বেও তিনি দমে যাননি। ভক্তবৎসল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় শক্তিআবিষ্ট হয়ে শ্রীল প্রভুপাদ ভয়ংকর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌছান। কেননা শ্রীল প্রভুপাদ তার ঐ ডায়েরীতে লিখেছিলেন “আটলান্টিক মহাসাগর যদি তার স্বাভাবিক রূপ ধারণ করত তাহলে হয়ত আমি বাঁচতাম না। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সেই জাহাজটি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।” আমেরিকায় পৌছানোর পর তার আসল সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৬৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেই ১২টি বছরে শ্রীল প্রভুপাদ সারাবিশ্বে এক আলোচিত পরিবর্তন সাধন করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি ৬টি মহাদেশের প্রায় ১০৮টি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শুধুমাত্র ১৯৭০ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এ সময়কালীন ঐ একটি বছরেই ৩২টি নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অর্থ্যাৎ গড়ে প্রতি মাসে তিনি তিনটি মন্দির তৈরি করেছিলেন। শুধু তাই নয় শ্রীল প্রভুপাদ বিশ্বের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে ভগবান শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন যা এখন আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট নামক একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন, যেটি এখন পর্যন্ত ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ রেকর্ডটি অর্জন করেছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ৯ কোটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এমন কোন দেশ নেই যেখানে এই ট্রাস্টের গ্রন্থ (শ্রীল প্রভুপাদের লিখিত গ্রন্থসহ) পৌছায়নি। তিনি বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউট সহ সারাবিশ্বে অনুরূপ আরো ইনস্টিটিউশন গড়ে তুলেছিল। শুধু ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউটেই বর্তমানে আড়াইশ’রও বেশী বিজ্ঞানী ভক্ত রয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ তার সুদক্ষ চিন্তা চেতনার দিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণের সকল বাধাকে দূরে ঠেলে দিয়ে বৈদিক দর্শন পশ্চিমা বিশ্বে প্রচারের মাথ্যমে তাদেরকে এই দর্শন গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করে। ফলে সারাবিশ্বে তাঁর ৫ হাজারেরও বেশী শিষ্য (বিভিন্ন ধর্মনুসারীরাও) গড়ে উঠেছিল।তিনি তাঁর শিষ্যদের বিশ্বের প্রতিটি রাস্তায়, শহরে, গ্রামে এই হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তনের নির্দেশ দেন যাতে করে সবাই এ মন্ত্রের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করে। তিনি তার শিষ্যদের লন্ডন পাঠানোর মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে জর্জ হ্যারিসনের সাথে Hare Krishna Mohamantra নামে একটি রেকর্ড করা এ্যালবাম প্রকাশ করেছিলেন যা সারাবিশ্বে প্রশংসার ঝড় তুলে। তিনি সে সময়ের নন্দিত ও বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে পর্যন্ত বৈদিক দর্শন দান করার মাধ্যমে তাকে কৃষ্ণের একজন ভক্ত হিসেবে গড়ে তুলেন। তিনি বিখ্যাত Sunday love feast  থেকে শুরু করে সুস্বাধু কৃষ্ণ প্রসাদ বিনামূল্যে বিতরণের অনেক কার্যক্রম চালু করেন। যার ফলে অনেক দুঃস্থ ও অভাবী লোকেরও উপকৃত হয় এবং বর্তমানে বিখ্যাত Food for life এর মাধ্যমে এটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। শ্রীল প্রভুপাদ প্রথমবারের মত সারাবিশ্বে বিভিন্ন নিরামিশাষী রেস্তোরা গড়ে তোলেন। তিনি প্রতিদিনই সবার মাঝে কৃষ্ণভাবনামৃতের দর্শন প্রচার করতেন। তার মুখনিঃসৃত সেসব গুরুত্বপূর্ণ লেকচার সম্বলিত ২,২০০ এরও বেশি রেকর্ড এখনও ইস্‌কন আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে। শুধুমাত্র বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গদের সাথে সাক্ষাৎকার বিষয়ক আলোচনা ১৩০০ এরও বেশি রেকর্ডকৃত রয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ ইন্দিরা গান্ধী, এলেন গিন্সবার্গ, রবী শংকর, অ্যালাইন কল্ট্রেন, জন লেনন এবং জর্জ হ্যারিসনের মত বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গসহ সারাবিশ্বে অনেক সাংবাদিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও শীর্ষস্থানীয় বিদগ্ধ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দদের কাছে এই কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করার মাধ্যমে তাদেরকে আকৃষ্ট করেছিলেন। ‘ব্যাক টু গডহেড’ নামক তারই প্রকাশিত একটি বিখ্যাত ম্যাগাজিন সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে