আয়ুর্বেদিক খাদ্যাভ্যাস: (শেষ পর্ব)

0
1006

গত সংখ্যার পর: প্রতিটি মানুষের খ্যাদ্যাভ্যাস প্রণালীতে ৩টি দোষ (ভত্ত, পিত্ত, কফ) এবং ৬ রকমের স্বাদ রয়েছে। যা প্রত্যেকের জীবনে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আয়ুর্বেদে একটি সূত্র রয়েছে “সদৃশ দুটি বস্তু থাকলে আয়তনের বৃদ্ধি হয় আর বিপরীতধর্মী দুটি বস্তু থাকলে সেগুলো বা ব্যালেন্স রক্ষা করে।” তেমনি আমাদের জন্মের সময় আমরা সুনিদিষ্ট দোষের ব্যালেন্স নিয়ে জন্মগ্রহণ করে থাকি। আমাদের জীবনে সুস্থ শরীর টিকিয়ে রাখার অর্থ হল যতটুকু সম্ভব জন্মসূত্রে পাওয়া সেই দোষের ব্যালেন্স বজায় রাখতে সক্ষম হওয়া। জন্মের সময় আমাদের যে দোষের ব্যালেন্স থাকে তাকে বলা হয় “প্রকৃতি” আর পরবর্তীতে যে অসমতা পরিলক্ষিত হয় তাকে “বিকৃতি” বলে।
যদি আমাদের দেহে যেকোন দুটি দোষ সমভাবে প্রকট হয় তবে তাদের মধ্যে বৈষম্য দেখা দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আগেই বলা হয়েছে যে সুস্থ থাকার প্রধান নিয়ামক হচ্ছে উক্ত ত্রিদোষের ভারসাম্য বজায় রাখা। আয়ুর্বেদ মতে, শুধুমাত্র সঠিক ভারসাম্যপূর্ণ জীবন পরিচালনার মাধ্যমে যে কেউ আমাদের শরীরের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং ত্রিদোষের সমতা রক্ষা করতে পারেন।
মানুষের চারটি প্রধান কার্যক্রম খাওয়া, ঘুমানো, বংশবৃদ্ধি ও আত্মরক্ষার মধ্যে খাওয়া হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শরীরের ভারসাম্য ও ভারসাম্যহীনতার জন্য দায়ী মূলত খাদ্যাভ্যাস প্রণালী। ত্রিদোষের প্রত্যেকেই দুটি করে শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন ঃ “ভত্ত” দোষ নিয়ন্ত্রণ করে বায়ু এবং ইথার পিত্ত দোষ নিয়ন্ত্রণ করে জল এবং আগুন, কফ দোষ নিয়ন্ত্রণ করে জল এবং মাটি।
উক্ত উপাদানগুলো সাধারণত বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বায়ু অন্য সকল বস্তুকে আমাদের দেহে পরিবহণে সহায়তা করে থাকে। অগ্নি প্রত্যেক উপাদানকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তরিত করে থাকে। যেমন বরফ থেকে জল হয় আবার জল বাষ্পে পরিণত হয় । অন্যদিকে জল বিভিন্ন উপাদানকে একীভূত করে যেমন ময়দার সাথে জল মেশালে সেখান থেকে রুটি তৈরি করা যায়। অন্যদিকে মাটি হচ্ছে এমন একটি শক্তি যা দৃঢ়তা প্রদান করে থাকে।
উপরোক্ত শক্তিসমূহ সমন্বিতভাবে আমাদের খাদ্যপ্রণালী ও দেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এছাড়া নিম্নাক্ত তালিকার মাধ্যমে আমরা দেহের ৬টি স্বাদের গঠনপ্রণালী জানব:
সাধারণত আমাদের দেহের অভ্যন্তরে থাকা দোষসমূহ মল, মূত্র এবং ঘামসমূহ দেহের বাইরে নির্গত হয়। এছাড়া আয়ুর্বেদ আমাদের দেহ শুদ্ধিকরণের বহু পন্থা দিয়েছে এবং কোন প্রকার খাবারে কি ধরণের উপাদান বা দোষ রয়েছে তার সুবিস্তৃত বর্ণনা করা হয়েছে। আমরা অতি সংক্ষেপে সেগুলো থেকে কতিপয় বিষয়ে বর্ণনা করব ঃ-
মিষ্টতা:
