আপনি কি শিক্ষিত?

0
26

উর্মিলা দেবী দাসী

বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীদের বার্ষিক বা শেষ পরীক্ষার ভাবনায় শরীর থেকে ঘাম ঝড়ে। যখন তারা পরীক্ষায় পাশ করে এবং বিভিন্ন ডিগ্রী অর্জন তখনই তাদেরকে শিক্ষিত হিসেবে খেতাব দেওয়া হয়।
কিন্তু শিক্ষিত হওয়ার জন্য বা শিক্ষিত বলে দাবি করার জন্য বৈদিক সংস্কৃতিতে রয়েছে ভিন্ন মাপকাঠি বা আদর্শ। শ্রীল প্রভুপাদ যার উক্তি প্রায়ই উল্লেখ করতেন সেই চাণক্য পণ্ডিত একজন ব্যক্তি শিক্ষিত কিনা তা পরীক্ষার জন্য তিনটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। এই তিনটি প্রশ্ন হলো চরিত্র, নৈতিকতা ও আত্মজ্ঞান ।

নারীকে মাতা স্বরূপ জ্ঞান

প্রথম পরীক্ষা : মাতবৎ পর দারেষু।
শিক্ষা আদর্শ পদ্ধতির মধ্যে একজন যথাযথ প্রশিক্ষিত যুবক পুরুষের উচিত নিজের পত্নী ছাড়া অন্য নারীদের মাতা রূপে দর্শন করা। অন্যভাবে বললে, বিবাহবহির্ভূত সঙ্গ করার বাসনা থেকে তার মন ও হৃদয় মুক্ত থাকা উচিত। তদ্রূপ একজন নারীর উচিত নিজের স্বামী ব্যতিত অন্য পুরুষকে পিতা হিসেবে দর্শন করা।
বৈদিক সমাজে, পুরুষদের অপর নারীদেরকে ‘মা’ হিসেবে সম্বোধনের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এখনও কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের সদস্যরা ঐ একই সদাচার শিক্ষা দেয়। যীশুও ঐ একই শিক্ষা দিয়েছিলেন যে, যখন কোনো পুরুষ নিজের পত্নী ছাড়া অন্য নারীর প্রতি কামার্ত হয় তখন তার হৃদয়েই সে ইতোমধ্যে ব্যভিচারি হয়েছে বা পরস্ত্রীগমন (Adultery) করছে।

রাস্তার আবর্জনা

দ্বিতীয় পরীক্ষা : অপরের সম্পদকে কিরূপে একজন গ্র্যাজুয়েট বা শিক্ষিত ব্যক্তি দর্শন করে থাকে।
চাণক্য পণ্ডিত বলেন, পর-দ্রব্যেষু লোস্ট্রবৎ একজন শিক্ষিত ব্যক্তি অপরের সম্পদকে রাস্তার পাথর বা আবর্জনা হিসেবে দর্শন করবেন।
একজন শিশুকে শিক্ষা দেওয়া উচিত যে, অনুমতি ছাড়া অপরের জিনিস না ধরা। আমি যখন দেখি কোনো শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীর ডেস্ক থেকে কিছু স্পর্শ করছে, তখন তাকে জিজ্ঞেস করি, “এটি কি তোমার? এটি স্পর্শ করার জন্য তুমি এর মালিকের অনুমতি নিয়েছ? যদি না নিয়ে থাক, রেখে দাও।” এমনকি শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত কোনো কিছু ধরার সময় আমি ঐ একই শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য সতর্ক থাকি, যেটি আমার ক্ষেত্রে এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আশা করি। অনুমতি ব্যতিত আমি তাদের ডেস্কের ভিতর তাকাই না বা তাদের ব্যক্তিগত জিনিসও স্পর্শ করি না।

