অবতার, প্যান্ডোরা এবং গোলকধাম

0
672

শ্যামানন্দ দাস: ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবতার ছবিটি হলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবি, ছবিটির আয়ের পরিমাণ আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ছবির নাম ‘অবতার’ শব্দটি দেখেই প্রথমে কেউ হয়ত মনে করতে পারে বোধ হয় সনাতন ধর্মে বর্ণিত অবতারদের নিয়ে এ ফিল্মটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব কিছুই না। ছবির নাম কেন ‘অবতার’ এ বিষয়ে পরিচালক জেম্স ক্যামেরন ব্যাখ্যা দেন: ‘অবতার’ শব্দটি সনাতন ধর্ম থেকে নেওয়া হয়েছে যার অর্থ শিব বা অন্যান্যদের মত কোন দিব্য মানবদেহ গ্রহণ। আর তাই ফিল্মটিতে একটি মানব অবতার দেখানো হয়েছে যারা তাদের চেতনাকে একটি শরীরের মধ্যে রাখতে সক্ষম। জেম্স ক্যামেরনকে এই কঠিন বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করার জন্য ধন্যবাদ দেয়া যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর অর্থ বিশেষ কিছু। ‘অবতার’ শব্দটির অর্থ হল কৃষ্ণ (বিষ্ণু), যিনি নিজেকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্নভাবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন। তাঁর এই আবির্ভাবকেই বলা হয় ‘অবতার’। আমাদেও স্থুল বুদ্ধি দিয়ে যদি কৃষ্ণের অবতারদের দেহ জড় উপাদান দিয়ে তৈরি বললে ভুল হবে। কেননা ভগবদগীতায় জড় উপাদান এবং ভগবানের নিজস্ব চিন্ময় প্রকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জড় উপাদানগুলি হল মাটি, জল, বায়ু, অগ্নি এবং আকাশ যেগুলি প্রকৃতিতে অনিত্য এবং একসময় বিনাশাপ্রাপ্ত হয়। পক্ষান্তরে কৃষ্ণের স্ব-প্রকৃতিকে বলা হয় পরা প্রকৃতি যা অদৃশ্য। শাশ্বত এবং অভ্রান্ত। শুধুমাত্র ভগবান কৃপা করলেই তার ইচ্ছাতে অদৃশ্যমান এ প্রকৃতি দৃশ্যমান হয়। ক্যামেরন আরো বলেন, “এটি একটি ভিন্নমাত্রিক অবতার। অবতারের শরীর একটি জৈবিক শরীর, তারা শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়। নিদিষ্ট স্থানে বসবাস করে। তাই আপনি যখন আপনার মানব শরীরে ঘুমিয়ে যান তখন আপনি একটি অবতারের শরীর নিয়ে জেগে উঠবেন। যখন দিন শেষে অবতাররা ঘুমোতে যায় তখন আপনি আবার মানব শরীরে জেগে উঠবেন। তারপর আপনাকে ঘুমাতে যেতে হবে কেননা আপনি পরিশ্রান্ত, তাই বিশ্রামের প্রয়োজন।” বিনোদনমূলক ইন্ডাষ্ট্রি কর্তৃক অবতার সম্পর্কে এটি হল তাদের ধারণা বা জল্পনা কল্পনা মাত্র। চলুন বৈদিক শাস্ত্র থেকে এর প্রকৃত সত্যটি অনুসন্ধান করি।

কতটি অবতার রয়েছে?
বৈদিক শাস্ত্রানুসারে আমরা মূলত দশাবতারের পরিচিতিই জানি। কিন্তু এর বাইরেও ভগবানের রয়েছে অনেক অনেক অবতার। এদের শ্রেণীবিভাগ রয়েছে। যেমন শক্ত্যাবেশ অবতার, মন্বন্তর অবতার ইত্যাদি। যে দশটি অবতার খুবই সুপরিচিত সেগুলো হল মৎস্য অবতার-একটি বৃহৎ মাছ রূপে ভগবান। কূর্ম অবতার কচ্ছপ রূপে, বরাহ অবতার-শূকর রূপে, শ্রী নৃসিংহ অবতার-অর্ধেক মানব শরীর অর্ধেক সিংহ শরীর রূপে, পরশুরাম-যিনি দাঁড়াল অস্ত্র হাতে অসুর নিধন করেন, বামন অবতার-ক্ষুদ্র আকৃতির ব্রাহ্মন ছেলে রূপে, শ্রী রামচন্দ্র-অযোধ্যার রাজা, শ্রী বলরাম-ভগবান কৃষ্ণের ভ্রাতা, বুদ্ধ-যিনি নাস্তিকদের প্রতারিত করেছিলেন, কল্কি-কলিযুগের শেষ প্রান্তে যিনি পাপিষ্ট লোকদের বিনাশ করবেন।

কেন ভগবান অবতার রূপ গ্রহন করেন?

