অপ্রাকৃত স্বপ্নের যন্ত্র

0
36

জাগতিক জীবনের স্বপ্নে আকড়ে ধরে থাকা জীবাত্মাদের স্বপ্নের কোনো গুরুত্ব রয়েছে কী?

দ্রুতকর্মা দাস

সূর্য অস্তমিত হওয়ার সাথে সাথে দিনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় তাপও হ্রাস পেতে শুরু করেছে। যে ভদ্রলোকদের সাথে আমার সাক্ষাৎ ঘটতে চলেছে তারা রাজধানীর একটি সবচেয়ে ব্যয়বহুল হোটেল ট্যাটিও এর একটি কোণে বসে আছে। হোটেলের চারদিকে ফ্রঞ্জিপনি পুষ্পের সুবাতাস বইছে। তাদের সম্মুখে আসতেই তিনজন বিশিষ্ট পার্টির কর্মকর্তা অভিবাদন জানাতে দাড়িয়ে গেলেন। এখানে পার্টি বলতে নির্বাচনী ব্যালটের জন্য যে দলগুলো আপনারা দেখে থাকেন তাদেরকে বোঝাচ্ছিনা, অন্যদের আড়ালে বিশেষ ব্যক্তিবর্গ যাদের হয়তো অনেকেই জানে আবার নাও জানতে পারে। কেউ হয়তো অন্যরা তা জানে বা নাও জানতে পারে। আমরা সবাই হালকা রঙের স্যুটের সাথে সিল্ক শার্ট ও টাই পড়ে আছি। আমাদের কারো বয়সই পঁয়তাল্লিশ ঊর্ধ্ব নয় এবং আমার বয়স ছিল তিরিশ। করমর্দনের সময় লক্ষ্য করলাম আমারই মতো তাদের আঙ্গুলে শোভা পাচ্ছে দামী আংটি এবং হীরা ও স্বর্ণ খচিত ঘড়ি। পার্টির সঙ্গে এভাবেই পরিচয় পর্বের সমাপ্তি ঘটল।
ওদিকে আমার পৃষ্ঠপোষক মৃদুভাবে হাসছিল, তার চোখগুলি এক কোণে কুঁচিত হচ্ছিল। তার ধবধবে সাদা দাঁতগুলো পরিপাটি গোঁফের নিচে দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। তিনি কোমলভাবে পরিচয় পর্বটি সেরেছিলেন। আমরা সবাই একটি টেবিল বসে পড়লাম যার ওপরে ছিল পরিচ্ছন্ন কিছু গ্লাস, একজন ওয়েটার রৌপ্য থালায় করে কিছু পানীয় নিয়ে এসে দ্রুতই উদাও হয়ে গেল। ভদ্রলোকেরা কার ও টেনিস নিয়ে কথা বলাবলি শুরু করল এবং এক পর্যায়ে সেই কথাবার্তা ব্যবসা সম্বন্ধীয় হয়ে গেল। হঠাৎ এক সবচেয়ে উর্ধ্বতন পার্টি সদস্য বলে উঠলেন যে, আমাকে কোনো একটি পাবলিক পার্টির নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হবে এবং তারপর সংসদ সদস্য। আমার পার্টি বা দলটি সরকারি জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হবে এবং আমি তখন মন্ত্রী হয়ে যাব। এটি শুনে বাকি তিনজন আমার দিকে তাকাতে শুরু করল। তারপর সেই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা মৃদু হেসে আমাকে বলল “এবং তারপর….. আপনাকে গুপ্ত হত্যা ( assassinated) করা হবে।”
আমি তখন আমার পৃষ্টপোষকের দিকে তাকালাম, এবং তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন। বাকি তিনজন তখনও আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি নম্রস্বরে মৃদু হেসে বললাম “ভাল”। এই বলে পানীয়তে খানিকটা চুমু দিলাম। প্রত্যেকেই তখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে মৃদু হাসতে লাগল।
আমাদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, আমরা এই শরীরগুলোর কোনটাই নই। কিছু সময়ের জন্য আমরা নির্দিষ্ট শরীরে অবস্থান করি, তারপর সেটি ভুলে যাই। অতএব, শরীরটি প্রকৃতপক্ষে একটি মানসিক কাঠামো, যেটি অনেকটা স্বপ্নের মতোই, কিন্তু আত্মা এ সমস্ত মানসিক কাঠামো থেকে ভিন্ন।”
পার্টির মধ্যে আমার অবস্থান নিয়ে তখন স্বস্তি অনুভূত হল। এরপরই আমি জেগে উঠলাম। আমি এতক্ষণ আমার একটি অদ্ভুত স্বপ্নের কথা বলছিলাম। কোত্থেকে যে এর আগমন হল?
বোধহয় পূর্বজন্ম থেকে। প্রাচীনকালে একবার মহর্ষি নারদ রাজা প্রাচীনবহিকে বলেছিলেন: “মাঝে মাঝে আমরা এমন সব স্বপ্নের অভিজ্ঞতা লাভ করি যেগুলো এ বর্তমান শরীরে ইতোপূর্বে কখনো ঘটেনি বা শোনা যায়নি। আমার প্রিয় রাজা, জীব তার পূর্ব শরীরের কারণেই সব ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও চিত্র ধারণ করে। এটি নিশ্চিত জেনে রাখ। কেউ মানসিকভাবে কোনোকিছুই উদ্ভাবন (concoct) করতে পারে না যদি না তা পূর্বে কোনো না কোনোভাবে ঘটেছে।”
পূর্বজন্মে হয়তো আমি একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষি, উপেক্ষিত কনিষ্ট রাজনীতিবিদ ছিলাম এবং কোনো চক্রান্তে জড়িত হয়ে আমার মৃত্যু ঘটেছিল। আমি তা নিশ্চিত জানি না, কিন্তু আমার স্বপ্নটি বিবেচনা করলে যে ভাবনাটি উদিত হয় তা মাঝে মাঝে আমার মনকে অতিক্রান্ত করে। যদিও বর্তমান জন্মে আমি যখন যুবক ছিলাম আমি জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরেন অ্যাফিয়ার্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম এবং তখন দেশের কোনো ইন্টিলিজেন্স সার্ভিসে যোগ দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। সম্ভবত ওটাই ছিল পূর্বকৃত কর্মের সর্বশেষ উচ্ছিষ্ট অবশিষ্ট। অবশ্য, আমি একজন ঔপন্যাসিক, দার্শনিক ও কবিও হতে চেয়েছিলাম ।