দশ লক্ষেরও বেশি কপি সারাবিশ্বে বিক্রি হত। তিনি সারাবিশ্বে বৈদিক দর্শনের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধর্মীয় স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠাসহ ‘সরল জীবন উচ্চ চিন্তা’এ নিগূঢ় দর্শনের উপর ভিত্তি করে ‘নববৃন্দাবন প্রকল্পের’ মত বিভিন্ন প্রকল্প গড়ে তুলেছিলেন। তৎকালীন আমলে টেলিফোন সুযোগ-সুবিধা না থাকায় তিনি সারাবিশ্বের হাজার হাজার ভক্তের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন শুধুমাত্র পত্র বিনিময়ের মাধ্যমে। তাদের বিভিন্ন পারমার্থিক সমস্যা নিরসনসহ বিভিন্ন আদেশ ও নির্দেশ সম্বলিত প্রায় ৬০০০ এর বেশি পত্র লিখেছিলেন, যা আরেকটি বিরল নিদর্শন এবং সেই পত্রগুলো এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। তার স্মৃতিময় বিভিন্ন কার্যকলাপের উপর ভিত্তি করে ৩০,০০০ এরও বেশি আলোকচিত্র ও ৭০ ঘন্টারও বেশি ভিডিও চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি সারাদিন মাত্র কয়েক ঘন্টা ঘুমাতেন এবং বাকি সময় তিনি প্রচার ও গ্রন্থ রচনায় মনোনিবেশ করতেন। তিনি ১৭ খণ্ডের তাৎপর্যসম্বলিত চৈতন্য চরিতামৃত লিখেন (স্ক্রীপ্টে) মাত্র ১৮ মাসে এবং BBT কে তিনি নির্দেশ দেন এ গ্রন্থসমূহ মাত্র ২ মাসের মধ্যে প্রকাশ করার জন্য। শ্রীল প্রভুপাদ সমগ্র পৃথিবীতে প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৪ বার প্রদক্ষিণ করেন। এভাবেই তার সমগ্র জীবনকালেই তিনি কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের মাধ্যমেই অতিবাহিত করেন এবং অবশেষে ১৯৭৭ সালে বৃন্দাবনে তিনি দেহত্যাগ করেন। কিন্তু তাই বলে প্রচার থেমে থাকেননি। তার প্রকাশিত সমগ্র গ্রন্থের সুদক্ষ ও বিচক্ষন দর্শনের মাধ্যমে এখনও তিনি প্রচার করে চলেছেন আর তার সৈনিক হিসেবে রয়েছে তার লক্ষ লক্ষ অনুসারীরা যারা সবাই এ কৃষ্ণভাবনামৃত শ্রীল প্রভুপাদের দূর্গে আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে ভক্তিজীবন পালন করে চলেছেন। এখনও পর্যন্ত বিশ্বের অনেক ব্যক্তিবর্গ সারাবিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃতের এ অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য শ্রীল প্রভুপাদের অবিস্মরণীয় ও আশ্চর্যজনক সাফল্যের কথা স্মরণ করে অবাক হয়। তাইতো যখন শ্রীল প্রভুপাদ আমেরিকায় অতি নিম্নশ্রেণীর লোক হিপ্পিদের (নেশাগ্রস্ত, অবৈধ যৌন সঙ্গ আরো অন্যান্য খারাপ কর্মে আসক্ত এক প্রকার লোক) ভক্ত বানান। জনপ্রিয় বিশ্বজনীন পত্রিকা “দি নিউইয়র্ক টাইমস” সহ বিশ্বের অনেক খ্যাতমান পত্রিকায় এ নিয়ে অনেক আলোচনার ঝড় তুলেন। তারা সবাই শ্রীল প্রভুপাদের এ অবিস্মরণীয় সাফল্যের জন্য প্রশংসার ঝড় তুলে এবং অবাক হয় যে, ঐ বয়সে “কিভাবে এই সংগ্রাম সম্ভব?” এখনও পর্যন্ত বর্তমান সময়ের অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজের মত বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা শ্রীল প্রভুপাদের বিভিন্ন গ্রন্থে তার অগাধ পণ্ডিতের কথা স্মরণ করে ভূয়সী প্রশংসা জানায়। বর্তমান সময়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত স্বনামধন্য বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবি ব্যক্তিকেও তিনি আকৃষ্ট করেছেন। শ্রীল প্রভুপাদ থাকাকালীন সময়ে রাশিয়ার মত নাস্তিক দেশকে পর্যন্ত কৃষ্ণভাবনায় উন্মাদ করে। রাশিয়ার হাভার্ড ইউনিভার্সিটির ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক অধ্যাপক হার কটভক্সকে পর্যন্ত তিনি আকৃষ্ট করেছিলেন। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন কলেজ, ভার্সিটির বড় বড় অধ্যাপকবৃন্দ সহ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার লোক এ কৃষ্ণভাবনামৃত পালন করে চলছেন। আর তাইতো এন.এন. ব্যাশাম বলেছিলেন “শ্রীল প্রভুপাদ যে দূর্গ তৈরি করেছেন তাতে পৃথিবীর সব লোক আশ্রয় নিতে পারে।” কেননা এটিই একমাত্র জাহাজ বা তরণী, যে তরণীর আশ্রয় গ্রহণের ফলে যে কেউ এ দুঃখদুর্দশাপূর্ণ ভবসমুদ্র অবলীলায় পার হতে পারে। আর তাই সমস্ত মনোগত জল্পনা-কল্পনা ও অবিশ্বাসের বাঁধ ভেঙ্গে যিনি এ জাহাজে উঠবেন তিনি নিশ্চিতভাবেই সঠিক গন্তব্যে অর্থাৎ ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তন করবেন কেননা এই জাহাজের চালক একজন সুদক্ষ মেসেঞ্জার যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা সমস্ত শক্তি প্রাপ্ত হয়ে ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তনের সমগ্র দিক নির্দেশনা সম্পর্কে অবগত। আর সেই মেসেঞ্জার (বার্তাবাহক) আর কেউই নন তিনি হলেন ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। হরে কৃষ্ণ॥

(মাসিক চৈতন্য সন্দেস্য জুলাই ২০০৯ সালের প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here