শ্রীল প্রভুপাদ ভগবদ্গীতার (৪/৭) তাৎপর্যে ব্যাখ্যা করেন। “বেদ ভগবানের বাণী এবং ব্রহ্মার হৃদয়ে তিনি এই জ্ঞান সঞ্চার করেন। তাই ধর্মের বিধান হচ্ছে সরাসরিভাবে ভগবানের আদেশ (ধর্মং তু সাক্ষাদ্ভগবৎ প্রণীতম)। ভগবদ্গীতার সর্বত্রই এই তত্ত্বেও প্রতিষ্ঠা করাই হয়েছে। গীতার শেষে ভগবান স্পষ্টভাবে বলেছেন, সর্বধর্মান্ পরিতাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ- সর্ব ধর্ম ত্যাগি লও আমার শরণ। বৈদিক নির্দেশগুলি মানুষকে ভগবানের প্রতি পূর্ণ শরণাগত হতে সাহায্য করে। যখনই অসুরেরা অথবা আসুরিক ভাবাপন্ন মানুষেরা তাতে বাঁধার সৃষ্টি করে। তখনই ভগবান আবির্ভূত হন।”

আমরা কি সবাই অবতার হতে পারি?
কিছু লোক দাবি তুলে যে যেকোন জীবই ‘অবতার’ হয়ে যেতে পারে, যেমনটি ‘অবতার’ মুভিটিতে দেখানো হয়েছে। ভারত বাংলাদেশে এই দাবিটি একটু বেশিই পরিলক্ষিত হয়। এসব অবতার বা ভগবানরা হয় অতীন্দ্রিয়বাদী, অলৌকিক কিছু করতে সমর্থ হয়। আবার তাদের কেউবা রাজনীতিবিদও হয়। কিন্তু বৈদিক শাস্ত্র এসব কাউকেই অনুমোদন করে না। তারা দাবি করে যে, আকারহীন অসীম শক্তিরাজী কোন মানব জড় শরীরে প্রবেশ করে তাই তারা অবতার হিসেবে স্বীকৃত পায়। তাই সেই সূত্র ধরে আমি, তুমি সবাই ভগবান। তাই প্রত্যেক ভগবানই ভিন্ন ভিন্ন ধ্যান ধারণা অনুসারে নতুন নতুন ধর্ম উদ্ভাবন করে এবং চরমে তারা বলে, যে পথই অনুসরণ করা হোক না কেন সব পথই এক। এভাবে কেউ হয়ত দাবি তুলতে পারে সে অবতার। কিন্তু সেসব অবতাররা একসময় ভগবান যে সব অদ্ভুত শক্তি প্রদর্শন করেছিল সেসব অদ্ভুত লীলা প্রদর্শন করতে অসমর্থ। সাধারণ লোকদের প্রতারণামূলক দাবি ধর্মের পথ থেকে ধর্মানুরাগী মানুষদের বিচ্যুতি করে। তাই ভগবান বলছেন, “হে ভারত, যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মেও অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবর্তীণ হয়।” (ভ.গীতা-৪.৮)

