আতংকের নাম ভূমিকম্প!

0
21

কেন এবং কি করণীয়?
শ্রীল প্রভুপাদের শিক্ষা ও শ্রীমান চৈতন্য চরণ দাসের প্রশ্নোত্তর অবলম্বনে

সর্বাত্মা দাস

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি লোক মারা গিয়েছিল ১৫৫৬ সালের ২৩ জানুয়ারি চায়নাতে। সেই প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে প্রায় ৮ লক্ষ ৩০ হাজার লোকের প্রাণহানী ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থাৎ ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতিতে মারা গিয়েছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজার। গত ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্পে নেপালে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। এ ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট সুনামীতেও বিশ্বের ইতিহাসে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণহানী ঘটে ক্ষতি হয়েছে কোটি কোটি ডলার। ব্যাপারটি এমন কোনো দেশ একটি গুছিয়ে উঠার পরই ভূমিকম্পের মতো কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে হানা দিচ্ছে আর সবকিছু মুহূর্তেই তছনছ করে দিচ্ছে। তার চেয়ে বড় ব্যাপার হলো ভূমিকম্প এখন একটি সর্বোচ্চ আতংকের নাম হয়ে দাড়িয়েছে। ভগবান বলেছেন, এ জড় জগৎ বিপদসংকুল, প্রতি পদে পদে রয়েছে বিপদ। জনমনে এ সত্যটি যেন ভূমিকম্প নামক আতংকটি আরও স্বচ্ছভাবে প্রতীয়মান করছে।

কেন ভূমিকম্প হয়?

দুর্ভাগ্যবশত ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো হলো আমাদের পূর্বকৃত খারাপ কর্মের প্রতিক্রিয়া। ভগবানের নির্দেশনায় কর্মের আইন রয়েছে যার মাধ্যমে আমরা নিজেদের কৃত কর্মের যথাযথ প্রতিক্রিয়া লাভ করে থাকি। এ বিষয়ে ভগবদ্গীতার ৯ম অধ্যায়ে ২৯ নং শ্লোকে ভগবান ব্যক্ত করেছেন-

সমোহহং সর্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোহস্তি ন প্রিয়ঃ ।
যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্ ॥

