আমাদের প্রিয় মা যমুনা

0
499

মাধব দাসঃ মুনা দেবীদাসী ইস্‌কন কৃষ্ণ আন্দোলনের শুরুর দিকের একজন আত্মনিবেদিত ভক্ত। সেসাথে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ইস্‌কনের মুখপাত্র হিসেবে যমুনা দেবী দাসী হলেন এক অতি সুপরিচিত মুখ। হরে কৃষ্ণ আন্দোলনের শুরু থেকে এই মহিয়সী নারীর অবদান ইস্‌কনের সমস্ত ভক্তদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। সারাবিশ্বে নিরামিষের গুরুত্ব প্রচার এবং বিভিন্ন আকর্ষনীয় সুস্বাধু কৃষ্ণ প্রসাদের রেসিপি তৈরি করে সারাবিশ্বে নিরামিষ খাদ্যদ্রব্যকে খুবই জনপ্রিয় করে তুলেছেন। এ অবদানের জন্য পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার। গত ২০ ডিসেম্বর ২০১১ সফলা একাদশী তিথিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এই শুদ্ধ ভক্ত নিত্যলীলায় প্রবিষ্ট হন। জপমালা হাতে দিব্য হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে করতে তার দেহবসান হয়। তার কয়েকজন ঘনিষ্ট ভক্তরা বলছিলেন যমুনা দেবী দাসী যেভাবে রান্না করতেন তা মনে হয় যেন অবিকল স্বয়ং রাধারাণীর হাতের রান্না। শ্রীল প্রভুপাদের সবচেয়ে প্রিয় শিষ্যাদের মধ্যে একজন এই যমুনা দেবী দাসী। নিশ্চয়ই চিন্ময়ধাম বৃন্দাবনে শ্যামসুন্দরের জন্য রান্নায় রাধারাণীকে সহায়তার জন্য গেছেন।
নিম্নে যমুনা দেবী দাসীর সংক্ষিপ্ত কিছু ইতিহাস তুলে ধরা হল :


বিটলসের জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর থেকে যমুনা দেবী দাসী হাজার হাজার ভক্তের সামনে কীর্তন পরিচালনা করতেন। সেসময় তিনি সারা ভারত ও লন্ডন জুড়ে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র বিতরণের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। যমুনা দেবীর প্রকাশিত গ্রন্থসারাবিশ্বে vegetarian Indian cook জিতেছেন শীর্ষ আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ওয়াশিংটন পোস্টে তিনি নিয়মিত নিরামিষ বিষয়ে লিখতেন। জীবনের গত ৪৫টি বছর নিজেকে উৎসর্গ করেছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অপ্রাকৃত সেবায়। হরে কৃষ্ণ আন্দোলনে তিনি সবার খুব প্রিয় সদস্য হিসেবে সুপরিচিত।

১৯৬৬ সালে ইস্‌কন প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য শ্রীল প্রভুপাদের সাথে সাক্ষাত হয় এবং তার কাছে দীক্ষা নেয়ার পর নাম হয় যমুনা দেবী দাসী। পারমার্থিক আন্দোলন সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার প্রচেষ্ঠা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যার ফলে সারাবিশ্বে এখন চারশোরও বেশি ইস্‌কন মন্দির, রেস্তোরা, ফার্ম কমিউনিটি এবং ইকো-ভিলেজ গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি কৃষ্ণ সেবার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। জর্জ হ্যারিসনের সুর ও যমুনা দেবী দাসীর গাওয়া ‘গোবিন্দম আদি পুরুষম…’ গানটি বিশ্বের প্রতিটি ইস্‌কন মন্দিরে প্রতিদিন ভোরে শোনা হয়। ১৯৬৮ সালে যমুনা দেবী দাসী ও তাঁর স্বামী গুরুদাস সহ শ্রীল প্রভুপাদের আরো চারজন শিষ্য ইংল্যান্ডের লন্ডনে হরে কৃষ্ণ সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যেখানে যমুনা দেবী দাসীর সংশ্লিষ্টতা ছিল অগ্রনীয়। কোন অর্থ, সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই তারা শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় সফল হয়েছিলেন। তখন তাদের সঙ্গে জর্জ হ্যারিসন ও বিটলসের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠে এবং হ্যারিসন হরে কৃষ্ণ আন্দোলনে যোগদান করে। যমুনা দেবী দাসী একজন মিউজিশিয়ান ছিলেন। বিটলসের সঙ্গে অনেক অ্যালবামেও কাজ করেন। ‘গোবিন্দম’ গানটি ইউরোপিয়ান মিউজিক চার্টে হরে কৃষ্ণ গানটির সাথে যৌথভাবে শীর্ষে অবস্থান করে। ঐদিন থেকে গোবিন্দম গানটি ইস্‌কনের প্রতিটি মন্দিরে ভোরে গাওয়া বাধ্যতামূলক। শ্রীল প্রভুপাদের অনেক দিন যাবৎ ভারত ভ্রমনের সময় অন্যান্য ভক্তদের সাথে যমুনা দেবী দাসী তার সঙ্গ পেয়েছিলেন। তিনি প্রায় দীর্ঘ আট বছর শ্রীল প্রভুপাদের জন্য রান্না করেন। তিনি এক চিঠিতে লিখেছিলেন, শ্রীল প্রভুপাদের সাথে ভারত ভ্রমণের সময় যমুনা দেবী দাসী ব্রাহ্মণদের কাছ থেকে বিভিন্ন রান্না শেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনিই হয়তোবা প্রথম কোন পশ্চিমা ব্যক্তি ছিলেন। যিনি বিভিন্ন বাইরের মন্দিরের রান্নাঘরে কঠোর নিয়মকানুনের মধ্যেও রান্না করার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার আগে একটি প্রকাশিত গ্রন্থ Lord Krishna’s Cuisine: The Art of Indian vegetarian cooking’’  অর্জন করে বহু পুরস্কার। যাদের মধ্যে ছিল International Association of Culinary Professionals cookbook of the year  সম্প্রতি অনেক বছর ধরে কানাডাতে নিরামিষ খাদ্যের গুরুত্ব ও পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার কৌশল প্রচারে আত্মনিবেদিত ছিলেন। এরপর অবশেষে পুনরায় ফিরে আসেন ফ্লোরিডায় একটি কৃষ্ণ কমিউনিটিতে। যমুনা দেবী দাসী অনবদ্য অবদান হরে কৃষ্ণ আন্দোলনের সকল অনুসারীর কাছে চিরজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তার দৃষ্টান্ত কৃষ্ণভাবনা প্রচারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তার এক উক্তিতে তিনি বলেছিলেন, “পেছনে ফিরে তাকালে মনে পরে সেই দিনটির কথা যেই দিনটিতে প্রথম আসি শ্রীল প্রভুপাদের অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলাম, তখন কখনে কল্পনাও করিনি, আমার জন্য অপেক্ষা করছিল অপ্রাকৃত দর্শন, সঙ্গীত শিল্পের প্রাচুর্যমন্ডিত সম্পদ।” চৈতন্য সন্দেশের পক্ষ থেকে তারই উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি উক্তি, “হরে কৃষ্ণ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠার লক্ষে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আপনি যা করে গেছেন সেই ঋণ কেউই পরিশোধ করতে পারবে না। কেউই না।” হরে কৃষ্ণ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here