একটি স্বর্ণ পর্বতের স্বপ্ন

স্বপ্ন এবং অতীত জীবন। এ বিষয়ে আমার গুরুদেব শ্রীল প্রভুপাদের ব্যাখ্যা খুবই পছন্দনীয় “মাঝে মাঝে স্বপ্নে আমরা দেখি যে, আমরা আকাশে উড়ছি, যদিও বাস্তব জীবনে উড়ার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এর মানে হল পূর্ব জীবনে কোনো এক সময় হয়তো কোনো দেবতা বা নভোচারী হয়ে আকাশে উড়েছিলাম। সেই ধারণাটি মনের মধ্যে এখনও সঞ্চিত রয়েছে এবং হঠাৎ তা প্রকাশিত হয়। এটি অনেকটা জলের গভীরে উৎসেচন/গাঁজন (fermentation) প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মতই। যা জলের ওপর বুদবুদ আকারে মাঝে মাঝে প্রকাশিত হয়।”
মনের মধ্যে সঞ্চিত অনুভূতি বা ছাপসমূহ শুধু যে পূর্বের মনুষ্য শরীরের অভিজ্ঞতা থেকে উত্থিত হতে পারে তা নয়, বরং মনুষ্য ছাড়াও অন্য শরীরে থাকাকালীন অভিজ্ঞতা থেকেও আসতে পারে। এক্ষেত্রে আমার সেই স্বপ্নটি অবশ্যই পূর্বের মনুষ্য জীবন থেকে উত্থিত। স্বপ্নের চিত্রগুলি বর্তমান জীবন থেকেও উত্থিত হতে পারে।
এই জীবনে, আমি নিশ্চিতভাবে স্বপ্নের সেই পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা বাস্তবে লাভ করিনি। কিন্তু সম্ভবত আমার মন ভিন্ন ভিন্ন চিত্র ব্যবহার করেছে, এই যেমন কিছু চিত্র আসতে পারে হয়তো কোনো ভুলে যাওয়া গোয়েন্দা ফিল্ম বা ষড়যন্ত্রমূলক কোনো উপন্যাসের কাহিনি থেকে। যেগুলোর সমন্বয়ে মন একটি দৃশ্য দাঁড় করিয়েছে। নারদ মুনি এটিকে ব্যাখ্যা করেছেন, “মনের মধ্যে সঞ্চিত ভিন্ন ভিন্ন চিত্রগুলো একত্রিত হয়ে উত্থিত হয়, আর তাই এই চিত্রগুলো মাঝে মাঝে এমনভাবে উত্থিত হয় যেগুলো ইতোপূর্বে দৃশ্যমান বা শ্রুতিত নয় ।”
এ বিষয়ে শ্রীল প্রভুপাদ একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত দিয়েছেন : “মাঝে মাঝে স্বপ্নে আমরা হয়তো কোনো স্বর্ণ পর্বত দেখতে পারি, এবং এটি ঘটে পৃথকভাবে স্বর্ণ ও পর্বত দর্শনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার কারণে। স্বপ্নে, মোহবশত আমরা এই পৃথক বিষয়গুলোকে একত্রে দর্শন করি। এজন্যে আমরা স্বর্ণ পর্বত দেখতে পাই
হয়তো আমার স্বপ্নটি স্বর্ণ পর্বতের ন্যায় কোনো উদ্ভাবিত মোহ ছিল। কিন্তু এখানে আরেকটি সম্ভাবনা রয়েছে। স্বপ্ন হয়তো ভবিষ্যতের শরীর নিয়ে কোনো সূত্র প্রদান করতে পারে। মন শুধু যে পূর্ব শরীরের পুঞ্জীভূত চিত্র প্রদান করে তা নয় এটি কামনা-বাসনাগুলোকেও সঞ্চিত রাখে যা ভবিষ্যতের শরীর লাভের দিকে পরিচালিত করে। জন্ম-মৃত্যুর চক্রের মধ্যে আত্মার এই বদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভের জন্য সঞ্চিত জড় কামনাগুলোর পরিসমাপ্তি করতে হয়। আর এই পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। তাই হয়তো আমার ভবিষ্যত জীবন নির্ধারিত হয়েছিল একজন যুবক রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য যে একটি চক্রান্তের কারণে মৃত্যুবরণ করবে। যেহেতু আমি কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ করেছি, তাই আমার সেই কর্মের প্রতিক্রিয়া বাস্তব জীবনে ঘটার পরিবর্তে স্বপ্নের মধ্যে ঘটেছে।

