আমাদের অবশ্যই ভালো মানুষ হতে হবে

0
494

প্রভুপাদ পাশ্চাত্য দেশে কৃষ্ণকথা শোনাবার জন্য আপনার গুরুদেব আপনাকে এই প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছেন প্রায় ৩৬ বছর হতে চলল। কিন্তু এই সময়ের ভিতর পৃথিবীতে অনেক কিছু ঘটে গেছে। এই পৃথিবী…
শ্রীল প্রভুপাদঃ সেটা কিন্তু নয়। সেই সময়কালটুকু হচ্ছে আপেক্ষিক। মানুষ হিসেবে কিছু সময়ের জন্য আমরা বেঁচে থাকি- বলা যায় একশত বছর – কিন্তু দেবতারা লক্ষ লক্ষ বছর বেঁচে থাকতে পারে। আর একটি পিপীলিকা মাত্র কয়েক ঘন্টা বেচেঁ থাকতে পারে। অতএব এগুলো হচ্ছে আপেক্ষিক। কিন্তু সময় হল নিত্য আর মানব ইতিহাসে কি ঘটছে নিত্যকালের পরিপ্রেক্ষিতে, তা কিছু নয়। পিপীলিকা-সমাজে যদি কোন আকষ্মিক দুর্ঘটনা ঘটে, পিপীলিকারা হয়ত সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকতে পারে, কিন্তু মানব সমাজ সে ব্যাপারে কোনও প্রকার কর্ণপাত করবে না। অনুরূপভাবে মানব-সমাজে যদি কোন আকষ্মিক দুর্ঘটনা হয়, আমাদের থেকে উন্নত দেবতারা সে ব্যাপারে কোন চিন্তা করবে না। কতগুলি পাখি, বিড়াল, কিংবা কুকুর পরস্পর মারামারি করতে পারে এবং তাদের কাছে তা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে, কিন্তু আমাদের জানা উচিত যে, যা কিছু এই পৃথিবীতে ঘটছে,   বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্রিয়াকলাপের তুলনায় তা কিছুই নয়। ঘটনা কেবল ঋতু পরিবর্তনের মতো আসে আর যায়। কৃষ্ণের কাছেও অর্জুন এই প্রশ্ন রেখেছিল ‘এটি এক আকস্মিক বিপর্যয়! নিজের স্বজনদের আমাকে হত্যা করতে হবে! অর্জুন যদিও বিশ্বাস করেছিলেন যে এটি একটি বিপর্যয়, কিন্তু কৃষ্ণ সেটিকে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। “মাত্রাস্পর্শান্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণ সুখদুঃখদা।”  ‘হে কৌন্তেয়, সুখ ও দুঃখের ক্ষণস্থায়ী আগমন এবং যথা সময়ে তাদের অন্তর্ধান শীত ও গ্রীষ্মের আগমন ও অন্তর্ধানের মতো।’ (গীতা-২/১৪) শীতকালে জল খুব একটা আনন্দদায়ক নয়, কিন্তু গ্রীষ্মকালে জল আনন্দদায়ক। তাহলে জলের অবস্থানটি কি? জল কি তবে আনন্দদায়ক অথবা নয়? জল একই রকমের, কিন্তু আমাদের ত্বকের সংস্পর্শের প্রভাবে জল আনন্দদায়ক বলে প্রতিভাত হয় অথবা আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আনন্দদায়ক বলে মনে হয় না। ঠিক যেমন গ্রীষ্মকালে খুব গরম। কিন্তু তা বলে কি সে সময় রান্না করা ছেড়ে দিতে হবে? রান্না অবশ্যই করতে হবে। তেমনই, শীতকালে যেহেতু জল ঠান্ডা, সেজন্য কি আমি স্নান করা পরিত্যাগ করব? না। এই সকল অবস্থা আসে আর যায়, কিন্তু আমাদের কর্তব্যকর্ম হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত। সেটিই আমাদের দর্শন এবং সেটা কি একটি বাস্তব সত্য। ঋতুর মতো পরিবর্তনগুলি আমাদের জীবনে আসে আর যায়। কখনও কখনও সেগুলি আমাদের আনন্দ দান করে আর কখনও কখনও দুঃখ দান করে, কিন্তু মানব-জীবনে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানকে হৃদয়ঙ্গম করা। যে সকল বিপর্যয় আসে আর যায় সেদিকে আমাদের কর্ণপাত করা উচিত নয়। তাদের আমাদের জানা দরকার নেই, কারণ তাদের অভাব এই রকমেরÑকখনও আনন্দদায়ক বা কখনও আনন্দদায়ক নয়। এতৎ সত্ত্বেও আমাদের কর্তব্যকর্ম করতে হবে, আর তা হচ্ছে ভগবানকে হৃদয়ঙ্গম করা।
সাংবাদিকঃ তাহলে ভবিষ্যতটি কোথায়? কৃষ্ণভাবনামৃত বহু সংখ্যক লোককে নিয়ে আসা কী সম্ভব হবে?
