আপনি কি মানসিক চাপে ভুগছেন?

0
66

পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ লোকই মানসিক চাপের কারনে বিভিন্ন সমস্যাই ভুগছেন। টেনশন থেকে উদ্ভুত এ চাপ শরীর, মনের উপর বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করে। আর এ জন্যই কেউ কেউ ঘুমের ঔষধ, নেশাজাতীয় দ্রব্য কিংবা কোথাও ভ্রমণের মাধ্যমে সেই চাপের উপশম ঘটাতে চাই। তারা বিভিন্ন উপায়ে এ থেকে নিবারণের উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। কৃত্রিম উপায়ে

আপনি কি মানসিক চাপে
ক্ষণিকের জন্য তারা এর থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করলেও কিভাবে সারাজীবন এই মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হওয়া যায় তার কোন স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। এই ধরণের মানুষগুলো ঠিক একজন মদ্যপায়ী মানুষের মত আচরণ করে। একজন মদ্যপায়ী মানুষ মদ খেয়ে কিছু সময়ের জন্য তার দুঃখ ভোলানোর চেষ্টা করে কিন্তু পরক্ষণেই আবার সে একেই দুঃখে নিপতিত হয়। মানসিক চাপ বিভিন্নভাবে সৃষ্টি হতে পারে। প্রকৃতির নিয়মই হল, এই ধরণের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে বদ্ধ জীবদের কষ্ট দেয়া। ধরুন আপনি একটি অনুষ্ঠানে গেলেন সেখানে উপস্থিত সকল অতিথিরা খুব সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে আছে। ঠিক তখনি কেউ একজন এসে বলল “কি ব্যাপার? আপনাকে আজ এই রকম দেখাচ্ছে কেন?” কিংবা আপনি দেখতে পাচ্ছেন সবাই আপনাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে কারণ আপনার ড্রেস-আপ ওদের মতো মানান সই নয়। ঠিক সেই মুহুর্তে আপনাকে কোন কারণে কেউ অপমান করলে আপনার অবস্থাটা ঠিক মরার উপর খাড়ার ঘাঁয়ের মতো অবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। ভাবুনতো তখন এমুহুর্তে আপনার কি কি সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। আপনার ত্বক জ্বালা করতে পারে, অতিরিক্ত ঘাম বের হতে পারে, মাথা ঘুরতে পারে, হাত-পা অবশ হতে পারে, মুখ শুকিয়ে যেতে পারে, নিজেকে ভারী ভারী মনে হতে পারে এমনকি শরীরের বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। এতো গেলো একটা উদাহরণ, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে আমরা এরকম আরো অনেক কারণে মানসিক চাপের সম্মুখীন হয় যার কারণে আমাদের উপর উল্লেখিত এই সমস্যাগুলি সৃষ্টি হওয়া ছাড়াও আরো বিবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমাদের ঐ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন অমঙ্গল সূচক লক্ষণও মনের মধ্যে ভেসে উঠতে দেখি। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, এ চাপের কারণে শরীরে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। হার্ট অ্যাটাক, নিদ্রাহীনতা, মাথা ব্যাথা, ব্রেইন ক্যান্সার ইত্যাদি বহুবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। যা আমাদের জীবনের নিত্য নৈমত্তিক ঘটনা। আমরা প্রতি নিয়ত এই ধরণের ঘটনা প্রায় সবার মধ্যে দেখতে পাই কিন্তু সেই অবস্থায় আমাদের কি করনীয় তা মানুষ বুঝতে পারে না। অনেক সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা আত্মহত্যা পর্যন্ত করতে দ্বিধাবোধ করে না। এছাড়াও সমাজে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এবং বিভিন্ন পেশায় সংযুক্ত পেশাজীবিরা এইধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়। আর যারা সংসার জীবনে আছে তাদের কথাতো বলাই বাহুল্য। ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের পড়ালেখার চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেকের মধ্যে পড়ালেখার প্রতি বিরক্তিভাব চলে আসে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এধরণের ছাত্র ছাত্রীরা এ অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে তাদের বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয় এবং অবশেষে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। এক্ষেত্রে অনেকাংশই দায়ী তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উচ্চতর ভাবনা, এবং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক চাপ যেন মনে হয় তারা কিছু একটা আনন্দের উৎস খোঁজার চেষ্টা করছে। আর তার ফলে তারা জড় জগতের সর্বোচ্চ আনন্দের উৎস কোন নারীর পুরুষের অনিত্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এই জড়িয়ে পড়ার ফলে তাদের এ মানসিক চাপের তো উপশম হয় না বরঞ্চ উল্টো আরো জঠিল সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা ইংরেজীতে যাকে Stress বলা হয়, তাদেরকে আরো ভালোভাবে গ্রাস করে । এসম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সমূহ আমাদের এই পত্রিকায় ‘সেক্স এবং নতুন প্রজন্ম’ কলামে তুলে ধরা হয়েছে। এমনও দেখা যায় যে এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক ছাত্রের ক্যারিয়ার তো গঠন হয় না, উল্টো ক্যারিয়ার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা এ Stress এর ফলে অকালে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এতো গেলো ছাত্র ছাত্রীদের কথা যারা কিনা দেশ গড়ার কারিগর, তারাই যদি এধরণে সমস্যার সম্মুখীন হয় তাহলে অন্যদের কথা বলাই বাহুল্য। সুতরাং অন্যান্য পেশার সাথে সম্পৃক্তদের এই Stress এ ভুগে কষ্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে, একথা নির্বিঘ্নেই বলা যায়। সমাজের এ আলোচিত সমস্যার সমাধানে আমরা ভগবদ্‌গীতায় অর্জুনের সাহায্য নিতে পারি । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যখন তিনি তার সামনে তার বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদের দেখেন, তখন তার মধ্যে এক স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব হয়েছিল। তিনিও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরেছিলেন এবং তার মধ্যেও উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণত মানসিক চাপের ফলে