স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন

স্বপ্ন এবং শারীরিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্বন্ধটা বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। স্বপ্ন ঘটে মনের মধ্যে, কিন্তু তবুও সেটি শরীরের সঙ্গে সম্বন্ধীয়। যদি দেহ নির্দিষ্ট একটি স্তরে না পৌছায় তবে নির্দিষ্ট ধরনের স্বপ্ন সাধিত হয় না, এমনকি বর্তমান ও পূর্ব জন্মের চিত্রগুলো মনের মধ্যে সঞ্চিত থাকলেও। দৃষ্টান্তস্বরূপ শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন, “নির্দিষ্ট ইন্দ্রিয়সমূহের বেড়ে না উঠার কারণে একটি শিশু বা বালক স্বপ্নে কোনো যুবতী মেয়েকে দর্শন করবে না।” কিন্তু ইন্দ্রিয়সমূহ যখন পূর্ণরূপে বেড়ে উঠে তখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। “একজন যুবকের স্বপ্নে এক যুবতীকে দর্শন করার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ প্ৰজনক পদার্থ নির্গত হতে পারে।”
আরো গভীরতর স্বপ্ন সূক্ষ্ম জড় শরীরকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা দেয়। মাঝে মাঝে যখন আমি স্বপ্ন দেখি, তখন হঠাৎ জেগে উঠে দেখি আমি অনেক দূরে চলে গিয়ে আবার এ শরীরে ফিরে এসেছি। আমি আসলেই এ শরীর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম? আমি ঠিক জানি না, কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ একবার বলেছিলেন, “যখন আমরা স্বপ্ন দেখি, আমাদের শরীরটি বিছানায় শুয়ে থাকে, কিন্তু আমরা চলে যাই অন্য কোথাও।”
এই ব্যাপারটি ঘটে এ জন্যেই কারণ চেতন আত্মা এই জড় শরীর থেকে ভিন্ন। স্বপ্ন দেখার সময় আমরা একটি ভৌতিক শরীর সম্পর্কে হয়তো অবগত থাকতে পারি। আমাদের জড় শরীরটি যখন জেগে উঠে তখন বুঝতে পারি শরীরের সেই অভিজ্ঞতাটি প্রকৃতপক্ষে স্বপ্নে সাধিত হয়েছে। বিষয়টি সতর্কভাবে ভাবুন, আমি কি বোঝাতে চাচ্ছি তা বোধগম্য হবে।
শ্রীল প্রভুপাদ একজন জার্মান মনস্তত্ত্ববিদ ড. কার্লফ্রাইড গ্রুফ ভন ডার্কহেইমের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন, “যখন আমরা স্বপ্ন দেখি, আমরা ভুলে যায় যে, বিছানায় শুয়ে আছি। আমরা ভিন্ন শরীর ও স্থানে কার্য করি। তদ্রুপ দিনের বেলায় আমরা আমাদের স্বপ্ন সম্পর্কে ভুলে যায়, অথচ স্বপ্নে আমরা অনেক স্থানে ভ্রমণ করি। উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের চেতন আত্মা বর্তমান থাকে এবং আমরা অবগত থাকি যে, উভয় শরীরেই আমাদের অস্তিত্ব রয়েছে। অতএব, আমাদের এটি উপলব্ধি করতে হবে যে, আমরা এই শরীরগুলোর কোনটাই নই। কিছু সময়ের জন্য আমরা নির্দিষ্ট শরীরে অবস্থান করি, তারপর সেটি ভুলে যাই। অতএব, শরীরটি প্রকৃতপক্ষে একটি মানসিক কাঠামো, যেটি অনেকটা স্বপ্নের মতোই, কিন্তু আত্মা এ সমস্ত মানসিক কাঠামো থেকে ভিন্ন।”
তাই শরীর ও জড় চেতনায় জাগ্রত স্তরের অবস্থাও একটি স্বপ্নের অংশবিশেষের মতোই। আমার রাতের সেই স্বপ্নগুলো স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্নের মতোই। এটিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে বললে, এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে বলা চলে অপ্রাকৃত স্বপ্নের মেশিন বা যন্ত্র। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, “এই জড় সৃষ্টি হলো চিন্ময় আত্মার স্বপ্ন। যখন জীবাত্মা পরমেশ্বর ভগবানকে অনুকরণ করতে চায় তখন তাকে এই জড় সৃষ্টির স্বপ্নভূমিতে রাখা হয়।”
মাঝে মাঝে মায়ার এই স্বপ্নভূমিতে কৃষ্ণ আবির্ভূত হয়ে আমাদের জাগ্রত হওয়ার জন্য উৎসাহ প্রদান করে। ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তার ভজনে এ বিষয়টি লিখেছেন, “জীব জাগো, জীব জাগো! কত নিদ্রা যাও মায়া পিশাচীরও কোলে।”