শ্রীল প্রভুপাদঃ নিঃসন্দেহে। ভালো ও মন্দ লোক আছে। ভালো লোকেরা এই প্রচার সংগঠনকে গ্রহণ করছে, কারণ এটি একটি উত্তম প্রচার কার্যালয়। অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ না করা, মাংস না খাওয়া, নেশা না করা এবং দ্যুতক্রীড়ায় নিযুক্ত না হওয়া-কেউ যদি এই চারটি নিয়ম-নীতি পালন করে, তাকে ভালো লোক বলে গণ্য করতে হবে এবং কেউ যদি এই ৪টি নিয়ম পালন না করে তবে সে একজন মন্দ লোক। তাই ভালো লোক এই কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করবে, মন্দ লোক গ্রহণ করবে না। আমরা নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি বলে দিই কিভাবে ভালো মানুষ হতে হয়। কারণ একজন ব্যক্তি যদি ভালো মানুষ না হয় কি করে সে ভগবানকে জানবে? প্রথমে আমাদের ভালো মানুষ হতে হবে। তারপর আমরা ভগবানকে জানতে পারব। ভগবান মঙ্গলময় এবং আমরা যদি ভালো না হই তাহলে আমরা তাঁকে জানতে পারব না। সেটিই সঠিক। এখন পছন্দটি আমাদের কাছে। ভবিষ্যতটি সকলের কাছে খোলা। কোন বিধিনিষেধ নেই। কেউ বলতে পারে না, এই শ্রেনীর লোকগুলো খারাপ হবে আর এই শ্রেনীর লোকগুলো ভালো হবে। যে কেউই ভালো হতে পারে। আমরা যদি একটি শিশুকে সুন্দরভাবে শিক্ষা দিই সে ভালো হয়, কিন্তু আমরা যদি খারাপভাবে শিক্ষা দিই সে একজন দুরাচারী হয়। সরকার, পিতা এবং শিক্ষকদের কর্তব্য সকলকে ভালো মানুষে পরিণত করা। যদি সরকার মন্দ হয়, পিতা মন্দ হয়, বা সমাজ মন্দ হয় তাহলে একজন শিশু কিভাবে ভালো হতে পারে? সর্বত্রই সরকার,পিতা ও সমাজ মন্দ। সুতরাং আমরা খারাপ মানুষ সৃষ্টি করছি। এজন্যই কোথাও সুখ-শান্তি নেই।
সাংবাদিকঃ আপনার চারপাশের মানুষগুলো কি রকমের?
শ্রীল প্রভুপাদঃ এরা সকলেই ভালো মানুষ।
সাংবাদিকঃ এরা ভালো মানুষ অথচ এই খারাপ সমাজেই তারা উন্নীত হয়েছে।
শ্রীল প্রভুপাদ : তারা খারাপ সমাজেই উন্নীত হয়েছে কিন্তু ভালো হওয়াটা তারা পছন্দ করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here