কিভাবে অন্যদের দর্শন করে

তৃতীয় পরীক্ষা : আত্মবৎ সর্ব-ভুতেষু ।
একজন শিক্ষিত ব্যক্তি অন্য জীবদেরকে সে নিজেকে যেভাবে দেখেন সেভাবে দর্শন করবেন।
এক্ষেত্রে কিছু স্বর্ণ নীতি রয়েছে। তিনি অন্যদের সঙ্গে সেরকম আচরণ করবে যেরকম তিনি নিজের জন্য প্রত্যাশা করেন।
‘অন্যরা’ বলতে এখানে শুধুমাত্র কারো নিজের পরিবার, সঙ্গী, জনগণ বা এমনকি শুধু অন্য মানুষদের বোঝানো হয় না। যেরকম শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন, এমনকি এই আচরণ নিষ্ঠুর, হিংস্র প্রকৃতির প্রাণীদের জন্যে, যেরকম একটি বাঘ তার শিশু শাবকদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করে থাকে। যখন কোনো ব্যক্তি এই স্বর্ণ-নীতি এমনকি একজন শত্রু বা আত্মরক্ষাহীন প্রাণীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করে, তখন চাণক্য তাকে পাশ গ্রেড দিয়ে পুরষ্কৃত করতেন।
একজন শিক্ষিত ব্যক্তি স্বভাবতই একজন নিরামিশাষী হবেন এবং অন্যদের সেই মতে দর্শন করবেন। তিনি ভাববেন, “আমি তো নিজের কোনো ব্যাথা-বেদনা পছন্দ করি না, তবে খাওয়ার জন্য কেন আমি একটি প্রাণীকে ব্যাথা-বেদনা দেব? তিনি সৎ ব্যক্তি হবেন; “আমি প্রতারিত হতে পছন্দ করি না, তবে কেন আমি অন্যদের সঙ্গে প্রতারণা করবো?” এবং তিনি সর্বদা অপরের উপকার সাধন হয় সেভাবে কথা বলবেন।
“আমি সত্য শ্রবণ করতে পছন্দ করি, আমি অপমানিত হতে পছন্দ করি না এবং আমি তাই শ্রবণ করতে চাই যা আমার জন্য উপকারী। তবে অন্যদের সঙ্গে সেভাবে আমাকে কথা বলতে হবে।” অতএব একজন সত্যিকারের শিক্ষিত ব্যক্তি এমনকি বাক্যের দ্বারাও অন্যকে আঘাত করার প্রচেষ্টা করবেন না। একজন শিক্ষার্থী কর্মের আইন সম্পর্কে জানেন যে, “অন্যদের সঙ্গে আমি যা করব তা আমার ক্ষেত্রেও সাধিত হবে।”

কৃষ্ণ কর্তৃক ‘শিক্ষিত’ শব্দটির সংজ্ঞা

কৃষ্ণ একজন শিক্ষিত ব্যক্তিকে সংজ্ঞায়িত করেন যে, তিনি সমস্ত জীবদের তাঁরই অংশরূপে চিন্ময়ভাবে দর্শন করেন এবং কৃষ্ণ বলেন যে, সবকিছুই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান এটি দর্শন করে চরমে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি তাঁর শরণাগত হন।
দুর্ভাগ্যবশত, এই অন্ধকার কলিযুগে হাজার হাজার বিদ্যালয় তাদের শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও পারমার্থিক চরিত্র সম্পর্কে বিবেচনা ছাড়াই ডিপ্লোমা প্রদান করছে। কোনো একটি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কি হৃদয়ের অভ্যন্তরে বিবাহ বহির্ভূত মৈথুন বাসনা থেকে মুক্ত? তারা কি অন্যের সম্পদ ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখেছে? আমরা প্রায়ই পত্রিকায় পড়ি যে ক্যাম্পাসে ধর্ষন ও নির্বিঘ্নে চৌর্য প্রথা হয়ে চলেছে এবং আমরা দেখি উন্নত ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরাও মাংসাহার ও নিষ্ঠুর কার্যক্রমে লিপ্ত।
কিন্তু আমাদের সন্তানদের মিথ্যা জ্ঞানের নিশ্চয়তা থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রয়োজন যা বৈদিক আদর্শ অনুসারে অজ্ঞতাস্বরূপ, বরঞ্চ চলুন না এমন একটি শিক্ষার্থী প্রজন্ম গড়ে তুলি যারা নৈতিকতা ও চিন্ময় পাণ্ডিত্য দ্বারা সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক পরিচিতি : ড. এডিথ ই. বেস্ট (উর্মিলা দেবী দাসী) আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটি থেকে এডুকেশনাল লিডারশীপ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্যা। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গডহেড ম্যাগাজিনের সহ- সম্পাদক রূপে সেবা করছেন। এছাড়াও তিনি ইস্কন শিক্ষা বিভাগের উন্নয়নে নিরলস কাজ করে চলেছেন। অনন্ত বল্লভ দাস ও তার পরিবার ব্যাঙ্গালোরে, ইস্কন শ্রী জগন্নাথ মন্দিরের ভক্ত গোষ্ঠিদের সঙ্গে কৃষ্ণভাবনা অনুশীলন করেন।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here