চিন্ময় স্বপ্ন

যখন কেউ জাগতিক স্বপ্ন থেকে জাগ্রত হয়, তখন সে চিন্ময় স্বপ্ন দর্শন করতে পারে, যেমন : কৃষ্ণ, তাঁর অবতারসমূহ, তার ভক্তবৃন্দের স্বপ্ন।
প্রায় ৬ শত বছর পূর্বে, ভগবানের এক মহান ভক্ত মাধবেন্দ্র পুরী একাই পবিত্র তীর্থভূমি বৃন্দাবনে ভ্রমণ করেছিলেন, যেখানে কৃষ্ণ হাজার হাজার বছর পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এক রাতে কৃষ্ণ মাধবেন্দ্র পুরীর স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে বললেন, তার অপ্রাকৃত বিগ্রহ নিকটবর্তী একটি জঙ্গলের মধ্যে ভূমির অভ্যন্তরে শায়িত আছে। ঘুম থেকে জেগে উঠে মাধবেন্দ্র পুরী ও কিছু গ্রামবাসী স্বপ্নে দেখা সেই স্থানে গিয়ে সেই বিগ্রহের সন্ধান লাভ করে। মাধবেন্দ্র পুরীপাদ সেই বিগ্রহকে গোবর্ধন পর্বতের শিখরে অভিষিক্ত করান এবং ঐশ্বর্য ও ভক্তি সহকারে তার আরাধনা করেন। ভক্তের স্বপ্নে কৃষ্ণের নির্দেশনা প্রাপ্ত হওয়ার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ।
কৃষ্ণকেন্দ্রিক আরেকটি স্বপ্ন রয়েছে আরেক মহান ভক্ত পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির দৃষ্টান্তে, যিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর লীলাকালীন সময়ে পুরী শহরে বাস করছিলেন। পুরীতে একটি জগন্নাথ মন্দির রয়েছে। যখন পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি লক্ষ্য করলেন যে, মন্দিরের পূজা অর্চনায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। যার পরনায় তিনি রাগান্বিত হয়ে দোষ দর্শন করলেন। তখন এক স্বপ্নে প্রভু জগন্নাথ আবির্ভূত হয়ে পুণ্ডরীকের মনোভাবে অসন্তুষ্টতার কথা প্রকাশ করে তাঁর গালে চড় মেরেছিলেন। তিনি তখন জেগে উঠে দেখেন স্বপ্নে জগন্নাথ কর্তৃক চড় মারার ফলে তাঁর গাল ফুলে গেছে।
স্বপ্নের মাধ্যমে পূর্ব সতর্কবার্তাও প্রাপ্ত হওয়া যেতে পারে । শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পিতা-মাতা হলেন জগন্নাথ মিশ্র ও শচীদেবী। ভগবানের আবির্ভাবের পূর্বে জগন্নাথ মিশ্র শচীদেবীকে বললেন, “এক স্বপ্নে আমি দর্শন করলাম যে, ভগবানের এক দ্যুতিময় আলো আমার হৃদয়ে প্রবেশ করেছে। আমার হৃদয় থেকে তা তোমার হৃদয়ে প্রবেশ করে। আমি এর মাধ্যমে বুঝতে পারলাম যে, শীঘ্রই এক মহান ব্যক্তির জন্ম হতে যাচ্ছে।”