সংস্কৃত অর্থে একে বলে মাদুরা। অধিকাংশ খাবারের মধ্যেই মিষ্টতা রয়েছে তবে যে সমস্ত খাবারে চিনি কিংবা যষ্টিমধু রয়েছে সেখানে প্রবলভাবে মিষ্টতা পাওয়া যাবে। এছাড়া দুধ কিংবা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার যেমন শস্যতে এই উপাদান বিদ্যমান। মিষ্টতা ‘ভত্ত’ ও ‘পিত্ত’ দোষ প্রশমিত করে কিন্তু ‘কফ’ দোষ বৃদ্ধি করে। কিছু কিছু খাবারে যে এই উপাদান রয়েছে তা বোঝা যায় না। যেমন: অন্ন বা ভাতে। প্রথমে কিছু তিক্ত বা তিতা জাতীয় খাবার গ্রহণ করার পর অন্ন গ্রহণ করলে মিষ্টতা অধিক উপলব্দি করা যায়। মিষ্টতা আমাদের দেহের টিস্যু গঠনে সহায়তা করে। এছাড়া এটি দেহের শক্তি ও জীবনীশক্তি প্রদান করে। আবার অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার আমাদের দেহকে নিশ্চল করে এবং দেহের সংযোগ নলি বন্ধ করে দেয়। যদি মিষ্টি সঠিকভাবে হজম না হয় তবে তা থেকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং পরজীবি সৃষ্টি করে। এছাড়া অতি মিষ্টি স্বাদ রক্ত ঘন করে এবং কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়। মিষ্ট স্বাদের ভারসাম্য থাকলে ভালোবাসা কিংবা আনন্দের উদ্বেগ হয় কিন্তু ভারসাম্য না থাকলে লোভ এবং জড়জগতের প্রতি অতি আসক্তি জন্মে।
টক:
সংস্কৃত ভাষায় এর নাম ‘অম্ল’ অর্থাৎ এসিডিয়। এই জাতীয় খাবার ‘পিত্ত’ ও ‘কফ’ বৃদ্ধি করে কিন্তু ‘ভক্ত’ দোষ কমায়। গাজন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন সকল খাদ্য, ভিনেগার, সবুজ আঙ্গুর, অপক্ক আম, লেবু প্রভৃতি খাবারে টক থাকে। টক আমাদের ইন্দ্রিয়কে তীক্ষ্ম করে এবং হজমে সহায়তা করে। এছাড়া এটি দেহ সতেজ করে। কিন্তু অতিরিক্ত টক গ্রহণ দেহের পরিবহণ নালী বন্ধ করে এবং যে সমস্ত লোকের ‘পিত্ত’ দোষ রয়েছে তাদের দেহে অম্ল রোগ (Acidity) পাকস্থলী দগ্ধ হওয়া এবং অন্যান্য রোগ সৃষ্টি করে। টক খাবার আমাদের সচেতনতা ও বিচক্ষণতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। কিন্তু অতিরিক্ত টক গ্রহণ আমাদের শক্রতা এবং ঈর্ষাপরায়ণ হতে সহায়তা করে। বসন্ত লোধ নামক এক আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক বলেছিলেন যে, “যখন আমাদের কোন প্রিয় সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় তখন প্রায়ই আমাদের মুখে টক স্বাদ পরিলক্ষিত হয়।”
লবণাক্ততা:
এটি সমস্ত খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধি করে। এতে ‘পিত্ত’ এবং ‘কফ’ বৃদ্ধি পেলেও ‘ভক্ত’ প্রশমিত হয়। এটি শরীরে জল প্রবাহের সহায়তা করে। এছাড়া দেহের বিষাক্ত গ্যাস মলাশয় দিয়ে বের করে পেট ফাঁপা থেকে রক্ষা করে। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ করলে রক্ত কণিকা দুবর্ল হয় এবং উচ্চরক্তচাপ বৃদ্ধি হয়। এছাড়া দেহের চামড়া বিবর্ণ হয়ে থাকে। সাধারণত বিশুদ্ধ খনিজ লবণ আমাদের দেহে ‘পিত্ত’ দোষ বৃদ্ধি করে না যতটা না সমুদ্র লবণ করে থাকে। ভারসাম্যপূর্ণ লবণাক্ত খাবার গ্রহণ জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করে কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণ আমাদের যৌনকামনা বৃদ্ধি করে থাকে।