সৌন্দর্যে হতাশা
ক্যামেরনের থ্রি ডি সাইন্স ফিকশন মুভি অবতার বিশ্বের অনেক লোকদের মোহিত করে। মুভিটিতে যে জগতটি দেখানো হয় সেটি তাদের কাছে এতটাই বাস্তব বলে মনে হয় যে তারা সেরকম একটি জগতে যেতে উদ্গ্রিব হয়ে উঠে। তারা ঐ জগতের সৌন্দর্যের অভিজ্ঞতা অর্জনের ফলে এ জগতের প্রতি হতাশা অনুভব করে। ফ্যান ফোরাম সাইট ‘অবতার ফোরামস্ এ “সরাসরি সংস্পর্শিত না হয়ে প্যান্ডোরার ভৃবনে হতাশার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করার পন্থা”-এ শিরোনামে একটি থ্রেড প্রদর্শন করা হয়। ‘অবতার’ মুভিটি যাত্রার শুরুতেই, CNN এর রিপোর্ট মতে, যখন এ থ্রেড প্রদর্শিত হয় তখন এক হাজারের ও বেশি লোক, এটি পেয়ে হতাশার অভিজ্ঞতা থেকে এ প্রতিযোগীতায় তারাও লিপ্ত হতে চায় বলে প্রকাশ করে। এক কথায় ‘অবতার’-এর জগতে তারা অংশগ্রহন করে সমস্ত হতাশাকে দূরীভুত করতে চায়। উপরোক্ত বিষয়টি এতই জনপ্রিয় হয় যে, ফোরাম অ্যাডমিনিষ্ট্রেটর দ্বিতীয় থ্রেড সৃষ্টি করে যাতে করে লোকেরা মুভিটি নিয়ে তাদের অনুভূতিগুলো ব্যক্ত করে। এক ব্যক্তি ছবিটি দেখার পর আত্মহত্যা করার জন্য মনস্থির করেছে বলে জানান। “আমি যখন অবতার মুভিটি দেখি আমি হতাশ অনুভব করি কেননা আমি সে জগতে নেই। এরকম আশ্চর্যকর প্যান্ডেরা জগত দেখে গাঢ় নীল মানুষদের একজন হতে চাই। আমি ফিল্মটিতে যা হয়েছে তার ভাবনা কোনমতেই থামাতে পারছি না। আমার হৃদয় চোখের জলে সিক্ত হয়েছে। আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছি এজন্যেই যে, যদি আমি তা করি তবে আমি সেই অনুরূপ প্যান্ডোরা ভুবনে জন্ম নিতে পারব এবং অবতারদের একজন হতে পারব।” অন্য আরেকজন অভিব্যক্তি লিখেছিলেন, “আমি অবতার ছবি দেখার পর সকালে ঘুম থেকে জাগি, তখন এই বিশ্বটাকে মনে হচ্ছিল ধূসর। আমি সারাজীবন ধরে যা কিছুই এখানে করেছি তার কোন মানে নেই। তার মূল্যই হারিয়ে গেছে। অর্থহীন লাগছে সবকিছু। এ জগতে আর কিছু করার কোন অভিপ্রায় দেখছি না। আমি মৃত্যুবরণ করে সে জগতে যেতে অভিলাষ করছি।” স্টীফেন কুইন্টজেল, নিউইয়র্কের বেথ ইসরাইল মেডিকেল সেন্টারের লুইন আর্মস্ট্রং সেন্টার ফরা মিউজিক এবং মেডিসিনের মেডিকেল ডিরেক্টর এবং মনস্তত্ববিদ, এ প্রসঙ্গে বলেন,“কল্পনার জীবন বাস্তব নয় এবং এটা কখনো হবেও না। কিন্তু কিভাবে এ রকম একটি কল্পনার জগত তৈরি করা হয়েছে তা দেখে বিস্ময়াভূত। প্রযুক্তি সেইরকম বিস্ময়কর জগত সৃষ্টি করতে পেরেছে যা বাস্তব জীবন কখনোই ঐ জগতের মত নয়। এ বাস্তব জগতকে এর মাধ্যমে অযথাযথ বলে প্রতিপন্ন করছে।

চিন্ময় জগত
মুভিটির কল্পনার জগতটি অবাস্তব, কিন্তু একটি বাস্তব জগত রয়েছে যেটি এর থেকেও অনন্ত গুন সুন্দর এবং আমরা সবাই চাইলেই সে জগতে যেতে পারি। সেটি হল চিন্ময় জগত। ভগবানের রাজ্য, আমাদের সবার প্রকৃত আলয়, যেটি বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। সে চিন্ময় জগতের অধিবাসীদের গায়ের রং দিব্য রঙে উদ্ভাসিত, তাদের চোখ পদ্মফুলের মত, তাদের বসন হলুদভাব রঙের, তারা চিন্ময় সৌন্দের্যে উদ্ভাসিত। তারা চির যৌবন, তাদের চারটি হস্ত রয়েছে, মনিরত্ন খোচিত মূল্যবান অলঙ্কারে সুসজ্জিত, পুষ্পমাল্য দ্বারা বিভুষিত, পুষ্প দিয়ে তারা তাদের শরীরকে সুসজ্জিত করে। সে সমস্ত দিব্য দেহধারীরা এতটাই আর্কষনীয় যে যা অচিন্ত্য। বেদে সে জগত সম্পর্ক বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সে জগতের ধ্যান করলে আত্মহত্যার মনোভাব জন্মে না, বরং চিন্ময় আনন্দের স্ফুরণ ঘটে। বরঞ্চ সমস্ত হতাশা বিদুরিত হয়। প্রকৃতপক্ষে এ দিব্য জগতের বর্ণনা অধ্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত অবতার কারা সেই তত্ত্ব প্রকাশিত হয় এবং অসুস্থ প্যান্ডোরা জগতের অনুভূতি তখন তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুভব করে। হরে কৃষ্ণ।

(মাসিক চৈতন্য সন্দেশ এপ্রিল ২০১১ সালে প্রকাশিত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here