পাঁচ হাজার বছর পূর্বে, যখন কৃষ্ণ এই ধরাধামে অবস্থান করছিলেন, তখন মথুরা শাসন করতেন এক কলুষিত রাজা কংস। কৃষ্ণ যে কংসকে হত্যা করবেন তা পূর্ব নির্ধারিত ছিল। লীলাপুরুষোত্তম গ্রন্থে, শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছিলেন : “স্বপ্নে তিনি দর্শন করেছিলেন, অনেক ধরনের ভূত-প্রেত গাধার গাড়িতে করে চড়ছে। তিনি এটিও দর্শন করছিলেন যে, কেউ একজন তাকে বিষ প্রদান করছে, আর তিনি তা পান করছেন। তিনি এটিও দেখলেন যে, তিনি বিবস্ত্র হয়ে পড়েছেন এবং পুষ্পমাল্য পরিহিত হয়েছেন, তার সারা শরীরে তেল মর্দন করা হয়েছে।” কংস এই সমস্ত কিছু দর্শন করে বুঝতে পারল যে, এগুলো হলো তার অবধারিত মৃত্যুরই লক্ষণ।
আরেকটি অপ্রাকৃত স্বপ্নের দৃষ্টান্ত হলো ঊষা। যিনি হলেন বানাসুরের রূপবতী কন্যা। তিনি রক্ষণ বেষ্ঠিত এক প্রাসাদে বাস করতেন। যেখানে তার পিতা তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছিলেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তিনি এমন এক সুদর্শন যুবকের সাহচর্য উপভোগ করছেন যাকে ইতোপূর্বে কখনো দেখেননি। হঠাৎ নিদ্রা ভঙ্গ করে তার সখীদের উপস্থিতিতে বলে উঠলেন, “হে আমার প্রিয়, তুমি কোথায়?” চিত্রলেখা নামে এক সখির কাছে তিনি তা ব্যাখ্যা করলেন, “হে সখী, দীর্ঘবাহু, পীতবসন ও কমললোচন অপূর্ব সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ এক রাজকুমারকে আমি স্বপ্নে দেখলাম । এই দীর্ঘ-বাহু, সুঠাম দেহী ও মনোহর যুবক যে কোনো যুবতীর মন হরণ করবে। আমার বলতে গর্ব হচ্ছে যে, সেই অপূর্ব সুন্দর রাজকুমারটি আমাকে চুম্বন করছিল; আর আমি তার এই চুম্বন সুধা আস্বাদন করছিলাম। কিন্তু বলতে দুঃখ হচ্ছে যে, তারপর সে অন্তর্হিত হয়ে যায় এবং আমাকে গভীর হতাশা ও নৈরাশ্যের মধ্যে ফেলে রেখে চলে যায়। হে সখী! সেই অপূর্ব সুন্দর হৃদয়বল্লভ রাজকুমারকে আমি আকুল হয়ে খুঁজছি।”
এ সব কথা বলতেই চিত্রলেখা উর্ধ্বলোকবাসী বহু দেবতা, গন্ধর্ব, সিদ্ধ, চারণ, কিন্নর, দৈত্য, বিদ্যাধর, যক্ষ এবং বহু মানুষের প্রতিকৃতি এঁকে ফেলল। চিত্রলেখা বহু ছবি আঁকল বিভিন্ন মানুষের ছবির মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের পিতা বসুদেব সহ বৃষ্ণিবংশ শ্রীকৃষ্ণের পিতামহ শূরসেন, বলরাম, শ্রীকৃষ্ণ ও অন্যান্য বহু লোকের প্রতিকৃতি সে অঙ্কন করল। শ্রীল প্রভুপাদ লিখেছেন, “চিত্রলেখা ছিল এক বিশিষ্ট অতীন্দ্রিয় শক্তিময়ী যোগিনী। সে এবং ঊষা উভয়েই তাকে কখনো না দেখলেও তাঁর নামের সঙ্গেও কখনো পরিচিত না হলেও চিত্রের মাধ্যমে ঊষার কাছ থেকে তার পরিচয় লাভ করে। যোগিনী চিত্রলেখা অচিরেই উপলব্ধি করল যে, চিত্রটি হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধের।”