তীক্ষ্নতা:
সংস্কৃত অর্থে কটু। এটি ‘পিত্ত’ ও ‘ভত্ত’ দোষ বৃদ্ধি করে কিন্তু ‘কফ’ প্রশমিত করে। মরিচ, আদা, লবঙ্গ, গোলমরিচে কটু স্বাদ রয়েছে। এছাড়া পেঁয়াজ, রসুন, মুলাতে তীক্ষ্নতা রয়েছে। কটু স্বাদ ক্ষুধা বৃদ্ধি, পরিপাকে সহায়তা এবং চর্বি কমানোতে সহায়তা করে কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণ করলে দেহের বীর্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং বংশবৃদ্ধি ক্ষমতা কমে যায়। এছাড়া কটু খাবারগুলো আমাদের রাগ এবং হতাশা বৃদ্ধি করে। তাই পেঁয়াজ, রসুন এবং অতি ঝাল পরিহার করুন।
তিক্ত:
নিম, এলোভেরা, চন্দন প্রভৃতিতে এই প্রকারের স্বাদ রয়েছে। আধুনিক সমাজে এই সকল খাবারের ব্যবহার তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু তিতা বা তিক্ত স্বাদ যেকোন খাবারের স্বাদ বৃদ্ধি করে অর্থাৎ যে কোন খাবার গ্রহণের আগে এই প্রকার খাবার স্বল্প খেলেও স্বাদ বৃদ্ধি হবে। এটি আমাদের বৃক্ক (লিভার) পরিষ্কার করে, আমাদের শরীরের বিষাক্ততা, উষ্ণতা রোধ করে এবং জীবাণু ধ্বংস করে, এছাড়া রক্ত পরিশুদ্ধ করে। এই প্রকারের খাবার অতিরিক্ত গ্রহণ করলে যৌন কামনা প্রশমিত হয়। তাই যারা কৌমার্য বা ব্রক্ষচারীব্রত পালন করতে চান তাদের বেশি করে এই প্রকারের তিক্ত খাবার গ্রহণ করা উচিত।
কষা:
এটি ‘ভত্ত’ দোষ বৃদ্ধি করে কিন্তু ‘পিত্ত’ ও ‘কফ’ দোষ কমায়। পাকা নয় এমন কলা , শিম ও মটরশুটি জাতীয় খাবারে এই স্বাদ রয়েছে। এই প্রকারের খাবার আলসার রোগ সারাতে পারে এবং শরীরে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি করে। এই প্রকারের স্বাদে মানসিক বিকাশ হয় কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণ করলে ভয় ভীতি বৃদ্ধি পায়।
এবার মিশ্র স্বাদের কথায় আসা যাক। উদাহরণস্বরূপ যদি আমরা একটি কমলার অর্ধেক অংশ খাওয়ার পর মিষ্টি জাতীয় দ্রব্য যেমন মধু খাই এবং এরপর কমলার বাকী অর্ধেক অংশ খাই তবে কমলার ২য় অংশটি ১ম অংশটির চেয়ে বেশি টক বলে মনে হবে। তাহলে এখানে স্বাদের পার্থক্য হল কেন? তার কারণ হল মধু খাওয়ার মাধ্যমে আমাদের মিষ্টি স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা পরিতৃপ্ত হয়েছে এবং ২য় বার কমলা খাওয়ার সময় তার টক স্বাদ আরো ভালোভাবে উপলব্দি হয়েছে।সুতরাং আমাদের দেহে ‘প্রকৃতি’ তথা ত্রিদোষের ভারসাম্য, পরিপাকপ্রণালীর ভারসাম্য রাখার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেহ ও মন-বুদ্ধিকে সংযত, ক্রিয়াশীল ও সুস্থ রাখতে পারি। প্রকৃতি প্রদত্ত বিশুদ্ধ জল ও ভারসাম্যপূর্ণ নিরামিষ খাবার গ্রহণের মাধ্যমে যে কেউ তাদের দেহকে সুস্থ সবল রাখতে পারে এবং হতে পারে নিজেই নিজের ডাক্তার। ॥হরে কৃষ্ণ॥

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ এপ্রিল ২০১১ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here