উন্নত জ্যোতির্বিদ্যা (পর্ব-০১)

0
481

সদাপূত দাস: বর্তমানে আমরা পৃথিবীকে গোলাকার হিসেবে জানি, কিন্তু প্রাচীন গ্রীকরা পৃথিবীকে সমতল চ্যাপ্টা হিসেবে বিশ্বাস করত। উদাহরণস্বরূপ: খ্রীস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দির পূর্বে গ্রীক দার্শনিক থেলিস পৃথিবীকে সমতল চাকতি হিসেবে ধারণা করেন যেটি কাঠের গুলির মত জলে ভাসছে। এক শতক শেষে এনাগোরাস মতবাদ দেন যে, পৃথিবী সমতল এবং বাতাসে ভাসছে। কয়েক দশকের পর বিখ্যাত অণুবিদ ডেমোক্রিটাস ভিন্নমত পোষণ করে বলেন যে, পৃথিবী গোলাকার যা গ্রীকদের কাছে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি তখন। সর্বপ্রথম ২য় শতকে পৃথিবীর ব্যাস মাপার চেষ্টা করেন ইরেটোস্টিন।
গবেষকগণ বিশ্বাস করেন যে, গ্রীকদের দর্শনগত এবং বৈজ্ঞানিক অর্জন পূর্বে প্রাচীন পৃথিবীর মানুষেরা পৃথিবীকে একটি গোলাকার সমতল চাকতি হিসেবে জানত। তাই ভগবত পুরাণে বর্ণিত সমতল গোলাকার চাকতি রূপ পৃথিবীর বর্ণনায় বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। গবেষকগণ শ্রীমদ্ভাগবতম এর নির্ণয়কাল সম্পর্কে ধারণা করছেন ৫০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, যদিও এই শাস্ত্রে আরো বহু পূর্বের এমনকি খ্রিস্টপূর্বের ৩ মিলিয়ন বছর আগের ঘটনাও বিবৃত হয়েছে।
শ্রীমদ্ভাগবতম মতে পৃথিবী একটি বৃত্তাকার চাকতি যার ব্যাস ৫০০ মিলিয়ন যোজন। এক যোজন ৮ মাইলের সমান। তাই পৃথিবীর ব্যাস হবে ৪ বিলিয়ন মাইল। ভূমণ্ডল গোলাকার নকশায় নির্মিত দ্বীপ এবং সমুদ্র রয়েছে। পৃথিবীর এই উপাদানসমূহের নাম ও তাদের ব্যাসের একটি ধারণা চিত্র-১ এ উল্লেখিত হয়েছে। ভাগবত পুরাণ মতে ভূমণ্ডলের বিভিন্ন দ্বীপ এবং মহাসাগরগুলির বর্ণনা যোজন পদ্ধতি অনুসারে)iskcon. ctg