গুরুদেবকে স্বপ্নে দর্শন

মাঝে মাঝে শুদ্ধ ভক্তরা স্বপ্নে গুরুদেবের নির্দেশনা প্রাপ্ত হন। শ্রীল প্রভুপাদের ক্ষেত্রে এটি ঘটেছিল । বৃদ্ধ জীবনের অধিকাংশই অভয়চরণ দে (প্রভুপাদ) তার পত্নী ও সন্তানদের সাথে কাটিয়েছিলেন । বৈদিক প্রথা অনুসারে জীবন সায়াহ্নে পরিবারের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে সন্ন্যাস আশ্রমে প্রবেশক্ষকরা উচিত। শ্রীল প্রভুপাদ প্রথমদিকে তা করতে অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু ১৯৪৪ সালে যখন তাঁর বয়স ৪৮ বছর, তার গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী এক স্বপ্নে তার কাছে আবির্ভূত হন এবং গৃহজীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস নেওয়ার আহ্বান জানান।
শ্রীল প্রভুপাদের জীবনীতে সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী লিখেছেন, “অভয় তখন গভীর আবেগঘন অবস্থায় জেগে উঠলেন। তিনি ভাবলেন, “কি ভয়ঙ্কর!” তিনি জানতেন এটি সাধারণ কোনো স্বপ্ন ছিল না, তবুও সে অনুরোধ তাঁর কাছে দুরুহ ও অসম্ভব মনে হল। সন্ন্যাস গ্রহণ কর! অন্তত এটি এমন কিছু নয় যে, অবিলম্বেই করা যায়…… তিনি তাঁর কর্তব্য সম্পাদন চালিয়ে যেতে লাগলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন তাঁকে বিহ্বল করেছিল।
১৯৪৮ সালে ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর পুণরায় শ্রীল প্রভুপাদের স্বপ্নে আবির্ভূত হলেন এবং সন্ন্যাস গ্রহণের জন্য পুণরায় আদেশ দিলেন। সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী লিখেছেন, “অভয় বিস্ময়াভূত হয়ে জেগে উঠলেন। তিনি এই নির্দেশনাটির সঙ্গে সেই প্রথম নির্দেশনার যোগসূত্র উপলব্ধি করলেন যেটি তিনি প্রাপ্ত হয়েছিলেন, কলকাতায় শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎকারে। সেই একই নির্দেশনা তিনি পুনরায় তাঁর এক পত্রে উল্লেখ করেছিলেন : ইংরেজি ভাষায় প্রচার কর এবং পশ্চিমা বিশ্বে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার কর।” অভয় তখন উপলব্ধি করলেন যে, তাঁর গুরুদেব স্বপ্নে এটিই বলছেন যে, “এখন সন্ন্যাস গ্রহণ কর এবং তুমি এই মিশনটি সম্পন্ন করতে সমর্থ হবে। পূর্বে বা প্রথমদিকে সময়টি যথার্থ ছিল না।”