“আমি সকলের প্রতি সমভাবাপন্ন। কেউই আমার বিদ্বেষ ভাবাপন্ন নয় এবং প্রিয়ও নয়। কিন্তু যাঁরা ভক্তিপূর্বক আমাকে ভজনা করেন, তাঁরা আমাতে অবস্থান করেন এবং আমিও তাঁদের মধ্যে বাস করি।”
এইভাবে প্রকৃতি নিরপেক্ষভাবে তার কার্য সম্পন্ন করে, যেরকম একজন নিরপেক্ষ বিচারক আইন অনুসারে বিচার কার্য সম্পন্ন করে থাকে।
যখন একজন ব্যক্তি কোনো বৈদ্যুতিক তার স্পর্শ করে তবে তিনি শক পান। এজন্যে আমরা বিদ্যুৎ বোর্ডকে দায়ী করতে পারি না। যদিও বিদ্যুৎ বোর্ডই এই বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বলে সে শকটি পেল । প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তি নিজেই দায়ী কেননা তিনি বৈদ্যুতিক তারটি স্পর্শ করেছেন। তদ্রুপ যখন আমরা খারাপ কর্ম করি এবং তার প্রতিক্রিয়া প্রাপ্ত হই। এজন্যে আমরা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সরকারকে দায়ী করতে পারি না, যদিও তিনি শক্তি সরবরাহ করছেন বলে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের কৃতকর্মের জন্য আমরাই দায়ী।
শক ও ভূমিকম্প হওয়ার পেছনে একই নীতি প্রযোজ্য। যেরকম বীজ বপন করব, সেরকমই ফল প্রাপ্ত হই। পার্থক্যটি হল বপন আর ফসল উত্তোলনের মধ্যকার সময়টি। শক পাওয়ার ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ এবং ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে তা দেরিতে হয়। এই পার্থক্যের কারণ ভিন্ন ভিন্ন ক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন সময় পর প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসে। যেরকম ভিন্ন ভিন্ন বীজ ভিন্ন ভিন্ন সময়কাল পরে ফল প্রদান করে। যেমন, দুই থেকে তিন মাস পর শস্য উৎপাদিত হয়, কিছু ফলের বীজ ফল উৎপাদন করতে বিশ বছর সময় নেয়, আবার কিছু বীজ শত বৎসর পরে ফল প্রদান করে থাকে।
তদ্রুপ আমরা পরিলক্ষণ করতে পারি যে, ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়ার উদ্ভব হয় ভিন্ন ভিন্ন সময় পর। একজন ব্যক্তি রাতে কয়েকটি আইসক্রিম খাওয়ার দরুণ সকালে উঠে হয়তো দেখে যে তার সর্দি হয়েছে, এক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াটি কয়েক ঘণ্টা পর আগত হয়। একটি শিশু অতিরিক্ত চকোলেট খাওয়ার দরুণ অল্প বয়সেই তার দাঁত নষ্ট হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখা যায় কয়েক বছর পর। একজন ব্যক্তি যদি কৈশোর থেকেই ধূমপায়ী হয় তাহলে তার মধ্য বয়সে গিয়ে হয়তো ফুসফুসের সমস্যা হতে পারে, এক্ষেত্রে কয়েক দশক পর কর্মের প্রতিক্রিয়াটি আগত হয়।
এভাবে কর্মের প্রতিক্রিয়া প্রাপ্ত হওয়ার জন্য কয়েক দশকও লাগতে পারে। এমনকি এই প্রতিক্রিয়া লাভ হতে পারে এই জীবনের পূর্বে এবং এই জীবনেরও ঊর্ধ্বে। কারণ ব্যক্তিটি আত্মা হিসেবে সর্বদা একই থাকে এবং এভাবে এক জীবন থেকে পরবর্তী জীবনে চলতে থাকে। কর্মের প্রতিক্রিয়া লাভের জন্য কেন পরবর্তী জীবনও লেগে যায়? কারণ কিছু প্রতিক্রিয়া ফলবতী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিস্থিতির প্রয়োজন হতে পারে। বিষয়টি উপলব্ধির জন্য, মহাভারতের একটি দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরা হলো:
কুরুক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ধৃতরাষ্ট্র কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার একশত পুত্র ছিল এবং এই যুদ্ধে তারা সবাই নিহত হলো। কেন?” কৃষ্ণ উত্তরে বললেন, “পঞ্চাশ জীবন পূর্বে আপনি ছিলেন একজন শিকারি, এক শিকারের সময় আপনি একটি পুরুষ পাখিকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটি উড়ে চলে গেলে ক্রোধবশত আপনি নির্মমভাবে ঐ পাখির একশত শিশু পাখিদের হত্যা করেছিলেন। যেহেতু আপনি সেই পিতা-পাখিটিকে তার শত সন্তানের বিয়োগান্তক অসহ্য বেদনা দিয়েছিলেন, তাই আপনাকেও শত পুত্রের মৃত্যুর বেদনা এখন বহন করতে হচ্ছে।” ধৃতরাষ্ট্র তা শ্রবণ করে জিজ্ঞেস করলেন, “তবে কেন আমাকে এজন্যে ৪০ জীবন অপেক্ষা করতে হলো?” কৃষ্ণ তখন উত্তর দিলেন, “আপনি গত ৪০ জীবন ধরে শত পুত্র লাভের পূণ্য সঞ্চয় করছিলেন। এরপরই ৪০ বছর পূর্বে যে পাপটি আপনি করেছিলেন তার প্রতিক্রিয়া আপনি এই জীবনে প্রাপ্ত হয়েছেন।
ভগবদ্‌গীতায় ৪/১৭ নং শ্লোকটি থেকে আমরা জানতে পারি যে, গহনা কর্মাণো গতি যেভাবে কর্ম ও তার প্রতিক্রিয়া কাজ করে তা অত্যন্ত জটিল। বর্তমান দুর্দশার কারণস্বরূপ পূর্বের কর্মের বীজ সম্পর্কে অনুসন্ধান করার জন্য ব্যাপারটি নিরর্থক। ভগবদ্গীতার ৪/১৭ নং শ্লোকটি উক্ত করে যে, “কর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন। তাই কর্ম, বিকর্ম ও অকর্ম সম্বন্ধে যথাযথভাবে জানা কর্তব্য।”
তথাপিও কর্মের প্রতিক্রিয়া একটি গড়পাতের নকশা অবলোকন করা যায়। যেমন, গত শতাব্দীতে বিশেষত দ্বিতীয় ভাগে ভ্রুণ হত্যার (Abortion) অনুমোদন বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন অসমভাবে প্রাণী হত্যা ও ভ্রুণহত্যা হয়েছিল। ঐ সময়ে প্রাকৃতিক দূর্যোগসমূহও প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। যেমন-ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর ডিজাস্টার রেডাকশন (ISDR) এর তথ্য অনুসারে, ১৯৬০ এর দিকে যত ভয়ংকর প্রাকৃতিক দূর্যোগ সাধিত হয়েছিল তার চেয়েও তিন গুণ বেশি প্রাকৃতিক দূর্যোগ সাধিত হয়েছিল ১৯৯০ এর দিকে। একসাথে বিশাল সংখ্যক লোক একই খারাপ কর্ম বা পাপ কর্ম করলে, তারা সবাই একত্রে একই প্রতিক্রিয়া লাভ করতে পারে।
এভাবে প্রকৃতির কর্মের প্রতিক্রিয়ার গড়অনুপাতিক নকশা দর্শন করা খুব একটা কঠিন নয়। আমাদের জন্য এটাই কি উপযুক্ত সময় নয়। শিক্ষা নেওয়ার এবং সে সাথে অবৈধ সঙ্গ ও আমিষাহার ত্যাগ করার? যেগুলো ভ্রুণহত্যা ও প্রাণী হত্যার মূল কারণ।

যদি ভূ-কম্পন হয়?