জম্বুদীপ থেকে পুস্করদ্বীপ পর্যন্ত ৭টি দ্বীপ রয়েছে। জম্বুদ্বীপ অভ্যন্তরীণভাবে চাকতির মত এবং অন্য ৬টি আরো বৃহৎ আংটি আকৃতির গোলাকার। এছাড়াও দ্বীপ এর পাশাপাশি অনেকগুলো আংটি সদৃশ আকৃতির মহাসাগর রয়েছে যেগুলো লাভানদ দ্বারা শুরু হয়। লাভানদ হচ্ছে এটি লবণাক্ত যেটির চারপাশে জম্বুদ্বীপ রয়েছে এবং শেষ হয়েছে স্বাদুদক দিয়ে। স্বাদুদক হচ্ছে মিষ্টি জলের মহাসাগর। স্বাদুদক ছাড়া আরেকটি রিং আকৃতির কাঞ্চনভূমি রয়েছে যার ভূমি সোনালী আকৃতির এবং অদর্মতলোপমা ভূমি যা দেখতে আয়নার মত। এখানে আরো তিনটি গোলাকার পর্বতমালা রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে মেরু পর্বত, যেটি ভূমণ্ডলের মাঝখানে অবস্থিত এবং আকৃতিতে কোণ আইসক্রিমের মত, যার ব্যাসার্ধ ৮০০০ যোজন থেকে শুরু করে একেবারে উপরের দিকে ১৬০০০ যোজন পর্যন্ত বিস্তৃত। অন্য দুটি পর্বতমালাকে আমরা ছোট কোন রিং এর সাথে তুলনা করতে পারি। প্রথমটি হচ্ছে মানসত্তার, যার ব্যাসার্ধ হচ্ছে ১৫৭৫০ হাজার যোজন এবং যা ভূমণ্ডলের ভেতরের অংশকে পৃথক করেছে (এটির শেষে আয়নাসদৃশ ভূমি রয়েছে।) আলোকবর্ষ নামক অন্ধকারময় অংশ থেকে।
প্রথম নজরে ভূমণ্ডলকে একটি অস্বাভাবিক প্রতিকৃতির পৃথিবী বলে মনে হবে যাতে প্রচুর সমতল রিং আকৃতির অঞ্জল রয়েছে এবং মহাসাগর ও সমুদ্র সমূহ ভৌগলিক রেখার সাথে মিলে না এমন। কিন্তু সতর্কতার সাথে পরিলক্ষিত করলে দেখা যাবে যে ভূমণ্ডল বলতে পৃথিবীকে বোঝানো হয়নি। সেটি কেন তা বোঝার জন্র আমাদের সূর্যের গতি পরিলক্ষিত করতে হবে। ভাগবতে বলা হয়েছে যে, সূর্য তার রথে করে পরিভ্রমণ করে। এই রথের চাকাগুলো বছরের অংশ যেমন মাস এবং ঋতু নিয়ে গঠিত। এখানে আমরা যদি চাকাটির আয়তনের দিকে নজর দিই তবে দেখব যে, এই একটি অক্ষদণ্ড (যেই কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে রথটি ঘুরছে) রয়েছে জম্বুদ্বীপের মধ্যখানে অবস্থিত মেরু পর্বতের উপর। অন্যপ্রান্তের অক্ষদণ্ডটি এমন একটি চাকার সাথে লাগানো যা মানসত্তোর পর্বতে তেল নির্গমনকারী যন্ত্রের মত ক্রমাগত ঘুরছে। চাকাগুলো মানসত্তোর পর্বতমালার উপর এমনভাবে ঘুরে যেন সেটি একটি দৌড় প্রতিযোগিতার ট্র্যাক বলে মনে হয়। অক্ষদেণ্ডর সাথে সংযোগ রেখে সূর্য ভূমণ্ডলের উপর প্রায় ১০০,০০০ যোজন পথ অতিক্রম করে। যেহেতু এটির ব্যাসার্ধ দণ্ডমেরেু পর্বত থেকে মানসত্তোর পর্বত পর্যন্ত তাই এটির দৈর্ঘ্য অবশ্যই ১৫,৭৫০ হাজার যোজন অথবা ভূমণ্ডলের উপর সূর্যের উচ্চতার প্রায় ১৫৭ গুণ। যেহেতু সূর্যের বিস্তার তার কেন্দ্র মেরু পর্বত বরাবর এবং ঘূর্ণায়মান রেখা বা চাকা মানসত্তোর পর্বত এর উপর অবস্থিত তাই সূর্যের অবস্থান ভূমণ্ডলের উপরের স্তরের খুবই নিকটবর্তী। এটি বোঝার জন্য ভাবুন এমন একটি স্কেল মডেলে কথা যেটি সূর্যের চাকায় ১০০,০০০ হাজার যোজন দূরত্বে ঘুরছে। এই মডেলে সূর্য হচ্ছে একটি বল যেটি কোন সমতল মাঠের উপর ১৫৭.৫ ফুট উচু দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট যা অক্ষদণ্ড হিসেবে পরিচিত। তার এক কোণায় মেরু পর্বত রয়েছে যা ১ ফুট উঁচু এবং অন্যশেষ প্রান্তে একটি চাকা যা ১ ব্যাস ১ ফুট যেটি গোলাকার ঘুরতে থাকে। এখন কেউ যদি মেরু পর্বতকে বেইজ ধরে সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে তবে সে সূর্যের কেন্দ্র ৫০ ফিট তার চেয়ে একটু বেশি উঁচুতে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। (বাকী অংশ আগামী পর্বে)

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ এপ্রিল ২০১২ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here