১৯৫৯ সালে শ্রীল প্রভুপাদ সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন এবং ১৯৬৫ সালে জলদূত জাহাজে করে তিনি আমেরিকার উদ্দেশ্যে গমন করলেন। তাঁর সেই যাত্রায় তিনি সামুদ্রিক অসুস্থতাসহ হার্ট অ্যাটাকের কবলে পড়েন। হার্ট অ্যাটাকের দ্বিতীয় রাতে শ্রীল প্রভুপাদ একটি স্বপ্ন দেখলেন, যেটি সৎস্বরূপ দাস গোস্বামী বর্ণনা করেছেন এভাবে : “ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সমস্ত অবতারসহ জাহাজটিকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং তিনি শ্রীল প্রভুপাদকে ভয় না করে তার সঙ্গে আসতে বললেন। প্রভুপাদ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সুরক্ষা বিধান সম্পর্কে নিশ্চিত অনুভব করলেন এবং হার্ট অ্যাটাক আর পুণরায় হল না।
অনেক বার শ্রীল প্রভুপাদের শিষ্যগণ শ্রীল প্রভুপাদকে স্বপ্নে দর্শন করেছেন এবং এখনও করেন। ১৯৭০ সালে শ্রীল প্রভুপাদ তার এক শিষ্য সুদামার উদ্দেশ্যে লেখা এক পত্রে একটি কথা উল্লেখ করেন, যিনি টোকিওতে একটি মন্দির করার প্রয়াস করছিলেন: “আসলে, আমি লন্ডন থেকে তোমার কথা ভাবছিলাম এবং কৃষ্ণের কৃপায় আমার উদ্বিগ্নতা স্বপ্নের মাধ্যমে তোমার কাছে দৃশ্যমান হল।”
আমিও শ্রীল প্রভুপাদকে নিয়ে কিছু বিরল স্বপ্ন দর্শন করি, এমনকি মন্দিরের বিগ্রহ ও ইস্কন ভক্তদেরকে নিয়েও আমি ঐ স্বপ্ন দর্শন করি কিন্তু সেগুলোতে কোনো নির্দেশনা প্রাপ্ত হইনি। তবে আমি সেই স্বপ্নগুলোকে পবিত্র অপ্রাকৃত নিদর্শন হিসেবে শ্রদ্ধা করি। এই সব কোথায় আমাকে ছেড়ে যায়? আমি নিজেকে বিবেচনা করি যে, এখনও জাগতিক জীবনের স্বপ্নকে আমি আঁকড়ে ধরে আছি। কিন্তু আমি জেগে উঠছি। আমি পূর্ণরূপে প্রকৃত পারমার্থিক পরিচয়ের পথে জাগ্রত হইনি, কিন্তু আমি মনে করি একদিন না একদিন আমি তা করতে পারব। শ্রীল প্রভুপাদ প্রায়ই বলতেন যে, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অপ্রাকৃত শব্দ তরঙ্গের শক্তিতে আমরা জাগতিক জীবনের স্বপ্ন থেকে জাগ্রত হয়ে উঠি এবং এক্ষেত্রে বৈদিক সাহিত্যের বাণীকে তুলনা করা যায় অপ্রাকৃত অ্যালার্ম ঘড়ির সঙ্গে। আমি অ্যালার্ম ঘড়ির আওয়াজ শ্রবণ করতে পারি। আমি উপলব্ধি করতে পারি যে, আমার জেগে উঠা উচিত এবং আমাকে কিসের পথে জাগ্রত হওয়া উচিত সে বিষয়ে কিছুটা ধারণা রয়েছে। কিন্তু আমার মন এখন জাগতিক জীবনের স্বপ্নের অবশিষ্ট কিছুকে আকড়ে ধরছে যদিও আমার প্রকৃত স্বপ্ন কোনো না কোন সময় আমার মনকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে পূর্ণরূপে নিয়োজিত করতে পারি।

দ্রুতকর্মা দাস আন্তর্জাতিক ব্যাক টু গডহেডের একজন সাধারণ সম্পাদক এবং Forbidden Archeology: The hidden history of the human race এর সহ-লেখক, যেটি ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত একটি জনপ্রিয় গ্রন্থ।


 

জানুয়ারি-মার্চ ২০১৬ ব্যাক টু গডহেড

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here