ভূমিকম্পের একটি আতংক এখন সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এক তথ্য মতে এমনিতে প্রায় প্রতিদিনই বিশ্বের কোথাও না কোথাও ছোট মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। কয়েকটি এলাকাতো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সেখানকার জনগণতো প্রতি মুহূর্তেই আতঙ্কে থাকে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও এ আতংক কিছুটা ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ক্ষেত্রে ভগবদ্ভক্ত ও জড়বাদী ব্যক্তির দুটি ভিন্ন ভিন্ন দর্শন রয়েছে। জড়বাদীরা নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য কিংবা প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শনের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করে থাকে। কিন্তু ভগবদ্ভক্ত এসব দূর্যোগের জন্য অবিচল থাকেন ভূমিকম্পের আগাম খবর পেয়ে, এক শিষ্য শ্রীল প্রভুপাদকে তা অবহিত করলে, শ্রীল প্রভুপাদ তার উত্তর দেন এভাবে, “তোমাদের দেশের এই অংশে প্রলয়ংকরী (Cataclysmic) ভূমিকম্পের জন্য তোমার ভবিষ্যৎবাণী এবং আমার জীবন নিয়ে শংকিত হওয়ার ব্যাপারটি অবশ্যই স্বাভাবিক। শৈশবে পিতার অধীনে পালিত ছিলাম। যাকে আমি ১৯৩০ সালে হারাই এবং তখন থেকে আমাকে একজন স্নেহময় পুত্রের মতো করে কেউই যত্ন গ্রহণ করতো না। কিন্তু সুদূর আমেরিকাতে এসে আমার যত্ন গ্রহণের জন্য কৃষ্ণ অনেক পিতাকে পাঠিয়েছেন। এজন্যে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান অনুভব করছি যে, তোমরা সবাই আমাকে নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই সর্বদা কৃষ্ণের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। এটি নিশ্চিত যে, প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের এই নির্বোধ ধারণাটি কখনোই ঘটবে না। এমনকি যদি ভূমিকম্প হয় তবে এ নিয়ে আমরা কেন ভীত হব? যেই মাত্র এর কোনো লক্ষণ দেখা যাবে, আমরা ‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্র জপ করতে থাকব। হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে করতে মৃত্যুবরণ করার জন্য এটি তখন এক মহাসুযোগ হয়ে আসবে। যদি কেউ দেহ ও মন সুস্থ থাকা অবস্থায় মহামন্ত্র জপ-কীর্তন করতে করতে মৃত্যুবরণ করে, সে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান একজন ব্যক্তি। এ সম্পর্কিত একটি প্রবাদ রয়েছে, “আমার প্রিয় রাজা, অনুগ্রহ করে তুমি মরো না। আমার প্রিয় ব্রহ্মচারী, তুমি অবিলম্বেই মৃত্যুবরণ কর। আমার প্রিয় সাধু ব্যক্তি, তুমি মরো না আবার জীবিত থেকো না।” অতএব, আমরা কোনো কসাই কিংবা রাজা নয়, আমরা সবাই হলাম ব্রহ্মচারী এবং আমাদের অনেকেই আবার সাধু ব্যক্তি। তাই, যদি ব্রহ্মচারী মৃত্যুবরণ করে, সে অবিলম্বেই বৈকুণ্ঠে যাবে এবং যদি সাধু ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য সর্বত্র সমান তিনি এ ধরাধামে কৃষ্ণসেবায় নিয়োজিত আবার মৃত্যুর পর তিনি যেখানে যাবেন সেখানেও কৃষ্ণ সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। তাই, এই ভূমিকম্প নিয়ে বিচলিত হইও না। শান্তিপূর্ণভাবে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ-কীর্তন কর, আর তোমার কর্তব্যসমূহ সুন্দরভাবে সম্পাদন কর। এক্ষেত্রে অবশ্যই যদি এরকম কোনো বিপদ আসে, অন্যদের মতো আমাকেও অবশ্যই নিজের যত্ন গ্রহণ করতে হবে। যা হোক অপ্রয়োজনে আমার জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা ভালো নয়, কিন্তু অনেক জ্যোতির্বিদ যে ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছেন তা আমি মনে করি খুব কার্যকরী নয়। আমি তোমার উপদেশ গ্রহণ করব, যেইমাত্র ক্রমাগত ছোটখাটো কম্পন দেখা দেবে আমি অবশ্যই তোমার আশ্রয়ের জন্য স্থান ত্যাগ করব।”
শ্রীল প্রভুপাদের উপরোক্ত উদ্ধৃতিসমূহ থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, সর্বতোভাবে আমাদের উচিত কৃষ্ণভাবনাময় হওয়া। আর এর মাধ্যমে আমরা ভূমিকম্প কেন যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্পূর্ণ অবিচল থাকতে সক্ষম হবো। কেননা তখন কৃষ্ণই আমাদের রক্ষা করবেন। আমাদের জন্য যেটা উত্তম কৃষ্ণ তারই প্রতিফলন ঘটাবেন। আর তাতেই বা কি আসে যায়, ভগবদ্ভক্ত তাঁর প্রতিটি অবস্থায় কৃষ্ণভাবনাময় আর সেটিই তো পরম আনন্দময়।


 

জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০১৫ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here