আমাদের যে সমস্যার সৃষ্টি হয় তারও সেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। শ্রীমদ্ভগবদগীতার প্রথম অধ্যায়ে ঐ অবস্থায় তার কি কি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তার শরীর কম্পন কেশাথে রোমাঞ্চ সৃষ্টি হওয়া, হাত থেকে গাণ্ডিব ধন খসে পড়া, ত্বক জ্বালা করা, স্থির থাকতে না পারা, অমঙ্গল সূচক লক্ষণ দর্শন ইত্যাদি আদি বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল এখন পাঠক বর্গ আমাদের দেখার বিষয় যে, তিনি ঐ অবস্থায় কিভাবে এ মানসিক চাপের দরুন সৃষ্ট সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন। অর্জুন তখন শ্রীকৃষ্ণবে বলেন

কার্পণ্যদোষপহতস্বভাবঃ

পৃচ্ছামি ত্বাং ধর্মসংমূঢ়চেতাঃ।
যচ্ছেয়ঃ স্যন্নিশ্চিতং ক্রহি তন্মে

শিষ্যস্তেহহং শাধি মাং ত্বাং প্রপন্নম ॥ (২/৭) “কার্পণ্যজনিত দূর্বলতার প্রভাবে আমি এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছি। আমার কর্তব্য সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়ে আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি এখন কি করা আমার পক্ষে শ্রেয়স্কর। এখন আমি তোমার শিষ্য, সর্বেতোভাবে তোমার শরণাগত । দয়া করে তুমি আমাকে শিক্ষা দাও।” তিনি প্রকৃতপক্ষে এভাবে শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়ার কারণে এধরণের মানসিক চাপ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। তাই আমাদের ও উচিৎ অর্জুনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্রীকৃষ্ণের চরণে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সবরকমের মানসিক চাপ থেকে রেহায় পাওয়া। আগামী সংখ্যায় কিভাবে মানসিক চাপ থেকে রেহাই পাওয়া যায় তার সম্পর্কে বেদের আলোকে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। (চলবে)


চৈতন্য সন্দেশ মে ২০০৮ প্রকাশিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here